বিষয়: অতীত ও ঐতিহ্য (সপ্তম শ্রেণি)
অধ্যায় ৮: মুঘল সাম্রাজ্যের সংকট (প্রকল্প নোটস)
মূল ধারণা ও প্রশ্নাবলী
১. ‘মনসবদারি’ ব্যবস্থা কী?
উত্তর: ‘মনসব’ একটি ফারসি শব্দ, যার অর্থ ‘পদ’ বা ‘মর্যাদা’। মুঘল সম্রাট আকবর তাঁর সাম্রাজ্যের সামরিক ও অসামরিক প্রশাসন পরিচালনার জন্য এই ব্যবস্থা চালু করেন। যারা সরকারি পদে যোগ দিতেন, তাঁদের ‘মনসবদার’ বলা হতো। প্রতিটি মনসবদার ‘জাত’ (বেতন ও মর্যাদা) ও ‘সওয়ার’ (সৈন্য সংখ্যা) পদের অধিকারী হতেন।
২. ‘জায়গিরদারি’ ব্যবস্থা কী?
উত্তর: ‘জায়গিরদারি’ ব্যবস্থায় মনসবদারদের নগদ বেতনের পরিবর্তে একটি নির্দিষ্ট অঞ্চল থেকে রাজস্ব আদায়ের অধিকার দেওয়া হতো। এই রাজস্বের বরাত বা অধিকারকেই ‘জায়গির’ বলা হতো এবং এর অধিকারীকে ‘জায়গিরদার’ বলা হতো। জায়গিরদাররা ওই রাজস্ব থেকে নিজেদের বেতন ও সৈন্যদের খরচ মেটাতেন।
৩. ‘জায়গিরদারি সংকট’ বলতে কী বোঝায়?
উত্তর: মুঘল সাম্রাজ্যের শেষের দিকে, বিশেষত ঔরঙ্গজেবের আমলে, মনসবদারের সংখ্যা 엄청 বেড়ে যায়। কিন্তু সেই তুলনায় ‘জায়গির’ বা রাজস্ব আদায়ের মতো ভালো জমির পরিমাণ কম ছিল।
ফলে, নতুন মনসবদারদের জায়গির দেওয়া অসম্ভব হয়ে পড়ে। ভালো জায়গির পাওয়ার জন্য অভিজাতদের মধ্যে তীব্র রেষারেষি শুরু হয়। অনেক সময় একটি জায়গির একাধিক মনসবদারকে দেওয়া হতো। জায়গির পেলেও তা থেকে নির্দিষ্ট পরিমাণ রাজস্ব আদায় করা যেত না। মুঘল প্রশাসনের এই অবস্থাকেই ‘জায়গিরদারি সংকট’ বলা হয়। এটি মুঘল সাম্রাজ্যের পতনের অন্যতম প্রধান কারণ।
চিত্র: জায়গিরদারি সংকট। মনসবদারের সংখ্যার তুলনায় ভালো জায়গিরের অভাব।
৪. ‘কৃষি সংকট’ কী?
উত্তর: ঔরঙ্গজেবের আমলে জায়গিরদারদের খুব ঘন ঘন বদলি করা হতো। এর ফলে জায়গিরদাররা সেই অঞ্চলের কৃষির উন্নতির দিকে নজর না দিয়ে, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব কৃষকদের ওপর চড়া হারে রাজস্ব চাপিয়ে তা আদায় করার চেষ্টা করতেন।
এই অতিরিক্ত করের বোঝা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং অভিজাতদের শোষণের ফলে কৃষকদের অবস্থা শোচনীয় হয়ে পড়ে। বহু কৃষক চাষবাস ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন। এর ফলে সাম্রাজ্যের কৃষি উৎপাদন দারুণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মুঘল সাম্রাজ্যের এই অবস্থাকে ‘কৃষি সংকট’ বলা হয়।
৫. ঔরঙ্গজেবের আমলে কোন কোন আঞ্চলিক শক্তি মুঘলদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল?
