বিষয়: অতীত ও ঐতিহ্য (ষষ্ঠ শ্রেণি)
অধ্যায় ২: ভারতীয় উপমহাদেশে আদিম মানুষ (প্রকল্প নোটস)
মূল ধারণা ও প্রশ্নাবলী
১. ‘হোমিনিড’ বা ‘মানুষ পরিবার’ কীভাবে তৈরি হলো?
উত্তর: লক্ষ লক্ষ বছর আগে আফ্রিকা মহাদেশের পূর্ব অংশে ঘন জঙ্গল ছিল। সেখানে ‘এপ’ (Ape) নামক এক ধরনের লেজবিহীন বড় বানর বাস করত। আবহাওয়া বদলের ফলে গাছপালা কমে গেলে, এপ-দের একটি দল খাবার খুঁজতে গাছ থেকে মাটিতে নেমে আসে। তারা ধীরে ধীরে দু-পায়ে দাঁড়াতে চেষ্টা করে এবং খাবার খোঁজা শুরু করে। এইভাবেই প্রায় ৩০ থেকে ৪০ লক্ষ বছর আগে এপ থেকে আলাদা হয়ে ‘হোমিনিড’ বা ‘মানুষ পরিবার’-এর জন্ম হয়।
২. আদিম মানুষের প্রধান প্রজাতিগুলির নাম ও একটি করে বৈশিষ্ট্য লেখো।
উত্তর: আদিম মানুষের প্রধান প্রজাতিগুলি হলো:
- অস্ট্রালোপিথেকাস (Australopithecus): (আনুমানিক ৪০-৩০ লক্ষ বছর আগে)। এরা দু-পায়ে ভর দিয়ে কোনোক্রমে দাঁড়াতে পারত। এদের চোয়াল শক্ত ও সুগঠিত ছিল। (উদাহরণ: লুসি)।
- হোমো হাবিলিস (Homo Habilis) বা ‘দক্ষ মানুষ’: (আনুমানিক ২৬-১৭ লক্ষ বছর আগে)। এরা দলবদ্ধভাবে থাকত এবং এরাই প্রথম পাথরকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে শেখে।
- হোমো ইরেকটাস (Homo Erectus) বা ‘সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারা মানুষ’: (আনুমানিক ২০-৩.৫ লক্ষ বছর আগে)। এরা সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারত এবং দলবদ্ধভাবে গুহায় থাকত। এরাই প্রথম আগুনের ব্যবহার শিখেছিল।
- হোমো স্যাপিয়েন্স (Homo Sapiens) বা ‘বুদ্ধিমান মানুষ’: (আনুমানিক ২ লক্ষ ৩০ হাজার বছর আগে)। এরা দল বেঁধে বড় পশু শিকার করত, মাংস পুড়িয়ে খেত এবং ছোট, তীক্ষ্ণ ও ধারালো পাথরের অস্ত্র (যেমন বর্শা) বানাতে পারত।
চিত্র: আদিম মানুষ থেকে আধুনিক মানুষের বিবর্তন (বাম থেকে ডানে): অস্ট্রালোপিথেকাস, হোমো হাবিলিস, হোমো ইরেকটাস, এবং হোমো স্যাপিয়েন্স।
৩. পাথরের যুগকে কয়টি ভাগে ভাগ করা হয় ও কী কী?
