ALL NOTES
ইতিহাসের ধারণা
প্রথম অধ্যায় • ভূমিকা ও পরিচিতি
ইতিহাস কেবল রাজা-বাদশাদের যুদ্ধের গল্প নয়। ইতিহাস হলো মানুষের এগিয়ে চলার কাহিনী। কীভাবে মানুষ বনের পশু শিকার থেকে শুরু করে আজকের আধুনিক সভ্যতায় পৌঁছাল, কীভাবে তারা আগুন জ্বালাতে শিখল, চাকা বানাল এবং সমাজ গড়ে তুলল—এসব কিছুর ধারাবাহিক বিবরণই হলো ইতিহাস। এসো, আমরা সময়ের হাত ধরে অতীতে ফিরে যাই।
ইতিহাস কী?
পুরনো দিনের কথা এবং মানুষের জীবনযাত্রার পরিবর্তনের ধারাবাহিক কাহিনী। কেন আমরা অতীত সম্পর্কে জানব?
ইতিহাসের উপাদান
পুরনো মুদ্রা, শিলালিপি, স্থাপত্য এবং লিখিত সাহিত্য—কীভাবে এই উপাদানগুলি আমাদের অতীত জানতে সাহায্য করে?
ভৌগোলিক প্রেক্ষাপট
ভারতবর্ষকে কেন 'উপমহাদেশ' বলা হয়? হিমালয় পর্বত ও নদনদী কীভাবে ভারতের ইতিহাসকে প্রভাবিত করেছে?
সময়ের হিসাব
খ্রিস্টপূর্বাব্দ (BC) ও খ্রিস্টাব্দ (AD/CE)-এর ধারণা। ইতিহাসের সময়কে কীভাবে ভাগ করা হয়?
এই অধ্যায় শেষে তুমি জানবে:
- ইতিহাস ও তার উপাদানের গুরুত্ব
- ভারতবর্ষের ভৌগোলিক বৈচিত্র্য
- প্রাচীন, মধ্য ও আধুনিক যুগের ধারণা
ইতিহাসের ধারণা
পাঠ্যপুস্তক: অতীত ও ঐতিহ্য (ষষ্ঠ শ্রেণি) | অধ্যায় ১
অতি সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন ও উত্তর (Short Answer Questions)
১. 'ইতিহাস' কথাটির সাধারণ অর্থ কী?
পুরোনো দিনের কথা বা অতীতের কাহিনি।
২. ইতিহাসের জনক কাকে বলা হয়?
গ্রিক ঐতিহাসিক হেরোডোটাসকে ইতিহাসের জনক বলা হয়।
৩. 'ইন্ডিয়া' নামটি কোন নদীর নাম থেকে এসেছে?
সিন্ধু নদ বা ইন্ডাস (Indus) থেকে 'ইন্ডিয়া' নামটি এসেছে।
৪. প্রাচীন ভারতের ইতিহাসের উপাদানগুলিকে কয় ভাগে ভাগ করা যায়?
মূলত চার ভাগে: প্রত্নতাত্ত্বিক উপাদান, সাহিত্যিক উপাদান, বিদেশিদের বিবরণ এবং মৌখিক ঐতিহ্য।
৫. প্রত্নতাত্ত্বিক উপাদান কাকে বলে?
পুরোনো দিনের ব্যবহৃত জিনিসপত্র, মুদ্রা, লিপি, স্থাপত্য ইত্যাদি যা মাটি খুঁড়ে বা উপরে পাওয়া যায়, তাদের প্রত্নতাত্ত্বিক উপাদান বলে।
৬. লিপি বা লেখমালা কী?
পাথর, তামা বা ধাতুর পাতে খোদাই করা লেখাগুলিকে লিপি বা লেখমালা বলা হয়।
৭. ভারতের প্রাচীনতম লিপির নাম কী?
সিন্ধু সভ্যতার লিপি (যা এখনও পাঠোদ্ধার করা সম্ভব হয়নি) এবং অশোকের লিপি।
৮. 'হর্ষচরিত' কার লেখা?
বাণভট্টের লেখা। এটি হর্ষবর্ধনের জীবনী।
৯. 'অর্থশাস্ত্র' কে রচনা করেন?
কৌটিল্য বা চাণক্য।
১০. মেগাস্থিনিস কে ছিলেন?
চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের রাজসভায় আগত গ্রিক দূত। তাঁর লেখা বইয়ের নাম 'ইন্ডিকা'।
১১. ফাহিয়েন কে ছিলেন?
একজন চিনা পর্যটক যিনি দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের আমলে ভারতে এসেছিলেন।
১২. অব্দ বা সাল গণনা কেন করা হয়?
ইতিহাসের ঘটনাগুলি কোন সময়ে ঘটেছিল তা নির্দিষ্ট করার জন্য অব্দ বা সাল গণনা করা হয়।
১৩. খ্রিষ্টপূর্বাব্দ (BC) বলতে কী বোঝো?
যিশু খ্রিষ্টের জন্মের আগের সময়কালকে খ্রিষ্টপূর্বাব্দ বলা হয়।
১৪. শকাব্দ কে চালু করেন?
কনিষ্ক ৭৮ খ্রিষ্টাব্দে শকাব্দ চালু করেন।
১৫. জাদুঘর বা মিউজিয়াম কী?
যেখানে মাটির নিচ থেকে পাওয়া পুরোনো দিনের নানা জিনিসপত্র যত্ন করে রাখা হয়, তাকে জাদুঘর বলে।
১৬. প্রাগৈতিহাসিক যুগ কাকে বলে?
যে যুগের কোনো লিখিত বিবরণ পাওয়া যায় না, তাকে প্রাগৈতিহাসিক যুগ বলে।
১৭. প্রায়-ঐতিহাসিক যুগ কী?
যে যুগের লিখিত উপাদান পাওয়া গেছে কিন্তু পড়া সম্ভব হয়নি, তাকে প্রায়-ঐতিহাসিক যুগ বলে।
১৮. প্রাচীন ভারতের দুটি মহাকাব্যের নাম লেখো।
রামায়ণ ও মহাভারত।
১৯. 'ভারতবর্ষ' নামটির উল্লেখ প্রথম কোন লিপি থেকে পাওয়া যায়?
কলিঙ্গরাজ খারবেলের হাতিগুশ্ফা লিপি থেকে।
২০. হিউয়েন সাং কার সময়ে ভারতে আসেন?
হর্ষবর্ধনের রাজত্বকালে।
রচনামূলক প্রশ্ন ও উত্তর (Long Answer Questions)
১. ইতিহাস পাঠের প্রয়োজনীয়তা কী? আমরা কেন ইতিহাস পড়ব?
উত্তর: ইতিহাস পাঠের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম:
- অতীত জানা: ইতিহাস পড়লে আমরা আমাদের পূর্বপুরুষদের কথা, তাদের জীবনযাত্রা, এবং সমাজ সম্পর্কে জানতে পারি।
- সভ্যতার বিবর্তন: মানুষ কীভাবে বন্য দশা থেকে ধাপে ধাপে আজকের সভ্য অবস্থায় পৌঁছাল, তা ইতিহাস থেকেই জানা যায়।
- ভুল থেকে শিক্ষা: অতীতে মানুষ কী ভুল করেছিল এবং তার ফল কী হয়েছিল, তা জেনে আমরা বর্তমানে সতর্ক হতে পারি।
- সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য: নিজেদের দেশ, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে চেনার জন্য ইতিহাস পাঠ জরুরি।
২. ইতিহাসের উপাদান হিসেবে লিপির গুরুত্ব আলোচনা করো।
উত্তর: প্রাচীন ভারতের ইতিহাস রচনায় লিপি বা লেখমালা সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য উপাদান।
- নির্ভুল তথ্য: লিপিগুলি পাথর বা ধাতুর ওপর খোদাই করা থাকে বলে এগুলি সহজে নষ্ট হয় না বা বিকৃত করা যায় না।
- রাজাদের তথ্য: লিপিতে রাজাদের নাম, বংশপরিচয়, রাজ্যজয়ের কাহিনি, এবং শাসনব্যবস্থা সম্পর্কে জানা যায় (যেমন—অশোকের লিপি, সমুদ্রগুপ্তের এলাহাবাদ প্রশস্তি)।
- সময়কাল নির্ণয়: লিপির ভাষা ও হরফ দেখে সেই সময়ের তারিখ ও সময়কাল সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায়।
- সীমানা নির্ধারণ: কোথায় লিপি পাওয়া গেছে তা দেখে রাজার রাজ্যের সীমানা অনুমান করা যায়।
৩. ইতিহাসের উপাদান হিসেবে মুদ্রার গুরুত্ব কী?
