প্রকল্প পত্র (সপ্তম শ্রেণি): অধ্যায় ৭ – জীবনযাত্রা ও সংস্কৃতি
প্রসেসিং…

বিষয়: অতীত ও ঐতিহ্য (সপ্তম শ্রেণি)

অধ্যায় ৭: জীবনযাত্রা ও সংস্কৃতি: সুলতানি ও মুঘল যুগ (প্রকল্প নোটস)

মূল ধারণা ও প্রশ্নাবলী

১. মধ্যযুগে সুলতান ও বাদশাহদের জীবনযাত্রা কেমন ছিল? [৩ নম্বর]

উত্তর: সুলতান ও বাদশাহদের জীবনযাত্রা ছিল অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণ ও বিলাসবহুল। তাঁরা বিশাল উঁচু রাজপ্রাসাদে বাস করতেন এবং অসংখ্য চাকর-বাকর তাঁদের সেবা করত। তাঁদের প্রতিদিনের খাবারে বিভিন্ন সুস্বাদু পদ, বিদেশি ফল, মিষ্টি এবং বরফ মেশানো পানীয় থাকত। তাঁদের পোশাক ছিল মূল্যবান রেশম, পশম ও সূক্ষ্ম সুতির, যাতে সোনা ও রুপোর কাজ করা থাকত। শিকার করা, পোলো খেলা, গান-বাজনা শোনা ছিল তাঁদের প্রধান অবসর বিনোদন।

২. মধ্যযুগে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা কেমন ছিল? [৩ নম্বর]

উত্তর: মধ্যযুগে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা ছিল শাসকদের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা এবং খুবই সাদাসিধা।

  • তাঁরা সাধারণত মাটির তৈরি ছোট একতলা বা দোতলা বাড়িতে বাস করতেন।
  • তাঁদের প্রধান খাদ্য ছিল ভাত, রুটি, ডাল, শাক-সবজি এবং মাছ। আমিষ খাবারের প্রচলনও ছিল।
  • তাঁদের পোশাক ছিল খুব সাধারণ, মূলত সুতির তৈরি ধুতি ও চাদর।
  • কৃষিকাজ, পশুপালন এবং বিভিন্ন ধরনের কারিগরি শিল্প (যেমন – তাঁতি, কামার, কুমোর) ছিল তাঁদের প্রধান জীবিকা।

৩. মধ্যযুগে ভারতে কী কী নতুন খাদ্যদ্রব্য ও পানীয়ের প্রচলন হয়? [৩ নম্বর]

উত্তর: সুলতানি ও মুঘল যুগে খাবারের সংস্কৃতিতে পারস্য ও মধ্য এশিয়ার প্রভাব পড়েছিল।

  • খাবার: পোলাও, বিরিয়ানি, কোরমা, কাবাব, জিলাপি, হালুয়ার মতো খাবারগুলির প্রচলন হয়। পর্তুগিজদের মাধ্যমে আলু, লঙ্কা, পেঁপে, আনারস, পেয়ারার মতো নতুন সবজি ও ফলের ব্যবহার শুরু হয়।
  • পানীয়: ফলের রস বা শরবত (যেমন – গোলাপ জল, কেওড়া মেশানো) এবং ‘বরফ’ বা ‘কুলফি’র ব্যবহার এই সময়েই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।

৪. ‘ভক্তিবাদ’ বলতে কী বোঝায়? [২ নম্বর]

উত্তর: মধ্যযুগে ভারতের ধর্মীয় জীবনে একটি নতুন ধারার জন্ম হয়, যা ‘ভক্তিবাদ’ নামে পরিচিত। এই মতের মূল কথা ছিল— কোনো আচার-অনুষ্ঠান, জাঁকজমক বা শাস্ত্রীয় মন্ত্রপাঠের প্রয়োজন নেই; শুধুমাত্র গভীর ভক্তি, শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার মাধ্যমেই ঈশ্বরের কাছাকাছি পৌঁছানো যায় বা মুক্তি (মোক্ষ) লাভ করা সম্ভব।

৫. ‘সুফিবাদ’ কী? দুটি প্রধান সুফি গোষ্ঠীর নাম লেখো। [৩ নম্বর]

