বিষয়: অতীত ও ঐতিহ্য (ষষ্ঠ শ্রেণি)
অধ্যায় ৫: খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকের ভারতীয় উপমহাদেশ (প্রকল্প নোটস)
মূল ধারণা ও প্রশ্নাবলী
১. ‘জনপদ’ থেকে ‘মহাজনপদ’-এর উত্থান কীভাবে হলো?
উত্তর: প্রাচীন ভারতে ‘জন’ বা জনগোষ্ঠীকে কেন্দ্র করে ছোট ছোট রাজ্য গড়ে উঠেছিল, যেগুলিকে ‘জনপদ’ বলা হতো। খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতক নাগাদ এই জনপদগুলির শাসকরা যুদ্ধ করে নিজেদের রাজ্যের সীমানা বাড়াতে শুরু করেন। ছোট ছোট জনপদগুলিকে জয় করে সেগুলি বড় বড় রাজ্যে পরিণত হয়। এই বড় রাজ্যগুলিই ‘মহাজনপদ’ নামে পরিচিত হয়। মহাজনপদগুলির শাসকরা (রাজারা) জনপদের শাসকদের চেয়ে অনেক বেশি ক্ষমতাশালী ছিলেন।
২. ‘ষোড়শ মহাজনপদ’ বলতে কী বোঝায়?
উত্তর: খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতক নাগাদ ভারতীয় উপমহাদেশে (মূলত উত্তর ভারতে) ১৬টি বড় রাজ্যের বা মহাজনপদের কথা জানা যায়। জৈন ও বৌদ্ধ সাহিত্য থেকে এই ১৬টি রাজ্যের কথা জানা যায়। এই ১৬টি মহাজনপদকে একসাথে ‘ষোড়শ মহাজনপদ’ বলা হয়।
৩. রাজতান্ত্রিক রাজ্য ও গণরাজ্যের মধ্যে প্রধান পার্থক্য কী?
উত্তর:
- রাজতান্ত্রিক রাজ্য: এই রাজ্যগুলিতে শাসনের সব ক্ষমতা থাকত একজন ব্যক্তির হাতে, যিনি হলেন ‘রাজা’। রাজার পদ ছিল সাধারণত বংশানুক্রমিক (অর্থাৎ রাজার ছেলেই রাজা হতেন)। মগধ, কোশল, অবন্তী ছিল রাজতান্ত্রিক রাজ্য।
- গণরাজ্য: এই রাজ্যগুলিতে কোনো একজন রাজা ছিলেন না। এই রাজ্যগুলি পরিচালিত হতো এক বা একাধিক গোষ্ঠী বা ‘গণ’-এর নেতাদের দ্বারা। এখানে শাসকরা আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নিতেন। বজ্জি ও মল্ল ছিল দুটি বিখ্যাত গণরাজ্য।
চিত্র: মহাজনপদের দুই প্রকার শাসন ব্যবস্থা।
৪. ষোড়শ মহাজনপদের মধ্যে মগধ সবচেয়ে শক্তিশালী হয়ে উঠেছিল কেন?
উত্তর: ষোলোটি মহাজনপদের মধ্যে শেষ পর্যন্ত মগধই সবথেকে শক্তিশালী হয়ে ওঠে। এর প্রধান কারণগুলি হলো:
- ভৌগোলিক অবস্থান: মগধের রাজধানী রাজগৃহ (পরে পাটলিপুত্র) ছিল নদী ও পাহাড় দিয়ে ঘেরা, যা ছিল অত্যন্ত সুরক্ষিত।
- উর্বর কৃষিজমি: গঙ্গা নদীর পলিমাটি মগধের কৃষিজমিকে খুব উর্বর করে তুলেছিল, ফলে প্রচুর ফসল ফলত এবং রাজ্যের রাজস্ব বা করের পরিমাণ বেশি ছিল।
- বনজ সম্পদ: মগধের ঘন বন থেকে ঘরবাড়ি তৈরির জন্য কাঠ এবং যুদ্ধের জন্য প্রচুর হাতি পাওয়া যেত।
- খনিজ সম্পদ: মগধের কাছেই লোহা ও তামার খনি ছিল। এই খনিজ সম্পদ দিয়ে তারা সহজেই লোহার তৈরি মজবুত অস্ত্রশস্ত্র বানাতে পারত।
- নদীপথে বাণিজ্য: গঙ্গা নদীপথে বাণিজ্যের সুবিধাও মগধের ছিল।
- যোগ্য শাসক: বিম্বিসার, অজাতশত্রু ও महापদ্ম নন্দের মতো দক্ষ ও উচ্চাকাঙ্ক্ষী রাজাদের নেতৃত্বে মগধের ক্ষমতা বহুগুণ বেড়ে গিয়েছিল।
৫. বজ্জি গণরাজ্যের বিরুদ্ধে অজাতশত্রুর যুদ্ধের বিষয়ে গৌতম বুদ্ধের পরামর্শ কী ছিল?
