প্রকল্প পত্র (ষষ্ঠ শ্রেণি): অধ্যায় ৭ – অর্থনীতি ও জীবনযাত্রা
প্রসেসিং…

বিষয়: অতীত ও ঐতিহ্য (ষষ্ঠ শ্রেণি)

অধ্যায় ৭: অর্থনীতি ও জীবনযাত্রা (প্রকল্প নোটস)

মূল ধারণা ও প্রশ্নাবলী

১. প্রাচীন ভারতে কৃষির উন্নতির প্রধান কারণগুলি কী ছিল? [৩ নম্বর]

উত্তর: প্রাচীন ভারতে, বিশেষত খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকের পর থেকে, কৃষির ব্যাপক উন্নতি ঘটে। এর প্রধান কারণগুলি হলো:

  1. লোহার সরঞ্জামের ব্যবহার: লোহার তৈরি লাঙলের ফলা, কুঠার, কাস্তে ইত্যাদি ব্যবহারের ফলে একদিকে যেমন শক্ত মাটি কর্ষণ করা সহজ হয়, তেমনই জঙ্গল পরিষ্কার করে নতুন কৃষিজমি তৈরি করা সম্ভব হয়।
  2. জলসেচ ব্যবস্থার উন্নতি: এই যুগে কূপ, পুকুর এবং সেচখালের মাধ্যমে জলসেচ ব্যবস্থার উন্নতি ঘটানো হয়, ফলে খরা বা অনাবৃষ্টির সময়েও চাষবাস করা যেত।
  3. নতুন ফসলের চাষ: ধান, গম, যব ছাড়াও কৃষকরা কার্পাস (তুলা), আখ, সরষে ও বিভিন্ন ডালের চাষ শুরু করে।

২. ‘শ্রেণি’ (Guild) ও ‘সার্থবাহ’ কাদের বলা হতো? [৩ নম্বর] [গুরুত্বপূর্ণ]

উত্তর: প্রাচীন ভারতে কারিগর ও বণিকরা নিজেদের স্বার্থ রক্ষার জন্য আলাদা আলাদা সংগঠন বা ‘গিল্ড’ তৈরি করত।

  • শ্রেণি: একই পেশার কারিগরদের (যেমন – তাঁতি, কুমোর, কামার) সংগঠনকে বলা হতো ‘শ্রেণি’। এই ‘শ্রেণি’-গুলি কারিগরদের স্বার্থরক্ষা করত, জিনিসের মান ও দাম ঠিক করত এবং ব্যাঙ্ক হিসেবেও কাজ করত (অর্থাৎ টাকা জমা রাখা বা ধার দেওয়ার কাজ করত)।
  • সার্থবাহ: একইভাবে, বণিকদের সংগঠনও ছিল। যারা দলবদ্ধভাবে বাণিজ্য করত, তাদের নেতাকে বলা হতো ‘সার্থবাহ’। এই ‘সার্থবাহ’-এর নেতৃত্বে বণিকরা এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় বাণিজ্য করতে যেত।

৩. প্রাচীন ভারতে বাণিজ্যের প্রধান পথগুলি কী ছিল? [২ নম্বর]

উত্তর: প্রাচীন ভারতে জলপথ ও স্থলপথ—উভয় পথেই বাণিজ্য চলত।

  1. স্থলপথ: উত্তর ভারতের **’উত্তরাপথ’** (যা পূর্ববঙ্গের সোনারগাঁ থেকে উত্তর-পশ্চিমের পুরুষপুর বা পেশোয়ার পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল) এবং দক্ষিণ ভারতের **’দক্ষিণাপথ’** ছিল দুটি প্রধান স্থল বাণিজ্যপথ।
  2. জলপথ: নদীপথে এবং সমুদ্রপথেও (পশ্চিম এশিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া) বাণিজ্য চলত।

