বিষয়: অতীত ও ঐতিহ্য (ষষ্ঠ শ্রেণি)
অধ্যায় ৮: প্রাচীন ভারতীয় উপমহাদেশের সংস্কৃতিচর্চার নানাদিক (প্রকল্প নোটস)
মূল ধারণা ও প্রশ্নাবলী
১. প্রাচীন ভারতের শিক্ষাব্যবস্থায় ‘গুরুকুল’ বা ‘গুরুগৃহ’ ব্যবস্থা কেমন ছিল?
উত্তর: প্রাচীন ভারতে শিক্ষা গ্রহণের প্রধান কেন্দ্র ছিল ‘গুরুকুল’ বা ‘গুরুগৃহ’।
- ছাত্রদের (শিষ্য) গুরুর বাড়িতে থেকে পড়াশোনা করতে হতো।
- শিক্ষা ছিল মূলত মৌখিক। গুরু বলতেন, শিষ্যরা তা শুনে শুনে মুখস্থ করত (এই পদ্ধতিকে ‘শ্রুতি’ বলা হতো)।
- ছাত্রদের পড়াশোনার পাশাপাশি গুরুর নানা কাজে সাহায্য করতে হতো, যেমন – গুরুর সেবা করা, গোরু চরানো ইত্যাদি।
- নির্দিষ্ট সময় (সাধারণত বারো বছর) শিক্ষালাভের পর ‘সমাবর্তন’ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে ছাত্ররা ‘স্নাতক’ হয়ে বাড়ি ফিরত এবং সাধ্যমতো গুরুদক্ষিণা দিত।
২. প্রাচীন ভারতের দুটি বিখ্যাত মহাবিহারের নাম লেখো। এগুলিকে ‘মহাবিহার’ বলা হয় কেন?
উত্তর: প্রাচীন ভারতের দুটি বিখ্যাত মহাবিহার হলো **নালন্দা** (বর্তমান বিহারে) এবং **তক্ষশিলা** (বর্তমান পাকিস্তানে)।
বৌদ্ধ সন্ন্যাসীদের থাকার ও পড়াশোনার কেন্দ্রকে ‘বিহার’ বা ‘সংঘ’ বলা হতো। কিন্তু নালন্দা বা তক্ষশিলার মতো বিহারগুলি আকারে ছিল বিশাল এবং সেখানে দেশ-বিদেশ (যেমন – চিন, তিব্বত, কোরিয়া) থেকে বহু ছাত্রছাত্রী পড়তে আসত। এখানে ধর্ম, দর্শন, যুক্তি, ব্যাকরণ, চিকিৎসাবিদ্যা সহ নানা বিষয় পড়ানো হতো। এই বিশাল আয়তন এবং উচ্চশিক্ষার কেন্দ্র হওয়ার কারণেই এগুলিকে ‘মহাবিহার’ (University) বলা হয়।
৩. ‘সঙ্গম সাহিত্য’ কী?
উত্তর: প্রাচীন দক্ষিণ ভারতের (তামিলনাড়ু) কবিদের সভা বা সম্মেলনকে ‘সঙ্গম’ বলা হতো। এই সঙ্গমগুলিতে যে সমস্ত সাহিত্য (কবিতা, কাব্য) সংকলিত হয়েছিল, তাই ‘সঙ্গম সাহিত্য’ নামে পরিচিত। এটিই প্রাচীন তামিল সাহিত্যের প্রধান নিদর্শন।
৪. প্রাচীন ভারতের বিজ্ঞানচর্চায় আর্যভট্ট ও সুশ্রুতের অবদান কী?