উত্তর: ঔরঙ্গজেবের আমলে একাধিক আঞ্চলিক শক্তি মুঘল শাসনের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল। এদের মধ্যে প্রধানরা হলো:
- মারাঠা: শিবাজীর নেতৃত্বে মারাঠারা দাক্ষিণাত্যে মুঘলদের বিরুদ্ধে সবচেয়ে সফল প্রতিরোধ গড়ে তোলে।
- জাঠ: মথুরা অঞ্চলের জাঠ কৃষকরা মুঘলদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে।
- সৎনামী: হরিয়ানার সৎনামী কৃষকরাও বিদ্রোহ ঘোষণা করে।
- শিখ: পাঞ্জাবে শিখরাও মুঘলদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে।
৬. ঔরঙ্গজেবের ‘দাক্ষিণাত্য ক্ষত’ (Deccan Ulcer) বলতে কী বোঝায়?
উত্তর: ঔরঙ্গজেব তাঁর রাজত্বকালের শেষ ২৫ বছর (১৬৮১-১৭০৭) দাক্ষিণাত্যে (দক্ষিণ ভারতে) কাটিয়েছিলেন। তাঁর প্রধান লক্ষ্য ছিল দাক্ষিণাত্যের দুটি সুলতানি রাজ্য (বিজাপুর ও গোলকোন্ডা) দখল করা এবং মারাঠা শক্তিকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করা।
তিনি বিজাপুর ও গোলকোন্ডা দখল করতে সফল হলেও, মারাঠাদের দমন করতে পারেননি। মারাঠাদের সঙ্গে এই পঁচিশ বছরের নিরন্তর গেরিলা যুদ্ধে মুঘলদের বিপুল পরিমাণ অর্থ ও সৈন্যবল নষ্ট হয়। রাজকোষ শূন্য হয়ে পড়ে।
বাদশাহ নিজে ২৫ বছর দিল্লি থেকে দূরে থাকায় উত্তর ভারতে শাসনব্যবস্থা শিথিল হয়ে পড়ে এবং বিভিন্ন অঞ্চলে বিদ্রোহ দেখা দেয়। দাক্ষিণাত্যের এই দীর্ঘস্থায়ী ও ব্যর্থ যুদ্ধ মুঘল সাম্রাজ্যের পতনকে যেভাবে ত্বরান্বিত করেছিল, তাকেই ঐতিহাসিকরা ‘দাক্ষিণাত্য ক্ষত’ (Deccan Ulcer) বলে অভিহিত করেন।
৭. ‘আঞ্চলিক শক্তি’ হিসেবে বাংলার উত্থান কীভাবে হয়েছিল?
উত্তর: ঔরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর মুঘল কেন্দ্রীয় শক্তি দুর্বল হয়ে পড়লে, বাংলার মতো প্রদেশগুলি প্রায় স্বাধীন হয়ে ওঠে।
- বাংলার সুবাদার (প্রাদেশিক শাসক) মুর্শিদকুলি খান এবং তাঁর পরবর্তী নবাবরা (আলিবর্দি খান) দিল্লিকে নামমাত্র রাজস্ব পাঠাতেন।
- তাঁরা বাংলাতেই রাজস্ব আদায় করতেন, নিজেদের সেনাবাহিনী রাখতেন এবং প্রায় স্বাধীন শাসকের মতোই বাংলা শাসন করতেন।
- তাঁরা দিল্লির অনুমতি ছাড়াই প্রশাসনিক ও সামরিক সিদ্ধান্ত নিতেন। এভাবেই বাংলা একটি স্বাধীন আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।
৮. ‘আমলনামা’ কী?
উত্তর: ‘আমলনামা’ ছিল একটি সরকারি দলিল বা নির্দেশ। মুঘল আমলে যখন কোনো নতুন জমিদার নিয়োগ করা হতো, তখন তাঁকে ওই অঞ্চলের প্রজা, রায়ত, পাটোয়ারি ও কানুনগোদের উদ্দেশ্যে একটি ‘আমলনামা’ দেওয়া হতো। এই দলিলের মাধ্যমে প্রজাদের নির্দেশ দেওয়া হতো যেন তারা পুরোনো জমিদারকে নয়, বরং এই নতুন জমিদারকেই রাজস্ব জমা দেয় এবং তাঁকে জমিদার হিসেবে মেনে নেয়।
অতিরিক্ত প্রশ্নাবলী (Higher Order Thinking)
৯. মুঘল সাম্রাজ্যের পতনের জন্য কি শুধুমাত্র ঔরঙ্গজেবই দায়ী ছিলেন?
