বাংলা সাহিত্য (অষ্টম শ্রেণি)
সপ্তম পাঠ: আদাব (সমরেশ বসু) – নোটস ও উত্তর
**উৎস:** ছোটোগল্প | **বিষয়বস্তু:** কলকাতার নিম্নবিত্ত মানুষের জীবনসংগ্রাম, দাঙ্গা-বিধ্বস্ত পরিবেশে দুই ভিন্ন ধর্মাবলম্বী মানুষের মানবিক সম্পর্ক ও শেষ পরিণতি।
—১. রচনা পরিচিতি ও সারমর্ম (Core Theme)
সমরেশ বসুর **’আদাব’** গল্পটি কলকাতার এক দাঙ্গা-বিধ্বস্ত এলাকার পটভূমিতে রচিত। গল্পের মূল চরিত্র হলো **দুই নিম্নবিত্ত তাঁতি শ্রমিক** (একজন হিন্দু, একজন মুসলমান), যারা জীবন ও জীবিকার তাগিদে একটি সরু গলি বা **’গুলি’**তে আশ্রয় নেয়। গল্পটি ধর্ম ও জাতপাতের ঊর্ধ্বে উঠে মানবিকতা, জীবনবোধ এবং মানুষের অনিবার্য দুঃখকে তুলে ধরে।
মূল বক্তব্য:
- **দাঙ্গার পটভূমি:** গল্পটি এমন এক সময়ে স্থাপিত যখন শহরে ধর্মীয় উন্মাদনায় দাঙ্গা চলছে। জীবন বাঁচানোর তাগিদে মানুষ আশ্রয় খুঁজছে।
- **নিম্নবিত্তের সংগ্রাম:** হিন্দু এবং মুসলমান, উভয় তাঁতিই ধর্মীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে কেবল **শ্রমিক** হিসেবে নিজেদের পরিচয় দেয়। তাদের জীবন একই রকম দারিদ্র্য ও সংগ্রাম দ্বারা চিহ্নিত।
- **মানবিক বন্ধন:** গল্পের দুই প্রধান চরিত্র মৃত্যুর ভয়ে পাশাপাশি আশ্রয় নেয়। প্রথমদিকে পরিচয় নিয়ে সন্দেহ থাকলেও, দ্রুতই তাদের মধ্যে এক **সহানুভূতি ও মানবিক বন্ধন** তৈরি হয়। তারা একে অপরের প্রতি কোনো বিদ্বেষ বা ঘৃণা পোষণ করে না, বরং ভাগ করে নেয় তাদের জীবন ও পরিবারের কথা।
- **করুণ পরিণতি:** গল্পের শেষে উভয় চরিত্রই দাঙ্গাকারীদের হাতে নিহত হয়। মৃত্যুর আগে তারা একে অপরকে **’আদাব’** জানিয়ে বিদায় নেয়। এই ‘আদাব’ শব্দটি কেবল বিদায় সম্ভাষণ নয়, বরং **মানবিকতা ও বন্ধুত্বের** চূড়ান্ত প্রকাশ।
- **গভীর জীবনবোধ:** গল্পটি দেখায় যে **দাঙ্গা** মানুষের তৈরি, কিন্তু **দুঃখ ও মৃত্যু** সকল মানুষের জন্য সমান। লেখকের সহানুভূতি সমাজের নিম্নস্তরের মানুষের প্রতি ছিল, যারা ধর্মীয় ভেদাভেদের শিকার।
২. গুরুত্বপূর্ণ শব্দ ও ব্যাখ্যা
- **আদাব:** মুসলমান সম্প্রদায়ের মধ্যে ব্যবহৃত এক প্রকার সম্মানজনক সম্ভাষণ বা বিদায়সূচক অভিবাদন।
- **গুলি:** সরু গলি।
- **পেশোয়ার:** পোশাকের ভেতরের অংশ, যা দিয়ে শীতকালে শরীর ঢাকা হয়।
- **মদিরা:** মদ, সুরা।
- **বড়োবাবু:** এখানে পুলিশ বা উচ্চপদস্থ ব্যক্তিকে বোঝানো হয়েছে।
- **নিরুদ্দেশ:** যার কোনো ঠিকানা নেই, উদ্দেশ্যহীন।
- **লন্ঠন:** আলো দেওয়ার যন্ত্র, এখানে পুলিশের টর্চ বা আলো অর্থে ব্যবহৃত।
- **তাঁতি:** যারা কাপড় বোনার কাজ করে, শ্রমিক শ্রেণী।
৩. হাতেকলমে (অনুশীলনী প্রশ্ন ও উত্তর)
(অনুশীলনী থেকে নির্বাচিত প্রশ্নের উত্তর নিচে দেওয়া হলো:)
সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন ও উত্তর (মান: ১-২ নম্বর):
১. ‘আদাব’ গল্পটির পটভূমি কী?
