বিষয়: পরিবেশের সংকট, উদ্ভিদ ও পরিবেশের সংরক্ষণ (সপ্তম শ্রেণি)
অধ্যায় ৭: পরিবেশের সংকট ও সংরক্ষণ (নোটস)
১. পরিবেশ দূষণ ও বিশ্ব উষ্ণায়ন (Pollution & Global Warming)
১. পরিবেশ দূষণ কাকে বলে?
বায়ু, জল, মাটি ইত্যাদি পরিবেশের বিভিন্ন উপাদানের ভৌত, রাসায়নিক বা জৈবিক বৈশিষ্ট্যের যে অবাঞ্ছিত পরিবর্তন জীবের পক্ষে ক্ষতিকারক হয়ে ওঠে, তাকে **পরিবেশ দূষণ** বলে।
২. দূষক (Pollutant) কী?
যেসব ক্ষতিকারক পদার্থ বা শক্তি পরিবেশে মিশে দূষণ ঘটায়, তাদের **দূষক** বলে। যেমন: প্লাস্টিক, ডিডিটি (DDT), কার্বন মনোক্সাইড ($\text{CO}$), কলকারখানার বর্জ্যজল।
৩. বায়ু দূষণের প্রধান কারণগুলি কী কী?
বায়ু দূষণের প্রধান কারণগুলি হলো:
- **জীবাশ্ম জ্বালানির দহন:** কয়লা, পেট্রল পোড়ানোর ফলে $\text{CO}_2$, $\text{SO}_2$ ও $\text{NO}_x$ গ্যাস নির্গমন।
- **কলকারখানার ধোঁয়া:** যাতে সূক্ষ্ম ধূলিকণা (SPM) ও বিভিন্ন বিষাক্ত গ্যাস থাকে।
- **অরণ্যচ্ছেদন:** গাছপালা কমে যাওয়ায় বায়ুতে $\text{CO}_2$-এর পরিমাণ বৃদ্ধি।
- **$\text{CFC}$ গ্যাস:** রেফ্রিজারেটর বা শীতাতপ নিয়ন্ত্রক যন্ত্র থেকে নির্গত $\text{CFC}$ (ক্লোরোফ্লুরোকার্বন)।
৪. বিশ্ব উষ্ণায়ন (Global Warming) কাকে বলে? এর দুটি ক্ষতিকর প্রভাব লেখো।
বায়ুমণ্ডলে গ্রিনহাউস গ্যাস (যেমন – $\text{CO}_2$, $\text{CH}_4$) -এর পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের **গড় তাপমাত্রা ক্রমশ বৃদ্ধি** পাওয়ার ঘটনাকে বিশ্ব উষ্ণায়ন বলে।
ক্ষতিকর প্রভাব:
- **সমুদ্রের জলস্তর বৃদ্ধি:** মেরু অঞ্চলের ও হিমবাহের বরফ গলে যাওয়ায় সমুদ্রের জলস্তর বৃদ্ধি পায়, ফলে উপকূলীয় এলাকা ডুবে যায়।
- **জলবায়ুর পরিবর্তন:** অতিবৃষ্টি, খরা, শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় (যেমন – আম্ফান, আয়লা) -এর প্রকোপ বৃদ্ধি।
চিত্র: গ্রিনহাউস প্রভাব ও বিশ্ব উষ্ণায়ন। গ্রিনহাউস গ্যাসগুলি পৃথিবীর বিকিরিত তাপ আটকে রাখে।
৫. অ্যাসিড বৃষ্টি (Acid Rain) কী?
কলকারখানা ও যানবাহন থেকে নির্গত সালফার ডাইঅক্সাইড ($\text{SO}_2$) এবং নাইট্রোজেন অক্সাইড ($\text{NO}_x$) গ্যাস বায়ুমণ্ডলে জলীয় বাষ্পের সঙ্গে বিক্রিয়া করে **সালফিউরিক অ্যাসিড ($\text{H}_2\text{SO}_4$)** ও **নাইট্রিক অ্যাসিড ($\text{HNO}_3$)** তৈরি করে। এই অ্যাসিডগুলি বৃষ্টির জলের সঙ্গে মিশে পৃথিবীতে নেমে এলে তাকে অ্যাসিড বৃষ্টি বলে।
ক্ষতি: ঐতিহাসিক সৌধের ক্ষয় (স্টোন ক্যান্সার) এবং মাটির উর্বরতা হ্রাস।
৬. ওজোন স্তর (Ozone Layer) কাকে বলে? এর গুরুত্ব কী?
বায়ুমণ্ডলের স্ট্র্যাটোস্ফিয়ার স্তরে ওজোন ($\text{O}_3$) গ্যাসের যে ঘন আবরণটি রয়েছে, তাকে ওজোন স্তর বলে।
গুরুত্ব: এই স্তর সূর্য থেকে আগত ক্ষতিকারক **অতিবেগুনি (UV) রশ্মিকে শোষণ** করে পৃথিবীতে আসতে বাধা দেয় এবং জীবজগতকে ত্বক ক্যান্সার ও চোখের ক্ষতি থেকে রক্ষা করে।
৭. জল দূষণ কাকে বলে? এর দুটি কারণ ও দুটি প্রভাব লেখো।
জলের ভৌত, রাসায়নিক বা জৈবিক বৈশিষ্ট্যের অবাঞ্ছিত পরিবর্তন যা জীবের পক্ষে ক্ষতিকারক।
কারণ: ১. কলকারখানার রাসায়নিক বর্জ্য (যেমন পারদ, সিসা)। ২. কৃষিজমি থেকে সার ও কীটনাশক জলে মেশা।
প্রভাব: ১. কলেরা, টাইফয়েডের মতো জলবাহিত রোগের সংক্রমণ। ২. ইউট্রোফিকেশন (জলে শৈবালের অতিবৃদ্ধি)।
২. জীববৈচিত্র্য ও সংরক্ষণ (Biodiversity and Conservation)
৮. জীববৈচিত্র্য (Biodiversity) কাকে বলে?
