প্রকল্প পত্র (সপ্তম শ্রেণি): অধ্যায় ৩ – ভারতের সমাজ, অর্থনীতি ও সংস্কৃতি
প্রসেসিং…

বিষয়: অতীত ও ঐতিহ্য (সপ্তম শ্রেণি)

অধ্যায় ৩: ভারতের সমাজ, অর্থনীতি ও সংস্কৃতির কয়েকটি ধারা (প্রকল্প নোটস)

মূল ধারণা ও প্রশ্নাবলী

১. ‘সামন্ত ব্যবস্থা’ বলতে কী বোঝায়? [৩ নম্বর] [গুরুত্বপূর্ণ]

উত্তর: খ্রিস্টীয় সপ্তম থেকে দ্বাদশ শতকে ভারতে (বিশেষত উত্তর ভারতে) রাজা, গোষ্ঠীর শাসক এবং সাধারণ জনগণকে নিয়ে একটি স্তরভিত্তিক সমাজ ব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল। এই ব্যবস্থায় রাজস্ব ও শাসনের অধিকার স্তরে স্তরে ভাগ হয়ে গিয়েছিল।

  • সবার উপরে ছিলেন রাজা।
  • তাঁর নীচে ছিলেন কিছু উঁচু রাজকর্মচারী বা যুদ্ধে হেরে যাওয়া রাজা, যারা ‘মহাসামন্ত’ বা ‘সামন্ত’ নামে পরিচিত হতেন। এঁরা নগদ বেতনের বদলে জমি ভোগ করতেন এবং রাজাকে প্রয়োজনে সৈন্য দিয়ে সাহায্য করতেন।
  • এঁদের নীচে ছিলেন আরও ছোট ছোট গোষ্ঠীর প্রধান বা ধনী কৃষকরা।
  • সবার নীচে ছিল সাধারণ কৃষক বা প্রজারা, যাদের শ্রমের ওপর এই গোটা ব্যবস্থাটা দাঁড়িয়ে ছিল।

এই স্তরবিন্যাসকেই ‘সামন্ত ব্যবস্থা’ বলা হয়। [Image of the Indian Samanta system pyramid structure]

২. পাল-সেন যুগে বাংলার অর্থনৈতিক অবস্থা কেমন ছিল? (কৃষি ও বাণিজ্য) [৫ নম্বর]

উত্তর: পাল-সেন যুগে বাংলার অর্থনীতি ছিল মূলত **কৃষিনির্ভর**।

কৃষি:

  • এই যুগের প্রধান ফসল ছিল ধান। এছাড়া সর্ষে, আম, কাঁঠাল, কলা, পান, সুপুরি, এলাচ, তুলো ইত্যাদিও প্রচুর উৎপন্ন হতো।
  • রাজারা উৎপন্ন ফসলের ১/৬ (এক-ষষ্ঠাংশ) ভাগ কৃষকদের কাছ থেকে কর নিতেন।
  • রাজা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলিকে ভূমিদানের ফলে কৃষিজমির পরিমাণ বাড়ানোর চেষ্টা করা হতো।

বাণিজ্য ও মুদ্রা:

  • এই যুগে বাংলার বাণিজ্যের গুরুত্ব ক্রমশ কমে এসেছিল। ভারতের পশ্চিম দিকের সাগরে আরব বণিকদের দাপটের ফলে বাংলার বণিকরা বৈদেশিক বাণিজ্যে পিছিয়ে পড়ে।
  • বাণিজ্যের অবনতির ফলে এই যুগে সোনা বা রুপোর মুদ্রার ব্যবহারও খুব কমে যায়।
  • জিনিসপত্র কেনা-বেচার প্রধান মাধ্যম হয়ে উঠেছিল ‘কড়ি’।

৩. পাল-সেন যুগে বাঙালির খাওয়া-দাওয়া কেমন ছিল? [৩ নম্বর]

উত্তর: পাল-সেন যুগে বাঙালির প্রধান খাদ্য ছিল ভাত। প্রাচীন কাব্য থেকে জানা যায়, গরম ভাতের সঙ্গে ঘি, মৌরলা মাছ, পাট শাক, দুধ ও কলা খাওয়ার চল ছিল।

