অধ্যায় ১০: আমাদের দেশ ভারত (নোটস)
১. অবস্থান ও প্রতিবেশী রাষ্ট্র
ভারত এশিয়া মহাদেশের দক্ষিণ অংশে, ভারত মহাসাগরের উত্তর প্রান্তে অবস্থিত একটি দেশ। এর দক্ষিণাংশ ত্রিভুজের মতো।
- অবস্থান: ভারত সম্পূর্ণভাবে উত্তর গোলার্ধে এবং পূর্ব গোলার্ধে অবস্থিত।
- মূল ভূখণ্ড: দক্ষিণে ৮°৪’ উত্তর অক্ষরেখা থেকে উত্তরে ৩৭°৬’ উত্তর অক্ষরেখা এবং পশ্চিমে ৬৮°৭’ পূর্ব দ্রাঘিমারেখা থেকে পূর্বে ৯৭°২৫’ পূর্ব দ্রাঘিমারেখার মধ্যে অবস্থিত।
- কর্কটক্রান্তি রেখা: (২৩.৫° উত্তর) রেখাটি ভারতের প্রায় মাঝখান দিয়ে বিস্তৃত হয়েছে।
- আয়তন: ৩২,৮৭,৭৮২ বর্গকিমি (পৃথিবীতে সপ্তম)।
- জনসংখ্যা: ১২১ কোটি (২০১১ জনগণনা অনুযায়ী), পৃথিবীতে দ্বিতীয়।
- প্রতিবেশী দেশসমূহ:
- উত্তর-পশ্চিমে: পাকিস্তান, আফগানিস্তান।
- উত্তরে: চিন, নেপাল, ভুটান।
- পূর্বে: বাংলাদেশ, মায়ানমার।
- দক্ষিণে (সামুদ্রিক): শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ।
২. ভারতের ভূ-প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য
ভূ-প্রকৃতির বৈচিত্র্য অনুসারে ভারতকে পাঁচটি প্রধান অঞ্চলে ভাগ করা হয়।
ক) উত্তরের পার্বত্য অঞ্চল
জম্মু ও কাশ্মীর থেকে অরুণাচল প্রদেশ পর্যন্ত বিস্তৃত। হিমালয় ও কারাকোরাম এখানকার প্রধান পর্বতশ্রেণি।
- কারাকোরাম: গডউইন অস্টিন বা K2 (৮,৬১১ মি) ভারতের উচ্চতম পর্বতশৃঙ্গ। সিয়াচেন ভারতের দীর্ঘতম হিমবাহ।
- হিমালয়: তিনটি সমান্তরাল শ্রেণি নিয়ে গঠিত—
- হিমাদ্রি: (গড় উচ্চতা ৬০০০ মি-এর বেশি) মাউন্ট এভারেস্ট (নেপালে), কাঞ্চনজঙ্ঘা (ভারতের সর্বোচ্চ হিমালয় শৃঙ্গ) এখানে অবস্থিত।
- হিমাচল: (গড় উচ্চতা ৩০০০ মি-এর বেশি) কাশ্মীর উপত্যকা, সিমলা, দার্জিলিং এই অংশে অবস্থিত।
- শিবালিক: (গড় উচ্চতা ১৫০০ মি-এর কম) হিমালয়ের দক্ষিণতম অংশ। এর পাদদেশের অরণ্যকে ‘তরাই’ বলে।
খ) উত্তরের নদীগঠিত সমভূমি অঞ্চল
সিন্ধু, গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্র এবং তাদের উপনদীগুলির পলি জমে এই উর্বর সমভূমি তৈরি হয়েছে। এটি ভারতের প্রধান কৃষি অঞ্চল এবং সর্বাধিক জনবসতিপূর্ণ এলাকা।
- গঙ্গা: ভারতের দীর্ঘতম নদী (২৫০০ কিমি)। উৎস गंगোত্রী হিমবাহের গোমুখ।
