প্রকল্প পত্র (ষষ্ঠ শ্রেণি): অধ্যায় ১ – ইতিহাসের ধারণা
প্রসেসিং…

বিষয়: অতীত ও ঐতিহ্য (ষষ্ঠ শ্রেণি)

অধ্যায় ১: ইতিহাসের ধারণা (প্রকল্প নোটস)

মূল ধারণা ও প্রশ্নাবলী

১. ‘ইতিহাস’ শব্দটির অর্থ কী? [২ নম্বর]

উত্তর: ‘ইতিহাস’ শব্দের একটি মানে হলো পুরোনো দিনের কথা বা অতীতের কাহিনি। পুরোনো দিনের যেসব কথা গল্পের মতো শোনালেও আসলে সত্যি, তাই হলো ইতিহাস।

২. ইতিহাস পাঠে ‘কবে, কেন, কীভাবে, কোথায়’ – এই প্রশ্নগুলি গুরুত্বপূর্ণ কেন? [৩ নম্বর]

উত্তর: ইতিহাস শুধু পুরোনো ঘটনা জানা নয়, তার পেছনের কার্যকারণ বোঝা।

  • কবে: ঘটনাটি কতদিন আগে ঘটেছে, তা সময় অনুযায়ী সাজানোর জন্য ‘কবে’ প্রশ্নটি জরুরি।
  • কেন: ঘটনাটি কেন ঘটল, তার কারণ বুঝতে ‘কেন’ প্রশ্ন করা হয়।
  • কীভাবে: মানুষ কীভাবে সেই কাজটি করল (যেমন – কীভাবে আগুন জ্বালাতে শিখল) তা জানতে হয়।
  • কোথায়: ঘটনাটি কোথায় ঘটল তা জানা প্রয়োজন, কারণ ভূগোল ও পরিবেশের ওপর মানুষের কাজকর্ম ও ইতিহাস নির্ভর করে (যেমন – নদীর ধারের মানুষের জীবনযাত্রা আর মরুভূমির মানুষের জীবনযাত্রা আলাদা)।
ইতিহাসের মূল প্রশ্ন ইতিহাস কবে? কেন? কীভাবে? কোথায়?

চিত্র: ইতিহাসের গোড়ার কথা।

৩. গল্পের (রূপকথা) সঙ্গে ইতিহাসের পার্থক্য কী? [৩ নম্বর]

উত্তর: গল্পের বইতে (রূপকথা) অনেক মনগড়া বা কাল্পনিক কথা থাকে (যেমন – পক্ষীরাজ ঘোড়া), যা সত্যি নয়। গল্পের বইতে ঘটনা ‘কবে’ ঘটেছিল তা ঠিকমতো বলা থাকে না, শুধু বলা হয় ‘অনেক অনেক দিন আগে’।

কিন্তু ইতিহাসের কথা মনগড়া নয়, তা সত্যি ঘটনার ওপর ভিত্তি করে লেখা হয়। ইতিহাস জানতে উপাদান বা প্রমাণ লাগে (যেমন – পুরোনো মুদ্রা, লেখা, মূর্তি)। ইতিহাসে সাল-তারিখের মাধ্যমে সময়ের হিসাব থাকে।

৪. ‘ইতিহাসের উপাদান’ কাকে বলে? প্রধান ভাগগুলি কী কী? [৫ নম্বর] [গুরুত্বপূর্ণ]

উত্তর: পুরোনো দিনের যেসব জিনিস (যেমন – পুরোনো ঘর-বাড়ি, মুদ্রা, বইপত্র, হাতিয়ার) আজও রয়ে গেছে এবং যেগুলি থেকে আমরা অতীতের কথা জানতে পারি, সেগুলিকে ‘ইতিহাসের উপাদান’ বলে।

ঐতিহাসিকরা এই উপাদানগুলিকে প্রধানত দুটি ভাগে ভাগ করেন:

১. প্রত্নতাত্ত্বিক উপাদান: যেগুলি মাটি খুঁড়ে পাওয়া যায় বা মাটির ওপরে থাকে। যেমন:

  • লেখমালা: পাথর বা ধাতুর পাতের উপর খোদাই করা লেখা (যেমন: শিলালেখ, তাম্রলেখ)।
  • মুদ্রা: পুরোনো দিনের টাকা-পয়সা, যা থেকে শাসকের নাম, সাল ইত্যাদি জানা যায়।
  • স্থাপত্য ও ভাস্কর্য: পুরোনো মন্দির, মসজিদ, স্তূপ, মূর্তি ইত্যাদি।
  • প্রত্নবস্তু: পুরোনো দিনের ব্যবহার করা জিনিসপত্র (যেমন – বাসন, হাতিয়ার, গয়না)।

২. সাহিত্যিক উপাদান: পুরোনো দিনের লেখা। এগুলি দুই প্রকার:

