অধ্যায় ৬: বরফে ঢাকা মহাদেশ (নোটস)
১. আন্টার্কটিকা: সাদা মহাদেশ
পৃথিবীর মানচিত্রে একেবারে দক্ষিণে সাদা রং-এর অঞ্চলটা হলো আন্টার্কটিকা মহাদেশ। ১৮২০ সালে প্রথম জানা যায় পৃথিবীর দক্ষিণ মেরুতে (কুমেরুতে) রয়েছে বরফে ঢাকা একটা বিশাল ভূখণ্ড। গ্রিক শব্দ ‘Antarktika’-র অর্থ ‘উত্তরের বিপরীত’।
- অবস্থান: দক্ষিণ মেরুবিন্দু থেকে ৬০° দক্ষিণ অক্ষরেখার মধ্যে এই মহাদেশ অবস্থিত।
- আয়তন: এটি পৃথিবীর পঞ্চম বৃহত্তম মহাদেশ (১ কোটি ৪০ লক্ষ বর্গ কিমি)।
- বৈশিষ্ট্য: এটি পৃথিবীর উচ্চতম, শীতলতম, শুষ্কতম ও দুর্গম মহাদেশ। সারাবছরই ১-২ কিমি পুরু স্থায়ী বরফের চাদরে ঢাকা থাকে বলে একে ‘সাদা মহাদেশ’ বলা হয়।
২. আন্টার্কটিকার ভূপ্রকৃতি: বরফের রাজ্য
পুরো মহাদেশটাই একটা বিশাল উঁচু মালভূমি, যার উচ্চতা ২০০০ থেকে ৫০০০ মিটার।
- প্রধান শৃঙ্গ: ‘ভিনসন ম্যাসিফ’ (৪৮৯৭ মি.) আন্টার্কটিকার সর্বোচ্চ শৃঙ্গ।
- আগ্নেয়গিরি: প্রশান্ত মহাসাগরের রস উপসাগরের তীরে ‘মাউন্ট এরেবাস’ আন্টার্কটিকার জীবন্ত আগ্নেয়গিরি।
- পর্বতমালা: ৩,৫০০ কিমি দীর্ঘ ট্রান্স আন্টার্কটিকা পর্বতশ্রেণি এই মহাদেশে অবস্থিত।
- হিমবাহ: ‘ল্যাম্বার্ট হিমবাহ’ পৃথিবীর দীর্ঘতম হিমবাহ।
৩. আবহাওয়া ও জলবায়ু
চিরস্থায়ী বরফে ঢাকা এই মহাদেশ পৃথিবীর শীতলতম অঞ্চল। সারাবছরই হিমশীতল আবহাওয়া, কনকনে ঠান্ডা বাতাস আর তুষারঝড় চলে।
- শীতকাল (মে-আগস্ট): তাপমাত্রা -৪০° সে. থেকে -৭৫° সে. পর্যন্ত নেমে যায়। রাশিয়ার গবেষণাকেন্দ্র ‘ভস্টক’-এ সর্বনিম্ন তাপমাত্রা (-৮৯.২° সে) রেকর্ড করা হয়েছে, যা পৃথিবীর শীতলতম। এই সময় ২৪ঘণ্টাই অন্ধকার থাকে এবং আকাশে মাঝে মাঝে মেরুজ্যোতি (Aurora) দেখা যায়।
- গ্রীষ্মকাল (নভেম্বর-ফেব্রুয়ারি): তাপমাত্রা কিছুটা বেড়ে -২০° সে. এ পৌঁছায়। এই সময় ২৪ ঘণ্টাই আকাশে সূর্য দেখা যায় (নিশীথ সূর্য)। কিন্তু সূর্যের আলো বাঁকাভাবে পড়ায় এবং বরফে প্রতিফলিত হয়ে ফিরে যাওয়ায় উষ্ণতা খুব বেশি বাড়তে পারে না।
৪. আন্টার্কটিকার জীবজগৎ
