বিষয়: ভৌত পরিবেশ (সপ্তম শ্রেণি)
অধ্যায় ১(ii): আলো (নোটস)
১. আলোর সাধারণ ধর্ম ও গতি
১. স্বপ্রভ বস্তু (Luminous Object) ও অপ্রভ বস্তু (Non-luminous Object) কাকে বলে?
- স্বপ্রভ বস্তু: যে বস্তুগুলির নিজস্ব আলো আছে বা যারা আলো নির্গত করে, তাদের স্বপ্রভ বস্তু বলে। (যেমন – সূর্য, তারা, জোনাকি, জ্বলন্ত মোমবাতি)।
- অপ্রভ বস্তু: যে বস্তুগুলির নিজস্ব আলো নেই, তাদের অপ্রভ বস্তু বলে। এদের উপর আলো পড়লে তা প্রতিফলিত হয়। (যেমন – ইট, কাঠ, চাঁদ, বই)।
২. স্বচ্ছ, অস্বচ্ছ ও ঈষৎ স্বচ্ছ মাধ্যম কাকে বলে?
- স্বচ্ছ মাধ্যম: যে মাধ্যমের মধ্যে দিয়ে আলো সহজেই যাতায়াত করতে পারে। (যেমন – বায়ু, কাচ, জল)।
- অস্বচ্ছ মাধ্যম: যে মাধ্যমের মধ্যে দিয়ে আলো একেবারেই চলাচল করতে পারে না। (যেমন – কাঠ, দেয়াল, লোহা)।
- ঈষৎ স্বচ্ছ মাধ্যম: যে মাধ্যমের মধ্যে দিয়ে আলো আংশিকভাবে যাতায়াত করতে পারে বা হালকাভাবে যায়। (যেমন – ঘষা কাচ, কুয়াশা, ট্রেসিং পেপার)।
৩. আলোর সরলরৈখিক গতি কাকে বলে? এর একটি পরীক্ষা লেখো।
আলো সর্বদা একটি সরলরেখা বরাবর চলাচল করে। এটি আলোর একটি মৌলিক ধর্ম।
পরীক্ষা: একটি সোজা পাইপের মধ্য দিয়ে কোনো বস্তুর শিখা দেখা গেলেও, বাঁকা পাইপের মধ্য দিয়ে তা দেখা যায় না। এর কারণ হলো, আলো সরলরেখা ধরে চলে বলেই বাঁকা পথে যেতে পারে না।
৪. আলোক রশ্মি (Ray of Light) ও আলোক রশ্মিগুচ্ছ (Beam of Light) কী?
- আলোক রশ্মি: আলোর চলার পথকে তীর চিহ্ন যুক্ত যে কাল্পনিক সরলরেখা দিয়ে বোঝানো হয়, তাকে আলোক রশ্মি বলে।
- আলোক রশ্মিগুচ্ছ: একসঙ্গে অসংখ্য আলোক রশ্মিকে আলোক রশ্মিগুচ্ছ বলে। এটি তিন প্রকারের হতে পারে: সমান্তরাল, অপসারী বা অভিসারী।
২. ছায়া ও সূচিছিদ্র ক্যামেরা
৫. প্রচ্ছায়া (Umbra) ও উপচ্ছায়া (Penumbra) কী?
আলোর পথে কোনো অস্বচ্ছ বস্তু থাকলে তার পেছনে ছায়া গঠিত হয়।
- প্রচ্ছায়া: ছায়ার যে অংশটি **সম্পূর্ণ অন্ধকার** থাকে, যেখানে আলোক উৎসের কোনো অংশ থেকেই আলো পৌঁছায় না, তাকে প্রচ্ছায়া বলে। এটি গাঢ় অন্ধকার অংশ।
- উপচ্ছায়া: ছায়ার যে অংশটি **আবছা অন্ধকার** থাকে, যেখানে আলোক উৎসের কিছু অংশ থেকে আলো পৌঁছায়, তাকে উপচ্ছায়া বলে। এটি প্রচ্ছায়াকে ঘিরে থাকে।
আলোক উৎস বড়ো হলে প্রচ্ছায়া ও উপচ্ছায়া উভয়ই গঠিত হয়। বিন্দু উৎসের ক্ষেত্রে সাধারণত শুধু প্রচ্ছায়া গঠিত হয়।
৬. সূচিছিদ্র ক্যামেরা (Pin-hole Camera) কীভাবে কাজ করে?