উত্তর: প্রাচীন ভারতে গণিত, জ্যোতির্বিদ্যা ও চিকিৎসাশাস্ত্রে অভূতপূর্ব উন্নতি ঘটেছিল।
আর্যভট্ট (গণিত ও জ্যোতির্বিদ্যা):
- তিনি গুপ্তযুগের শ্রেষ্ঠ গণিতবিদ ও জ্যোতির্বিজ্ঞানী ছিলেন। তাঁর লেখা বিখ্যাত বই ‘আর্যভট্টীয়’।
- তিনিই প্রথম **শূন্যের (০)** ব্যবহার দেখান এবং **পাই (π)**-এর মান নির্ণয় করেন।
- তিনি প্রথম ঘোষণা করেন যে, পৃথিবী নিজের অক্ষের ওপর ঘোরে (‘আবর্তন গতি’) এবং সেই কারণেই দিন-রাত্রি হয়।
- তিনিই প্রথম সূর্যগ্রহণ ও চন্দ্রগ্রহণের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দেন এবং বলেন যে, এগুলি রাহু বা কেতুর কারণে ঘটে না, বরং পৃথিবী ও চাঁদের ছায়া পড়ার ফলে ঘটে।
সুশ্রুত (চিকিৎসাবিদ্যা – শল্যচিকিৎসা):
- সুশ্রুত ছিলেন প্রাচীন ভারতের একজন কিংবদন্তি শল্যচিকিৎসক (Surgeon)। তাঁর লেখা বইয়ের নাম ‘সুশ্রুত সংহিতা’।
- এই গ্রন্থে তিনি অস্ত্রোপচার বা অপারেশন করার বিভিন্ন জটিল পদ্ধতি, যন্ত্রপাতি (১২০টিরও বেশি) এবং প্লাস্টিক সার্জারির (নাক, কান জোড়া লাগানো) বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। এই কারণেই তাঁকে ‘শল্যচিকিৎসার জনক’ বলা হয়।
৫. ‘চরক সংহিতা’ ও ‘সুশ্রুত সংহিতা’ গ্রন্থ দুটির বিষয়বস্তু কী?
উত্তর:
- চরক সংহিতা: চরকের লেখা এই বইটি ছিল মূলত **কায়চিকিৎসা** (General Medicine) বা ভেষজ ওষুধপত্র বিষয়ক গ্রন্থ। এতে বিভিন্ন রোগের লক্ষণ ও তার প্রতিকারের উপায় (ওষুধ) নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে।
- সুশ্রুত সংহিতা: সুশ্রুতের লেখা এই বইটি ছিল মূলত **শল্যচিকিৎসা** (Surgery) বা অস্ত্রোপচার বিষয়ক গ্রন্থ। এতে অপারেশন করার বিভিন্ন পদ্ধতি ও যন্ত্রপাতির বিবরণ রয়েছে।
৬. ‘স্তূপ’, ‘বিহার’ ও ‘চৈত্য’ – এই তিন প্রকার বৌদ্ধ স্থাপত্যের মধ্যে পার্থক্য কী?
উত্তর:
- স্তূপ: স্তূপ হলো একটি অর্ধ-গোলাকার গম্বুজ বা ঢিবির মতো স্থাপত্য। বুদ্ধ বা প্রধান বৌদ্ধ সন্ন্যাসীদের দেহাবশেষের (যেমন – চুল, নখ, হাড়) ওপর এগুলি নির্মাণ করা হতো। এটি ছিল মূলত স্মৃতিসৌধ এবং উপাসনার স্থান। (উদাহরণ: সাঁচি স্তূপ)।
- বিহার: ‘বিহার’ হলো বৌদ্ধ সন্ন্যাসী ও সন্ন্যাসিনীদের থাকার জায়গা বা মঠ। এখানে তাঁরা বসবাস, অধ্যয়ন ও ধর্মচর্চা করতেন। (উদাহরণ: নালন্দা মহাবিহার)।
- চৈত্য: ‘চৈত্য’ হলো বৌদ্ধদের প্রার্থনা করার বা উপাসনা করার ঘর (Prayer Hall)। এগুলি সাধারণত পাহাড় বা পাথর কেটে তৈরি করা হতো এবং এর শেষে একটি ছোট স্তূপ থাকত, যাকে কেন্দ্র করে উপাসনা করা হতো। (উদাহরণ: কার্লে চৈত্য)।
চিত্র: বৌদ্ধ স্থাপত্যের তিনটি প্রধান ধরণ— স্তূপ, বিহার ও চৈত্য।
৭. ভারতীয় ভাস্কর্য শিল্পে ‘গান্ধার রীতি’ ও ‘মথুরা রীতি’-র মধ্যে পার্থক্য কী?