‘আদাব’ গল্পটির পটভূমি হলো **দাঙ্গা-বিধ্বস্ত কলকাতা শহরের** একটি নিম্নবিত্ত এলাকা, বিশেষত হুগলি নদীর তীরে অবস্থিত তাঁতিপাড়া।
২. দুই শ্রমিকের মধ্যে কোন বিষয়ে মিল ছিল?
দুই শ্রমিকের মধ্যে তাদের **পেশা, দারিদ্র্য এবং সমাজের নিম্নবিত্ত শ্রেণিভুক্ত** হওয়ার বিষয়ে মিল ছিল। উভয়ই তাঁতি শ্রমিক এবং জীবন ধারণের জন্য সংগ্রামরত ছিল।
৩. তারা কোথায় আশ্রয় নিয়েছিল?
তারা জীবন বাঁচানোর জন্য দাঙ্গা চলাকালীন একটি **সরু গলির (গুলি) কোণে** আশ্রয় নিয়েছিল।
৪. তাদের মধ্যে কী বলে কথোপকথন শেষ হয়?
দাঙ্গাকারীদের হাতে নিহত হওয়ার ঠিক আগে তারা দুজনেই একে অপরের উদ্দেশে **’আদাব’** বলে বিদায় সম্ভাষণ জানায়।
সংক্ষিপ্ত উত্তরধর্মী প্রশ্ন (মান: ৩ নম্বর):
৫. ‘মানুষের মতো মানুষ, যারা সব দুঃখের ঊর্ধ্বে ওঠে, তারা এক’- এই গল্পের প্রেক্ষিতে আলোচনা করো।
গল্পের দুই তাঁতি শ্রমিক ভিন্ন ধর্মাবলম্বী হওয়া সত্ত্বেও, তাদের **দারিদ্র্য, সংগ্রাম ও জীবনবোধ** ছিল এক। যখন তারা মৃত্যুর মুখে এসে দাঁড়ায়, তখন **হিন্দু-মুসলমান** পরিচয়টি গৌণ হয়ে যায়। তারা একে অপরের প্রতি **সহানুভূতি** দেখায় এবং একে অপরের পরিবার ও জীবনযাত্রার কথা জানতে চায়। তাদের এই আচরণ প্রমাণ করে যে, যখন জীবনের মৌলিক সমস্যাগুলি সামনে আসে, তখন **মানবিক সম্পর্ক** ধর্মীয় পরিচয়ের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
৬. ‘আমরা দুজনেই তাঁতি, আমরা মানুষ।’ – বক্তার এই মন্তব্যের তাৎপর্য ব্যাখ্যা করো।
তাৎপর্য: এই মন্তব্যটি গল্পের **মূল ভাবনা** বা **কেন্দ্রীয় বার্তা** বহন করে।
- **শ্রেণি-চেতনা:** বক্তা ধর্ম বা জাতিগত পরিচয়ের পরিবর্তে **পেশাগত পরিচয়কে** বড় করে দেখেছেন। তারা সমাজের নিম্নস্তরের শ্রমজীবী মানুষ, যাদের জীবনযাত্রার সমস্যা একই।
- **ধর্মের ঊর্ধ্বে মানবতা:** দাঙ্গার উন্মাদনার মধ্যে দাঁড়িয়ে বক্তা এই কথাটি বলে বোঝাতে চেয়েছেন যে, তাদের আসল পরিচয় **শ্রমিক** বা **মানুষ** হিসেবে। ধর্মীয় বিভেদ তাদের জীবনের মৌলিক সত্যকে মুছে দিতে পারে না।
- **একাত্মতা:** এই উক্তিটি তাদের মধ্যে এক **সহানুভূতিমূলক বন্ধন** তৈরি করে এবং দাঙ্গার বিরুদ্ধে এক নীরব প্রতিবাদ হিসেবে কাজ করে।
৭. গল্পের নামকরণ ‘আদাব’ কতখানি তাৎপর্যপূর্ণ, বুঝিয়ে দাও।
গল্পের নামকরণ **’আদাব’** অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও প্রতীকী:
- **বিদায় সম্ভাষণ:** ‘আদাব’ একটি মুসলমানি সম্ভাষণ। কিন্তু গল্পের শেষে হিন্দু ও মুসলমান—উভয় শ্রমিকই মৃত্যুর আগে একে অপরকে ‘আদাব’ জানায়।
- **মানবিকতার প্রতীক:** এটি কেবল বিদায় সম্ভাষণ নয়, বরং দুই ভিন্ন ধর্মাবলম্বী মানুষের মধ্যে গড়ে ওঠা **গভীর মানবিক বন্ধন, সমবেদনা ও বন্ধুত্বের** প্রতীক।
- **দাঙ্গার বিরুদ্ধে বার্তা:** দাঙ্গা যেখানে মানুষকে হত্যা করে, সেখানে এই **’আদাব’** শব্দটি প্রমাণ করে যে, চরম সংকটেও মানবিকতা টিকে থাকে এবং মানুষের মৃত্যু হলেও **ভালোবাসা ও সম্মান** শেষ হয় না।
রচনাধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর (মান: ৫ নম্বর):
৮. ‘আদাব’ গল্পে লেখকের যে দাঙ্গাবিরোধী মানবিক চেতনার পরিচয় পাওয়া যায়, তা বিশ্লেষণ করো।
সমরেশ বসুর ‘আদাব’ গল্পটি একটি **শক্তিশালী দাঙ্গাবিরোধী দলিল**, যেখানে ধর্মীয় বিভাজনের বিপরীতে **মানবতার শ্রেষ্ঠত্ব** প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে:
- **ধর্মীয় পরিচয়ের গৌণতা:** গল্পের দুই চরিত্র – হিন্দু ও মুসলমান – নিজেদের পরিচয় দেওয়ার সময় **ধর্মের নাম উল্লেখ করে না**, বরং নিজেদের **তাঁতি** বা **শ্রমিক** হিসেবে পরিচয় দেয়। লেখক দেখিয়েছেন, দরিদ্রের কাছে ধর্মীয় পরিচয় গৌণ; তাদের আসল পরিচয় হলো তাদের **দারিদ্র্য ও শ্রমজীবীতা**।
- **শ্রেণিগত সমানুভূতি:** উভয় চরিত্রই **একই জীবন সংগ্রামের** শরিক। তারা একই রকম দুঃখ, অভাব ও ভয় নিয়ে বাঁচত। এই **শ্রেণিগত একাত্মতা** তাদের মধ্যে দ্রুত মানবিক বন্ধন গড়ে তোলে।
- **দাঙ্গার শিকার:** দাঙ্গা কারা শুরু করে, কেন শুরু করে – তা তারা জানে না। অথচ তারাই এই উন্মাদনার **নিরীহ শিকার**। দাঙ্গা সৃষ্টিকারীরা উচ্চস্তরের মানুষ হলেও, মারা যায় নিম্নবিত্ত মানুষেরা।
- **’আদাব’ প্রতীকের ব্যবহার:** গল্পের শেষে, মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়ে তাদের একে অপরের প্রতি **’আদাব’** জানানোই গল্পের **সবচেয়ে বড়ো মানবিক বার্তা**। এটি প্রমাণ করে, যে বিভেদ দাঙ্গাকারীরা তৈরি করে, তা মানুষের হৃদয়ে পৌঁছাতে পারেনি। তাদের শেষ বিদায়টি ছিল **দাঙ্গার ধ্বংসলীলার বিপরীতে মানবিকতার জয়ধ্বনি**।
এভাবে সমরেশ বসু দেখিয়েছেন যে, দাঙ্গা হলো একটি **কৃত্রিম এবং আরোপিত ঘটনা**, কিন্তু **মানবিকতা ও মানুষের দুঃখ** হলো চিরন্তন সত্য।