একটি বাক্স বা কার্ডবোর্ডের এক পাশে ছোটো ছিদ্র এবং অন্য পাশে একটি পর্দা (যেমন – ট্রেসিং পেপার) রেখে সূচিছিদ্র ক্যামেরা তৈরি করা হয়।
কার্যনীতি: আলো সরলরেখায় চলে। বস্তুর প্রতিটি বিন্দু থেকে আলোকরশ্মি ছিদ্র দিয়ে প্রবেশ করে এবং সরলরেখা ধরে চলার ফলে পর্দার উপর বস্তুর একটি **উলটো (অবশীর্ষ)** ও **ছোটো (বা বড়ো)** প্রতিকৃতি (ছবি) তৈরি করে।
চিত্র: সূচিছিদ্র ক্যামেরায় অবশীর্ষ (উলটো) প্রতিকৃতি গঠন।
৭. ছায়ার দৈর্ঘ্য কখন সবচেয়ে বড়ো ও কখন সবচেয়ে ছোটো হয়?
- ছায়ার দৈর্ঘ্য **সবচেয়ে বড়ো** হয়: সূর্য যখন **সকাল বা সন্ধ্যায়** দিগন্তের কাছে থাকে।
- ছায়ার দৈর্ঘ্য **সবচেয়ে ছোটো** হয়: সূর্য যখন **মাথার ঠিক উপরে** (দুপুরবেলা) থাকে।
৩. আলোর প্রতিফলন ও প্রতিবিম্ব
৮. আলোর প্রতিফলন (Reflection of Light) কাকে বলে?
আলোক রশ্মি কোনো মাধ্যমে যেতে যেতে যখন অন্য একটি মাধ্যমের বিভেদতলে আপতিত হয়, তখন আলোর কিছু অংশ পুনরায় প্রথম মাধ্যমে ফিরে আসে। এই ঘটনাকে আলোর প্রতিফলন বলে।
৯. প্রতিফলনের দুটি সূত্র কী কী?
- প্রথম সূত্র: আপতিত রশ্মি, প্রতিফলিত রশ্মি এবং প্রতিফলকের উপর আপতন বিন্দুতে আঁকা অভিলম্ব সর্বদা **একই সমতলে** থাকে।
- দ্বিতীয় সূত্র: আপতন কোণ ($i$) ও প্রতিফলন কোণ ($r$) সর্বদা **সমান** হয়। ($\angle i = \angle r$)
১০. নিয়মিত প্রতিফলন (Regular Reflection) ও বিক্ষিপ্ত প্রতিফলন (Diffused Reflection) কাকে বলে?
- নিয়মিত প্রতিফলন: মসৃণ তলে (যেমন – আয়না) আলোর প্রতিফলনকে নিয়মিত প্রতিফলন বলে। এখানে সমান্তরাল রশ্মি প্রতিফলনের পরেও সমান্তরাল থাকে।
- বিক্ষিপ্ত প্রতিফলন: অমসৃণ তলে (যেমন – ঘরের দেয়াল, সিনেমার পর্দা) আলোর প্রতিফলনকে বিক্ষিপ্ত প্রতিফলন বলে। এখানে সমান্তরাল রশ্মি প্রতিফলনের পরে বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে পড়ে।
১১. সমতল আয়নায় গঠিত প্রতিবিম্বের বৈশিষ্ট্যগুলি লেখো।
- **অসদ প্রতিবিম্ব:** প্রতিবিম্বকে পর্দায় ফেলা যায় না।
- **সমশীর্ষ:** প্রতিবিম্বটি উলটো না হয়ে সোজা হয়। (উপরের অংশ উপরে, নীচের অংশ নীচে)।
- **পার্শ্ব পরিবর্তন:** প্রতিবিম্বের ডান দিক বাম দিক এবং বাম দিক ডান দিক বলে মনে হয়।
- **সমান মাপ:** প্রতিবিম্বের মাপ বস্তুর মাপের সমান হয়।
- **দূরত্ব:** আয়না থেকে বস্তুর দূরত্ব ও আয়না থেকে প্রতিবিম্বের দূরত্ব সমান হয়।
১২. অ্যাম্বুলেন্স (AMBULANCE) শব্দটি উলটো করে লেখা থাকে কেন?