৪. প্রাচীন ভারতের সামুদ্রিক বাণিজ্যে রোমের ভূমিকা কী ছিল? দক্ষিণ ভারতে কেন এত রোমান মুদ্রা পাওয়া যায়? [৫ নম্বর]

উত্তর:

রোমের ভূমিকা: কুষাণ ও সাতবাহন আমলে (খ্রিস্টীয় প্রথম-দ্বিতীয় শতক) রোমান সাম্রাজ্যের সঙ্গে ভারতের সামুদ্রিক বাণিজ্য তুঙ্গে ওঠে। ভারত থেকে গোলমরিচ, মশলা, সূক্ষ্ম বস্ত্র, হাতির দাঁত ইত্যাদি রোমে রপ্তানি হতো। এর বিনিময়ে রোম থেকে ভারতে আসত বিপুল পরিমাণ সোনা ও রুপোর মুদ্রা, কাচ এবং মদ।

রোমান মুদ্রা পাওয়ার কারণ:

এই বাণিজ্যের প্রধান কেন্দ্র ছিল দক্ষিণ ভারত (বিশেষত করমণ্ডল ও মালাবার উপকূল)। ভারতীয় পণ্যের বিনিময়ে রোমান বণিকরা সোনা ও রুপোর মুদ্রা দিত। এই বাণিজ্য ভারতের অনুকূলে ছিল (অর্থাৎ ভারত রপ্তানি বেশি করত, আমদানি কম করত)। এর ফলেই দক্ষিণ ভারতের বিভিন্ন প্রত্নক্ষেত্রে (যেমন – আরিকামেডু) বিপুল পরিমাণ রোমান মুদ্রা পাওয়া গেছে, যা এই সমৃদ্ধ বাণিজ্যের প্রমাণ।

রোম-ভারত বাণিজ্য ভারত (বিশেষত দক্ষিণ) রপ্তানি: মশলা, বস্ত্র (লাভজনক বাণিজ্য) আমদানি: সোনা ও রুপোর মুদ্রা রোমান সাম্রাজ্য

চিত্র: প্রাচীন রোম-ভারত সামুদ্রিক বাণিজ্য।

৫. ‘দ্বিতীয় নগরায়ণ’ (Second Urbanisation) বলতে কী বোঝায়? [৩ নম্বর]

উত্তর: হরপ্পা সভ্যতা ছিল ভারতীয় উপমহাদেশের প্রথম নগর সভ্যতা। হরপ্পার পতনের পর প্রায় এক হাজার বছর ভারতে কোনো নগর বা শহর সেভাবে গড়ে ওঠেনি।

খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতক নাগাদ গঙ্গা নদীর উপত্যকা অঞ্চলে লোহার ব্যবহার, কৃষির উন্নতি এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের ওপর ভিত্তি করে আবার নতুন করে নগর বা শহর গড়ে উঠতে শুরু করে (যেমন – মগধ, কোশল, বৈশালী)। এই ঘটনাকেই ‘দ্বিতীয় নগরায়ণ’ বলা হয়।

৬. ‘চতুর্বর্ণ’ ও ‘জাতি’-র মধ্যে পার্থক্য কী? [৩ নম্বর] [গুরুত্বপূর্ণ]

উত্তর:

  • চতুর্বর্ণ: এটি ছিল পরবর্তী বৈদিক যুগে তৈরি একটি সামাজিক কাঠামো, যা সমাজকে **চারটি** প্রধান বর্ণে (ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য, শূদ্র) ভাগ করেছিল। এটি ছিল মূলত কাজের ভিত্তিতে একটি তাত্ত্বিক বা আদর্শ বিভাজন।
  • জাতি: ‘জাতি’ হলো ‘চতুর্বর্ণ’-এরই পরবর্তী ও বাস্তব রূপ। এটি ছিল **জন্মের** ভিত্তিতে তৈরি একটি কঠোর সামাজিক বিভাজন। পরবর্তীকালে বিভিন্ন বর্ণের মধ্যে বিবাহ এবং বিভিন্ন পেশার উদ্ভবের ফলে অগণিত ‘জাতি’-র (Sub-caste) জন্ম হয় (যেমন – কামার, কুমোর, তাঁতি ইত্যাদি)। বর্ণ মাত্র চারটি হলেও, জাতির সংখ্যা ছিল অসংখ্য। জাতিভেদ প্রথা ছিল চতুর্বর্ণের থেকেও অনেক বেশি কঠোর।