চিরতুষারে ঢাকা আন্টার্কটিকায় কোনো গাছপালা নেই। শুধু গ্রীষ্মকালে সমুদ্রের ধারে সামান্য বরফ গলে গেলে মস, লাইকেন, শ্যাওলা জন্মায়।
- পেঙ্গুইন: আন্টার্কটিকার একমাত্র স্থায়ী বাসিন্দা। এরা উড়তে পারে না কিন্তু ভালো সাঁতার কাটতে পারে। এম্পেরর পেঙ্গুইন সবথেকে বড়ো হয়।
- সামুদ্রিক প্রাণী: সমুদ্র চিংড়ি জাতীয় ‘ক্রিল’-এ ভর্তি। এই ক্রিল মাছ ও পেঙ্গুইনের প্রধান খাদ্য। এছাড়া প্রচুর মাছ, সামুদ্রিক পাখি, তিমি ও সীল দেখা যায়।
নরওয়ের অভিযাত্রী রোয়াল্ড আমুন্ডসেন ও তাঁর সঙ্গীরা ভয়ংকর প্রতিকূল আবহাওয়াকে উপেক্ষা করে ১৪ই ডিসেম্বর ১৯১১ সালে প্রথম পৃথিবীর দক্ষিণ মেরুতে পৌঁছান।
৫. বিজ্ঞানের মহাদেশ
এই মহাদেশ কোনো দেশের অধীন নয়। এটি পৃথিবীর সমস্ত দেশের একটা ‘আন্তর্জাতিক ভূখণ্ড’। এখানে প্রায় ৪০টি দেশের ১০০-রও বেশি গবেষণাকেন্দ্র রয়েছে।
- আন্টার্কটিকা চুক্তি (১৯৫৯): এই চুক্তি অনুসারে, যে কোনো দেশ এখানে শান্তির উদ্দেশ্যে বৈজ্ঞানিক গবেষণা করতে পারবে। কিন্তু এখানকার প্রাকৃতিক সম্পদে কোনো দেশের নিজস্ব অধিকার থাকবে না এবং সকলকেই এই অঞ্চলের জীববৈচিত্র্য ও প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষা করতে হবে।
- খনিজ সম্পদ: ভূগর্ভে কয়লা, খনিজতেল, প্রাকৃতিক গ্যাস, তামা, নিকেল, সোনার ভাণ্ডার রয়েছে।
আন্টার্কটিকায় ভারতের অভিযান
- দক্ষিণ গঙ্গোত্রী (১৯৮২): ৯ই জানুয়ারি, ১৯৮২ সালে প্রথম ভারতীয় অভিযাত্রী দল আন্টার্কটিকায় পৌঁছায় এবং ভারতের প্রথম গবেষণাকেন্দ্র ‘দক্ষিণ গঙ্গোত্রী’ স্থাপন করে।
- মৈত্রী (১৯৮৮): ‘দক্ষিণ গঙ্গোত্রী’ থেকে ৭০কিমি দূরে ‘মৈত্রী’ নামে আরও একটি গবেষণাকেন্দ্র স্থাপন করা হয়।
৬. আন্টার্কটিকার ভবিষ্যৎ
এই মহাদেশের আবহাওয়া পৃথিবীর জলবায়ুর ভারসাম্য রক্ষা করে। কিন্তু বিশ্ব উষ্ণায়ন, ওজোন স্তর ক্ষয় ও দূষণের কারণে আন্টার্কটিকার বিশুদ্ধ পরিবেশ আজ সংকটে। ক্রমাগত উষ্ণতা বাড়ার ফলে প্রতিদিন বরফ গলে যাচ্ছে, যার ফলে ক্রিল, সীল, পেঙ্গুইনের সংখ্যা কমছে এবং নষ্ট হচ্ছে আন্টার্কটিকার প্রাকৃতিক ভারসাম্য। বরফ গলে যাওয়ায় সমুদ্রের জলস্তরও বেড়ে চলেছে, যা সমগ্র পৃথিবীর জন্য বিপদজনক।