সমতল আয়নায় গঠিত প্রতিবিম্বে পার্শ্ব পরিবর্তন ঘটে। তাই অ্যাম্বুলেন্স শব্দটি উলটো করে লেখা থাকলে, তার সামনের গাড়ির চালক তার রিয়ার ভিউ মিররে (Rear View Mirror) শব্দটি **সঠিকভাবে সোজা** দেখতে পান এবং অ্যাম্বুলেন্সকে দ্রুত রাস্তা ছেড়ে দিতে পারেন।
১৩. পেরিস্কোপ (Periscope) ও ক্যালাইডোস্কোপ (Kaleidoscope) কোন নীতির উপর ভিত্তি করে কাজ করে?
উভয় যন্ত্রই আলোর **প্রতিফলন** নীতির উপর ভিত্তি করে কাজ করে।
৪. আলোর প্রতিসরণ (Refraction) ও বিচ্ছুরণ (Dispersion)
১৪. আলোর প্রতিসরণ কাকে বলে?
আলোকরশ্মি এক স্বচ্ছ মাধ্যম থেকে অন্য স্বচ্ছ মাধ্যমে তির্যকভাবে প্রবেশ করার সময় দুই মাধ্যমের বিভেদতলে আলোর গতিপথের পরিবর্তন ঘটে (আলো বেঁকে যায়)। এই ঘটনাকে আলোর প্রতিসরণ বলে।
১৫. প্রতিসরণের ফলে ঘটা দুটি ঘটনার উদাহরণ দাও।
- জলের মধ্যে আংশিক ডোবানো কাঠিকে বাঁকা মনে হওয়া।
- খালি বালতিতে জল ঢালার পর বালতির তলদেশকে কিছুটা ওপরে উঠে এসেছে বলে মনে হওয়া।
১৬. আলো যখন ঘন মাধ্যম থেকে লঘু মাধ্যমে যায়, তখন প্রতিসৃত রশ্মি কী করে?
প্রতিসৃত রশ্মি অভিলম্ব থেকে দূরে সরে যায়।
১৭. বিচ্ছুরণ (Dispersion) কাকে বলে?
সূর্যের সাদা আলো প্রিজমের মধ্য দিয়ে যাওয়ার সময় তার উপাদান বর্ণগুলিতে (যেমন – বেগুনি, নীল, সবুজ, হলুদ, কমলা, লাল) ভেঙে যায়। যৌগিক আলো থেকে তার উপাদান বর্ণগুলির আলাদা হয়ে যাওয়ার ঘটনাকে বিচ্ছুরণ বলে।
১৮. বর্ণালি (Spectrum) কাকে বলে?
বিচ্ছুরণের ফলে আলোর যে সাতটি উপাদান বর্ণ একটি পটির আকারে পাওয়া যায়, তাকে বর্ণালি বলে। বর্ণালির ক্রম হলো **VIBGYOR** (বেগুনি থেকে লাল)।
১৯. রংধনু (Rainbow) কেন গঠিত হয়?
বৃষ্টির পর বায়ুমণ্ডলে ভাসমান জলকণাগুলির মধ্য দিয়ে সূর্যের সাদা আলো যাওয়ার সময় আলোকরশ্মির **প্রতিসরণ, প্রতিফলন এবং বিচ্ছুরণ** ঘটে। এর ফলেই আকাশে রংধনু গঠিত হয়।
২০. অতিবেগুনি (UV) রশ্মি কী? এর ক্ষতিকারক প্রভাব কী?
অতিবেগুনি রশ্মি হলো এক প্রকার অদৃশ্য আলো, যা দৃশ্যমান আলোর চেয়ে বেশি শক্তি বহন করে।
ক্ষতিকারক প্রভাব: এটি জীবন্ত কোশের পক্ষে অত্যন্ত ক্ষতিকারক। এর প্রভাবে মানুষের ত্বকের ক্যানসার, চোখের লেন্সের ক্ষতি এবং উদ্ভিদের ডিএনএ-এর ক্ষতি হতে পারে।
২১. ওজোন স্তর অতিবেগুনি রশ্মির হাত থেকে জীবজগতকে রক্ষা করে কীভাবে?
ওজোন স্তর সূর্যের আলো থেকে আসা অতিবেগুনি রশ্মিকে **শোষণ** করে নেয়, ফলে ক্ষতিকারক রশ্মি পৃথিবীতে পৌঁছাতে পারে না।