- ব্রহ্মপুত্র: তিব্বতে সাংপো নামে পরিচিত।
- সিন্ধু: তিব্বতের মানস সরোবরের কাছ থেকে উৎপন্ন হয়ে লাদাখের মধ্যে দিয়ে পাকিস্তানে প্রবেশ করেছে।
গ) উপদ্বীপীয় মালভূমি অঞ্চল
উত্তরের সমভূমির দক্ষিণে অবস্থিত ত্রিভুজাকার এই মালভূমিটি ভারতের প্রাচীনতম ভূখণ্ড।
- সীমানা: উত্তরে আরাবল্লী, বিন্ধ্য; পশ্চিমে পশ্চিমঘাট; পূর্বে পূর্বঘাট পর্বতমালা।
- নদী: নর্মদা, তাপি (পশ্চিমে আরব সাগরে পড়েছে) এবং মহানদী, গোদাবরী, কৃষ্ণা, কাবেরী (পূর্বে বঙ্গোপসাগরে পড়েছে)।
- সর্বোচ্চ শৃঙ্গ: আনাইমালাই পর্বতের আনাইমুদি (দাক্ষিণাত্য মালভূমির উচ্চতম শৃঙ্গ)।
ঘ) পশ্চিমের মরু অঞ্চল (থর মরুভূমি)
রাজস্থানের পশ্চিমে অবস্থিত ভারতের বৃহত্তম মরু অঞ্চল। এখানে বৃষ্টিপাত খুব কম হওয়ায় কাঁটা জাতীয় গাছ জন্মায়। এখানকার প্রধান নদী লুনী, যা একটি অন্তর্বাহিনী নদী (সমুদ্রে মেশেনি)।
ঙ) উপকূলের সমভূমি অঞ্চল ও দ্বীপপুঞ্জ
দাক্ষিণাত্য মালভূমির দু-পাশে এই সমভূমি অবস্থিত।
- পশ্চিম উপকূল: আরব সাগরের তীরে অবস্থিত। (মালাবার উপকূল)
- পূর্ব উপকূল: বঙ্গোপসাগরের তীরে অবস্থিত। (করমণ্ডল উপকূল)
- দ্বীপপুঞ্জ:
- আন্দামান ও নিকোবর: বঙ্গোপসাগরে অবস্থিত। ব্যারেন একটি জীবন্ত আগ্নেয়গিরি।
- লাক্ষাদ্বীপ: আরব সাগরে অবস্থিত। এটি একটি প্রবাল দ্বীপ।
ভারতের জলবায়ুতে মৌসুমি বায়ুর প্রভাব সবথেকে বেশি, তাই একে ‘ক্রান্তীয় মৌসুমি জলবায়ুর দেশ’ বলে। এখানে প্রধান চারটি ঋতু দেখা যায়: গ্রীষ্ম, বর্ষা, শরৎ ও শীত।
- গ্রীষ্মকাল (মার্চ-মে): উত্তর-পশ্চিম ভারতে ‘লু’ (শুষ্ক গরম বাতাস) ও ‘আঁধি’ (ধূলিঝড়) এবং পশ্চিমবঙ্গে ‘কালবৈশাখী’ হয়।
- বর্ষাকাল (জুন-সেপ্টেম্বর): দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে বৃষ্টিপাত হয়। মেঘালয়ের মৌসিনরাম পৃথিবীর সর্বাধিক বৃষ্টিবহুল স্থান।
- শরৎকাল (অক্টোবর-নভেম্বর): মৌসুমি বায়ুর প্রত্যাবর্তনকাল। করমণ্ডল উপকূলে (তামিলনাড়ু) এই সময় বৃষ্টি হয়।
- শীতকাল (ডিসেম্বর-ফেব্রুয়ারি): উত্তর-পূর্ব মৌসুমি বায়ু প্রবাহিত হয়। উত্তর-পশ্চিম ভারতে ‘পশ্চিমি ঝঞ্ঝা’-র প্রভাবে সামান্য বৃষ্টি হয়।
৩. ভারতের মাটি (Soil)
