বিষয়: ভৌত পরিবেশ (সপ্তম শ্রেণি)
অধ্যায় ১(iii): চুম্বক (নোটস)
১. চুম্বকের সাধারণ ধর্ম
১. চুম্বক কী? চুম্বক কয় প্রকার ও কী কী?
চুম্বক হলো এমন একটি বস্তু যা লৌহ বা লৌহজাতীয় পদার্থকে (যেমন লোহা, নিকেল, কোবাল্ট) আকর্ষণ করে এবং স্বাধীনভাবে ঝোলানো অবস্থায় সর্বদা উত্তর-দক্ষিণ দিক নির্দেশ করে।
চুম্বক প্রধানত দুই প্রকার: **প্রাকৃতিক চুম্বক** (যেমন – ম্যাগনেটাইট পাথর) এবং **কৃত্রিম চুম্বক** (মানুষের তৈরি, যেমন – দণ্ড চুম্বক, অশ্বক্ষুরাকৃতি চুম্বক)।
২. চৌম্বক পদার্থ (Magnetic Substance) ও অচৌম্বক পদার্থ (Non-magnetic Substance) কাকে বলে?
- চৌম্বক পদার্থ: যে পদার্থগুলিকে চুম্বক আকর্ষণ করে এবং যাদের চুম্বকে পরিণত করা যায়। (যেমন – লোহা, নিকেল, কোবাল্ট, ইস্পাত)।
- অচৌম্বক পদার্থ: যে পদার্থগুলিকে চুম্বক আকর্ষণ করে না। (যেমন – কাঠ, প্লাস্টিক, কাগজ, তামা)।
৩. চুম্বকের দিক-নির্দেশক ধর্ম (Directive Property) কাকে বলে?
একটি চুম্বককে সুতোয় বেঁধে বা তরলে ভাসিয়ে স্বাধীনভাবে ঝোলানো বা স্থাপন করলে তা সর্বদা পৃথিবীর **উত্তর-দক্ষিণ** দিক বরাবর স্থির হয়ে থাকে। চুম্বকের এই ধর্মকে দিক-নির্দেশক ধর্ম বলে।
৪. চুম্বকের মেরু (Magnetic Pole) কাকে বলে?
চুম্বকের যে দুটি অঞ্চলে চুম্বকের আকর্ষণ ক্ষমতা **সবচেয়ে বেশি** থাকে, সেই দুই অঞ্চলকে চুম্বকের মেরু বলে। যে মেরু উত্তর দিকে মুখ করে থাকে, তাকে **উত্তর মেরু (N)** এবং যেটি দক্ষিণ দিকে মুখ করে থাকে, তাকে **দক্ষিণ মেরু (S)** বলে।
৫. চুম্বকের উদাসীন অঞ্চল (Neutral Region) কী?
চুম্বকের ঠিক মাঝখানে যে অঞ্চলে চুম্বকের আকর্ষণ ক্ষমতা **প্রায় নেই** বললেই চলে, সেই অঞ্চলকে উদাসীন অঞ্চল বলে।
চিত্র: দণ্ড চুম্বকের মেরু ও উদাসীন অঞ্চল।
২. চুম্বকের পারস্পরিক ক্রিয়া
৬. আকর্ষণ (Attraction) ও বিকর্ষণ (Repulsion) ধর্ম ব্যাখ্যা করো।
- **সমমেরু (Like Poles) বিকর্ষণ:** চুম্বকের সমজাতীয় মেরু (N-N বা S-S) পরস্পরকে **বিকর্ষণ** করে (দূরে ঠেলে দেয়)।
- **বিপরীত মেরু (Unlike Poles) আকর্ষণ:** চুম্বকের বিপরীত জাতীয় মেরু (N-S বা S-N) পরস্পরকে **আকর্ষণ** করে (কাছে টানে)।
৭. চুম্বকের আকর্ষণের চেয়ে বিকর্ষণ কেন বেশি নির্ভরযোগ্য?
আকর্ষণ ঘটে দুটি ক্ষেত্রে: ১) দুটি বিপরীত মেরুর মধ্যে এবং ২) একটি চুম্বক ও একটি চৌম্বক পদার্থের মধ্যে। পক্ষান্তরে, বিকর্ষণ ঘটে শুধুমাত্র দুটি **সমমেরুর** মধ্যে।
তাই কোনো বস্তু চুম্বক কিনা তা নিশ্চিতভাবে জানতে **বিকর্ষণ** পরীক্ষাটিই বেশি নির্ভরযোগ্য, কারণ বিকর্ষণ প্রমাণ করে যে বস্তুটি নিশ্চিতভাবেই চুম্বক (এবং মেরু সমজাতীয়)।
৮. চৌম্বক আবেশ (Magnetic Induction) কাকে বলে?