উত্তর: মগধের রাজা অজাতশত্রু যখন বজ্জিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের উদ্যোগ নেন, তখন তিনি গৌতম বুদ্ধের মতামত জানতে চান। বুদ্ধ সরাসরি যুদ্ধের পরামর্শ না দিয়ে, বজ্জিদের ঐক্যের কথা বলেন। তিনি বলেন যে, বজ্জিরা যতদিন সাতটি নিয়ম মেনে চলবে, ততদিন তাদের কোনো ক্ষতি হবে না।
এই সাতটি নিয়মের মধ্যে প্রধান ছিল:
- নিয়মিত সভা করে রাজ্যের কাজ চালানো।
- সবাই মিলেমিশে একজোট হয়ে কাজ করা।
- নিজেদের বানানো আইন মেনে চলা।
- বয়স্কদের সম্মান করা ও তাঁদের কথা শোনা।
- নারী ও দেবতাদের সম্মান করা।
এই বিবরণ থেকে বোঝা যায়, বজ্জিদের ঐক্যই ছিল তাদের শক্তির মূল উৎস।
৬. ‘নব্যধর্ম আন্দোলন’ বা নতুন ধর্মমতগুলির উত্থানের কারণ কী?
উত্তর: খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকে ব্রাহ্মণ্য বৈদিক ধর্মের জটিলতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে ভারতে জৈন ও বৌদ্ধ ধর্মের মতো একাধিক নতুন ধর্মমতের (নব্যধর্ম) উত্থান ঘটে। এর কারণগুলি হলো:
- ব্রাহ্মণ্য ধর্মের জটিলতা: বৈদিক ধর্মে ব্যয়বহুল যাগযজ্ঞ, আচার-অনুষ্ঠান ও পশুবলি অত্যন্ত বেড়ে গিয়েছিল, যা সাধারণ মানুষের পক্ষে পালন করা কঠিন ছিল।
- পশুবলির কুফল: লোহার লাঙলের ব্যবহারের ফলে কৃষিকাজ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কৃষির জন্য গবাদি পশুর প্রয়োজন ছিল। কিন্তু যজ্ঞে পশুবলি দেওয়ার ফলে কৃষিকাজের ক্ষতি হচ্ছিল, তাই কৃষকরা এর বিরোধী হয়ে ওঠে।
- জাতিভেদ প্রথা: পরবর্তী বৈদিক যুগে জাতিভেদ প্রথা (ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য, শূদ্র) অত্যন্ত কঠোর হয়ে ওঠে। ব্রাহ্মণরা সমাজে সর্বোচ্চ স্থান দাবি করে। এই ভেদাভেদের বিরুদ্ধে ক্ষত্রিয় (যেমন মহাবীর ও বুদ্ধ) এবং বৈশ্যরা (ব্যবসায়ী) ক্ষুব্ধ হয়।
- ব্যবসায়ীদের অসন্তোষ: ব্যবসায়ীদের বাণিজ্যের জন্য সমুদ্রযাত্রা করতে হতো বা সুদে টাকা খাটাতে হতো, যা ব্রাহ্মণ্য ধর্মে ‘পাপ’ বলে গণ্য করা হতো।
- সহজ-সরল ধর্মের চাহিদা: এই পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীরা একটি সহজ-সরল ধর্মের খোঁজ করছিল, যেখানে পশুবলি বা জাতিভেদ প্রথার স্থান থাকবে না। এই চাহিদাই নব্যধর্ম আন্দোলনের পথ তৈরি করে।
৭. জৈন ধর্মের প্রধান প্রচারককে কী বলা হতো? ‘চতুর্যাম’ ও ‘পঞ্চমহাব্রত’ কী?