মাটি হলো ভূপৃষ্ঠের ওপরের পাতলা স্তর যেখান থেকে উদ্ভিদ পুষ্টি পায়। ভারতের প্রধান মাটিগুলি হলো:
- পলি মাটি: নদী বাহিত পলি দিয়ে গঠিত। খুব উর্বর, ধান-গম চাষ হয়। উত্তর ভারতের সমভূমি ও ব-দ্বীপ অঞ্চলে দেখা যায়।
- কালো মাটি: ব্যাসল্ট শিলা থেকে সৃষ্ট। তুলা ও আখ চাষের জন্য বিখ্যাত। মহারাষ্ট্র, গুজরাটে দেখা যায়।
- লাল মাটি: লোহা বেশি থাকায় রং লাল। দাক্ষিণাত্যের মালভূমির অনেক অংশে দেখা যায়।
- ল্যাটেরাইট মাটি: ইটের মতো লাল। পশ্চিমঘাট ও পূর্বঘাট পর্বতের কিছু অংশে দেখা যায়।
- মরু অঞ্চলের মাটি: রাজস্থানে দেখা যায়। লবণাক্ত ও অনুর্বর।
- পার্বত্য অঞ্চলের মাটি: হিমালয় ও নীলগিরি পার্বত্য অঞ্চলে দেখা যায়। চা, কফি চাষ ভালো হয়।
৪. ভারতের স্বাভাবিক উদ্ভিদ (Natural Vegetation)
মানুষের চেষ্টা ছাড়া প্রকৃতির উপর নির্ভর করে জন্মানো গাছপালাই হলো স্বাভাবিক উদ্ভিদ। বৃষ্টিপাত ও জলবায়ুর উপর নির্ভর করে ভারতে পাঁচ ধরণের স্বাভাবিক উদ্ভিদ দেখা যায়:
- ক্রান্তীয় চিরসবুজ অরণ্য: (প্রচুর বৃষ্টিপাত) গাছগুলির পাতা সারা বছর সবুজ থাকে। (যেমন- মেহগনি, রবার)। পশ্চিমঘাট পর্বত, আন্দামানে দেখা যায়।
- ক্রান্তীয় পাতাঝরা অরণ্য: (মাঝারি বৃষ্টিপাত) শুষ্ক ঋতুতে গাছের পাতা ঝরে যায়। (যেমন- শাল, সেগুন)। ভারতের বেশিরভাগ জুড়ে এই অরণ্য দেখা যায়।
- কাঁটাঝোপ ও গুল্ম জাতীয় উদ্ভিদ: (কম বৃষ্টিপাত) জল বাঁচাতে পাতা কাঁটায় পরিণত হয়। (যেমন- বাবুল, ফণিমনসা)। রাজস্থানের মরু অঞ্চলে দেখা যায়।
- উপকূলীয় ম্যানগ্রোভ অরণ্য: (নোনা মাটি) গাছের শ্বাসমূল ও ঠেসমূল থাকে। (যেমন- সুন্দরী, গরান)। পশ্চিমবঙ্গের সুন্দরবনে দেখা যায়।
- পার্বত্য নাতিশীতোষ্ণ অরণ্য: (ঠান্ডা জলবায়ু) গাছগুলি শঙ্কু আকৃতির ও পাতা সূঁচালো। (যেমন- পাইন, দেবদারু)। হিমালয় পার্বত্য অঞ্চলে দেখা যায়।
অরণ্য সংরক্ষণ
অরণ্য আমাদের বন্ধু। অরণ্য বৃষ্টিপাত ঘটায়, মাটি ক্ষয় কমায়, বন্যা নিয়ন্ত্রণ করে এবং বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল। তাই আইন করে গাছকাটা বন্ধ করা, পশুচারণ নিয়ন্ত্রণ করা এবং প্রচুর পরিমাণে চারাগাছ লাগিয়ে অরণ্য সংরক্ষণ করা অত্যন্ত জরুরি।