এছাড়া বেগুন, লাউ, কুমড়ো, কচুর মতো নানা শাক-সবজি এবং রুই, পুঁটি, ইলিশ মাছও খাওয়া হতো। অনেকে হরিণ, ছাগল, কচ্ছপ বা পাখির মাংসও খেত। দুধ, দই, ক্ষীর, গুড় বাঙালির প্রিয় খাদ্য ছিল। তবে আশ্চর্যের বিষয়, সেই যুগে আলু বা ডাল খাওয়ার উল্লেখ বিশেষ পাওয়া যায় না।

৪. ‘রামচরিত’ কাব্যটি কে, কোন ভাষায় রচনা করেন? এই কাব্যের ঐতিহাসিক গুরুত্ব কী? [৫ নম্বর]

উত্তর: ‘রামচরিত’ কাব্যটি **সন্ধ্যাকর নন্দী** **সংস্কৃত** ভাষায় রচনা করেন। তিনি ছিলেন পাল রাজা রামপালের (আনুমানিক ১০৭২-১১২৬ খ্রিঃ) সভাকবি।

ঐতিহাসিক গুরুত্ব:

  1. দ্ব্যর্থক কাব্য: এই কাব্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এর প্রতিটি শ্লোকের দুটি করে অর্থ আছে। এক অর্থে কবি রামায়ণের নায়ক রামচন্দ্রের কাহিনি বলেছেন, অন্য অর্থে তিনি তাঁর পৃষ্ঠপোষক রাজা রামপালের জীবনের কথা বলেছেন।
  2. কৈবর্ত বিদ্রোহের বিবরণ: এই কাব্য থেকেই আমরা পাল রাজা দ্বিতীয় মহীপালের আমলে ঘটা ‘কৈবর্ত বিদ্রোহ’-এর বিস্তারিত বিবরণ পাই।
  3. বরেন্দ্রভূমি পুনরুদ্ধার: রামায়ণের সীতা উদ্ধারের কাহিনীর সঙ্গে তুলনা করে সন্ধ্যাকর নন্দী বর্ণনা করেছেন, কীভাবে রাজা রামপাল বিভিন্ন সামন্তদের সাহায্য নিয়ে কৈবর্ত রাজা ভীমকে পরাজিত করে তাঁর পিতৃভূমি বরেন্দ্র অঞ্চল পুনরুদ্ধার করেছিলেন।

৫. পাল যুগে বৌদ্ধধর্মের প্রসারে ‘সিদ্ধাচার্য’ কাদের বলা হতো? ‘চর্যাপদ’ কী? [৫ নম্বর]

উত্তর:

সিদ্ধাচার্য: পাল যুগে মহাযান বৌদ্ধধর্মের সঙ্গে বিভিন্ন দার্শনিক চিন্তা মিশে গিয়ে ‘বজ্রযান’ বা ‘তান্ত্রিক বৌদ্ধমত’-এর জন্ম হয়। এই মতের নেতাদের বা আচার্যদের বলা হতো ‘সিদ্ধাচার্য’। এঁরা ছিলেন ৮৪ জন। তাঁদের মধ্যে লুইপাদ, সরহপাদ, কাহ্নপাদ প্রমুখ ছিলেন উল্লেখযোগ্য। তাঁরা কোনো মন্ত্র, পুজো বা আচারের বদলে গুরুর মাধ্যমে জ্ঞানলাভ এবং আত্মার শুদ্ধির ওপর জোর দিতেন।

চর্যাপদ:

  • চর্যাপদ হলো বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্যদের লেখা কবিতা ও গানের সংকলন।
  • এটি খ্রিস্টীয় অষ্টম থেকে দ্বাদশ শতকের মধ্যে রচিত হয়।
  • এর গুরুত্ব হলো, চর্যাপদে যে ভাষা ব্যবহৃত হয়েছে, তাই হলো **আদি বাংলা ভাষার** প্রাচীনতম নিদর্শন।
  • আচার্য হরপ্রসাদ শাস্ত্রী নেপাল থেকে এই চর্যাপদের পুঁথি উদ্ধার করেন।

৬. পাল আমলে বাংলায় জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র হিসেবে ‘বৌদ্ধবিহার’গুলির (মহাবিহার) ভূমিকা লেখো। [৫ নম্বর] [গুরুত্বপূর্ণ]

উত্তর: পাল রাজারা ছিলেন বৌদ্ধধর্মের পৃষ্ঠপোষক। তাঁদের আমলে বাংলা ও বিহারে অনেকগুলি বিশাল বৌদ্ধবিহার বা ‘মহাবিহার’ জ্ঞানচর্চার প্রধান কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল।