উত্তর: মুঘল সাম্রাজ্যের পতনের জন্য ঔরঙ্গজেবের নীতি (বিশেষত দাক্ষিণাত্য নীতি ও জিজিয়া কর পুনঃপ্রবর্তন) অনেকটাই দায়ী ছিল, কিন্তু তিনি একাই দায়ী ছিলেন না। পতনের প্রক্রিয়া অনেক আগে থেকেই শুরু হয়েছিল।
- শাহজাহানের আমল: শাহজাহানের আমলেই সাম্রাজ্যের আয়তন বিশাল হয়ে গিয়েছিল এবং তাঁর বিলাসবহুল নির্মাণের ফলে রাজকোষে চাপ পড়তে শুরু করে।
- কাঠামোগত সংকট: ‘জায়গিরদারি সংকট’ (মনসবদারের তুলনায় জায়গিরের অভাব) এবং ‘কৃষি সংকট’ (চাষিদের ওপর অত্যধিক করের বোঝা) ছিল মুঘল ব্যবস্থার অভ্যন্তরীণ ত্রুটি, যা ঔরঙ্গজেবের আমলে তীব্র আকার ধারণ করে।
- আঞ্চলিক শক্তির উত্থান: মারাঠা, শিখ, জাঠদের মতো আঞ্চলিক শক্তিগুলির উত্থান মুঘল কেন্দ্রীয় শক্তিকে দুর্বল করে দেয়।
- ঔরঙ্গজেবের পরবর্তী শাসক: ঔরঙ্গজেবের পরবর্তী মুঘল শাসকরা ছিলেন অত্যন্ত দুর্বল ও অযোগ্য। তাঁরা অভিজাতদের দ্বন্দ্ব বা বৈদেশিক আক্রমণ (নাদির শাহ) কোনোটিই সামাল দিতে পারেননি।
সুতরাং, ঔরঙ্গজেবের নীতিগুলি পতনকে ত্বরান্বিত করলেও, সাম্রাজ্যের কাঠামোগত দুর্বলতা এবং পরবর্তী শাসকদের অযোগ্যতাই ছিল পতনের মূল কারণ।
১০. শিবাজীর নেতৃত্বে মারাঠা শক্তির উত্থানের প্রধান কারণগুলি কী ছিল?
উত্তর: সপ্তদশ শতকে ঔরঙ্গজেবের আমলে শিবাজীর নেতৃত্বে মারাঠা শক্তির উত্থানের প্রধান কারণগুলি হলো:
- ভৌগোলিক অবস্থান: দাক্ষিণাত্যের পাহাড়ি মালভূমি অঞ্চল (মহারাষ্ট্র) মারাঠাদের গেরিলা যুদ্ধের (Guerilla Warfare) জন্য অত্যন্ত সুবিধাজনক ছিল।
- অর্থনৈতিক কারণ: ওই অঞ্চল খুব উর্বর না হওয়ায়, মারাঠারা রাজস্বের জন্য পার্শ্ববর্তী মুঘল বা দাক্ষিণাত্যের সুলতানি অঞ্চলগুলি থেকে ‘চৌথ’ ও ‘সরদেশমুখী’ নামক কর আদায় করত, যা তাদের মুঘলদের সঙ্গে সংঘাতে নিয়ে আসে।
- ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐক্য: মহারাষ্ট্রের ভক্তিবাদী সাধকদের (যেমন – তুকারাম, রামদাস) প্রচারিত ভক্তিধর্ম মারাঠাদের মধ্যে ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐক্য গড়ে তুলেছিল।
- শিবাজীর নেতৃত্ব: শিবাজীর অসামান্য সামরিক প্রতিভা, সংগঠন ক্ষমতা এবং মুঘলদের বিরুদ্ধে মারাঠা জাতীয়তাবাদের আদর্শ—এই সবই মারাঠা শক্তিকে এক অপ্রতিরোধ্য বাহিনীতে পরিণত করেছিল।