বাংলা সাহিত্য (অষ্টম শ্রেণি)
অষ্টম পাঠ: হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় (হীরেন্দ্রনাথ দত্ত) – নোটস ও উত্তর
**উৎস:** প্রবন্ধ | **বিষয়বস্তু:** অভিধান প্রণেতা হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের জীবন ও তাঁর ‘বঙ্গীয় শব্দকোষ’ সৃষ্টির কঠিন ইতিহাস।
—১. রচনা পরিচিতি ও সারমর্ম (Core Theme)
হীরেন্দ্রনাথ দত্তের এই প্রবন্ধটি শুধুমাত্র একটি জীবনী নয়, এটি একটি **নিষ্ঠাবান সাধকের কর্মজীবনের উপাখ্যান**। প্রবন্ধে হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের **অসাধারণ ধৈর্য, অধ্যবসায়** এবং আর্থিক অনটন সত্ত্বেও প্রায় ৪০ বছর ধরে **’বঙ্গীয় শব্দকোষ’** নামক বাংলা ভাষার অন্যতম বৃহৎ অভিধানটি রচনার দুর্লভ প্রচেষ্টার কথা বলা হয়েছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অনুপ্রেরণা, শান্তিনিকেতনের লাইব্রেরি ও সীমিত ভাতার ওপর নির্ভর করে কীভাবে একাকী এক ব্যক্তি এত বড় কাজ সম্পন্ন করেন, তা-ই এই রচনার মূল উপজীব্য।
মূল বক্তব্য:
- **রবীন্দ্রনাথের অনুপ্রেরণা:** হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় শান্তিনিকেতনে কাজ করার সময়ে রবীন্দ্রনাথের নির্দেশে এবং অনুপ্রেরণায় অভিধান রচনার কাজে হাত দেন।
- **অসাধারণ অধ্যবসায়:** প্রায় ৪০ বছর ধরে তিনি অত্যন্ত সীমিত সুযোগ-সুবিধা ও আর্থিক কষ্টের মধ্যে এই বিরাট কাজটি সম্পন্ন করেন।
- **’বঙ্গীয় শব্দকোষ’:** হরিচরণের রচিত এই অভিধানটি ছিল তাঁর জীবনের শ্রেষ্ঠ কীর্তি, যা বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের জন্য এক অমূল্য সম্পদ।
- **নীরব সাধনা:** প্রবন্ধটি এই ভাষাসাধকের নিরলস পরিশ্রম, নিঃসঙ্গতা ও কর্মের প্রতি তাঁর একনিষ্ঠ প্রেমের ছবি তুলে ধরে।
২. গুরুত্বপূর্ণ শব্দ ও ব্যাখ্যা
- **শব্দকোষ:** অভিধান বা ডিকশনারি।
- **সাধক:** যিনি বিশেষ কোনো কঠিন ব্রত বা কাজ নিষ্ঠার সঙ্গে করে চলেন।
- **উপাখ্যান:** কাহিনী বা গল্প।
- **অধ্যবসায়:** কোনো কঠিন কাজে দৃঢ়ভাবে লেগে থাকা।
- **বাণীবাহক:** যিনি কোনো বার্তা বহন করেন বা প্রচার করেন।
- **স্বর্গীয়:** স্বর্গ বা দেবতা সম্পর্কিত। এখানে অলৌকিক বা অতি উন্নত অর্থে ব্যবহৃত।
- **দীক্ষাগুরু:** যিনি কোনো কঠিন বা নতুন কাজের সূচনা করেন বা প্রেরণা দেন।
৩. হাতেকলমে (অনুশীলনী প্রশ্ন ও উত্তর)
(অনুশীলনী থেকে নির্বাচিত প্রশ্নের উত্তর নিচে দেওয়া হলো:)
সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন ও উত্তর (মান: ১-২ নম্বর):
১. হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের রচিত অভিধানটির নাম কী?
হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের রচিত অভিধানটির নাম **’বঙ্গীয় শব্দকোষ’**।
২. হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় কার অনুপ্রেরণায় অভিধান রচনায় হাত দেন?
তিনি **রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর**-এর অনুপ্রেরণায় এবং নির্দেশে অভিধান রচনায় হাত দেন।
৩. ‘বঙ্গীয় শব্দকোষ’ রচনা করতে হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কত বছর সময় লেগেছিল?
প্রায় **৪০ বছর** সময় লেগেছিল এই বিরাট কাজটি সম্পন্ন করতে।
৪. অভিধান রচনার সময় হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রধান আশ্রয় কী ছিল?
প্রধানত **শান্তিনিকেতনের লাইব্রেরি** এবং রবীন্দ্রনাথের কাছ থেকে পাওয়া **সীমিত ভাতা** ছিল তাঁর প্রধান আশ্রয়।
সংক্ষিপ্ত উত্তরধর্মী প্রশ্ন (মান: ৩ নম্বর):
৫. হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের অভিধান রচনার কাজটি কেন ‘নীরব সাধনা’ আখ্যা পেতে পারে?
