প্রকল্প পত্র (সপ্তম শ্রেণি): অধ্যায় ৬ – নগর, বণিক ও বাণিজ্য
প্রসেসিং…

বিষয়: অতীত ও ঐতিহ্য (সপ্তম শ্রেণি)

অধ্যায় ৬: নগর, বণিক ও বাণিজ্য (প্রকল্প নোটস)

মূল ধারণা ও প্রশ্নাবলী

১. সুলতানি ও মুঘল যুগে শহরের প্রকারভেদগুলি কী কী ছিল? [৩ নম্বর]

উত্তর: সুলতানি ও মুঘল যুগে সাধারণত তিন ধরনের শহর বা নগর গড়ে উঠেছিল:

  1. রাজধানী শহর: যে শহরগুলি ছিল সাম্রাজ্যের বা আঞ্চলিক রাজ্যের শাসনের কেন্দ্র। যেমন – দিল্লি, আগ্রা, ফতেপুর সিক্রি, গৌড়, লখনৌতি।
  2. বাণিজ্যিক ও বন্দর শহর: যে শহরগুলি ব্যবসা-বাণিজ্য বা সামুদ্রিক বাণিজ্যের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠেছিল। যেমন – সুরাট, সপ্তগ্রাম, চট্টগ্রাম, ব্রোচ, কালিকট।
  3. তীর্থ শহর: যে শহরগুলি কোনো ধর্মীয় স্থানকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল। যেমন – বারাণসী (কাশী), প্রয়াগ (এলাহাবাদ), আজমির, মথুরা।

২. ‘দিল্লির সাতটি শহর’ বলতে কী বোঝায়? [৩ নম্বর]

উত্তর: দিল্লি সুলতানি ও মুঘল যুগে দিল্লির ভূখণ্ডে বিভিন্ন শাসক মোট সাতটি শহর বা নগর পত্তন করেছিলেন। এই সাতটি শহরকেই একত্রে ‘দিল্লির সাতটি শহর’ (Seven Cities of Delhi) বলা হয়।

এই শহরগুলি হলো: ১) কিল্লা রাই পিথোরা (পৃথ্বীরাজ চৌহানের), ২) সিরি (আলাউদ্দিন খলজি), ৩) তুঘলকাবাদ (গিয়াসউদ্দিন তুঘলক), ৪) জাহানপনাহ (মহম্মদ বিন তুঘলক), ৫) ফিরোজাবাদ (ফিরোজ শাহ তুঘলক), ৬) দীন-পনাহ (হুমায়ুন) এবং ৭) শাহজাহানাবাদ (শাহজাহান)।

৩. ফিরোজ শাহ তুঘলক কীভাবে ফিরোজাবাদ শহরে জল সরবরাহের ব্যবস্থা করেছিলেন? [৩ নম্বর] [গুরুত্বপূর্ণ]

উত্তর: সুলতান ফিরোজ শাহ তুঘলক তাঁর রাজধানী ফিরোজাবাদে জল সরবরাহের জন্য যমুনা নদী থেকে খাল কেটে নিয়ে এসেছিলেন।

  • একটি খাল যমুনা নদী থেকে শুরু হয়ে শহরের মধ্য দিয়ে গিয়ে দুর্গে প্রবেশ করেছিল।
  • অন্য একটি খাল যমুনা থেকে কেটে শহরের বাইরে দিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।
  • এই খালগুলি শুধু পানীয় জলের জোগান দিত না, বরং শহরের বাগান ও প্রাসাদগুলিতে জল সরবরাহ করত এবং দুর্গের চারপাশের পরিখা ভরাট রাখতে সাহায্য করত।

৪. আকবর কেন ফতেপুর সিক্রি নির্মাণ করেন এবং কেন তা ত্যাগ করেন? [৫ নম্বর]

উত্তর:

নির্মাণের কারণ:

  1. মুঘল বাদশাহ আকবর চিতোর ও রনথম্ভোর জয়ের পর সুফি সন্ত শেখ সেলিম চিশতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে আগ্রার কাছে সিক্রি গ্রামে একটি নতুন রাজধানী নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেন।
  2. এই শহরটি তিনি পারসিক ও ভারতীয় স্থাপত্য রীতির মিশ্রণে অপরূপভাবে সাজিয়ে তোলেন।
  3. ১৫৭১ খ্রিস্টাব্দে তিনি এর নাম দেন ‘ফতেপুর সিক্রি’ (অর্থাৎ ‘জয়ের শহর’)।

ত্যাগের কারণ:

এই শহর নির্মাণের পরিকল্পনায় একটি বড় ভুল ছিল। শহরটি এমন একটি পাথুরে এলাকায় অবস্থিত ছিল যেখানে জলের উৎস প্রায় ছিল না বললেই চলে। কৃত্রিম জলাধার তৈরি করা হলেও তা শহরের বিপুল চাহিদা মেটাতে পারেনি। এই তীব্র **জলসংকটের** কারণেই শেষ পর্যন্ত আকবর এই জাঁকজমকপূর্ণ রাজধানী ত্যাগ করতে বাধ্য হন।

