বিষয়: অতীত ও ঐতিহ্য (ষষ্ঠ শ্রেণি)
অধ্যায় ৪: প্রাচীন ইতিহাসের ধারা: দ্বিতীয় পর্যায় (প্রকল্প নোটস)
মূল ধারণা ও প্রশ্নাবলী
১. ‘ইন্দো-ইউরোপীয়’ ভাষাগোষ্ঠী বলতে কী বোঝো?
উত্তর: ভাষারও মানুষের মতো পরিবার হয়। একই ভাষা পরিবারভুক্ত ভাষাগুলির মধ্যে উচ্চারণে ও অর্থে অনেক মিল থাকে। এমনই একটি ভাষা পরিবার হলো ‘ইন্দো-ইউরোপীয়’ ভাষা পরিবার। ভারতীয় উপমহাদেশ (যেমন – সংস্কৃত, বাংলা, হিন্দি) এবং ইউরোপের (যেমন – ইংরেজি, লাতিন, গ্রিক) অনেক ভাষাই এই পরিবারের সদস্য। মনে করা হয়, এই ভাষা ব্যবহারকারীরা মূলত মধ্য এশিয়ার তৃণভূমি অঞ্চলের যাযাবর ছিল।
২. ‘ইন্দো-আর্য’ বা ‘বৈদিক’ সভ্যতা বলতে কী বোঝায়?
উত্তর: ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাগোষ্ঠীর একটি শাখা (‘ইন্দো-ইরানীয়’) উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত দিয়ে ভারতীয় উপমহাদেশে প্রবেশ করে। এদেরই ‘ইন্দো-আর্য’ ভাষা গোষ্ঠী বলা হয়। এই ইন্দো-আর্যদের মুখের ভাষাতেই ‘ঋকবেদ’ রচিত হয়েছিল।
বৈদিক সাহিত্য থেকে এই ইন্দো-আর্যদের বসতি, জীবনযাত্রা ও সংস্কৃতি সম্পর্কে জানা যায়, তাই এই সভ্যতাকে ‘বৈদিক সভ্যতা’ বলা হয়।
৩. ‘বৈদিক সাহিত্য’ কাকে বলে? এর প্রধান ভাগগুলি কী কী?
উত্তর: ‘বেদ’ শব্দটি এসেছে ‘বিদ’ শব্দ থেকে, যার অর্থ জ্ঞান। ইন্দো-আর্যদের প্রাচীনতম সাহিত্য হলো বেদ। বেদ ও বেদের ওপর ভিত্তি করে লেখা অন্যান্য সাহিত্যকে একসাথে ‘বৈদিক সাহিত্য’ বলা হয়।
বৈদিক সাহিত্যের প্রধান চারটি ভাগ হলো:
- সংহিতা: এটি হলো বেদের মূল অংশ। এগুলি ছন্দে বাঁধা কবিতা বা স্তোত্র। সংহিতা চারটি— **ঋক, সাম, যজুঃ ও অথর্ব**।
- ব্রাহ্মণ: সংহিতাগুলির গদ্যে লেখা ব্যাখ্যা। এতে যাগযজ্ঞ ও আচার-অনুষ্ঠানের নিয়মাবলী রয়েছে।
- আরণ্যক: ব্রাহ্মণ সাহিত্যের শেষ অংশ, যা অরণ্যে বা বনে বসে রচিত হয়েছিল। এতে যাগযজ্ঞের ভেতরের অর্থ ও দার্শনিক তত্ত্ব আলোচনা করা হয়েছে।
- উপনিষদ: বেদের শেষ অংশ, তাই একে ‘বেদান্ত’-ও বলে। এতে কর্মফল, আত্মা, ব্রহ্ম ইত্যাদি বিষয়ে গভীর দার্শনিক আলোচনা আছে।
চিত্র: বৈদিক সাহিত্যের প্রধান চারটি ভাগ।
৪. বৈদিক যুগকে কয়টি ভাগে ভাগ করা হয় ও কী কী?
উত্তর: বৈদিক সাহিত্য রচনার সময়কাল অনুসারে বৈদিক যুগকে দুটি প্রধান ভাগে ভাগ করা হয়:
- আদি বৈদিক যুগ (আনু. খ্রিস্টপূর্ব ১৫০০ – ১০০০ অব্দ): এই যুগের ইতিহাস জানার একমাত্র উপাদান হলো ‘ঋকবেদ সংহিতা’।
- পরবর্তী বৈদিক যুগ (আনু. খ্রিস্টপূর্ব ১০০০ – ৬০০ অব্দ): এই যুগের ইতিহাস জানার উপাদান হলো সামবেদ, যজুর্বেদ, অথর্ববেদ এবং অন্যান্য বৈদিক সাহিত্য।
৫. ‘দশ রাজার যুদ্ধ’ কী?