উত্তর: প্রাচীন ইতিহাস জানার জন্য মুদ্রা বা কয়েন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
- অর্থনৈতিক অবস্থা: মুদ্রাটি সোনা, রুপা না তামার তৈরি, তা দেখে সেই সময়ের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি বোঝা যায়।
- রাজ্যসীমা ও সময়কাল: মুদ্রায় খোদাই করা সাল ও রাজার নাম থেকে রাজত্বকাল জানা যায়। যেখানে মুদ্রা পাওয়া যায়, তা রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল বলে ধরা হয়।
- ধর্ম ও শিল্প: মুদ্রায় খোদাই করা দেবদেবীর মূর্তি দেখে রাজার ধর্মবিশ্বাস এবং সেই সময়ের শিল্পকলা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায় (যেমন—সমুদ্রগুপ্তের বীণাবাদক মূর্তি)।
৪. সাহিত্যিক উপাদান কাকে বলে? এটি কয় প্রকার ও কী কী?
উত্তর: পুরোনো দিনের লেখা বইপত্র, পুঁথি বা গ্রন্থকে ইতিহাসের সাহিত্যিক উপাদান বলা হয়।
সাহিত্যিক উপাদানকে মূলত দুই ভাগে ভাগ করা যায়:
- দেশীয় সাহিত্য: ভারতের ভেতরে রচিত গ্রন্থ। একে আবার দুই ভাগে ভাগ করা যায়—
ক) ধর্মীয় সাহিত্য: বেদ, রামায়ণ, মহাভারত, ত্রিপিটক।
খ) ধর্মনিরপেক্ষ সাহিত্য: অর্থশাস্ত্র, হর্ষচরিত, রাজতরঙ্গিনী। - বিদেশি বিবরণ: বিদেশ থেকে আগত পর্যটকদের লেখা বিবরণ। যেমন—মেগাস্থিনিসের 'ইন্ডিকা', হিউয়েন সাং-এর 'সি-ইউ-কি'।
৫. প্রাচীন ভারতের ইতিহাসে ভৌগোলিক পরিবেশের প্রভাব আলোচনা করো।
উত্তর: ভারতের ইতিহাসে ভূগোলের প্রভাব অপরিসীম।
- হিমালয় পর্বত: উত্তরে হিমালয় পর্বত ভারতকে বিদেশি আক্রমণ থেকে রক্ষা করেছে এবং সাইবেরিয়ার হাড়কাঁপানো ঠান্ডা বাতাস আটকে দিয়েছে।
- নদীমাতৃক সভ্যতা: সিন্ধু, গঙ্গা প্রভৃতি নদীর তীরে উর্বর মাটিতে প্রাচীন সভ্যতাগুলি গড়ে উঠেছিল। নদীপথ বাণিজ্যের সহায়ক ছিল।
- সমুদ্র: তিন দিকে সমুদ্র থাকায় ভারত বহির্বিশ্বের সঙ্গে নৌ-বাণিজ্য করতে পেরেছিল।
- আঞ্চলিক বৈচিত্র্য: পাহাড়, জঙ্গল ও মরুভূমি থাকার ফলে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে আলাদা আলাদা সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে।
৬. 'ভারতবর্ষ' বা 'ইন্ডিয়া' নামের উৎপত্তি কীভাবে হলো?
উত্তর: আমাদের দেশের নামের পেছনে দুটি প্রধান মত আছে:
- ভারতবর্ষ: পৌরাণিক কাহিনি অনুযায়ী, প্রাচীনকালে ভরত নামে এক রাজা ছিলেন। তাঁর নামানুসারেই এই দেশের নাম হয় ভারতবর্ষ। আবার ভরত নামক এক প্রাচীন গোষ্ঠীর নাম থেকেও এই নাম হতে পারে।
- ইন্ডিয়া: গ্রিকরা সিন্ধু নদকে 'ইন্ডাস' (Indus) বলত। এই ইন্ডাস শব্দ থেকেই কালক্রমে 'ইন্ডিয়া' নামটি এসেছে। পারসিকরা সিন্ধুকে 'হিদু' বলত, যা থেকে 'হিন্দুস্তান' নামের উৎপত্তি।
৭. প্রাগৈতিহাসিক, প্রায়-ঐতিহাসিক এবং ঐতিহাসিক যুগের মধ্যে পার্থক্য কী?