  • প্রধান বিহার: এগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল নালন্দা, ওদন্তপুরী (বিহার), বিক্রমশীল (ভাগলপুর), সোমপুরী (রাজশাহীর পাহাড়পুর), জগদ্দল (উত্তরবঙ্গ) ইত্যাদি।
  • শিক্ষা ব্যবস্থা: এই বিহারগুলি ছিল আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয়। এখানে শুধু বৌদ্ধধর্ম নয়, ব্যাকরণ, তর্কশাস্ত্র, দর্শন, চিকিৎসাবিজ্ঞান ইত্যাদিও পড়ানো হতো।
  • আন্তর্জাতিক খ্যাতি: সুদূর তিব্বত, চিন, কোরিয়া ও মোঙ্গোলিয়া থেকেও ছাত্ররা এখানে পড়তে আসত। নালন্দায় প্রায় ১০,০০০ ছাত্র ও শিক্ষক থাকতেন।
  • বিখ্যাত আচার্য: দীপঙ্কর-শ্রীজ্ঞান (অতীশ), শান্তরক্ষিত, কাহ্নপাদের মতো বিখ্যাত বাঙালি আচার্যরা এই বিহারগুলিতে অধ্যাপনা করতেন।
  • অর্থায়ন: পাল রাজারা এবং ধনী বণিকরা এই বিহারগুলি চালানোর জন্য প্রভূত অর্থ ও জমি দান করতেন।
  • ৭. চোল শাসনব্যবস্থায় ‘উর’, ‘নাড়ু’ ও ‘নগরম’-এর ভূমিকা কী ছিল? [৩ নম্বর]

    উত্তর: চোল শাসন ছিল অত্যন্ত বিকেন্দ্রীভূত। স্থানীয় স্বায়ত্তশাসনে তিনটি সভা প্রধান ভূমিকা নিত:

    1. উর: কৃষকদের বসতিকে ঘিরে গড়ে ওঠা সাধারণ গ্রাম-পরিষদকে বলা হতো ‘উর’।
    2. নাড়ু: কয়েকটি গ্রামকে (উর) নিয়ে গঠিত হতো ‘নাড়ু’। ‘উর’ ও ‘নাড়ু’ স্থানীয় বিচার এবং রাজস্ব বা কর সংগ্রহের দায়িত্ব পালন করত।
    3. নগরম: ব্যবসায়ীদের স্বার্থ ও বিভিন্ন সমস্যা মোকাবিলার জন্য ‘নগরম’ নামে পৃথক পরিষদ বা সভা তৈরি হয়েছিল।

    ৮. দীপঙ্কর-শ্রীজ্ঞান (অতীশ) কেন বিখ্যাত? [৩ নম্বর]

    উত্তর: অতীশ দীপঙ্কর-শ্রীজ্ঞান (আনুমানিক ৯৮০-১০৫৩ খ্রিঃ) ছিলেন পাল যুগের একজন শ্রেষ্ঠ বাঙালি বৌদ্ধ পণ্ডিত ও আচার্য।

    • তিনি বিক্রমশীল মহাবিহারের অন্যতম প্রধান আচার্য ছিলেন।
    • তাঁর পাণ্ডিত্যের খ্যাতি ভারত ছাড়িয়ে বিদেশেও ছড়িয়ে পড়ে।
    • তিব্বতের রাজার অনুরোধে তিনি দুর্গম হিমালয় পার করে তিব্বতে যান (১০৪০ খ্রিঃ)।
    • তাঁর প্রচেষ্টাতেই তিব্বতে মহাযান বৌদ্ধধর্ম অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। তিনি অনেক সংস্কৃত গ্রন্থ তিব্বতি ভাষায় অনুবাদ করেন। তিব্বতে তিনি ‘বুদ্ধের অবতার’ হিসেবে পূজিত হন।

    ৯. ভারতের সঙ্গে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সাংস্কৃতিক যোগাযোগের দুটি উদাহরণ দাও। [২ নম্বর]

    উত্তর:

