বিষয়: অতীত ও ঐতিহ্য (ষষ্ঠ শ্রেণি)
অধ্যায় ৯: ভারত ও সমকালীন বহির্বিশ্ব (প্রকল্প নোটস)
মূল ধারণা ও প্রশ্নাবলী
১. প্রাচীন ভারতীয় উপমহাদেশের সঙ্গে বাইরের জগতের যোগাযোগের প্রধান পথগুলি কী ছিল?
উত্তর: প্রাচীন ভারতীয় উপমহাদেশের সঙ্গে বহির্বিশ্বের যোগাযোগের দুটি প্রধান পথ ছিল:
- স্থলপথ: উপমহাদেশের উত্তর-পশ্চিম দিকে অবস্থিত গিরিপথগুলি (যেমন – খাইবার, বোলান) ছিল মধ্য এশিয়া ও পশ্চিম এশিয়ার সঙ্গে যোগাযোগের প্রধান স্থলপথ।
- জলপথ: উপমহাদেশের তিন দিকে সমুদ্র (আরব সাগর, ভারত মহাসাগর, বঙ্গোপসাগর) থাকায় পশ্চিম এশিয়া, পূর্ব আফ্রিকা, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং চিনের সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রে জলপথ বা সমুদ্রপথের গুরুত্ব ছিল অপরিসীম।
২. ‘হেলেনিস্টিক’ সংস্কৃতি কাকে বলে?
উত্তর: গ্রিক বীর আলেকজান্ডারের ভারত অভিযানের পর থেকে গ্রিক সংস্কৃতির সঙ্গে ভারতীয় উপমহাদেশের সংস্কৃতির আদান-প্রদান শুরু হয়। এই মিশ্র গ্রিক-ভারতীয় সংস্কৃতিকে ‘হেলেনিস্টিক’ সংস্কৃতি বা ‘গান্ধার শিল্পরীতি’ (ভাস্কর্যের ক্ষেত্রে) বলা হয়।
৩. পারস্য (ইরান) ও ভারতের মধ্যে যোগাযোগের দুটি উদাহরণ দাও।
উত্তর:
- শাসনে: পারসিক সম্রাট দারায়ুস (খ্রিঃপূঃ ৬ষ্ঠ শতক) উপমহাদেশের উত্তর-পশ্চিমাংশ (গান্ধার) জয় করেন, যা পারস্য সাম্রাজ্যের একটি প্রদেশে পরিণত হয়।
- লেখমালায়: পারসিক সম্রাটদের অনুকরণেই মৌর্য সম্রাট অশোক স্তম্ভের গায়ে লিপি খোদাই করার ভাবনা পেয়েছিলেন বলে ঐতিহাসিকরা মনে করেন।
৪. ‘রেশম পথ’ (Silk Route) কী?
উত্তর: প্রাচীনকালে মধ্য এশিয়ার মধ্য দিয়ে চিন থেকে রোমান সাম্রাজ্য পর্যন্ত যে দীর্ঘ স্থল বাণিজ্যপথটি বিস্তৃত ছিল, তাকে ‘রেশম পথ’ বা ‘সিল্ক রুট’ বলা হয়।
চিনের রেশম ছিল এই পথের প্রধান বাণিজ্যদ্রব্য, তাই এর এই নামকরণ। খ্রিস্টীয় প্রথম-দ্বিতীয় শতকে কুষাণ সম্রাট কনিষ্কের আমলে এই রেশম পথের একটি বড় অংশ কুষাণ সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল। এই পথটি ভারতকেও বহির্বিশ্বের সঙ্গে যুক্ত করেছিল।
চিত্র: রেশম পথের একটি সরলীকৃত নকশা।
৫. ‘পেরিপ্লাস অফ দি ইরিথ্রিয়ান সি’ এবং ‘ইন্ডিকা’ গ্রন্থ দুটির গুরুত্ব কী?