উত্তর: জৈন ধর্মের প্রধান প্রচারকদের ‘তীর্থঙ্কর’ বলা হতো। জৈন ঐতিহ্য অনুসারে মোট ২৪ জন তীর্থঙ্কর ছিলেন। পার্শ্বনাথ ছিলেন ২৩তম এবং বর্ধমান মহাবীর ছিলেন ২৪তম বা শেষ তীর্থঙ্কর।
চতুর্যাম: ২৩তম তীর্থঙ্কর পার্শ্বনাথ জৈনদের চারটি মূলনীতি মেনে চলার নির্দেশ দেন। এই চারটি নীতিকে একত্রে ‘চতুর্যাম’ বা ‘চতুর্যামব্রত’ বলা হয়। সেগুলি হলো:
- অহিংসা (কোনো প্রাণী হত্যা না করা)
- সত্য (মিথ্যা কথা না বলা)
- অস্তেয় (অন্যের জিনিস ছিনিয়ে না নেওয়া বা চুরি না করা)
- অপরিগ্রহ (নিজের জন্য কোনো সম্পত্তি না করা)
পঞ্চমহাব্রত: শেষ তীর্থঙ্কর বর্ধমান মহাবীর এই চারটি নীতির সঙ্গে আরও একটি নতুন নীতি যোগ করেন, সেটি হলো **ব্রহ্মচর্য** (সংযম পালন)। এই পাঁচটি নীতিকে একসঙ্গে ‘পঞ্চমহাব্রত’ বলা হয়।
৮. জৈন ধর্মের ‘দিগম্বর’ ও ‘শ্বেতাম্বর’ গোষ্ঠীদুটির মধ্যে পার্থক্য কী?
উত্তর: চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের শাসনের শেষ দিকে দুর্ভিক্ষ হলে জৈন সন্ন্যাসীদের মধ্যে দুটি ভাগ হয়ে যায়:
- দিগম্বর: যে সন্ন্যাসীরা ভদ্রবাহুর নেতৃত্বে দাক্ষিণাত্যে চলে গিয়েছিলেন এবং মহাবীরের কঠোর অনুশাসন মেনে চলতেন (যেমন – কোনো পোশাক পরতেন না), তাঁরা ‘দিগম্বর’ নামে পরিচিত।
- শ্বেতাম্বর: যে সন্ন্যাসীরা স্থূলভদ্রের নেতৃত্বে উত্তর ভারতেই থেকে গিয়েছিলেন এবং পার্শ্বনাথের অনুশাসন মেনে শ্বেত বা সাদা বস্ত্র পরিধান করতেন, তাঁরা ‘শ্বেতাম্বর’ নামে পরিচিত।
৯. ‘চতুরার্যসত্য’ ও ‘অষ্টাঙ্গিক মার্গ’ কোন ধর্মের অংশ? এগুলি কী?
উত্তর: ‘চতুরার্যসত্য’ ও ‘অষ্টাঙ্গিক মার্গ’ বৌদ্ধ ধর্মের মূল ভিত্তি। গৌতম বুদ্ধ সারনাথে তাঁর প্রথম উপদেশে এই তত্ত্বগুলি প্রচার করেন।
চতুরার্যসত্য: বুদ্ধ মানুষের জীবনের দুঃখের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে চারটি মহান সত্যের কথা বলেন, যা ‘চতুরার্যসত্য’ নামে পরিচিত:
- সংসারে দুঃখ আছে।
- দুঃখের কারণ আছে (তৃষ্ণা বা কামনা)।
- এই দুঃখ দূর করা সম্ভব (কামনা ত্যাগ করলে)।
- দুঃখ থেকে মুক্তি পাওয়ার পথ আছে।
অষ্টাঙ্গিক মার্গ: বুদ্ধ দুঃখ থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য যে আটটি পথের কথা বলেন, তাকেই ‘অষ্টাঙ্গিক মার্গ’ বা ‘আটটি পথ’ বলা হয়। যেমন – সৎ বাক্য, সৎ কর্ম, সৎ জীবন, সৎ চেষ্টা, সৎ সমাধি ইত্যাদি। বুদ্ধের মতে, এই আটটি পথ মেনে চললেই মানুষ ‘নির্বাণ’ বা চিরমুক্তি লাভ করতে পারে।
১০. ‘ত্রিপিটক’ কী?
