অধ্যায় ৫: জল-স্থল-বাতাস (নোটস)
১. বায়ুমণ্ডল (Atmosphere)
আমাদের মাথার ওপর ‘আকাশ’ নামের ছাদটা কত উঁচুতে আছে, কীরকম, কী দিয়ে তৈরি, কেনই বা দিনের বেলায় নীল, আর রাতের বেলা কালো হয়ে যায়… জানতে ইচ্ছে করে?
নীল আকাশটা হলো, পৃথিবীকে ঘিরে থাকা বায়ুর স্তর। বাতাসে প্রচুর ধুলোর কণা, জলের কণা ভেসে বেড়ায়। দিনের বেলা, এগুলোয় ধাক্কা খেয়ে সূর্যের আলো সাত রং-এ ভেঙে যায়। এর মধ্যে নীল রংটা সবথেকে বেশি করে আকাশজুড়ে বিচ্ছুরিত হয়। তাই আকাশকে নীল দেখায়।
পৃথিবীর গায়ে চাদরের মতো লেগে থাকা বায়ুস্তরই হলো বায়ুমণ্ডল। পৃথিবী সৃষ্টির সময়ে কিছু গ্যাস, পৃথিবীর আকর্ষণে পৃথিবীর চারদিকে আটকে পড়ে। ভূপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১০,০০০ কিমি পর্যন্ত বাতাসের অস্তিত্ব থাকলেও ৯৭ ভাগ বাতাসই আছে ভূপৃষ্ঠ থেকে প্রথম ২৭ কিমির মধ্যে।
বায়ুমণ্ডলের উপাদান:
- নাইট্রোজেন: শতকরা প্রায় ৭৮ ভাগ
- অক্সিজেন: শতকরা প্রায় ২১ ভাগ
- অন্যান্য গ্যাস: আর্গন, মিথেন, হাইড্রোজেন, হিলিয়াম, ওজোন, কার্বন ডাইঅক্সাইড, জলীয় বাষ্প (প্রায় ১ ভাগ)।
বায়ুমণ্ডলের স্তরবিন্যাস
ভূপৃষ্ঠ থেকে ওপরের দিকে বায়ুমণ্ডল কয়েকটি স্তরে বিভক্ত:
- ট্রপোস্ফিয়ার (Troposphere): ভূপৃষ্ঠ থেকে ওপরে ১৬ কিমি পর্যন্ত বিস্তৃত। এই স্তরে ধুলোর কণা, জলকণা থাকে বলে মেঘ, ঝড়, বৃষ্টি হয়। যত উঁচুতে ওঠা যায় তাপমাত্রা তত কমতে থাকে (প্রতি ১০০০ মিটারে ৬.৪° সে. হারে)।
- স্ট্র্যাটোস্ফিয়ার (Stratosphere): ট্রপোস্ফিয়ারের ওপরে, ভূপৃষ্ঠ থেকে ৫০ কিমি পর্যন্ত বিস্তৃত। এখানে বাতাস শান্ত, ধুলোর কণা বা জলকণা নেই, তাই মেঘ বা বৃষ্টি হয় না। জেটপ্লেন এই স্তর দিয়ে চলে। এই স্তরেই ওজোন গ্যাসের (Ozone Layer) স্তর আছে, যা সূর্য থেকে আসা ক্ষতিকারক অতিবেগুনি রশ্মি শোষণ করে।
- মেসোস্ফিয়ার (Mesosphere): ভূপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৮০ কিমি পর্যন্ত বিস্তৃত। এখানে উচ্চতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাপমাত্রা কমতে থাকে।
- থার্মোস্ফিয়ার (Thermosphere): ভূপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৩০০ কিমি পর্যন্ত বিস্তৃত। বাতাস প্রায় নেই। এই স্তর থেকে বেতার তরঙ্গ প্রতিফলিত হয়ে পৃথিবীতে ফিরে আসে, তাই আমরা রেডিও শুনতে পাই।