  • দেশি সাহিত্য: (যেমন – বেদ, পুরাণ, অর্থশাস্ত্র, হর্ষচরিত)।
  • বিদেশি সাহিত্য: (গ্রিক, রোমান বা চিনা পর্যটকদের বিবরণ, যেমন – মেগাস্থিনিসের লেখা)।

৫. ‘প্রাক-ইতিহাস’, ‘প্রায়-ইতিহাস’ ও ‘ইতিহাস’ – এই তিন যুগের মধ্যে পার্থক্য কী? [৩ নম্বর]

উত্তর:

  • প্রাক-ইতিহাস (Pre-history): এটি ইতিহাসের সেই পুরোনো পর্যায়, যখন মানুষ লিখতে পারত না। এই যুগের কথা জানতে শুধুমাত্র প্রত্নতাত্ত্বিক উপাদানের (যেমন – পাথরের হাতিয়ার, গুহাচিত্র) ওপর নির্ভর করতে হয়।
  • প্রায়-ইতিহাস (Proto-history): এটি সেই পর্যায়, যখন মানুষ লিখতে শিখেছে এবং তাদের লেখা (লিপি) পাওয়াও গেছে, কিন্তু সেই লেখা আজও পড়া যায়নি বা পাঠোদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। যেমন – হরপ্পা সভ্যতার লিপি।
  • ইতিহাস (History): এটি সেই পর্যায়, যে সময়কার লেখা পাওয়া যায় এবং তা পড়াও সম্ভব হয়েছে। এই যুগ থেকে ইতিহাস জানার জন্য লিখিত ও প্রত্নতাত্ত্বিক উভয় উপাদানই ব্যবহার করা যায়।
ইতিহাসের যুগবিভাগ (লিপির ভিত্তিতে) প্রাক-ইতিহাস কোনো লিপি/লেখা পাওয়া যায়নি। প্রায়-ইতিহাস লিপি পাওয়া গেছে, পড়া যায়নি। (হরপ্পা) ইতিহাস লিপি পাওয়া গেছে এবং পড়া গেছে।

চিত্র: লিপির ব্যবহারের ভিত্তিতে ইতিহাসের যুগ বিভাজন।

৬. ‘অব্দ’ বা ‘সাল’ গণনা কীভাবে করা হয়? খ্রিস্টপূর্বাব্দ ও খ্রিস্টাব্দের পার্থক্য কী? [৫ নম্বর] [গুরুত্বপূর্ণ]

উত্তর: কোনো একটি বড় বা জরুরি ঘটনাকে ভিত্তি ধরে ‘অব্দ’ বা ‘সাল’ গোনা হয়। যেমন, যিশু খ্রিস্টের জন্মকে ধরে ‘খ্রিস্টাব্দ’ গণনা করা হয়।

খ্রিস্টাব্দ (AD): যিশু খ্রিস্টের জন্মের বছর থেকে যে সাল গণনা শুরু হয়, তাকে খ্রিস্টাব্দ বলে। খ্রিস্টাব্দ ছোট থেকে বড়োর দিকে গোনা হয় (যেমন: ২০১৩, ২০১৪, ২০১৫…)।

খ্রিস্টপূর্বাব্দ (BC): যিশু খ্রিস্টের জন্মের আগের সময়কে ‘খ্রিস্টপূর্বাব্দ’ বলে। ‘পূর্ব’ মানে ‘আগের’। খ্রিস্টপূর্বাব্দ বড়ো থেকে ছোটোর দিকে গোনা হয় (যেমন: খ্রিস্টপূর্ব ৫, ৪, ৩, ২, ১…)। অর্থাৎ, খ্রিস্টপূর্ব ২০১৪ সালের পরের বছর হলো খ্রিস্টপূর্ব ২০১৩ সাল।

শতক গণনা: শতক গোনার সময় এক ধাপ এগিয়ে গুনতে হয়। যেমন:

  • ১ থেকে ১০০ খ্রিস্টাব্দ = খ্রিস্টীয় প্রথম শতক।
  • ১৯০১ থেকে ২০০০ খ্রিস্টাব্দ = খ্রিস্টীয় বিংশ শতক।
  • ২০০১ থেকে ২১০০ খ্রিস্টাব্দ = খ্রিস্টীয় একবিংশ শতক।

৭. ‘শকাব্দ’ ও ‘গুপ্তাব্দ’ বলতে কী বোঝায়? [২ নম্বর]

উত্তর:

  • শকাব্দ (কনিষ্কাব্দ): কুষাণ সম্রাট কনিষ্ক ৭৮ খ্রিস্টাব্দে সিংহাসনে বসেন। সেই বছর থেকেই ‘শকাব্দ’ গণনা শুরু হয়। (খ্রিস্টাব্দ থেকে ৭৮ বাদ দিলে শকাব্দ পাওয়া যায়)।
  • গুপ্তাব্দ: গুপ্ত সম্রাট প্রথম চন্দ্রগুপ্ত ৩১৯-৩২০ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ সিংহাসনে বসেন। তখন থেকে ‘গুপ্তাব্দ’ গণনা শুরু হয়।