কোনো একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলে বা বাস্তুতন্ত্রে বসবাসকারী বিভিন্ন প্রকার জীব (উদ্ভিদ, প্রাণী, অণুজীব) -এর মধ্যে যে **বৈচিত্র্য** দেখা যায়, তাকে জীববৈচিত্র্য বলে।
৯. জীববৈচিত্র্য হ্রাসের প্রধান কারণগুলি কী কী?
- **বাসস্থানের ধ্বংস:** বন কেটে ফেলা বা জলাভূমি ভরাট করা।
- **অতিরিক্ত শিকার:** বাণিজ্যিক লোভে বা খাদ্যের জন্য প্রাণী শিকার।
- **দূষণ:** পরিবেশ দূষণের ফলে জীবের মৃত্যু।
- **বহিরাগত প্রজাতির আগমন:** নতুন প্রজাতি এসে স্থানীয় জীবের খাদ্য ও বাসস্থানের অভাব ঘটায়।
১০. বিপন্ন প্রজাতি (Endangered Species) কাকে বলে? উদাহরণ দাও।
যেসব জীব প্রজাতির সংখ্যা দ্রুত কমে যাওয়ার ফলে অদূর ভবিষ্যতে পৃথিবী থেকে বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে, তাদের বিপন্ন প্রজাতি বলে।
উদাহরণ: রয়েল বেঙ্গল টাইগার, একশৃঙ্গ গণ্ডার, ডলফিন।
১১. ইন-সিটু (In-situ) সংরক্ষণ ও এক্স-সিটু (Ex-situ) সংরক্ষণের মধ্যে পার্থক্য লেখো।
| বৈশিষ্ট্য | ইন-সিটু (In-situ) সংরক্ষণ | এক্স-সিটু (Ex-situ) সংরক্ষণ |
|---|---|---|
| **সংজ্ঞা** | জীবদের **নিজস্ব প্রাকৃতিক বাসস্থানেই** সংরক্ষণ করা হয়। | জীবদের **বাসস্থানের বাইরে** কৃত্রিম পরিবেশে এনে সংরক্ষণ করা হয়। |
| **উদাহরণ** | জাতীয় উদ্যান (National Park), অভয়ারণ্য (Sanctuary), সংরক্ষিত বন। | চিড়িয়াখানা (Zoo), বোটানিক্যাল গার্ডেন, বীজ ব্যাংক, ক্রায়োসংরক্ষণ। |
| **সুবিধা** | জীবেরা প্রাকৃতিক পরিবেশে থাকে, খরচ তুলনামূলকভাবে কম। | বিলুপ্তির চরম ঝুঁকিতে থাকা জীবদের দ্রুত রক্ষা করা যায়। |
১২. জাতীয় উদ্যান (National Park) ও অভয়ারণ্য (Sanctuary) -এর মধ্যে পার্থক্য কী?
- **জাতীয় উদ্যান:** এখানে জীব ও প্রাকৃতিক পরিবেশ উভয়েরই সামগ্রিক সংরক্ষণ করা হয়। মানুষের প্রবেশ ও বন্যপ্রাণীর শিকার **সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ**।
- **অভয়ারণ্য:** এখানে মূলত একটি বা কয়েকটি বিশেষ বিপন্ন প্রজাতির সংরক্ষণের ওপর জোর দেওয়া হয়। শর্তসাপেক্ষে কিছু মানবিক কার্যকলাপ (যেমন – কাঠ সংগ্রহ, গবাদি পশু চরানো) **অনুমোদিত** হতে পারে।
১৩. পশ্চিমবঙ্গে অবস্থিত দুটি সংরক্ষিত বনাঞ্চলের নাম লেখো।
- সুন্দরবন জাতীয় উদ্যান (বাঘ ও ম্যানগ্রোভের জন্য বিখ্যাত)।
- জলদাপাড়া জাতীয় উদ্যান (একশৃঙ্গ গণ্ডারের জন্য বিখ্যাত)।
১৪. উদ্ভিদ সংরক্ষণ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার জন্য দুটি গুরুত্বপূর্ণ কাজের নাম লেখো।
- **বৃক্ষরোপণ:** ব্যাপকভাবে গাছ লাগানো (সামাজিক বনসৃজন)।
- **আইন প্রণয়ন:** বন্যপ্রাণী শিকার ও বন ধ্বংসের বিরুদ্ধে কঠোর আইন তৈরি করা।
- **সচেতনতা বৃদ্ধি:** পরিবেশ রক্ষার বিষয়ে সাধারণ মানুষকে সচেতন করা।