উত্তর: ‘ত্রিপিটক’ হলো বৌদ্ধদের প্রধান ধর্মগ্রন্থ। ‘পিটক’ কথার অর্থ ঝুড়ি। তিনটি পিটক বা সংকলন নিয়ে এটি গঠিত, তাই এর নাম ‘ত্রিপিটক’। এই গ্রন্থ পালি ভাষায় লেখা।
তিনটি পিটক হলো:
- সুত্তপিটক: এতে গৌতম বুদ্ধের মূল উপদেশগুলি সংকলিত আছে।
- বিনয়পিটক: এতে বৌদ্ধ সন্ন্যাসী ও সংঘের (মঠ) আচার-আচরণের নিয়মগুলি আছে।
- অভিধম্মপিটক: এতে বুদ্ধের উপদেশের দার্শনিক ব্যাখ্যা আছে।
১১. ‘হীনযান’ ও ‘মহাযান’ বলতে কী বোঝায়?
উত্তর: সম্রাট কনিষ্কের আমলে (চতুর্থ বৌদ্ধ সংগীতিতে) বৌদ্ধধর্ম দুটি প্রধান ভাগে ভাগ হয়ে যায়:
- হীনযান: যারা বুদ্ধের পুরোনো ও কঠোর নীতিগুলি মেনে চলতেন এবং মূর্তিপূজার বিরোধী ছিলেন, তাঁরা ‘হীনযান’ (ছোট গাড়ি) নামে পরিচিত হন।
- মহাযান: যারা সময়ের সাথে সাথে বৌদ্ধধর্মে কিছু পরিবর্তন আনেন (যেমন – বোধিসত্ত্বের ধারণা) এবং বুদ্ধের মূর্তিপূজা শুরু করেন, তাঁরা ‘মহাযান’ (বড় গাড়ি) নামে পরিচিত হন। কনিষ্ক মহাযান মতের সমর্থক ছিলেন।
১২. জৈন ও বৌদ্ধ ধর্মের মধ্যে দুটি মিল ও দুটি অমিল লেখো।
উত্তর:
মিল:
- উভয় ধর্মের প্রচারক (মহাবীর ও বুদ্ধ) ছিলেন ক্ষত্রিয় রাজকুমার।
- উভয় ধর্মই ব্রাহ্মণ্য ধর্মের জটিল যাগযজ্ঞ, পশুবলি এবং জাতিভেদ প্রথার বিরোধিতা করেছিল।
- উভয় ধর্মই সাধারণ মানুষের বোধগম্য ভাষায় (জৈনরা প্রাকৃত, বৌদ্ধরা পালি) ধর্ম প্রচার করে।
অমিল:
- জৈন ধর্ম কঠোর তপস্যা ও কৃচ্ছ্রসাধনের ওপর জোর দিয়েছিল, কিন্তু বৌদ্ধ ধর্ম ‘মধ্যপন্থা’ বা মাঝামাঝি পথের কথা বলেছিল।
- জৈন ধর্মে ‘অহিংসা’ নীতি ছিল অত্যন্ত কঠোর (কৃষিকাজকেও পাপ মনে করা হতো), বৌদ্ধ ধর্মে অহিংসা পালিত হলেও তা এতটা কঠোর ছিল না।
১৩. ‘জাতক’ কী?
উত্তর: ‘জাতক’ হলো বৌদ্ধ ধর্মগ্রন্থ ত্রিপিটকের (সুত্তপিটক) অন্তর্গত কিছু গল্প। এই গল্পগুলিতে মনে করা হয় গৌতম বুদ্ধের পূর্বজন্মের কাহিনি বর্ণিত আছে। এই গল্পগুলির সংখ্যা ৫০০-এরও বেশি এবং এগুলি পালি ভাষায় লেখা। সাধারণ মানুষের মধ্যে বৌদ্ধধর্মের উপদেশ প্রচার করার জন্য এই গল্পগুলি বলা হতো।