৫. ‘শাহজাহানাবাদ’ শহরটির সংক্ষিপ্ত পরিচয় দাও। [৩ নম্বর]

উত্তর: ‘শাহজাহানাবাদ’ হলো মুঘল বাদশাহ শাহজাহানের তৈরি নতুন রাজধানী (বর্তমান পুরোনো দিল্লি)। ১৬৩৯ খ্রিস্টাব্দে তিনি যমুনা নদীর তীরে এই শহর তৈরির কাজ শুরু করেন।

এই শহরের প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল এর লাল বেলেপাথরের তৈরি কেল্লা (আজকের লালকেল্লা) এবং বিশাল ‘জামা মসজিদ’। শহরের মধ্যে দিয়ে ‘নহর-ই बहिشت’ (স্বর্গের খাল) নামে একটি খাল বয়ে যেত, যা শহরের জল সরবরাহ নিশ্চিত করত। ‘চাঁদনি চক’ ছিল এই শহরের প্রধান বাজার।

৬. সুলতানি ও মুঘল যুগে বাণিজ্যে ‘বঞ্জারা’ ও ‘মুলতানি’ কাদের বলা হতো? [৩ নম্বর]

উত্তর:

  • বঞ্জারা: সুলতানি ও মুঘল যুগে এক বিশেষ শ্রেণীর যাযাবর ব্যবসায়ী ছিল, যারা বলদে করে শস্য, লবণ ইত্যাদি এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় নিয়ে গিয়ে বিক্রি করত। এদের বলা হতো ‘বঞ্জারা’। তারা সাধারণত দলবদ্ধভাবে বাণিজ্য করত।
  • মুলতানি: মুলতানের ব্যবসায়ীরা দূরপাল্লার বাণিজ্যে খুব দক্ষ ছিলেন। তাঁরা শুধু ভারতের মধ্যেই নয়, ভারতের বাইরে মধ্য এশিয়া ও পশ্চিম এশিয়াতেও বাণিজ্য করতেন। এই কারণেই দূরপাল্লার ব্যবসায়ীদের অনেক সময় ‘মুলতানি’ বলা হতো।

৭. ‘হুণ্ডি’ কী? [২ নম্বর]

উত্তর: ‘হুণ্ডি’ হলো মধ্যযুগের ভারতে ব্যবহৃত এক ধরনের ‘বিল অফ এক্সচেঞ্জ’ বা বাণিজ্যিক বিনিময়পত্র। বণিকরা এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় নগদ টাকা না নিয়ে গিয়ে ‘সরাফ’ বা পোদ্দারদের কাছে টাকা জমা রাখতেন। সরাফরা সেই টাকার বিনিময়ে একটি কাগজ বা ‘হুণ্ডি’ দিতেন। বণিকরা অন্য শহরে গিয়ে সেই হুণ্ডি দেখিয়ে স্থানীয় সরাফের কাছ থেকে টাকা তুলে নিতেন। এটি ছিল নিরাপদ বাণিজ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায়।

৮. ‘সরাফ’ ও ‘দালাল’ কাদের বলা হতো? [২ নম্বর]

উত্তর:

  • সরাফ: সুলতানি ও মুঘল যুগে যারা টাকা-পয়সার লেনদেন ও মুদ্রা বিনিময়ের কাজ করত, তাদের ‘সরাফ’ বা ‘পোদ্দার’ বলা হতো। তারা ‘হুণ্ডি’ ব্যবস্থার মাধ্যমে বাণিজ্যে মূলধন জোগাতে সাহায্য করত।
  • দালাল: ‘দালাল’ বা মধ্যস্থতাকারীরা ক্রেতা ও বিক্রেতার মধ্যে যোগাযোগ করিয়ে দিত এবং তার বিনিময়ে কিছু কমিশন বা ‘দস্তুরি’ পেত।

৯. মধ্যযুগে ভারতের প্রধান সামুদ্রিক বন্দরগুলির নাম লেখো। [৩ নম্বর]

উত্তর: মধ্যযুগে ভারতের দুটি উপকূল বরাবরই অনেক গুরুত্বপূর্ণ বন্দর ছিল:

  • পশ্চিম উপকূল (আরব সাগর): সুরাট (প্রধানতম বন্দর), ব্রোচ, কালিকট, কোচিন, গোয়া, দিউ।
  • পূর্ব উপকূল (বঙ্গোপসাগর): সপ্তগ্রাম (বাংলা), চট্টগ্রাম (বাংলা), সোনারগাঁ (বাংলা), মুসলিপট্টনম (করমণ্ডল উপকূল)।

১০. মধ্যযুগে ভারত থেকে কী কী জিনিস প্রধানত রপ্তানি হতো এবং কী কী আমদানি হতো? [৩ নম্বর]

উত্তর:

  • প্রধান রপ্তানি দ্রব্য: ভারতের প্রধান রপ্তানি দ্রব্য ছিল **সুতির বস্ত্র**। এছাড়া রপ্তানি হতো চাল, গম, চিনি, মশলা (গোলমরিচ), নীল, আফিম এবং হিরে।
  • প্রধান আমদানি দ্রব্য: ভারত মূলত মূল্যবান ধাতু আমদানি করত, যেমন – **সোনা ও রুপো** (টাকা তৈরির জন্য)। এছাড়া আমদানি হতো উন্নত জাতের ঘোড়া (আরব ও পারস্য থেকে), চিনা রেশম ও পোর্সেলিনের বাসন।
সুলতানি ও মুঘল যুগের বাণিজ্য ভারত রপ্তানি (সুতির বস্ত্র, মশলা, চাল) আমদানি (সোনা, রুপো, ঘোড়া)

চিত্র: মধ্যযুগের ভারতের আমদানি ও রপ্তানি বাণিজ্য।

১১. ‘দাদনি’ প্রথা কী? [২ নম্বর]

উত্তর: ‘দাদনি’ প্রথা হলো বাণিজ্যের একটি বিশেষ ধরণ, যেখানে বণিকরা কারিগরদের (যেমন তাঁতি) কাঁচামাল কেনার জন্য অগ্রিম অর্থ বা ‘দাদন’ দিতেন। শর্ত থাকত যে, কারিগররা তাদের তৈরি জিনিসপত্র শুধুমাত্র সেই বণিকদের কাছেই নির্দিষ্ট দামে বিক্রি করবেন, অন্য কারো কাছে নয়। ইউরোপীয় কোম্পানিগুলি এই প্রথার মাধ্যমে ভারতের কারিগরদের ওপর নিয়ন্ত্রণ কায়েম করেছিল।

অতিরিক্ত প্রশ্নাবলী (Higher Order Thinking)

১২. সুলতানি ও মুঘল যুগে শহরের জল সরবরাহ ব্যবস্থা এত গুরুত্বপূর্ণ ছিল কেন? [৩ নম্বর]

উত্তর: সুলতানি ও মুঘল যুগে শহরগুলি ছিল ঘনবসতিপূর্ণ এবং সেগুলিতে শাসক, অভিজাত ও বিশাল সেনাবাহিনীর বাস ছিল।

  1. পানীয় জল: লক্ষ লক্ষ মানুষের প্রতিদিনের পানীয় জলের জোগান দেওয়া ছিল প্রশাসনের প্রধান চ্যালেঞ্জ।
  2. অন্যান্য ব্যবহার: এছাড়া প্রাসাদ, দুর্গ, মসজিদ, বাগান, হামাম (স্নানাগার) এবং পরিখা ভরাটের জন্যও জলের প্রয়োজন হতো।
  3. কৃষিকাজ: শহরের আশেপাশে কৃষিকাজের জন্যও সেচের জলের দরকার হতো।

এই বিপুল চাহিদা মেটানোর জন্যই ফিরোজ শাহ তুঘলক বা শাহজাহানের মতো শাসকরা যমুনা নদী থেকে খাল কেটে বা বড় বড় ‘হাউজ’ (জলাধার) তৈরি করে জল সরবরাহের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিতেন।

১৩. মুঘল আমলে ‘সুরাট’ বন্দর এবং বাংলার ‘সপ্তগ্রাম’ বন্দরের গুরুত্ব আলোচনা করো। [৫ নম্বর]

উত্তর:

সুরাট (পশ্চিম উপকূল):

  • মুঘল আমলে সুরাট ছিল ভারতের **প্রধানতম বাণিজ্যিক বন্দর**।
  • এটি ছিল পশ্চিম এশিয়া (লোহিত সাগর ও পারস্য উপসাগর) এবং ইউরোপের সঙ্গে বাণিজ্যের প্রধান প্রবেশদ্বার।
  • মক্কায় হজ্জ যাত্রার জন্যও মুসলিম তীর্থযাত্রীরা এই বন্দর ব্যবহার করতেন।
  • ইংরেজ, ওলন্দাজ, ফরাসি—সকল ইউরোপীয় বণিকদেরই এখানে ‘কুঠি’ বা বাণিজ্য ঘাঁটি ছিল। সুরাট ছিল মুঘল সাম্রাজ্যের রাজস্ব আয়ের এক বিরাট উৎস।

সপ্তগ্রাম (বাংলা):**

  • সুলতানি ও মুঘল যুগের প্রথম দিকে সপ্তগ্রাম (বর্তমান হুগলি জেলায়) ছিল বাংলার এক অত্যন্ত সমৃদ্ধ বন্দর।
  • এই বন্দর দিয়ে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং চিনের সঙ্গে বাংলার চাল, কাপড় ও অন্যান্য পণ্যের বাণিজ্য চলত।
  • কিন্তু পরবর্তীকালে সরস্বতী নদী মজে যাওয়ায় (শুকিয়ে যাওয়ায়) সপ্তগ্রাম বন্দরের পতন ঘটে এবং এর স্থান দখল করে নেয় ‘হুগলি’ বন্দর, যা পোর্তুগিজদের হাতে গড়ে উঠেছিল।

BISWAZ GROWTH ACADEMY - Class Menu
BISWAZ GROWTH ACADEMY - Class Menu