অধ্যায় ৭: আবহাওয়া ও জলবায়ু (নোটস)
১. আবহাওয়া (Weather)
আবহাওয়া বলতে কোনো একটি নির্দিষ্ট স্থানের নির্দিষ্ট সময়ের বায়ুর উষ্ণতা, বায়ুর আর্দ্রতা, বায়ুচাপ, বায়ুপ্রবাহ, মেঘাচ্ছন্নতা-এর অবস্থাকে বোঝায়।
‘গরম, ঠান্ডা, মেঘলা, বৃষ্টি, রোদ ঝলমলে’- শব্দগুলো আমাদের চারপাশের বায়ুমণ্ডলের একটা বিশেষ অবস্থাকে বোঝায়। দিনের বিভিন্ন সময়ে আবহাওয়া বদলাতে পারে। আবার কখনও অল্প সময়ের মধ্যেও আবহাওয়া বদলে যেতে পারে।
২. জলবায়ু (Climate)
কোনো অঞ্চলের প্রায় ৩০ থেকে ৪০ বছরের আবহাওয়ার গড় অবস্থা হলো ওই অঞ্চলের জলবায়ু। কোনো অঞ্চলের জলবায়ু বছরের পর বছর প্রায় একইরকম থাকে। যেমন পশ্চিমবঙ্গের জলবায়ু ক্রান্তীয় মৌসুমি প্রকৃতির।
আবহাওয়া ও জলবায়ুর পার্থক্য
| বৈশিষ্ট্য | আবহাওয়া | জলবায়ু |
|---|---|---|
| সংজ্ঞা | আবহাওয়া কোনো নির্দিষ্ট স্থানের নির্দিষ্ট সময়ের বায়ুমণ্ডলের বিভিন্ন উপাদানের অবস্থা। | জলবায়ু হলো কোনো অঞ্চলের ৩০-৪০ বছরের আবহাওয়ার গড় অবস্থা। |
| পরিবর্তন | আবহাওয়া প্রতিদিন এমন কী প্রতি মুহূর্তে বদলায়। | জলবায়ু প্রতিদিন বদলায় না। |
| পরিসর | আবহাওয়া স্বল্প পরিসরে পরিবর্তিত হয়। | জলবায়ু বিস্তৃত অঞ্চলভেদে পরিবর্তিত হয়। |
৩. আবহাওয়া ও জলবায়ুর প্রধান উপাদান
ক) বায়ুর উষ্ণতা (Temperature)
আগত সৌর বিকিরণ (Insolation): সূর্যরশ্মির ২০০ কোটি ভাগের ১ ভাগ মাত্র পৃথিবীতে এসে পৌঁছায়। একে ‘আগত সৌর বিকিরণ’ বলে।
- কার্যকরী সৌর বিকিরণ: আগত সৌর বিকিরণের মাত্র ৫১ শতাংশ ভূ-পৃষ্ঠকে উত্তপ্ত করে।
- অ্যালবেডো (Albedo): আগত সৌর বিকিরণের প্রায় ৩৫ শতাংশ মেঘ, ধূলিকণা দ্বারা প্রতিফলিত হয়ে মহাশূন্যে ফিরে যায়।
- পার্থিব বিকিরণ: যে ৫১ শতাংশ তাপ পৃথিবীপৃষ্ঠে এসে পৌঁছায়, তার প্রায় পুরোটাই রাতের বেলা বিকিরিত হয়ে মহাশূন্যে ফিরে যায়।
বায়ুমণ্ডল সরাসরি সূর্যরশ্মি দ্বারা উত্তপ্ত হয় না, বরং ভূপৃষ্ঠ থেকে বিকিরিত তাপ দ্বারা প্রধানত উত্তপ্ত হয়।
তাপমাত্রা মাপার যন্ত্র: থার্মোমিটার। সিক্স-এর থার্মোমিটার দিয়ে কোনো দিনের সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন তাপমাত্রা পরিমাপ করা হয়।
দৈনিক উষ্ণতার প্রসর: কোনো স্থানের এক দিনের সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন তাপমাত্রার পার্থক্য।
খ) বায়ুর আর্দ্রতা (Humidity)
নির্দিষ্ট উষ্ণতায় নির্দিষ্ট পরিমাণ বায়ুতে যে পরিমাণ জলীয় বাষ্প থাকে, সেটাই ওই বায়ুর আর্দ্রতা। বর্ষাকালে বাতাসে জলীয়বাষ্প বেশি থাকে, তাই আবহাওয়া ভেজা ভেজা লাগে।
আর্দ্রতা মাপার যন্ত্র: হাইগ্রোমিটার।