৭. মৌর্য আমলে নারীদের অবস্থা কেমন ছিল? [৩ নম্বর]

উত্তর: মৌর্য আমলে নারীদের সামাজিক অবস্থান সব ক্ষেত্রে সমান ছিল না।

  • সমাজে নারীদের সম্মান ছিল, তবে সাধারণভাবে তারা পুরুষের অধীনেই থাকত। নারীদের একা বাইরে বেরোনোর বা স্বাধীনভাবে কাজ করার অধিকার ছিল না।
  • সম্রাট অশোক নারীদেরও ‘মহামাত্র’ (উচ্চপদস্থ কর্মচারী) পদে নিয়োগ করেছিলেন।
  • মেগাস্থিনিসের বিবরণ থেকে জানা যায়, সম্রাটের দেহরক্ষী হিসেবে সশস্ত্র নারীদের নিয়োগ করা হতো। আবার গুপ্তচর হিসেবেও নারীরা কাজ করতেন।
  • সমাজে পর্দা প্রথা কঠোরভাবে পালিত হতো না, তবে উচ্চবংশের নারীরা কিছুটা আড়ালে থাকতেন।

৮. গুপ্ত যুগে নারীদের অবস্থার কী পরিবর্তন হয়েছিল? [৩ নম্বর]

উত্তর: গুপ্ত যুগে এসে নারীদের সামাজিক অবস্থার আরও অবনতি ঘটে।

  • এই যুগে মেয়েদের অল্প বয়সে বিবাহ দেওয়ার (বাল্যবিবাহ) প্রথা জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
  • নারীদের শিক্ষার অধিকার অনেকটাই কেড়ে নেওয়া হয়।
  • স্বামীর সম্পত্তিতে নারীদের অধিকার ছিল না বললেই চলে।
  • শাসক পরিবারে নারীদের কিছুটা সম্মান থাকলেও (যেমন – গুপ্ত রানি প্রভাবতীগুপ্তা), সাধারণ সমাজে নারীরা মূলত পুরুষদের অধীন হয়ে পড়েন।
  • এই যুগেই প্রথম ‘সতীদাহ’ প্রথার (স্বামীর চিতায় স্ত্রীর সহমরণ) নিদর্শন পাওয়া যায় (যেমন – ৫১০ খ্রিঃ-এর এরান লেখ)।

৯. চিনা পর্যটক ফা-হিয়েন (ফাক্সিয়ান) এবং হিউয়েন সাঙ (সুয়ান জাং)-এর বিবরণী থেকে গুপ্ত ও গুপ্ত-পরবর্তী যুগ সম্পর্কে কী জানা যায়? [৫ নম্বর]

উত্তর:

ফা-হিয়েন (গুপ্ত যুগ):**

তিনি গুপ্ত সম্রাট দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের আমলে ভারতে আসেন। তাঁর বিবরণী থেকে জানা যায়:

  • গুপ্ত শাসন ছিল সুশাসিত ও নমনীয়।
  • মানুষ সুখে-শান্তিতে ছিল এবং করের বোঝা ছিল কম।
  • পাটলিপুত্র ছিল এক সমৃদ্ধ নগরী।
  • তবে তিনি সমাজে অস্পৃশ্যতা বা ‘চণ্ডাল’দের দুঃখজনক অবস্থার কথাও উল্লেখ করেছেন, যাদের শহরের বাইরে বাস করতে হতো।

