বিষয়: পরিবেশ গঠনে পদার্থের ভূমিকা (সপ্তম শ্রেণি)
অধ্যায় ৪ (নোটস)
১. পরিবেশের উপাদান ও তাদের উৎস
১. পরিবেশের প্রধান জড় উপাদানগুলি কী কী?
পরিবেশের প্রধান জড় উপাদানগুলি হলো: **জল ($H_2O$)**, **বায়ু** এবং **মাটি**।
২. বায়ু কী কী প্রধান গ্যাস নিয়ে গঠিত?
বায়ু মূলত তিনটি গ্যাস নিয়ে গঠিত:
- **নাইট্রোজেন ($N_2$):** প্রায় ৭৮% (সবচেয়ে বেশি)।
- **অক্সিজেন ($O_2$):** প্রায় ২১%।
- **কার্বন ডাইঅক্সাইড ($CO_2$)** ও অন্যান্য গ্যাস: প্রায় ১%।
৩. জলচক্র (Water Cycle) কাকে বলে?
যে প্রক্রিয়ায় পৃথিবী পৃষ্ঠের জল বাষ্পীভূত হয়ে বায়ুমণ্ডলে যায়, সেখানে ঘনীভূত হয়ে মেঘ তৈরি করে এবং পুনরায় বৃষ্টি বা বরফ রূপে পৃথিবীতে ফিরে আসে, তাকে **জলচক্র** বলে। এই চক্রের মাধ্যমেই প্রকৃতিতে জলের ভারসাম্য বজায় থাকে।
চিত্র: জলচক্র।
৪. মাটি কী কী উপাদান নিয়ে গঠিত?
মাটি প্রধানত নিম্নলিখিত উপাদানগুলি নিয়ে গঠিত:
- খনিজ কণা: বালি, পলি, কাদা (প্রধান অংশ)।
- জৈব পদার্থ: মৃত উদ্ভিদ ও প্রাণীর দেহাবশেষ (হিউমাস)।
- জল ও বায়ু।
৫. হিউমাস (Humus) কী? এর গুরুত্ব কী?
মাটিতে থাকা মৃত উদ্ভিদ ও প্রাণীর দেহাবশেষ বিয়োজকদের মাধ্যমে আংশিক বিয়োজিত হয়ে যে কালচে রঙের জটিল জৈব পদার্থ তৈরি করে, তাকে **হিউমাস** বলে।
গুরুত্ব: হিউমাস মাটির উর্বরতা ও জলধারণ ক্ষমতা বাড়ায়।
২. জীবনের জন্য জলের গুরুত্ব
৬. জীবনের জন্য জলের দুটি প্রধান কাজ লেখো।
- জল ছাড়া কোনো জৈব রাসায়নিক বিক্রিয়া সম্ভব নয়। এটি সব জৈবনিক প্রক্রিয়ার মাধ্যম হিসেবে কাজ করে।
- জল উদ্ভিদ ও প্রাণীর দেহের উষ্ণতা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে।
- উদ্ভিদেরা মূলের মাধ্যমে জল শোষণ করে এবং সালোকসংশ্লেষে জল ব্যবহার করে।
৭. দূষিত জল থেকে ছড়ায় এমন দুটি রোগের নাম লেখো।
কলেরা এবং টাইফয়েড।
৮. জলের স্থায়ী ও অস্থায়ী ক্ষরতা (Hardness) কাকে বলে?
জলে দ্রবীভূত থাকা কিছু খনিজ লবণের উপস্থিতির কারণে জল ফেনা সৃষ্টিতে বাধা দেয় বা ফেনা তৈরি করে না। এই ধর্মকে জলের ক্ষরতা বলে।
- **অস্থায়ী ক্ষরতা:** জলের মধ্যে ক্যালসিয়াম বাইকার্বনেট [$Ca(HCO_3)_2$] এবং ম্যাগনেসিয়াম বাইকার্বনেট [$Mg(HCO_3)_2$] দ্রবীভূত থাকলে অস্থায়ী ক্ষরতা দেখা যায়। জল ফোটালে এই ক্ষরতা দূর হয়।
- **স্থায়ী ক্ষরতা:** জলের মধ্যে ক্যালসিয়াম বা ম্যাগনেসিয়ামের ক্লোরাইড ($CaCl_2$) ও সালফেট ($MgSO_4$) দ্রবীভূত থাকলে স্থায়ী ক্ষরতা দেখা যায়। শুধু জল ফোটালে এই ক্ষরতা দূর হয় না।
৯. ক্ষর জল ব্যবহার করলে কী কী অসুবিধা হয়?
- ক্ষর জল সাবানের সঙ্গে সহজে ফেনা তৈরি করে না, ফলে পরিষ্কার করতে বেশি সাবান লাগে।
- কলকারখানা ও বয়লারে ব্যবহারের ফলে জলের ক্ষারকীয় পদার্থগুলি পাইপের গায়ে জমাট বেঁধে পাইপ নষ্ট করে দেয়।
১০. জল দূষণ (Water Pollution) কাকে বলে?