উত্তর: ইতিহাসের সময়কালকে উপাদানের ভিত্তিতে তিন ভাগে ভাগ করা হয়:
- প্রাগৈতিহাসিক যুগ: যে সময়ের কোনো লিখিত বিবরণ পাওয়া যায় না। মানুষ তখন লিখতে জানত না। যেমন—প্রস্তর যুগ।
- প্রায়-ঐতিহাসিক যুগ: যে সময়ের লিখিত লিপি পাওয়া গেছে, কিন্তু আজ পর্যন্ত তা পড়া সম্ভব হয়নি। যেমন—সিন্ধু সভ্যতা বা হরপ্পা সভ্যতা।
- ঐতিহাসিক যুগ: যে সময়ের লিখিত বিবরণ পাওয়া গেছে এবং তা পড়া সম্ভব হয়েছে। যেমন—বৈদিক যুগ থেকে পরবর্তী সময়।
৮. বিদেশিদের বিবরণ ইতিহাস রচনায় কতটা সাহায্য করে? এর সীমাবদ্ধতা কী?
উত্তর: গুরুত্ব: বিদেশিরা নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে ভারতের সমাজ, অর্থনীতি ও রাজনীতির বর্ণনা দিয়েছেন। দেশীয় সাহিত্যে অনেক সময় রাজাদের অতিরিক্ত প্রশংসা থাকে, যা বিদেশিদের লেখায় কম থাকে।
সীমাবদ্ধতা:
- বিদেশিরা ভারতের ভাষা ও সংস্কৃতি পুরোপুরি বুঝতেন না, তাই অনেক ভুল তথ্য দিয়েছেন।
- অনেকে লোকমুখে শোনা কথা লিখে গেছেন, যা সবসময় সত্য ছিল না।
৯. প্রাচীন সভ্যতাগুলি কেন নদীর তীরে গড়ে উঠেছিল?
উত্তর: প্রাচীন প্রায় সব সভ্যতা (যেমন—সিন্ধু, মিশরীয়) নদীর তীরে গড়ে ওঠার কারণ:
- কৃষিকাজ: নদীর পলিমাটি খুব উর্বর, যা চাষবাসের জন্য উপযুক্ত ছিল।
- জলের জোগান: পানীয় জল এবং চাষের জলের সহজ উৎস ছিল নদী।
- পরিবহন: নদীতে নৌকা বা ভেলায় করে যাতায়াত ও মালপত্র আনা-নেওয়া সহজ ছিল।
- খাদ্য: নদী থেকে প্রচুর মাছ পাওয়া যেত।
১০. প্রত্নতাত্ত্বিক খননকার্য বলতে কী বোঝো? এটি কীভাবে ইতিহাস জানতে সাহায্য করে?
উত্তর: মাটির নিচে চাপা পড়ে থাকা প্রাচীন সভ্যতার নিদর্শন খুঁজে বের করার জন্য বিজ্ঞানসম্মতভাবে মাটি খোঁড়াকে প্রত্নতাত্ত্বিক খননকার্য বলে।
গুরুত্ব:
- এর মাধ্যমে হারিয়ে যাওয়া শহর (যেমন—হরপ্পা, মহেঞ্জোদাড়ো) আবিষ্কৃত হয়।
- মানুষের ব্যবহৃত আসবাব, অস্ত্র, গয়না দেখে তাদের জীবনযাত্রা সম্পর্কে জানা যায়।
- প্রাণী ও মানুষের হাড়গোড় (জীবাশ্ম) থেকে সেই সময়ের জীবজগত সম্পর্কে জানা যায়।
১১. সাল বা অব্দ গণনার ক্ষেত্রে খ্রিষ্টাব্দ ও খ্রিষ্টপূর্বাব্দের ধারণা স্পষ্ট করো।
উত্তর: ইতিহাসের সময় মাপার জন্য যিশু খ্রিষ্টের জন্মকে মাঝখানের বিন্দু ধরা হয়।
- খ্রিষ্টাব্দ (AD/CE): যিশু খ্রিষ্টের জন্মের বছর থেকে শুরু করে পরবর্তী সময়কে খ্রিষ্টাব্দ বলা হয়। এটি ছোট থেকে বড়র দিকে যায় (যেমন—২০২০, ২০২১)।
- খ্রিষ্টপূর্বাব্দ (BC/BCE): যিশু খ্রিষ্টের জন্মের আগের সময়কে খ্রিষ্টপূর্বাব্দ বলা হয়। এটি উল্টো দিকে গোনা হয়, অর্থাৎ বড় সংখ্যা আগে এবং ছোট সংখ্যা পরে আসে (যেমন—৫০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দের পর ৪৯৯ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ আসে)।
১২. ভারতকে 'উপমহাদেশ' বলা হয় কেন?