- এক্সোস্ফিয়ার (Exosphere): থার্মোস্ফিয়ারের পরে আছে এই স্তর, যা সীমাহীন মহাকাশে মিশে গেছে। কৃত্রিম উপগ্রহ, মহাকাশ স্টেশন এই স্তরে থাকে।
- বাতাস ছাড়া উদ্ভিদ বা প্রাণী কেউই বাঁচতে পারতো না।
- সূর্যাস্তের পর পৃথিবী হঠাৎ ভীষণ ঠান্ডা আর সূর্যোদয়ের পর হঠাৎ প্রবল গরম হয়ে যেত।
- মহাকাশ থেকে ছুটে আসা উল্কা বায়ুমণ্ডলের সঙ্গে ঘষা লেগে জ্বলে ছাই হয়ে যায়। বায়ুমণ্ডল না থাকলে উল্কা সরাসরি পৃথিবীতে আছড়ে পড়ত।
২. শিলামণ্ডল (Lithosphere)
প্রায় ৪৬০ কোটি বছর আগে সৃষ্টির সময়ে পৃথিবী ছিল একটা জ্বলন্ত গ্যাসীয় পিণ্ড। ক্রমে ঠান্ডা হয়ে পৃথিবীর বাইরের অংশ জমাট বেঁধে একটা কঠিন আস্তরণ তৈরি করে। পৃথিবীর সবথেকে বাইরের এই পাতলা শক্ত আস্তরণটা হলো ভূ-ত্বক (Crust)। মাঝের অংশটা গুরুমণ্ডল (Mantle) আর ভিতরে রয়েছে কেন্দ্রমণ্ডল (Core)।
ভূ-ত্বকের চারভাগের একভাগ মাত্র স্থল। স্থলভাগ মূলত শিলা আর মাটি দিয়ে তৈরি। তাই একে শিলামণ্ডল (Lithosphere) বলা হয়।
গুরুত্ব:
- উদ্ভিদ, প্রাণী, মানুষ সবারই জীবন-মৃত্যু স্থলভাগের ওপর নির্ভরশীল।
- শিলামণ্ডল থেকে আমরা বিভিন্ন দরকারি ধাতু ও খনিজ পদার্থ (লোহা, তামা, সোনা, কয়লা, খনিজতেল) পাই।
৩. বারিমণ্ডল (Hydrosphere)
সৃষ্টির বহু কোটি বছর পর পৃথিবীর বাইরেটা ঠান্ডা হয়ে এলে আকাশের জলীয় বাষ্প ঠান্ডা হয়ে অবিশ্রান্ত বৃষ্টির মতো পৃথিবীতে নেমে আসে। হাজার হাজার বছর ধরে সেই প্রবল বৃষ্টির জলে পৃথিবীর নীচু জায়গাগুলো ভরাট হয়ে সাগর মহাসাগর তৈরি হয়। পৃথিবীর এই বিশাল জল ভান্ডারের নাম বারিমণ্ডল (Hydrosphere)।
- পৃথিবীর চারভাগের তিনভাগই জল। তাই মহাকাশ থেকে পৃথিবীকে ঝলমলে নীল গোলকের মতো দেখায়। এইজন্য পৃথিবীকে ‘নীল গ্রহ’ (Blue Planet) বলা হয়।
- পৃথিবীর মোট জলের শতকরা ৯৭ ভাগই আছে সমুদ্রে (লবণাক্ত)। বাকি শতকরা ৩ ভাগ জল আছে নদী, জলাশয়, হ্রদ, হিমবাহ এবং মাটির নীচে (মিষ্টি জল)।
- জলই জীবন। জল ছাড়া পৃথিবীতে প্রাণের অস্তিত্ব সম্ভব নয়।
জলচক্র (Water Cycle)
জল কখনও মেঘ, কখনও বৃষ্টি আবার কখনও কঠিন বরফ, তুষার রূপে আকাশ আর পৃথিবীর মধ্যে ক্রমাগত আবর্তিত হয়ে চলেছে। জলের এই চক্রাকার আবর্তন হলো ‘জলচক্র’।