উত্তর: ‘দশ রাজার যুদ্ধ’-এর বিবরণ ঋকবেদে পাওয়া যায়। এটি ছিল আদি বৈদিক যুগের একটি বিখ্যাত যুদ্ধ। এই যুদ্ধে ভরত গোষ্ঠীর রাজা সুদাসের সঙ্গে অন্যান্য দশটি গোষ্ঠীর রাজাদের জোটের যুদ্ধ হয়েছিল।
রাভি (প্রাচীন পারুষ্ণী) নদীর তীরে এই যুদ্ধ হয়। যুদ্ধে রাজা সুদাস দশ রাজার জোটকে পরাজিত করেন। এর ফলে ভরত গোষ্ঠীর রাজনৈতিক ক্ষমতা বহুগুণ বেড়ে যায়।
৬. আদি বৈদিক যুগ ও পরবর্তী বৈদিক যুগের রাজনীতির মধ্যে প্রধান পার্থক্য কী ছিল?
উত্তর:
| বিষয় | আদি বৈদিক যুগ (ঋকবেদ) | পরবর্তী বৈদিক যুগ |
|---|---|---|
| রাজার ক্ষমতা | রাজা ছিলেন মূলত গোষ্ঠীর প্রধান বা ‘বিশপতি’, ‘গোপতি’। তাঁর ক্ষমতা ছিল সীমিত। | রাজার ক্ষমতা 엄청 বৃদ্ধি পায়। তিনি ‘ভূপতি’ (জমির মালিক), ‘মহীপতি’ (পৃথিবীর রাজা) উপাধি নেন। |
| রাজ্য | ‘রাজ্য’-এর ধারণা ছিল না। শাসন চলত ‘জন’, ‘বিশ’ বা গোষ্ঠীর ওপর ভিত্তি করে। | নির্দিষ্ট অঞ্চল বা ‘জনপদ’-এর ওপর ভিত্তি করে ‘রাজ্য’-এর ধারণা তৈরি হয় (যেমন – কুরু, পাঞ্চাল)। |
| সভা ও সমিতি | ‘সভা’ ও ‘সমিতি’ নামক দুটি প্রতিষ্ঠানের হাতে অনেক ক্ষমতা ছিল। তারা রাজাকে শাসনকাজে সাহায্য করত ও নিয়ন্ত্রণ করত। | রাজার ক্ষমতা বাড়ার ফলে ‘সভা’ ও ‘সমিতি’-র গুরুত্ব ও ক্ষমতা অনেক কমে যায়। |
| যজ্ঞ | যজ্ঞের আড়ম্বর কম ছিল। | রাজারা নিজেদের ক্ষমতা জাহির করার জন্য অশ্বমেধ, রাজসূয়, বাজপেয়র মতো বিশাল ও জটিল যজ্ঞের আয়োজন করতেন। |
৭. আদি বৈদিক যুগ ও পরবর্তী বৈদিক যুগের অর্থনীতির মধ্যে পার্থক্য কী ছিল?
উত্তর:
- আদি বৈদিক যুগ: এই যুগের অর্থনীতি ছিল মূলত **পশুপালন-নির্ভর**। গবাদি পশুই (বিশেষত গোরু) ছিল প্রধান সম্পদ। কৃষিকাজ ছিল গৌণ বা দ্বিতীয় প্রধান জীবিকা।
- পরবর্তী বৈদিক যুগ: এই যুগে অর্থনীতি **কৃষি-নির্ভর** হয়ে ওঠে। গঙ্গা-যমুনা দোয়াব অঞ্চলে লোহার লাঙলের ফলার সাহায্যে জঙ্গল পরিষ্কার করে চাষবাস শুরু হয়। ধান ও গম প্রধান ফসলে পরিণত হয়। পশুপালন দ্বিতীয় প্রধান জীবিকা হয়ে দাঁড়ায়।
৮. ‘চতুর্বর্ণপ্রথা’ বা ‘বর্ণাশ্রম’ বলতে কী বোঝায়?