উত্তর: মহাদেশের মতো বিশাল আয়তন এবং বৈচিত্র্য থাকার কারণে ভারতকে উপমহাদেশ বলা হয়।
- ভৌগোলিক বৈচিত্র্য: এখানে পাহাড়, নদী, মরুভূমি, মালভূমি এবং সমুদ্রতট—সবই আছে।
- সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য: নানা ভাষা, ধর্ম, পোশাক এবং খাদ্যাভ্যাসের মানুষ এখানে বাস করে।
- প্রাচীনকালে পাকিস্তান, বাংলাদেশ, নেপাল, ভুটান এবং ভারত একই ভৌগোলিক কাঠামোর অংশ ছিল, যা একটি মহাদেশের মতোই স্বয়ংসম্পূর্ণ ছিল।
১৩. প্রাচীন ভারতের ইতিহাসে হিমালয় পর্বতের ভূমিকা কী ছিল?
উত্তর: হিমালয় পর্বত ভারতের উত্তরে প্রহরীর মতো দাঁড়িয়ে আছে।
- প্রতিরক্ষা: প্রাচীনকালে উত্তর দিক থেকে বিদেশি শত্রুর আক্রমণ আটকানো সহজ ছিল।
- জলবায়ু: উত্তরের হিমশীতল বাতাস আটকে ভারতকে উষ্ণ রাখে এবং মৌসুমি বায়ুকে বাধা দিয়ে বৃষ্টিপাত ঘটায়।
- নদী: গঙ্গা, সিন্ধু, ব্রহ্মপুত্রের মতো বড় নদীগুলির উৎস হিমালয়, যা ভারতকে সুজলা-সুফলা করেছে।
১৪. ধর্মীয় সাহিত্য কীভাবে ইতিহাস রচনায় সাহায্য করে? উদাহরণ দাও।
উত্তর: ধর্মীয় সাহিত্য মূলত ধর্মপ্রচারের জন্য লেখা হলেও এর মধ্যে সমসাময়িক সমাজ ও রাজনীতির কথা থাকে।
- বেদ: বৈদিক যুগের আর্যদের জীবনযাত্রা, সমাজ ও ধর্ম সম্পর্কে জানা যায়।
- রামায়ণ ও মহাভারত: প্রাচীন ভারতের রাজাদের যুদ্ধ, নীতি, এবং সামাজিক রীতিনীতি জানা যায়।
- জৈন ও বৌদ্ধ সাহিত্য: অঙ্গ ও ত্রিপিটক থেকে ষোড়শ মহাজনপদ এবং সেই সময়ের সাধারণ মানুষের অবস্থার কথা জানা যায়।
১৫. 'জীবনী সাহিত্য' বা 'চরিত সাহিত্য' বলতে কী বোঝো? এটি ইতিহাসের উপাদান হিসেবে কেমন?
উত্তর: প্রাচীনকালে সভাকবিরা তাঁদের আশ্রয়দাতা রাজাদের গুণগান করে যে জীবনী লিখতেন, তাকে চরিত সাহিত্য বলে।
গুরুত্ব:
- এগুলি থেকে নির্দিষ্ট রাজার রাজত্বকাল ও কৃতিত্ব জানা যায়।
- উদাহরণ: বাণভট্টের 'হর্ষচরিত' (হর্ষবর্ধন সম্পর্কে), বিলহনের 'বিক্রমাঙ্কদেবচরিত', সন্ধ্যাকর নন্দীর 'রামচরিত'।
- তবে এগুলিতে রাজার দোষের কথা সাধারণত লেখা হতো না, তাই এগুলি পড়ার সময় সতর্ক থাকতে হয়।
১৬. প্রাচীন ভারতের ইতিহাসে বিন্ধ্য পর্বতের গুরুত্ব কী?