উত্তর: কুষাণ যুগে (খ্রিস্টীয় প্রথম-দ্বিতীয় শতক) ভারতে দুটি প্রধান ভাস্কর্য রীতির বিকাশ ঘটে:
গান্ধার রীতি:
- স্থান: এই রীতির কেন্দ্র ছিল উপমহাদেশের উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত অঞ্চল (গান্ধার)।
- প্রভাব: এর ওপর গ্রিক ও রোমান শিল্পরীতির গভীর প্রভাব ছিল। তাই একে ‘ইন্দো-গ্রিক’ (Indo-Greek) শিল্পও বলা হয়।
- উপাদান: এই রীতির মূর্তিগুলি মূলত ধূসর বা নীলচে রঙের **পাথর** দিয়ে তৈরি হতো।
- বৈশিষ্ট্য: এই রীতির বুদ্ধমূর্তিগুলির চুল কোঁকড়ানো, পেশিবহুল শরীর, বাস্তবসম্মত এবং গায়ে কোঁচকানো পোশাক দেখা যায় ( অনেকটা গ্রিক দেবতা অ্যাপোলোর মতো)।
মথুরা রীতি:
- স্থান: এই রীতির কেন্দ্র ছিল উত্তর ভারতের মথুরা।
- প্রভাব: এটি ছিল সম্পূর্ণ দেশীয় বা ভারতীয় শিল্পরীতি।
- উপাদান: এই রীতির মূর্তিগুলি মূলত **লাল বেলেপাথর** দিয়ে তৈরি হতো।
- বৈশিষ্ট্য: এই রীতির বুদ্ধমূর্তিগুলি ছিল আধ্যাত্মিক ভাবনার প্রতীক। মূর্তিগুলির শরীর পেশিবহুল নয়, পোশাক মসৃণ এবং মাথা সাধারণত মুণ্ডিত থাকত। এই রীতিতেই প্রথম বুদ্ধমূর্তি তৈরি হয়।
৮. ‘অজন্তা গুহা’ কেন বিখ্যাত?
উত্তর: মহারাষ্ট্রের ‘অজন্তা গুহা’ তার অনবদ্য ‘গুহাচিত্র’-এর (Mural Painting) জন্য বিশ্ববিখ্যাত।
- এটি মূলত একটি বৌদ্ধ বিহার, যেখানে অনেক চৈত্য ও বিহার পাহাড় কেটে তৈরি করা হয়েছে।
- গুপ্ত ও বাকাটক যুগে এই গুহাগুলির দেয়ালে ও ছাদে মূলত ‘ফ্রেসকো’ পদ্ধতিতে নানা ধরনের ছবি আঁকা হয়।
- এই ছবিগুলির প্রধান বিষয়বস্তু হলো জাতকের গল্প, বুদ্ধের জীবন এবং সমকালীন সামাজিক জীবনযাত্রা। রং ও রেখার ব্যবহারে এই ছবিগুলি ভারতীয় চিত্রকলার শ্রেষ্ঠ নিদর্শন।
৯. গুপ্ত যুগের দুজন বিখ্যাত সাহিত্যিকের নাম ও তাঁদের একটি করে রচনার নাম লেখো।
উত্তর:
- কালিদাস: তাঁর লেখা বিখ্যাত নাটক হলো ‘অভিজ্ঞান শকুন্তলম্’ (এছাড়াও – মেঘদূতম্, রঘুবংশম্)।
- শূদ্রক: তাঁর লেখা বিখ্যাত নাটক হলো ‘মৃচ্ছকটিকম্’।
১০. ‘প্রয়াগ প্রশস্তি’ (এলাহাবাদ প্রশস্তি) কে, কোন ভাষায় রচনা করেন?