উত্তর: ‘বর্ণাশ্রম’ বা ‘চতুর্বর্ণপ্রথা’ হলো পরবর্তী বৈদিক যুগে গড়ে ওঠা একটি সামাজিক বিভাজন ব্যবস্থা। ঋকবেদের শেষের দিকে (পুরুষসূক্তে) প্রথম এর উল্লেখ পাওয়া যায়।
এই প্রথা অনুযায়ী, সমাজের সমস্ত মানুষকে তাদের কাজের ভিত্তিতে চারটি ‘বর্ণে’ ভাগ করা হয়:
- ব্রাহ্মণ: এঁদের কাজ ছিল পুজো, যজ্ঞ করা এবং বেদ পাঠ ও শিক্ষাদান করা। এঁরা ছিলেন সমাজের শীর্ষে।
- ক্ষত্রিয়: এঁদের কাজ ছিল যুদ্ধ করা এবং দেশ শাসন করা।
- বৈশ্য: এঁদের কাজ ছিল কৃষি, পশুপালন ও ব্যবসা-বাণিজ্য করা।
- শূদ্র: এঁদের কাজ ছিল উপরের তিনটি বর্ণের (ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য) সেবা করা। এঁরা ছিলেন সমাজের সর্বনিম্ন স্তরে।
প্রথমদিকে এই ভাগ কাজের ভিত্তিতে হলেও, পরবর্তী বৈদিক যুগে তা ক্রমশ **জন্মগত** হয়ে পড়ে। অর্থাৎ, ব্রাহ্মণের ছেলেই ব্রাহ্মণ হবে, শূদ্রের ছেলেই শূদ্র হবে। এভাবেই জাতিভেদ প্রথার সূচনা হয়।
৯. ‘চতুরাশ্রম’ কী?
উত্তর: পরবর্তী বৈদিক যুগে ব্রাহ্মণরা মানুষের জীবনযাপনের চারটি পর্যায় বা ‘আশ্রম’-এর কথা বলেন। একে ‘চতুরাশ্রম’ বলে। এই চারটি আশ্রম হলো:
- ব্রহ্মচর্য: গুরুগৃহে থেকে শিক্ষালাভের পর্যায়।
- গার্হস্থ্য: শিক্ষা শেষে বিবাহ করে সংসার ধর্ম পালনের পর্যায়।
- বাণপ্রস্থ: সংসারের দায়িত্ব থেকে মুক্ত হয়ে বনে কুটির বানিয়ে ধর্মচর্চা করার পর্যায়।
- সন্ন্যাস: জীবনের শেষ পর্যায়ে সবকিছু ত্যাগ করে ঈশ্বরের চিন্তায় জীবন কাটানো।
দ্রষ্টব্য: এই ব্যবস্থা শূদ্রদের এবং নারীদের জন্য প্রযোজ্য ছিল না।
১০. আদি বৈদিক যুগ ও পরবর্তী বৈদিক যুগে নারীদের সামাজিক অবস্থার তুলনা করো।
উত্তর:
- আদি বৈদিক যুগে: নারীদের অবস্থা তুলনামূলকভাবে ভালো ছিল। সমাজে তাঁদের সম্মান ছিল। তাঁরা শিক্ষা লাভ করতে পারতেন (যেমন – লোপামুদ্রা, গার্গী)। তাঁরা ‘সভা’ ও ‘সমিতি’-র কাজে এবং এমনকি যুদ্ধেও অংশ নিতে পারতেন। বাল্যবিবাহ বা সতীদাহ প্রথা ছিল না।
- পরবর্তী বৈদিক যুগে: নারীদের সামাজিক মর্যাদা ও অধিকার অনেকটাই কমে যায়। মেয়েদের জন্মকে অশুভ বলে মনে করা হতো। তাঁদের শিক্ষালাভের সুযোগ কমে যায়, ‘সভা’ বা ‘সমিতি’-তে অংশগ্রহণ বন্ধ হয়ে যায় এবং অল্প বয়সে বিবাহের (বাল্যবিবাহ) প্রথা শুরু হয়।
১১. ‘মেগালিথ’ কী?
উত্তর: ‘মেগালিথ’ কথার অর্থ হলো ‘বড় পাথরের সমাধি’। প্রাচীন ভারতে (বিশেষত দক্ষিণ ভারতে) লোহার ব্যবহারের সমসাময়িক কালে, মৃতদেহকে বড় বড় পাথর দিয়ে চিহ্নিত করে সমাধি দেওয়ার প্রথা ছিল। কোথাও বৃত্তাকারে সাজানো পাথর, কোথাও বা একটি বিশাল পাথর দিয়ে এই সমাধিগুলি চেনা যেত। এগুলিই ‘মেগালিথ’ নামে পরিচিত।
১২. ইনামগাঁও প্রত্নকেন্দ্রের বৈশিষ্ট্য কী?
উত্তর: ইনামগাঁও হলো মহারাষ্ট্রের ভীমা নদী উপত্যকায় অবস্থিত একটি গুরুত্বপূর্ণ ‘মেগালিথ’ কেন্দ্র।
- এখানকার মানুষ কৃষি, পশুপালন ও মৎস্যশিকার করত।
- এখানে আয়তাকার মাটির বাড়ি, শস্য মজুতের জালা এবং সেচখালের অবশেষ পাওয়া গেছে।
- বাড়ির লাগোয়া সমাধিক্ষেত্র পাওয়া গেছে, যা থেকে ধনী-দরিদ্রের বিভাজন বোঝা যায় (যেমন – একটি শিশুর সমাধিতে দামি পাথরের হার)।
- মাথাসমেত ও মাথা ছাড়া দেবীমূর্তিও এখানে পাওয়া গেছে।