- সূর্যের তাপে নদ-নদী, সমুদ্র থেকে জল বাষ্প হয়ে বাতাসে মেশে (বাষ্পীভবন)।
- সেই জলীয় বাষ্প ওপরে উঠে ঠান্ডা হয়ে জলকণায় পরিণত হয় এবং মেঘ তৈরি করে (ঘনীভবন)।
- অনেকগুলো জলকণা একসঙ্গে জুড়ে গিয়ে বড়ো জলকণায় পরিণত হলে তা বৃষ্টি বা তুষার রূপে পৃথিবীতে নেমে আসে (অধঃক্ষেপণ)।
- এই জল আবার নদী বা সমুদ্রের ফিরে আসে।
৪. মহাদেশ সঞ্চরণ (Continental Drift)
আমাদের পায়ের নীচের মাটি স্থির নয়। মহাদেশগুলো বছরে ২-২০ সেমি. করে সরছে।
- প্যানজিয়া: প্রায় ৫০ কোটি বছর আগে পৃথিবীর মানচিত্রটা এখনকার মতো ছিল না। একটাই বিরাট অখণ্ড স্থলভাগ বা মহা-মহাদেশ ছিল, যার নাম ‘প্যানজিয়া’।
- প্যানথালাসা: ‘প্যানজিয়া’-র চারদিকে ছিল বিরাট জলভাগ বা মহা-মহাসাগর, নাম ‘প্যানথালাসা’।
- প্রায় ২০ কোটি বছর আগে ‘প্যানজিয়া’ ভাঙতে শুরু করে। পৃথিবীর ভিতরের প্রচণ্ড তাপে গুরুমণ্ডলে পরিচলন স্রোতের সৃষ্টি হয়। এই স্রোতের ফলে ভাঙা টুকরোগুলো পরস্পর দূরে সরে গিয়ে বর্তমানকালের সাতটা মহাদেশ এবং পাঁচটা মহাসাগর তৈরি করেছে।
৫. জীবমণ্ডল (Biosphere)
বারিমণ্ডল (জল), শিলামণ্ডল (স্থল) এবং বায়ুমণ্ডল (বাতাস) – এই তিনটি মণ্ডলকে একত্রে পৃথিবীতে এমন এক আদর্শ পরিবেশ সৃষ্টি করেছে, যেখানে জীবনের আবির্ভাব সম্ভব হয়েছে।
জল, স্থল, বাতাসে ছড়িয়ে থাকা প্রায় ৩৫ হাজার প্রজাতির উদ্ভিদ এবং ১১০ লক্ষ প্রজাতির প্রাণী নিয়ে তৈরি হয়েছে পৃথিবীর জীবমণ্ডল (Biosphere)।
পরিবেশ ও মানুষ
মানুষ জীবমণ্ডলের একটা অংশ হলেও মানুষেরই কিছু কাজকর্ম পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করছে।
- দূষণ: জনসংখ্যা বৃদ্ধি, বনজঙ্গল ধ্বংস, শিল্প, যানবাহন প্রভৃতির ফলে জল, মাটি, বাতাস সবই দূষিত হয়ে যাচ্ছে।
- বিশ্ব উষ্ণায়ন (Global Warming): যানবাহন ও শিল্প-কারখানা থেকে বিষাক্ত গ্যাস (যেমন কার্বন ডাইঅক্সাইড) পৃথিবীর চারিদিকে আবরণ তৈরি করে পৃথিবীর উষ্ণতা বাড়িয়ে দিচ্ছে। এর ফলে মেরুর বরফ গলে সমুদ্রের জলস্তর বাড়ছে, যা প্রবল বন্যা, খরা বা ঝড়ের কারণ হচ্ছে।
- ওজোন স্তরের ক্ষয়: ফ্রিজ, এ.সি. থেকে নির্গত ক্ষতিকারক গ্যাস বায়ুমণ্ডলের ওজোন স্তরকে নষ্ট করে দিচ্ছে।
প্রকৃতির এই অবক্ষয় না আটকালে শেষপর্যন্ত মানুষের ওপরই চরম সংকট নেমে আসবে।