উত্তর: বিন্ধ্য পর্বত ভারতের মাঝখানে অবস্থিত এবং এটি ভারতকে উত্তর ও দক্ষিণ—এই দুই ভাগে ভাগ করেছে।
- আর্যাবর্ত ও দাক্ষিণাত্য: বিন্ধ্য পর্বতের উত্তরের অংশকে 'আর্যাবর্ত' এবং দক্ষিণের অংশকে 'দাক্ষিণাত্য' বলা হয়।
- সংস্কৃতির পার্থক্য: এই পর্বতের বাধার কারণে উত্তর ভারতের আর্য সংস্কৃতি সহজে দক্ষিণ ভারতে প্রবেশ করতে পারেনি। ফলে দক্ষিণে দ্রাবিড় সংস্কৃতি নিজস্ব বৈশিষ্ট্য বজায় রাখতে পেরেছিল।
১৭. জাদুঘরে সংরক্ষিত উপাদানগুলি কীভাবে আমাদের অতীত জানতে সাহায্য করে?
উত্তর: জাদুঘর হলো ইতিহাসের ভাণ্ডার।
- এখানে প্রাচীন মূর্তি, অস্ত্রশস্ত্র, পোশাক, বাসনপত্র সাজিয়ে রাখা হয়।
- এগুলি দেখে আমরা বুঝতে পারি অতীতের মানুষ কতটা উন্নত ছিল, তারা কী ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহার করত।
- বিভিন্ন যুগের জিনিসের তুলনা করে সভ্যতার অগ্রগতির ধারা বোঝা যায়।
১৮. চৈনিক পরিব্রাজকদের বিবরণ থেকে প্রাচীন ভারতের কী কী তথ্য জানা যায়?
উত্তর: ফাহিয়েন, হিউয়েন সাং, ইৎ-সিং প্রমুখ চিনা পর্যটক বৌদ্ধধর্ম সম্পর্কে জানতে ভারতে এসেছিলেন।
- তাঁদের বিবরণ থেকে গুপ্ত যুগ ও হর্ষবর্ধনের সময়ের সমাজব্যবস্থা জানা যায়।
- নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো শিক্ষাকেন্দ্রগুলির বিস্তারিত বর্ণনা পাওয়া যায়।
- বৌদ্ধধর্মের অবস্থা এবং সাধারণ মানুষের ধর্মীয় আচরণের কথা জানা যায়।
১৯. স্থাপত্য ও ভাস্কর্য ইতিহাসের উপাদান হিসেবে কতটা জরুরি?
উত্তর: প্রাচীন মন্দির, স্তূপ, বিহার, এবং গুহাচিত্র ইতিহাসের নীরব সাক্ষী।
- স্থাপত্য: সাঁচি স্তূপ, অজন্তা-ইলোরার গুহা বা প্রাচীন মন্দিরের গঠনশৈলী দেখে সেই সময়ের ইঞ্জিনিয়ারিং দক্ষতা ও রুচি বোঝা যায়।
- ভাস্কর্য: পাথরের গায়ে খোদাই করা মূর্তি থেকে পোশাক-পরিচ্ছদ, অলংকার এবং ধর্মীয় বিশ্বাস সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।
২০. ইতিহাস চর্চায় 'নিরপেক্ষতা' কেন প্রয়োজন?
উত্তর: ইতিহাস হলো সত্য ঘটনার অনুসন্ধান।
- ঐতিহাসিক যদি কোনো বিশেষ রাজা বা ধর্মের প্রতি পক্ষপাতদুষ্ট হন, তবে প্রকৃত সত্য জানা যাবে না।
- সঠিক ইতিহাস না জানলে আমরা অতীত থেকে ভুল শিক্ষা নেব।
- তাই বিভিন্ন উপাদান যাচাই-বাছাই করে, যুক্তি দিয়ে বিচার করে তবেই ইতিহাস লেখা উচিত, যাতে তা নিরপেক্ষ ও সত্য হয়।
MOCK TEST
ইতিহাসের ধারণা
পাঠ্যপুস্তক: অতীত ও ঐতিহ্য (ষষ্ঠ শ্রেণি) | অধ্যায় ১
পরীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে!
আপনার ফলাফল নিচে দেওয়া হলো
ONLINE TEST
অনলাইন মূল্যায়ন (Online Exam)
পাঠ্যপুস্তক: অতীত ও ঐতিহ্য (ষষ্ঠ শ্রেণি)
অধ্যায়: ইতিহাসের ধারণা
ফলাফল (Result)
MCQ বিভাগে আপনার স্কোর। বর্ণনামূলক প্রশ্নগুলি নিজে যাচাই করুন।