হিউয়েন সাঙ (গুপ্ত-পরবর্তী যুগ):

তিনি হর্ষবর্ধনের রাজত্বকালে ভারতে আসেন। তাঁর বিবরণী থেকে জানা যায়:

  • হর্ষবর্ধন ছিলেন প্রজাদরদী শাসক এবং বৌদ্ধধর্মের পৃষ্ঠপোষক।
  • নালন্দা মহাবিহার ছিল তৎকালীন ভারতের শ্রেষ্ঠ শিক্ষাকেন্দ্র।
  • তবে এই যুগে বর্ণভেদ প্রথা খুব কঠোর ছিল এবং সমাজে অস্পৃশ্যতা বজায় ছিল।
  • পাটলিপুত্র শহরের গুরুত্ব কমে গিয়েছিল এবং কনৌজ শহর প্রধান হয়ে উঠেছিল।

অতিরিক্ত প্রশ্নাবলী (Higher Order Thinking)

১০. প্রাচীন ভারতে কৃষিকাজের উন্নতির ফলে সমাজে কী কী পরিবর্তন এসেছিল? [৩ নম্বর]

উত্তর: কৃষিকাজের উন্নতির ফলে সমাজে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে:

  1. স্থায়ী বসতি: যাযাবর জীবন ছেড়ে মানুষ কৃষিজমির পাশে স্থায়ীভাবে গ্রাম স্থাপন করে বসবাস শুরু করে।
  2. সম্পদের ধারণা: পশুপালনের যুগে ‘পশু’ ছিল প্রধান সম্পদ, কিন্তু কৃষির ফলে ‘জমি’ হয়ে ওঠে প্রধান সম্পদ।
  3. সামাজিক বিভাজন: জমির ওপর ব্যক্তিগত মালিকানা এবং কৃষিতে উদ্বৃত্ত (বাড়তি) ফসল দেখা দেওয়ায়, সমাজে ধনী-দরিদ্রের বিভাজন এবং শাসক-শাসিতের ধারণা স্পষ্ট হয়।
  4. নতুন পেশা: কৃষিকাজে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি (লাঙল, কাস্তে) এবং ফসল রাখার পাত্র (মাটির পাত্র) তৈরির জন্য কামার, কুমোর, ছুতোর ইত্যাদি নতুন পেশার জন্ম হয়।

১১. কুষাণ আমলে ভারতের বাণিজ্যের এত উন্নতি হয়েছিল কেন? [৩ নম্বর]

উত্তর: কুষাণ সম্রাট কনিষ্কের আমলে ভারতের বাণিজ্যের (বিশেষত বৈদেশিক বাণিজ্যের) প্রভূত উন্নতি হয়। এর প্রধান কারণ:

  • রেশম পথের (Silk Route) নিয়ন্ত্রণ: কুষাণ সাম্রাজ্য মধ্য এশিয়া থেকে চিন পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। চিনের রেশম রোমান সাম্রাজ্যে যাওয়ার প্রধান স্থলপথ ‘রেশম পথ’ কুষাণদের নিয়ন্ত্রণে ছিল। এই পথ দিয়ে বাণিজ্য করার জন্য কুষাণরা বণিকদের থেকে প্রচুর শুল্ক বা কর আদায় করত, যা সাম্রাজ্যকে সমৃদ্ধ করে।
  • সোনার মুদ্রা: রোমান সাম্রাজ্যের সঙ্গে বাণিজ্যের ফলে ভারতে প্রচুর রোমান সোনা আসত। কুষাণ সম্রাটরা (যেমন – বিম কদফিসেস) প্রথম ভারতীয় উপমহাদেশে উল্লেখযোগ্যভাবে সোনার মুদ্রা চালু করেন, যা বড় আকারের বাণিজ্যকে সহজ করে দিয়েছিল।

BISWAZ GROWTH ACADEMY - Class Menu
BISWAZ GROWTH ACADEMY - Class Menu