গ) বায়ুচাপ (Air Pressure) ও বায়ুপ্রবাহ (Wind)
বায়ুর ওজন আছে, তাই বায়ু পৃথিবীর ওপর চাপ দেয়। সমুদ্র-পৃষ্ঠে বায়ুর চাপ সবথেকে বেশি। যত ওপরে ওঠা যায় বায়ুর চাপ তত কমতে থাকে।
- নিম্নচাপ: বায়ুচাপ কমে গেলে নিম্নচাপ হলে ঝড়-বৃষ্টি, অশান্ত আবহাওয়া তৈরি হয়।
- উচ্চচাপ: বায়ুচাপ বেড়ে গিয়ে উচ্চচাপ হলে পরিষ্কার আকাশ, শান্ত আবহাওয়া দেখা যায়।
- বায়ুপ্রবাহ: বায়ু সব জায়গায় চাপ সমান রাখার জন্য উচ্চচাপ অঞ্চল থেকে নিম্নচাপ অঞ্চলের দিকে প্রবাহিত হয়। ভূপৃষ্ঠের সমান্তরালে বায়ুর প্রবাহ হলো ‘বায়ুপ্রবাহ’।
বায়ুচাপ মাপার যন্ত্র: ফোর্টিন ব্যারোমিটার।
বায়ুর গতিবেগ মাপার যন্ত্র: অ্যানিমোমিটার।
বায়ুপ্রবাহের দিক মাপার যন্ত্র: বাতপতাকা।
ঘ) মেঘাচ্ছন্নতা (Cloud Cover) ও বৃষ্টিপাত (Precipitation)
মেঘাচ্ছন্নতা: আকাশে মেঘের পরিমাণের পরিমাপই হলো মেঘাচ্ছন্নতা। মেঘলা আকাশ পৃথিবীকে চাদরের মতো ঢেকে রাখে, ফলে ভূপৃষ্ঠ থেকে বিকিরিত তাপ আটকে গিয়ে রাতের বেলা গরম বেশি লাগে।
বৃষ্টিপাত: জলীয় বাষ্পযুক্ত বাতাস ওপরে উঠে ঠান্ডা হয়ে ছোটো ছোটো জলকণায় পরিণত হয় (ঘনীভবন)। এই জলকণা ধূলিকণাকে আশ্রয় করে মেঘ তৈরি করে। জলকণাগুলি পরস্পর মিশে বড়ো ও ভারী হলে অভিকর্ষের টানে বৃষ্টি রূপে ঝরে পড়ে।
বৃষ্টিপাত মাপার যন্ত্র: রেনগজ।
৪. আবহাওয়ার পূর্বাভাস (Weather Forecast)
আবহাওয়া অফিস ২৪ ঘণ্টার আবহাওয়ার বিভিন্ন উপাদান সম্বন্ধে তথ্য সংগ্রহ করে আবহাওয়া মানচিত্র তৈরি করে এবং আবহাওয়া কেমন থাকবে সেই সম্বন্ধে পূর্বাভাস জানায়। পশ্চিমবঙ্গের আবহাওয়া অফিসের সদর দপ্তর কলকাতার আলিপুরে।
৫. পৃথিবীর তাপমণ্ডল (Heat Zones)
সূর্যরশ্মির পতনকোণের ভিত্তিতে পৃথিবীকে তিনটি তাপমণ্ডল বা তাপ অঞ্চলে ভাগ করা হয়।
- উষ্ণমণ্ডল: নিরক্ষরেখার উভয় দিকে কর্কটক্রান্তি ও মকরক্রান্তি রেখার মাঝের অঞ্চল। এখানে সূর্যরশ্মি সারা বছর লম্বভাবে পড়ে, তাই উষ্ণতা সবথেকে বেশি।
- নাতিশীতোষ্ণ মণ্ডল: কর্কটক্রান্তি রেখা থেকে সুমেরু বৃত্ত এবং মকরক্রান্তি রেখা থেকে কুমেরু বৃত্তের মাঝের অঞ্চল। এখানে সূর্যরশ্মি তির্যকভাবে পড়ায় উষ্ণতা মাঝারি।
- হিমমণ্ডল: সুমেরুবৃত্ত থেকে উত্তর মেরু এবং কুমেরু বৃত্ত থেকে দক্ষিণ মেরুর মাঝের অঞ্চল। সূর্যরশ্মি সারাবছর বেশি তির্যকভাবে পড়ায় এই অঞ্চল সবচেয়ে কম উত্তপ্ত হয় এবং সারাবছর ঠান্ডা থাকে।
- উচ্চতা: ভূপৃষ্ঠ থেকে প্রতি ১০০০ মি উচ্চতায় ৬.৫° সে. হারে তাপমাত্রা কমে যায়।
- সমুদ্র থেকে দূরত্ব: সমুদ্রের কাছাকাছি জলবায়ু সমভাবাপন্ন (নাতিশীতোষ্ণ) হয়। সমুদ্র থেকে দূরে জলবায়ু চরমভাবাপন্ন (খুব গরম বা খুব ঠান্ডা) হয়।