স্বাভাবিক জলের ভৌত, রাসায়নিক বা জৈবিক বৈশিষ্ট্যের যে অবাঞ্ছিত পরিবর্তন জীবের ব্যবহারের পক্ষে ক্ষতিকারক হয়, তাকে জল দূষণ বলে।
১১. জল দূষণের দুটি কারণ লেখো।
- কলকারখানার রাসায়নিক বর্জ্য (যেমন – সিসা, পারদ, ক্যাডমিয়াম) জলে মেশা।
- কৃষিজমি থেকে সার ও কীটনাশক (DDT) বৃষ্টির জলে ধুয়ে জলাশয়ে মেশা।
- শহরের নর্দমা ও পয়ঃপ্রণালীর আবর্জনা সরাসরি জলাশয়ে মেশা।
১২. জল দূষণের দুটি ক্ষতিকারক প্রভাব লেখো।
- কলেরা, টাইফয়েড, আমাশয়, হেপাটাইটিস-এর মতো জলবাহিত রোগের সংক্রমণ বৃদ্ধি।
- জলজ প্রাণীর (মাছ) মৃত্যু এবং বাস্তুতন্ত্রের ক্ষতি।
৩. পরিবেশ রক্ষায় পদার্থের ভূমিকা
১৩. পরিবেশে CO₂ এর ভূমিকা কী?
- **উপকারিতা:** সবুজ উদ্ভিদ সালোকসংশ্লেষের জন্য CO₂ ব্যবহার করে। বায়ুমণ্ডলে CO₂ একটি গ্রিনহাউস গ্যাস হিসেবে পৃথিবীর উষ্ণতা নিয়ন্ত্রণ করে।
- **অপকারিতা:** বায়ুমণ্ডলে এর অতিরিক্ত পরিমাণ বিশ্ব উষ্ণায়ন ঘটায়। জলে দ্রবীভূত CO₂ অ্যাসিড বৃষ্টি তৈরি করতে সাহায্য করে।
১৪. পরিবেশে O₂ এর ভূমিকা কী?
O₂ জীবজগতের শ্বসন কার্যের জন্য অত্যাবশ্যক। এটি ছাড়া কোনো জীবই বাঁচতে পারে না। এছাড়া, দহন (Combustion) প্রক্রিয়ার জন্যও অক্সিজেন অপরিহার্য।
১৫. পরিবেশে নাইট্রোজেন ($N_2$) এর ভূমিকা কী?
বায়ুতে নাইট্রোজেনের পরিমাণ সবচেয়ে বেশি (৭৮%)। এটি দহনে সাহায্য করে না এবং সরাসরি জীবেরা ব্যবহার করতে পারে না। তবে **নাইট্রোজেন সংবন্ধন** প্রক্রিয়ায় এটি নাইট্রেট যৌগে পরিণত হয়ে উদ্ভিদের প্রোটিন তৈরিতে সাহায্য করে।
১৬. ওজন স্তর (Ozone Layer) কীভাবে পরিবেশকে রক্ষা করে?
ওজোন স্তর বায়ুমণ্ডলের স্ট্র্যাটোস্ফিয়ারে (২৫-৩০ কিমি উপরে) অবস্থিত। এটি সূর্য থেকে আসা **ক্ষতিকারক অতিবেগুনি (UV) রশ্মি** শোষণ করে। ওজোন স্তর না থাকলে UV রশ্মি সরাসরি পৃথিবীতে চলে আসত, যার ফলে মানুষের ত্বকের ক্যানসার, চোখের ক্ষতি এবং উদ্ভিদের ক্ষতি হতো।
১৭. বর্জ্য পদার্থ (Waste Materials) কাকে বলে?
মানুষ বা অন্যান্য জীবের দৈনন্দিন কাজ, শিল্প বা কৃষি কাজ থেকে উৎপন্ন যে সব অপ্রয়োজনীয় পদার্থ পরিবেশে ফেলে দেওয়া হয় এবং যা পরিবেশের দূষণ ঘটায়, তাদের বর্জ্য পদার্থ বলে।
১৮. জীব-বিশ্লেষ্য (Biodegradable) ও জীব-অবিশ্লেষ্য (Non-biodegradable) বর্জ্যের পার্থক্য লেখো।
| বৈশিষ্ট্য | জীব-বিশ্লেষ্য বর্জ্য | জীব-অবিশ্লেষ্য বর্জ্য |
|---|---|---|
| সংজ্ঞা | যা অণুজীব দ্বারা বিয়োজিত হয়। | যা অণুজীব দ্বারা সহজে বিয়োজিত হয় না। |
| পরিবেশে প্রভাব | মাটিতে মিশে যায়, পরিবেশ দূষণ কম হয়। | দীর্ঘকাল পরিবেশে থেকে যায়, মারাত্মক দূষণ ঘটায়। |
| উদাহরণ | শাক-সবজির খোসা, কাগজ, পচনশীল খাদ্য। | প্লাস্টিক, পলিথিন, কাঁচ, ধাতব বর্জ্য, DDT। |
১৯. পরিবেশ সুরক্ষার জন্য বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ‘3R’ নীতিটি লেখো।
পরিবেশ সুরক্ষার জন্য বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ‘3R’ নীতিটি হলো:
- **Reduce (কম ব্যবহার):** বর্জ্য উৎপাদন কমাতে হবে (যেমন – একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক কম ব্যবহার করা)।
- **Reuse (পুনরায় ব্যবহার):** জিনিস বাতিল না করে পুনরায় ব্যবহার করা (যেমন – পুরোনো জামাকাপড় অন্য কাজে ব্যবহার)।
- **Recycle (পুনর্নবীকরণ):** বাতিল বস্তুকে প্রক্রিয়াকরণের মাধ্যমে নতুন জিনিস তৈরি করা (যেমন – পুরোনো কাঁচ বা প্লাস্টিক গলিয়ে নতুন বস্তু তৈরি)।