উত্তর: ‘সুফিবাদ’ হলো ইসলাম ধর্মের একটি উদারপন্থী ও মরমিয়া ধারা। সুফিরা ঈশ্বরের প্রতি ভক্তি এবং সমস্ত জীবের প্রতি প্রেমের ওপর জোর দিতেন। তাঁরা মনে করতেন, কঠোর আচার-অনুষ্ঠানের পরিবর্তে শুধুমাত্র ভক্তি, প্রেম ও ধ্যানের মাধ্যমেই ঈশ্বরের সন্ধান পাওয়া সম্ভব।

ভারতে দুটি প্রধান সুফি গোষ্ঠী বা সিলসিলা ছিল:

  1. চিশতি গোষ্ঠী (প্রতিষ্ঠাতা: মইনুদ্দিন চিশতি)
  2. সোহরাওয়ার্দি গোষ্ঠী (প্রতিষ্ঠাতা: বাহাউদ্দিন জাকারিয়া)
ভক্তিবাদ ও সুফিবাদ ভক্তিবাদ ঈশ্বর = ভক্তি ও প্রেম (হিন্দুধর্মের সংস্কার) সুফিবাদ আল্লাহ = ভক্তি ও প্রেম (ইসলামের সংস্কার) সাদৃশ্য

চিত্র: ভক্তিবাদ ও সুফিবাদ। উভয় মতবাদই ঈশ্বরের প্রতি ভক্তি ও প্রেমের ওপর জোর দিয়েছিল।

৬. গুরু নানক ও কবীরের প্রধান শিক্ষা কী ছিল? [৩ নম্বর] [গুরুত্বপূর্ণ]

উত্তর: গুরু নানক ও কবীর ছিলেন মধ্যযুগের ভক্তিবাদী সাধক, যাঁরা ধর্মীয় ভেদাভেদের ঊর্ধ্বে উঠে মানবিকতার কথা প্রচার করেন।

  • গুরু নানক (শিখ ধর্মের প্রবর্তক): তাঁর মূল শিক্ষা ছিল **একেশ্বরবাদ**। তিনি মূর্তিপূজা, জাতিভেদ প্রথা এবং ধর্মীয় আড়ম্বরের বিরোধী ছিলেন। তিনি বলতেন, ঈশ্বর এক ও অদ্বিতীয়, এবং হিন্দু-মুসলমান উভয়েই সেই এক ঈশ্বরেরই উপাসক।
  • কবীর: কবীরও ছিলেন একেশ্বরবাদের প্রচারক এবং মূর্তিপূজা, জাতিভেদ ও ধর্মীয় ভেদাভেদের কঠোর সমালোচক। তাঁর ‘দোঁহা’গুলির মাধ্যমে তিনি হিন্দু ও মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের গোঁড়ামিকে আক্রমণ করেন এবং রাম ও রহিমকে এক বলে প্রচার করেন।

৭. শ্রীচৈতন্যদেব কে ছিলেন? তাঁর প্রধান শিক্ষা কী ছিল? [৩ নম্বর]

উত্তর: শ্রীচৈতন্যদেব ছিলেন মধ্যযুগের বাংলায় (পঞ্চদশ-ষোড়শ শতক) ভক্তি আন্দোলনের প্রধান প্রচারক।

তাঁর প্রচারিত ধর্মমত ‘গৌড়ীয় বৈষ্ণব ধর্ম’ নামে পরিচিত। তাঁর মূল শিক্ষা ছিল— জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল মানুষ শুধুমাত্র ‘কৃষ্ণভক্তি’ বা ‘হরিনাম সংকীর্তন’-এর মাধ্যমে ঈশ্বরের ভালোবাসা লাভ করতে পারে এবং মুক্তি পেতে পারে। তিনি কোনো শাস্ত্রীয় আচার-অনুষ্ঠানের বদলে ভক্তির মাধ্যমে সাম্য ও প্রেমের বার্তা প্রচার করেছিলেন, যা বাংলার সমাজে গভীর প্রভাব ফেলে।

৮. আকবরের ‘দীন-ই-ইলাহি’ (তৌহিদ-ই-ইলাহি) কী ছিল? [৩ নম্বর]

উত্তর: মুঘল বাদশাহ আকবর সমস্ত ধর্মের ভালো বিষয়গুলিকে একত্রিত করে একটি নতুন একেশ্বরবাদী মতাদর্শ প্রচার করেন (১৫৮২ খ্রিঃ), যা ‘দীন-ই-ইলাহি’ (অর্থাৎ ‘ঈশ্বরের প্রতি বিশ্বাস’) নামে পরিচিত।