হরিচরণের অভিধান রচনার কাজটি ছিল এক নীরব সাধনা কারণ:
- **সময়কাল:** প্রায় ৪০ বছর ধরে তিনি এই কাজটি করেছেন।
- **একাকীত্ব:** তিনি লোকচক্ষুর অন্তরালে, সীমিত সুযোগ-সুবিধা ও আর্থিক অনটনের মধ্যে এই বিপুল কর্মযজ্ঞ চালিয়েছিলেন।
- **অধ্যবসায়:** এটি এমন এক কাজ, যার জন্য কোনো বাইরের স্বীকৃতি বা প্রতিদান ছিল না। কেবল ভাষার প্রতি ভালোবাসা ও কর্তব্যবোধ তাঁকে নিরলসভাবে কাজ করতে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে।
৬. রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কীভাবে হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘দীক্ষাগুরু’ হয়ে উঠলেন?
হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় যখন শান্তিনিকেতনে কাজ শুরু করেন, তখন রবীন্দ্রনাথই তাঁকে **বাংলা ভাষার শব্দ সংগ্রহ করে অভিধান রচনার** কঠিন ও মহৎ কাজটি করার জন্য নির্দেশ দেন। রবীন্দ্রনাথ কেবল নির্দেশ দিয়েই ক্ষান্ত হননি, তিনি হরিচরণকে শান্তিনিকেতনের লাইব্রেরি ব্যবহারের অনুমতি দেন এবং **আর্থিক সহায়তারও ব্যবস্থা** করেন। এই অনুপ্রেরণা ও পৃষ্ঠপোষণাই ছিল তাঁর কাজের **সূচনা ও ভিত্তি**, তাই রবীন্দ্রনাথকে তাঁর **’দীক্ষাগুরু’** বলা যথার্থ।
৭. ‘বঙ্গীয় শব্দকোষ’ কেন বাংলা সাহিত্যের একটি ‘স্বর্গীয় দান’ বলা চলে?
‘বঙ্গীয় শব্দকোষ’ বাংলা সাহিত্যের জন্য একটি **’স্বর্গীয় দান’** কারণ:
- **বৃহৎ আকার:** এটি একটি সুবিশাল, তথ্যসমৃদ্ধ ও ব্যাপক অভিধান, যা বাংলা ভাষার শব্দভাণ্ডারকে সুসংগঠিত করেছে।
- **দীর্ঘ সাধনা:** এক ব্যক্তির প্রায় চার দশক ধরে নিঃস্বার্থ পরিশ্রমের ফল হলো এই অভিধান, যার তুলনা বিরল।
- **ভাষার ভিত্তি:** বাংলা ভাষার শব্দ, তার ব্যুৎপত্তি ও ব্যবহারকে সঠিক মানদণ্ড দিতে এই অভিধানটি একটি **মৌলিক ভিত্তি** স্থাপন করেছে, যা পরবর্তীকালে বাংলা ভাষাকে আরও শক্তিশালী করেছে।
রচনাধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর (মান: ৫ নম্বর):
৮. ‘হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়’ প্রবন্ধে লেখকের রচনাশৈলী এবং হরিচরণের প্রতি তাঁর মনোভাব আলোচনা করো।
**হীরেন্দ্রনাথ দত্ত**-এর রচনাশৈলী এই প্রবন্ধে **তথ্যভিত্তিক, শ্রদ্ধাপূর্ণ ও সংযত**।
- **সহজ ও প্রাঞ্জল ভাষা:** প্রবন্ধের ভাষা অত্যন্ত সহজ ও সরল, যা হরিচরণের মতো নিরলস সাধকের জীবনীকে পাঠকের কাছে সহজে পৌঁছে দেয়। এতে লেখকের বক্তব্যের স্পষ্টতা বজায় থাকে।
- **শ্রদ্ধাপূর্ণ মনোভাব:** লেখক হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের **অধ্যবসায়, নিষ্ঠা ও নিঃসঙ্গ সাধনার** প্রতি গভীর শ্রদ্ধা দেখিয়েছেন। তিনি হরিচরণকে **’সাধক’** বা **’বাণীবাহক’**-এর মতো মহৎ উপাধিতে ভূষিত করেছেন।
- **গুরুত্বের প্রতিষ্ঠা:** হীরেন্দ্রনাথ দত্ত শুধুমাত্র হরিচরণের জীবন বর্ণনা করেননি, বরং **’বঙ্গীয় শব্দকোষ’** রচনার ঐতিহাসিক গুরুত্ব ও বাংলা ভাষার প্রতি তাঁর অবদানকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তিনি ব্যক্তিগত জীবন ও ভাষার প্রতি হরিচরণের আত্মত্যাগ—এই দুয়ের মধ্যে ভারসাম্য রেখেছেন।
- **রবীন্দ্রনাথের প্রসঙ্গ:** হরিচরণের জীবন আলোচনায় রবীন্দ্রনাথের অনুপ্রেরণাকে তিনি গুরুত্ব দিয়ে দেখিয়েছেন, যা তাঁর রচনার বিশ্বস্ততা ও তাৎপর্য বাড়িয়ে তুলেছে।
লেখক হরিচরণের প্রতি অত্যন্ত **শ্রদ্ধাশীল ও সহানুভূতিশীল** ছিলেন, যা তাঁর সংযত অথচ আবেগপূর্ণ রচনার মাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।