    1. স্থাপত্য: দ্বাদশ শতকে কম্বোডিয়ার ‘আঙ্কোরভাট’-এ নির্মিত বিখ্যাত বিষ্ণু মন্দিরটি ভারতীয় স্থাপত্যের দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত। এই মন্দিরের গায়ে রামায়ণ ও মহাভারতের গল্প খোদাই করা আছে।
    2. সাহিত্য ও ধর্ম: ইন্দোনেশিয়ার বোরোবোদুরের বৌদ্ধ মন্দির এবং কম্বোডিয়ায় রামায়ণের কাহিনি নিয়ে নৃত্য-সংগীতের প্রচলন ভারতে সঙ্গে এই অঞ্চলের গভীর ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক যোগাযোগের প্রমাণ দেয়।

    অতিরিক্ত প্রশ্নাবলী (Higher Order Thinking)

    ১০. ভারতের ‘সামন্ত ব্যবস্থা’ এবং ইউরোপের ‘সামন্ততন্ত্র’-এর মধ্যে প্রধান পার্থক্য কী ছিল? [৩ নম্বর]

    উত্তর: ভারতের ‘সামন্ত ব্যবস্থা’ এবং ইউরোপের ‘সামন্ততন্ত্র’ (Feudalism) দেখতে একই রকম (ত্রিভুজাকার) হলেও এদের মধ্যে মূল পার্থক্য ছিল:

    • ইউরোপে সামন্তপ্রভুরা তাঁদের অধীনস্থ কৃষকদের (ভূমিদাস বা সার্ফ) শুধু জমিও নয়, ব্যক্তি হিসেবেও প্রায় ‘মালিক’ ছিলেন। কৃষকরা প্রভুর অনুমতি ছাড়া জমি বা গ্রাম ছেড়ে যেতে পারতেন না।
    • ভারতে সামন্ত বা জমিদাররা কৃষকদের কাছ থেকে রাজস্ব আদায় করতেন বটে, কিন্তু তাঁরা কৃষকদের ‘ব্যক্তিগত’ মালিক ছিলেন না। ভারতীয় কৃষকরা তুলনামূলকভাবে বেশি স্বাধীন ছিলেন।

    ১১. “পাল রাজারা বৌদ্ধ হলেও ব্রাহ্মণ্য সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষণা করতেন।” – একটি উদাহরণ দিয়ে বোঝাও। [২ নম্বর]

    উত্তর: পাল রাজারা নিজেরা বৌদ্ধ ছিলেন এবং বৌদ্ধবিহারগুলিকে দানধ্যান করতেন। কিন্তু তাঁরা ব্রাহ্মণ্য ধর্মকেও অবহেলা করেননি। যেমন, পাল আমলের শ্রেষ্ঠ শিল্পকীর্তি পাহাড়পুরের (সোমপুরী বিহার) মন্দিরের গায়ে বৌদ্ধ মূর্তির পাশাপাশি রাধা-কৃষ্ণ, বলরাম, শিব এবং গঙ্গার মতো ব্রাহ্মণ্য দেব-দেবীর মূর্তিও পাওয়া যায়। এটিই প্রমাণ করে যে পাল রাজারা উভয় সংস্কৃতিরই পৃষ্ঠপোষণা করতেন।

    ১২. পাল ও সেন যুগের সাহিত্যচর্চার মধ্যে প্রধান পার্থক্য কী ছিল? [৩ নম্বর]

    উত্তর:

    • পাল যুগ: এই যুগে বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্যদের হাতে ‘চর্যাপদ’ রচনার মাধ্যমে **আদি বাংলা ভাষার** জন্ম হয়, যা ছিল সাধারণ মানুষের মুখের ভাষা। যদিও সংস্কৃত চর্চাও (যেমন ‘রামচরিত’) ছিল।
    • সেন যুগ: সেন রাজারা ব্রাহ্মণ্য ধর্মের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। তাঁদের আমলে বাংলা ভাষার চর্চা কমে যায় এবং **সংস্কৃত ভাষার** প্রাধান্য খুব বেড়ে যায়। জয়দেবের ‘গীতগোবিন্দম্’ বা ধোয়ীর ‘পবনদূত’-এর মতো বিখ্যাত কাব্যগুলি সংস্কৃত ভাষাতেই লেখা হয়েছিল। এই সাহিত্য ছিল মূলত রাজসভা-কেন্দ্রিক ও পণ্ডিতদের জন্য।

    BISWAZ GROWTH ACADEMY - Class Menu
    BISWAZ GROWTH ACADEMY - Class Menu