উত্তর:
- পেরিপ্লাস… (Periplus of the Erythraean Sea): খ্রিস্টীয় প্রথম শতকে লেখা এই বইটির লেখক অজানা। তিনি ছিলেন একজন গ্রিক নাবিক। এই বইটি থেকে ভারত মহাসাগরের সামুদ্রিক বাণিজ্য, পশ্চিম ভারতের বন্দরগুলি (যেমন – বেরিগাছা বা ব্রোচ, মুজিরিস) এবং কী কী পণ্য আমদানি-রপ্তানি হতো, সে সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য জানা যায়।
- ইন্ডিকা (Indica): এটি রচনা করেন গ্রিক দূত মেগাস্থিনিস, যিনি মৌর্য সম্রাট চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের রাজসভায় এসেছিলেন। মূল বইটি হারিয়ে গেলেও, পরবর্তী লেখকদের লেখায় এর যে অংশগুলি পাওয়া যায়, তা থেকে মৌর্য যুগের শাসনব্যবস্থা, পাটলিপুত্র নগরের বর্ণনা এবং তৎকালীন সমাজ সম্পর্কে অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানা যায়।
৬. চিনা পর্যটক ফা-হিয়েন (ফাক্সিয়ান) এবং হিউয়েন সাঙ (সুয়ান জাং)-এর ভারত ভ্রমণের কারণ কী ছিল?
উত্তর: ফা-হিয়েন (গুপ্ত যুগে দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের আমলে) এবং হিউয়েন সাঙ (হর্ষবর্ধনের আমলে) দুজনেই ছিলেন বৌদ্ধ শ্রমণ।
তাঁদের ভারত ভ্রমণের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল বৌদ্ধ ধর্মের উৎসভূমি ভারত ভ্রমণ করা, বৌদ্ধধর্মের মূল গ্রন্থগুলি সংগ্রহ করা এবং নালন্দার মতো বিখ্যাত বৌদ্ধবিহারগুলিতে পড়াশোনা করা। তাঁরা ধর্মীয় উদ্দেশ্যেই ভারতে এসেছিলেন, তবে তাঁদের ভ্রমণ বিবরণী (যেমন – হিউয়েন সাঙ-এর ‘সি-ইউ-কি’) তৎকালীন ভারতের সমাজ, রাজনীতি ও শিক্ষাব্যবস্থা জানার জন্য অমূল্য উপাদান।
৭. প্রাচীন ভারতে রোমের সঙ্গে বাণিজ্যের পরিচয় দাও।
উত্তর: খ্রিস্টীয় প্রথম-দ্বিতীয় শতকে (কুষাণ ও সাতবাহন যুগে) রোমান সাম্রাজ্যের সঙ্গে ভারতের সামুদ্রিক বাণিজ্য তুঙ্গে ওঠে।
- রপ্তানি: ভারত থেকে প্রধানত গোলমরিচ, মশলা, সূক্ষ্ম বস্ত্র, হাতির দাঁত, মুক্তা ইত্যাদি রোমে রপ্তানি হতো।
- আমদানি: বিনিময়ে রোম থেকে ভারতে আসত বিপুল পরিমাণ সোনা ও রুপোর মুদ্রা, কাচ, মদ এবং বিভিন্ন বিলাসবহুল সামগ্রী।
- ফলাফল: এই বাণিজ্যে ভারতের লাভ হতো প্রচুর। দক্ষিণ ভারতের বিভিন্ন স্থান থেকে (যেমন – আরিকামেডু) প্রচুর রোমান মুদ্রা পাওয়া গেছে, যা এই সমৃদ্ধ বাণিজ্যের প্রমাণ।
৮. দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ভারতীয় সংস্কৃতির বিস্তারের দুটি উদাহরণ দাও।
উত্তর: প্রাচীনকালে বাণিজ্য ও ধর্ম প্রচারের মাধ্যমে ভারতীয় সংস্কৃতি (Hinduism and Buddhism) দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলিতে (যেমন – কম্বোডিয়া, জাভা, সুমাত্রা) ছড়িয়ে পড়েছিল।
এর দুটি শ্রেষ্ঠ উদাহরণ হলো:
- বোরোবোদুরের স্তূপ (ইন্দোনেশিয়া): খ্রিস্টীয় অষ্টম শতকে ইন্দোনেশিয়ার জাভা দ্বীপে নির্মিত এটি হলো পৃথিবীর সর্ববৃহৎ বৌদ্ধ স্তূপ বা মন্দির।
- আঙ্কোরভাট মন্দির (কম্বোডিয়া): দ্বাদশ শতকে কম্বোডিয়ায় (প্রাচীন কম্বোজ) রাজা দ্বিতীয় সূর্যবর্মণ কর্তৃক নির্মিত সুবিশাল বিষ্ণু মন্দির। এই মন্দিরের গায়ে রামায়ণ ও মহাভারতের কাহিনি খোদাই করা আছে।