৮. ‘আর্যাবর্ত’ ও ‘দাক্ষিণাত্য’ বলতে কী বোঝায়? [৩ নম্বর]

উত্তর: ভারতবর্ষের উত্তর ও দক্ষিণ অংশকে ভাগ করেছে বিন্ধ্য পর্বত।

  • আর্যাবর্ত: সাধারণভাবে মনে করা হয় আর্যরা উত্তর অংশে বাস করত, তাই বিন্ধ্য পর্বতের উত্তরের অঞ্চলকে ‘আর্যাবর্ত’ বলা হতো। একসময় আর্যাবর্ত বলতে প্রায় পুরো উত্তর ভারতকেই বোঝানো হতো।
  • দাক্ষিণাত্য: বিন্ধ্য পর্বতের দক্ষিণ দিকের অংশকে ‘দাক্ষিণাত্য’ বলা হতো। প্রাচীনকালে এই অঞ্চলে দ্রাবিড় জাতির বাস ছিল এবং এখানকার ভাষাগুলি দ্রাবিড় ভাষা নামে পরিচিত।

৯. ইতিহাস জানতে ভূগোল বা পরিবেশ পাঠ জরুরি কেন? [৩ নম্বর]

উত্তর: ইতিহাস বুঝতে ভূগোল জানা জরুরি, কারণ মানুষের কাজকর্ম তার পরিবেশ ও ভূগোল দিয়েই ঠিক হয়।

  • নদীর পাশে যারা বাস করে, তাদের জীবনে নদী ও নৌকার গুরুত্ব বেশি (যেমন – পশ্চিমবঙ্গ)।
  • আবার মরুভূমি অঞ্চলে যারা বাস করে, তাদের জীবনে উটের গুরুত্ব বেশি (যেমন – রাজস্থান)।
  • কোথায় ধান (সমতল) বা কোথায় গম (শুকনো এলাকা) চাষ হবে, তা ভূগোলই ঠিক করে দেয়।

এইভাবেই পরিবেশ ও ভূগোল আলাদা হওয়ায় বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের ইতিহাসও আলাদা হয়। তাই ইতিহাস বুঝতে ভূগোল পড়া জরুরি।

১০. প্রত্নতাত্ত্বিক উপাদান হিসেবে ‘লেখমালা’ ও ‘মুদ্রা’-র গুরুত্ব কী? [৫ নম্বর]

উত্তর:

লেখমালার গুরুত্ব:

  • পাথর বা ধাতুর পাতের ওপর খোদাই করা থাকায় ‘লেখ’ সহজে নষ্ট হয় না।
  • এগুলি থেকে শাসকের নাম, সাল-তারিখ এবং সাম্রাজ্যের সীমানা সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়।
  • অনেক লেখতে (যেমন – ‘প্রশস্তি’) রাজার গুণগান বা যুদ্ধের বর্ণনা থাকে (যেমন – সমুদ্রগুপ্তের এলাহাবাদ প্রশস্তি)।
  • অশোকের শিলালেখ থেকে তাঁর শাসন ও ‘ধম্ম’ সম্পর্কে জানা যায়।

মুদ্রার গুরুত্ব:

  • মুদ্রায় শাসকের নাম, মূর্তি ও অব্দ (সাল) খোদাই করা থাকে, যা থেকে সময়কাল জানা যায়।
  • মুদ্রা কোন ধাতু দিয়ে তৈরি (সোনা, রুপো বা তামা) তা থেকে রাজ্যের অর্থনৈতিক অবস্থা বোঝা যায়।
  • মুদ্রা পাওয়ার স্থান থেকে সাম্রাজ্যের সীমানা এবং বহির্বিশ্বের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্কের (যেমন – রোমান মুদ্রা) প্রমাণ মেলে।

১১. ইতিহাস জানার উপাদান হিসেবে দেশি ও বিদেশি সাহিত্যের সীমাবদ্ধতা কী? [৩ নম্বর]

উত্তর:

  • দেশি সাহিত্য: দেশীয় সাহিত্য (কাব্য, নাটক) অনেক সময় মনগড়া বা অতিরঞ্জিত হয়। এগুলিতে শাসকের গুণগান করা হয় এবং সাধারণ গরিব মানুষের কথা বিশেষ থাকে না।
  • বিদেশি সাহিত্য: বিদেশি পর্যটকরা (গ্রিক, চিনা) ভারতীয় উপমহাদেশের ভাষা ও সংস্কৃতি ঠিকমতো বুঝতেন না। ফলে তাঁদের লেখায় অনেক ভুল তথ্য থাকতে পারে বা পক্ষপাতিত্ব থাকতে পারে।

BISWAZ GROWTH ACADEMY - Class Menu
BISWAZ GROWTH ACADEMY - Class Menu