উত্তর: ‘প্রয়াগ প্রশস্তি’ রচনা করেন গুপ্ত সম্রাট সমুদ্রগুপ্তের সভাকবি **হরিষেণ**। এটি **সংস্কৃত** ভাষায় এবং ব্রাহ্মী লিপিতে লেখা হয়েছিল। এটি মূলত সম্রাট সমুদ্রগুপ্তের গুণগান ও রাজ্যজয়ের বিবরণ।
অতিরিক্ত প্রশ্নাবলী (Higher Order Thinking)
১১. তক্ষশিলা ও নালন্দা মহাবিহারের মধ্যে দুটি পার্থক্য লেখো।
উত্তর: দুটিই বিখ্যাত শিক্ষাকেন্দ্র হলেও এদের মধ্যে পার্থক্য ছিল:
- সময়কাল: তক্ষশিলা ছিল অনেক বেশি প্রাচীন। এটি খ্রিস্টপূর্বাব্দেও (যেমন – মৌর্য যুগে) বিখ্যাত ছিল। নালন্দা মহাবিহার অনেক পরে, গুপ্ত সম্রাটদের আমলে (খ্রিস্টীয় পঞ্চম শতক) খ্যাতি লাভ করে।
- শিক্ষার ধরণ: তক্ষশিলা কোনো একটি বিশেষ বিহার বা সংঘ ছিল না, এটি ছিল বিভিন্ন গুরুর ব্যক্তিগত টোল বা আশ্রমের সমষ্টি। কিন্তু নালন্দা ছিল একটি সুসংগঠিত, প্রাচীর-ঘেরা আবাসিক মহাবিহার (University Campus), যেখানে হাজার হাজার ছাত্র ও শিক্ষক একসাথে থাকতেন ও পড়াশোনা করতেন।
- প্রধান বিষয়: নালন্দা মূলত বৌদ্ধধর্ম (বিশেষত মহাযান) চর্চার প্রধান কেন্দ্র ছিল। তক্ষশিলায় ধর্ম ছাড়াও চিকিৎসাবিদ্যা, অস্ত্রবিদ্যা, ব্যাকরণ ইত্যাদি নানা বিষয়ে পড়ানো হতো।
১২. প্রাচীন ভারতের বিজ্ঞানচর্চা কি শুধুমাত্র ধর্মকে কেন্দ্র করেই হয়েছিল?
উত্তর: না, প্রাচীন ভারতের বিজ্ঞানচর্চা শুধুমাত্র ধর্মকে কেন্দ্র করে হয়নি, যদিও দুটির মধ্যে গভীর যোগ ছিল।
- যোগাযোগ: বৈদিক যুগে যাগযজ্ঞ করার জন্য যজ্ঞবেদী বানাতে ‘জ্যামিতি’-র প্রয়োজন হয়েছিল। যজ্ঞের সঠিক সময় গণনার জন্য ‘জ্যোতির্বিদ্যা’-র চর্চা শুরু হয়। – স্বাধীন চর্চা:** কিন্তু পরবর্তীকালে আর্যভট্ট, ব্রহ্মগুপ্ত বা বরাহমিহিরের মতো বিজ্ঞানীরা ধর্মীয় ব্যাখ্যার বাইরে গিয়ে গণিত ও জ্যোতির্বিদ্যার বৈজ্ঞানিক চর্চা করেন। আর্যভট্ট পৃথিবীর আবর্তন বা গ্রহণের যে বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দেন, তা ছিল ধর্মীয় কুসংস্কারের সম্পূর্ণ বিরোধী। একইভাবে, চরক ও সুশ্রুতের চিকিৎসাবিদ্যাও ছিল প্রায়োগিক বিজ্ঞানের নিদর্শন, যা ধর্মের থেকে আলাদা।