এটি কোনো নতুন ধর্ম ছিল না, বরং এটি ছিল আকবরের ব্যক্তিগত বিশ্বাস। এর মূল কথা ছিল ঈশ্বরের একত্ব এবং বাদশাহকে ঈশ্বরের প্রতিনিধি হিসেবে মান্য করা। এই মতবাদ সাধারণ মানুষের মধ্যে জনপ্রিয় হয়নি, শুধুমাত্র আকবরের দরবারের গুটিকয়েক অভিজাত (যেমন – বীরবল) এটি গ্রহণ করেছিলেন।

৯. ‘সুলহ-ই-কুল’ আদর্শ কী? [২ নম্বর]

উত্তর: ‘সুলহ-ই-কুল’ একটি ফারসি শব্দ, যার অর্থ ‘সকলের প্রতি সহনশীলতা’ বা ‘পরম শান্তি’। এটি ছিল মুঘল বাদশাহ আকবরের প্রশাসনিক আদর্শ। এই আদর্শের মূল কথা হলো— সাম্রাজ্যে বিভিন্ন ধর্ম, জাতি ও গোষ্ঠীর মানুষ বাস করে; তাই সাম্রাজ্যের শান্তি ও স্থায়িত্বের জন্য কোনো একটি বিশেষ ধর্ম বা গোষ্ঠীর প্রতি পক্ষপাতিত্ব না করে, সকলের প্রতি সহনশীলতার নীতি গ্রহণ করা।

১০. সুলতানি ও মুঘল যুগের স্থাপত্যের প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলি কী ছিল? [৫ নম্বর]

উত্তর: সুলতানি ও মুঘল যুগে ভারতে পারস্য ও মধ্য এশিয়ার স্থাপত্য রীতির সঙ্গে ভারতীয় রীতির মিশ্রণে এক নতুন স্থাপত্য শৈলী গড়ে ওঠে, যা ‘ইন্দো-ইসলামিক’ স্থাপত্য নামে পরিচিত।

প্রধান বৈশিষ্ট্য:

  1. খিলান ও গম্বুজ: এই যুগের স্থাপত্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো খিলান (Arch) এবং গম্বুজ (Dome)-এর ব্যাপক ব্যবহার, যা আগে ভারতে প্রচলিত ছিল না।
  2. মিনার: মসজিদের কোণে বা ভবনের পাশে উঁচু ‘মিনার’ নির্মাণ এই যুগের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
  3. চারবাগ শৈলী: মুঘল আমলে (বিশেষত হুমায়ুনের সমাধিতে) প্রথম ‘চারবাগ’ বা চারটি ভাগে বিভক্ত প্রতিসম বাগানের মধ্যে সৌধ নির্মাণের রীতি শুরু হয়।
  4. অলঙ্করণ: সুলতানি যুগে জ্যামিতিক নকশা ও কোরানের বাণী খোদাই করা হতো। মুঘল যুগে এর সাথে যুক্ত হয় মূল্যবান পাথর ও মার্বেল বসিয়ে সূক্ষ্ম কারুকার্য বা ‘পিয়েট্রা ডিউরা’-এর কাজ।

উদাহরণ: কুতুব মিনার (সুলতানি যুগ), তাজমহল (মুঘল যুগ)।

ইন্দো-ইসলামিক স্থাপত্য গম্বুজ খিলান মিনার

চিত্র: ইন্দো-ইসলামিক স্থাপত্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য— গম্বুজ, খিলান ও মিনার।

১১. ‘পিয়েট্রা ডিউরা’ (Pietra Dura) কী? [২ নম্বর]

উত্তর: ‘পিয়েট্রা ডিউরা’ হলো এক ধরনের সূক্ষ্ম অলঙ্করণ শিল্প। মুঘল স্থাপত্যে (বিশেষত শাহজাহানের আমলে, যেমন – তাজমহল) শ্বেতপাথরের ওপর নকশা খোদাই করে সেই খাঁজের মধ্যে বিভিন্ন রঙের মূল্যবান পাথর (যেমন – লাপিস লাজুলি, জ্যাসপার) বসিয়ে যে অপরূপ কারুকার্য করা হতো, তাকেই ‘পিয়েট্রা ডিউরা’ বলে।

১২. মুঘল আমলে ‘মিনিয়েচার’ বা ‘অণুচিত্র’ বলতে কী বোঝায়? [২ নম্বর]