উত্তর: পাথরের হাতিয়ারের বৈশিষ্ট্যের ওপর ভিত্তি করে পাথরের যুগকে প্রধানত তিনটে পর্যায়ে ভাগ করা হয়:
- পুরোনো পাথরের যুগ (Paleolithic Age)
- মাঝের পাথরের যুগ (Mesolithic Age)
- নতুন পাথরের যুগ (Neolithic Age)
৪. পুরোনো পাথরের যুগ ও নতুন পাথরের যুগের মধ্যে মানুষের জীবনযাত্রার প্রধান পার্থক্যগুলি লেখো।
উত্তর: পুরোনো পাথরের যুগ ও নতুন পাথরের যুগের মধ্যে পার্থক্যগুলি নিচে দেওয়া হলো:
| বিষয় | পুরোনো পাথরের যুগ | নতুন পাথরের যুগ |
|---|---|---|
| হাতিয়ার | হাতিয়ার ছিল বড়, ভারী ও এবড়োখেবড়ো (যেমন – হাত কুঠার, চপার)। | হাতিয়ার ছিল অনেক ছোট, হালকা, ধারালো ও মসৃণ (যেমন – ছোট পাথরের অস্ত্র)। |
| খাদ্য | মানুষ ছিল ‘খাদ্য সংগ্রাহক’। তারা শিকার করত ও বনের ফলমূল জোগাড় করত। | মানুষ ‘খাদ্য উৎপাদক’ হয়ে ওঠে। তারা কৃষিকাজ করতে শেখে। |
| বসবাস | মানুষ ছিল ‘যাযাবর’। তারা খোলা আকাশের নিচে বা প্রাকৃতিক গুহায় থাকত। | কৃষিকাজের জন্য মানুষ যাযাবর জীবন ছেড়ে ‘স্থায়ী বসতি’ স্থাপন করে এবং গ্রাম গড়ে তোলে। |
| পশুপালন | পশুপালন জানা ছিল না (একদম শেষের দিকে হয়তো শুরু হয়)। | কৃষির পাশাপাশি পশুপালন (গোরু, ছাগল, ভেড়া) গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। |
| পাত্র | মাটির পাত্রের ব্যবহার জানা ছিল না। | চাষের ফসল মজুত রাখার জন্য মাটির পাত্র বানানো শুরু হয়। |
৫. আগুন জ্বালাতে শেখার ফলে আদিম মানুষের জীবনে কী কী পরিবর্তন এসেছিল?
উত্তর: আগুন জ্বালাতে শেখা আদিম মানুষের ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী ঘটনা। এর ফলে জীবনে নানা বদল আসে:
- আত্মরক্ষা: আদিম মানুষ আগুন জ্বালিয়ে হিংস্র বন্য জন্তুর আক্রমণ থেকে নিজেদের রক্ষা করতে শেখে।
- শীত থেকে রক্ষা: আগুন শরীরকে উষ্ণতা দিত, ফলে প্রচণ্ড শীতের হাত থেকে মানুষ বাঁচতে পারল।
- খাদ্যাভ্যাসের বদল: সবচেয়ে বড় পরিবর্তন আসে খাবারে। মানুষ কাঁচা মাংসের বদলে আগুনে ঝলসানো নরম মাংস খাওয়া শুরু করে।
- শারীরিক বদল: ঝলসানো নরম মাংস খেতে চোয়াল ও দাঁতের জোর কম লাগত। এর ফলে ধীরে ধীরে তাদের চোয়াল সরু হয়ে আসে, সামনের ধারালো দাঁত ছোটো হয়ে যায় এবং চেহারায় বদল ঘটে।
- বুদ্ধির বিকাশ: ঝলসানো খাবার হজম করা সহজ হওয়ায় মানুষের শরীরে জোর বাড়ে এবং মস্তিষ্কের বিকাশ ঘটে।
৬. ‘ভীমবেটকা’ গুহা কেন বিখ্যাত?
উত্তর: ‘ভীমবেটকা’ ভারতের মধ্যপ্রদেশের ভূপালের কাছে অবস্থিত একটি বিখ্যাত প্রত্নক্ষেত্র।
- এখানে অনেক প্রাকৃতিক গুহার খোঁজ পাওয়া গেছে, যেখানে পুরোনো পাথরের যুগ থেকে আদিম মানুষেরা বাস করত।
- এই গুহাগুলির দেয়ালে আদিম মানুষদের আঁকা প্রচুর ছবি (গুহাচিত্র) পাওয়া গেছে।
- এই ছবিগুলিতে মূলত শিকারের দৃশ্য, নানা রকম বন্য পশু (ষাঁড়, হরিণ), পাখি, মাছ এবং দলবদ্ধভাবে মানুষের নাচ-গানের দৃশ্য ফুটে উঠেছে।
- এই ছবিগুলি থেকে আদিম মানুষের জীবনযাত্রা, সমাজ ও সংস্কৃতি সম্পর্কে অনেক কিছু জানা যায়।
চিত্র: ভীমবেটকার গুহাচিত্র। এখানে দলবদ্ধভাবে শিকারের দৃশ্য দেখা যাচ্ছে।
৭. মাঝের পাথরের যুগের হাতিয়ার ও জীবনযাত্রার বৈশিষ্ট্য কী ছিল?