একটি চুম্বকের প্রভাবে কোনো চৌম্বক পদার্থে (যেমন লোহা) সাময়িকভাবে চুম্বকত্ব সৃষ্টি হওয়ার ঘটনাকে চৌম্বক আবেশ বলে।
৯. “আকর্ষণের পূর্বে আবেশ হয়” – ব্যাখ্যা করো।
একটি চুম্বক যখন কোনো চৌম্বক পদার্থকে (যেমন লোহার পেরেক) আকর্ষণ করে, তখন চুম্বকটি প্রথমে চৌম্বক আবেশের মাধ্যমে পেরেকটিতে **বিপরীত মেরুর** সৃষ্টি করে। এরপর এই বিপরীত মেরুর মধ্যে আকর্ষণ বলের সৃষ্টি হয়। তাই আকর্ষণ ঘটার আগে আবেশ ক্রিয়াটি ঘটে।
১০. চুম্বকের একক মেরুর অস্তিত্ব নেই – ব্যাখ্যা করো।
একটি দণ্ড চুম্বককে মাঝখান থেকে ভেঙে দিলেও তার উত্তর মেরু (N) ও দক্ষিণ মেরু (S) আলাদা হয়ে যায় না। বরং প্রতিটি ভাঙা টুকরোর নতুন প্রান্তে আবার বিপরীত মেরু সৃষ্টি হয়ে ছোটো ছোটো নতুন চুম্বক তৈরি হয়। এটি প্রমাণ করে যে, চুম্বকের **দুটি বিপরীত মেরু সর্বদা একসঙ্গে** অবস্থান করে; একক মেরুর অস্তিত্ব সম্ভব নয়।
৩. পৃথিবী ও তড়িৎ-চুম্বক
১১. পৃথিবী কি একটি চুম্বক?
হ্যাঁ, পৃথিবী নিজেই একটি বিশাল চুম্বক হিসেবে কাজ করে। এর প্রধান প্রমাণ হলো, একটি স্বাধীনভাবে ঝোলানো চুম্বক সব সময় উত্তর-দক্ষিণ দিক নির্দেশ করে।
চিত্র: পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্র।
১২. তড়িৎ-চুম্বক (Electromagnet) কাকে বলে?
কোনো চৌম্বক পদার্থের (যেমন নরম লোহা) ওপর অন্তরিত তার পেঁচিয়ে ওই তারের মধ্য দিয়ে তড়িৎ প্রবাহ পাঠালে বস্তুটি সাময়িকভাবে চুম্বকে পরিণত হয়। এই ধরনের চুম্বককে তড়িৎ-চুম্বক বলে। তড়িৎ প্রবাহ বন্ধ করলে এর চুম্বকত্ব চলে যায়।
১৩. তড়িৎ-চুম্বকের শক্তি কীভাবে বাড়ানো যায়?
তড়িৎ-চুম্বকের শক্তি দুটি উপায়ে বাড়ানো যায়:
- কুণ্ডলীতে তারের **পাক সংখ্যা** বাড়িয়ে।
- কুণ্ডলীতে **তড়িৎ প্রবাহের পরিমাণ** (ব্যাটারির সংখ্যা) বাড়িয়ে।
১৪. তড়িৎ-চুম্বকের দুটি ব্যবহার লেখো।
- ইলেকট্রিক কলিং বেল (Electric Calling Bell)।
- ইলেকট্রিক ক্রেন (ভারী লোহার বস্তু তুলতে)।
- লাউড স্পিকার (Loud Speaker) এবং টেলিফোন।
১৫. চুম্বক বা তড়িৎ-চুম্বক ব্যবহৃত হয় এমন কয়েকটি জিনিসের নাম লেখো।
নৌকম্পাস, ATM কার্ড, ক্রেডিট কার্ড, কম্পিউটারের হার্ডডিস্ক, ইলেকট্রিক মিটার, ফ্রিজের দরজা, ইলেকট্রিক মোটর, ইলেকট্রিক কলিং বেল।
১৬. জীবদেহে ভূ-চৌম্বক ক্ষেত্রের প্রভাব কী?
পরিযায়ী পাখিরা (Migratory Birds) এবং কিছু কচ্ছপ পৃথিবীর **ভূ-চৌম্বক ক্ষেত্র** অনুসরণ করে তাদের গন্তব্যে পৌঁছায়। পায়রার মাথায় ম্যাগনেটাইট নামক চৌম্বকীয় পদার্থ থাকার প্রমাণ পাওয়া গেছে, যা দিক নির্ণয়ে সাহায্য করে।