উত্তর: মুঘল আমলে বইয়ের পাতা বা অ্যালবামের জন্য ছোট ছোট ছবি আঁকার এক বিশেষ রীতির বিকাশ ঘটে, যা ‘মিনিয়েচার’ বা ‘অণুচিত্র’ নামে পরিচিত। এই ছবিগুলি আকারে ছোট হলেও খুব সূক্ষ্ম কারুকার্য ও উজ্জ্বল রঙে পূর্ণ থাকত। বাদশাহদের জীবন, শিকারের দৃশ্য, যুদ্ধক্ষেত্র বা প্রকৃতির ছবি ছিল এর প্রধান বিষয়।

অতিরিক্ত প্রশ্নাবলী (Higher Order Thinking)

১৩. সুলতানি ও মুঘল যুগের দরবারি সাহিত্য এবং লোকসাহিত্যের মধ্যে মূল পার্থক্য কী ছিল? [৩ নম্বর]

উত্তর:

  • দরবারি সাহিত্য: এটি ছিল রাজদরবারের বা অভিজাতদের সাহিত্য। এটি মূলত ফারসি বা সংস্কৃত ভাষায় লেখা হতো। এর প্রধান বিষয় ছিল সুলতান বা বাদশাহদের গুণগান, যুদ্ধজয় এবং রাজকীয় জীবনযাত্রা। সাধারণ মানুষের কথা এতে প্রায় থাকত না। (যেমন – আবুল ফজলের ‘আকবরনামা’)।
  • লোকসাহিত্য: এটি ছিল সাধারণ মানুষের সাহিত্য। এটি লেখা হতো মুখের ভাষায় বা আঞ্চলিক ভাষায় (যেমন – বাংলা, হিন্দি)। এর বিষয় ছিল সাধারণ মানুষের সুখ-দুঃখ, ধর্মবিশ্বাস (যেমন – ভক্তিমূলক পদ) এবং লৌকিক কাহিনি। (যেমন – মঙ্গলকাব্য)।

১৪. ভক্তি আন্দোলন কেন এত জনপ্রিয় হয়েছিল? শ্রীচৈতন্যের ভূমিকা কী ছিল? [৫ নম্বর]

উত্তর:

জনপ্রিয়তার কারণ:

  1. সহজ ধর্ম: ভক্তি আন্দোলন জটিল শাস্ত্রীয় আচার-অনুষ্ঠান ও পুরোহিততন্ত্রের বিরোধিতা করে ভক্তির মাধ্যমে সহজ পথে ঈশ্বরের আরাধনার কথা বলে।
  2. সামাজিক সাম্য: এই আন্দোলন জাতিভেদ প্রথার কঠোর সমালোচনা করে এবং বলে যে, ভক্তির কাছে সকল মানুষ সমান।
  3. আঞ্চলিক ভাষা: ভক্তিবাদী সাধকরা সংস্কৃতের বদলে সাধারণ মানুষের মুখের ভাষায় (বাংলা, হিন্দি) তাঁদের মত প্রচার করতেন, যা জনগণ সহজে বুঝতে পারত।

শ্রীচৈতন্যের ভূমিকা:

শ্রীচৈতন্য ছিলেন বাংলার ভক্তি আন্দোলনের প্রাণপুরুষ। তিনি জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল মানুষকে ‘হরিনাম সংকীর্তন’-এর মাধ্যমে ভক্তির জোয়ারে ভাসিয়ে দেন। তাঁর প্রচারিত সাম্য ও প্রেমের বাণী উচ্চ-নীচ ভেদাভেদ ভুলে বহু মানুষকে বৈষ্ণব ধর্মের ছায়ায় নিয়ে আসে। তাঁর প্রভাবেই বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে এক নতুন যুগের সূচনা হয়।

    BISWAZ GROWTH ACADEMY - Free WBBSE Class 1 to 10 Books

    Biswaz Growth Academy: Free WBBSE Books & Study Materials

    Welcome to biswaz.com, your premier destination for high-quality educational resources. Explore our comprehensive library of West Bengal Board (WBBSE) textbooks from Class 1 to Class 10. Whether you are looking for Amar Boi, Sahaj Path, Ganit Prabha, Butterfly, Bliss, or Amader Paribesh, we provide easily accessible PDF downloads to support student growth, learning, and exam preparation.

    WBBSE Books PDF Download Class 1 to 10 Syllabus West Bengal Board Solutions Free School Textbooks Biswaz Educational Portal

    Biswaz Growth

    Academy Portal

    Select a Class

    0 items