উত্তর:
- হাতিয়ার: এই যুগের হাতিয়ারগুলি পুরোনো পাথরের যুগের তুলনায় অনেক ছোট, হালকা ও ধারালো হয়ে ওঠে। এগুলিকে ‘ছোট পাথরের হাতিয়ার’ (Microlith) বলা হয়। এই হাতিয়ারগুলি গাছের ডাল বা হাড়ের হাতলের সাথে জুড়ে ব্যবহার করা হতো (যেমন – ছুরি, তিরের ফলা)।
- জীবনযাত্রা: এই যুগে মানুষ শিকার ও ফলমূল সংগ্রহের পাশাপাশি পশুপালন করতে শেখে। মধ্যপ্রদেশের আদমগড় ও রাজস্থানের বাগোড়ে পশুপালনের প্রমাণ মিলেছে। মানুষ গুহা থেকে বেরিয়ে ছোট ছোট বসতি বানানো শুরু করে।
৮. কৃষিকাজ কীভাবে নতুন পাথরের যুগে মানুষের জীবনে ‘বিপ্লব’ এনেছিল?
উত্তর: নতুন পাথরের যুগে কৃষিকাজের সূচনা মানুষের জীবনে ‘বিপ্লব’ এনেছিল, কারণ এর ফলে মানুষের জীবনযাত্রায় আমূল পরিবর্তন আসে:
- খাদ্য উৎপাদক: মানুষ প্রথমবার ‘খাদ্য সংগ্রাহক’ (Food Gatherer) থেকে ‘খাদ্য উৎপাদক’ (Food Producer)-এ পরিণত হয়। খাদ্যের জোগান অনেক বেশি নিশ্চিত হয়।
- স্থায়ী বসতি: চাষবাসের দেখাশোনার জন্য মানুষকে এক জায়গায় পাকাপাকিভাবে বাস করতে হয়। এর ফলেই যাযাবর জীবনের অবসান ঘটে এবং প্রথম ‘স্থায়ী বসতি’ বা গ্রাম গড়ে ওঠে।
- পশুপালনের সুবিধা: চাষের ফলে পাওয়া খড়, বিচালি ইত্যাদি গবাদি পশুর খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করা সহজ হয়, ফলে পশুপালনও বৃদ্ধি পায়।
- নতুন পেশার উদ্ভব: চাষের জন্য লাঙল, কাস্তে এবং ফসল মজুত রাখার জন্য পাত্রের প্রয়োজন হয়। এর ফলে সমাজে কুমোর, কারিগরের মতো নতুন নতুন পেশার উদ্ভব হয়।
- জটিল সমাজ: জমি ও ফসলের ওপর ব্যক্তিগত মালিকানার ধারণা তৈরি হয়, যার ফলে সমাজে ধনী-দরিদ্রের ভেদাভেদ ও জটিল সমাজ ব্যবস্থা গড়ে উঠতে শুরু করে।
৯. ‘সংস্কৃতি’ ও ‘সভ্যতা’-র মধ্যে মূল পার্থক্য কী?
উত্তর: ‘সংস্কৃতি’ ও ‘সভ্যতা’ এক জিনিস নয়।
- সংস্কৃতি: সব মানুষেরই সংস্কৃতি থাকে। মানুষের জীবনযাপনের সমস্ত দিক—যেমন হাতিয়ার বানানো, পোশাক পরা, খাওয়া-দাওয়া, ছবি আঁকা—সবকিছুই তার সংস্কৃতির অংশ। আদিম মানুষেরও সংস্কৃতি ছিল।
- সভ্যতা: ‘সভ্যতা’ হলো সংস্কৃতির একটি উন্নত ও জটিল পর্যায়। সভ্যতা গড়ে উঠতে গেলে নির্দিষ্ট কিছু বৈশিষ্ট্য থাকতে হয়, যেমন:
- উন্নত ও স্থায়ী **নগর** ও গ্রাম।
- একটি সুনির্দিষ্ট **শাসন কাঠামো** বা শাসক গোষ্ঠী।
- উন্নত শিল্পকলা ও **স্থাপত্য** (যেমন মন্দির, প্রাসাদ)।
- এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো **লিপি** বা লেখার ব্যবহার।
তাই বলা যায়, সব সভ্যতারই সংস্কৃতি আছে, কিন্তু সব সংস্কৃতি সভ্যতা নয়।