বাংলা সাহিত্য (অষ্টম শ্রেণি)
সপ্তম পাঠ (দ্বিতীয় অংশ): নীল অঞ্জনঘন পুঞ্জছায়ায় (রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর) – নোটস ও উত্তর
**উৎস:** গীতবিতান | **বিষয়বস্তু:** বর্ষার আগমন, প্রকৃতির আনন্দ এবং দহন থেকে মুক্তির উৎসব।
—১. গান পরিচিতি ও সারমর্ম (Core Theme)
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এই গানটি বর্ষা ঋতুকে কেন্দ্র করে রচিত একটি বিখ্যাত গান। গানটিতে কবি দেখিয়েছেন, গ্রীষ্মের **দহন-যন্ত্রণা** থেকে প্রকৃতিকে মুক্তি দিতে **বর্ষা** ঘন মেঘের রূপে আসে। বর্ষার আগমন প্রকৃতির মধ্যে এক **আনন্দ ও মুক্তির উল্লাস** সৃষ্টি করে, যেখানে শুষ্ক পৃথিবী নতুন প্রাণের বার্তা লাভ করে।
মূল বক্তব্য:
- **বর্ষার রূপ:** বর্ষার আকাশ **’নীল অঞ্জনঘন পুঞ্জছায়ায়’** (নীল কাজলের মতো ঘন মেঘের ছায়ায়) আচ্ছন্ন। আকাশ **’গম্ভীর’** রূপ ধারণ করেছে।
- **প্রকৃতির উল্লাস:** মেঘের গর্জনে **বর্ষণগীত মুখরিত** হচ্ছে। **বনলক্ষ্মীর কায়া** (শরীর) **কম্পিত** এবং **অন্তর চঞ্চল**। কদম্ববন **আনন্দঘন গন্ধে** মগ্ন।
- **মুক্তি ও নবজীবন:** গ্রীষ্মের দহনে তপ্ত পৃথিবী ছিল **’পিপাসার্তা’**। বর্ষা **’অমৃতবারির বার্তা’** এনেছে, যার ফলে মাটির কঠিন বাধা ক্ষীণ হয়েছে এবং দিক-দিগন্তে **নব-অঙ্কুর** (নতুন চারা) জয়পতাকা উড়িয়েছে।
- **স্বাধীনতার প্রতীক:** বর্ষার আগমন এখানে **বন্ধন ছিন্ন হওয়া** এবং **বন্দীর মুক্তি**-র প্রতীক। বর্ষা যেন নতুন প্রাণের আনন্দ নিয়ে আসে।
২. গুরুত্বপূর্ণ শব্দ ও ব্যাখ্যা
- **অঞ্জনঘন:** কাজলের মতো ঘন কালো।
- **পুঞ্জছায়ায়:** মেঘের ঘন স্তূপের ছায়ায়।
- **অম্বর:** আকাশ।
- **বনলক্ষ্মীর কায়:** বনভূমি বা প্রকৃতির শরীর।
- **ঝিল্লির মন্ত্রীর:** ঝিঁঝিঁ পোকার গুঞ্জরন বা নীরব শব্দ।
- **মেঘমন্দ্রিত:** মেঘের গুরুগম্ভীর গর্জন সহকারে।
- **পিপাসার্তা:** পিপাসায় কাতর, তৃষ্ণার্ত।
- **অমৃতবারির বার্তা:** অমৃতের মতো জলের বা বৃষ্টির খবর।
- **নব-অঙ্কুর:** নতুন চারাগাছ।
- **ধরাতল সমাকীর্ণ:** পৃথিবী ভরে গেছে।
৩. হাতেকলমে (অনুশীলনী প্রশ্ন ও উত্তর)
(এই গানটির সঙ্গে অনুশীলনীতে যুক্ত প্রশ্নের উত্তর নিচে দেওয়া হলো:)
সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন ও উত্তর (মান: ১-২ নম্বর):
১. বর্ষার আকাশ কেমন?
বর্ষার আকাশ **’নীল অঞ্জনঘন পুঞ্জছায়ায়’** (নীল কাজলের মতো ঘন মেঘের ছায়ায়) আচ্ছন্ন এবং **’গম্ভীর’**।
২. বর্ষার আগমনে বনলক্ষ্মীর অবস্থা কেমন হয়?
বর্ষার আগমনে বনলক্ষ্মীর **কায়া (শরীর) কম্পিত** হয় এবং **অন্তর চঞ্চল** হয়ে ওঠে।
৩. বর্ষণগীত কীভাবে মুখরিত হয়?
বর্ষণগীত **মেঘমন্দ্রিত ছন্দে** মুখরিত হয়, অর্থাৎ মেঘের গুরুগম্ভীর গর্জনের সাথে বর্ষার সুর বাজে।
৪. কদম্ববন কেন মগ্ন?
কদম্ববন **আনন্দঘন গন্ধে** মগ্ন, যা বর্ষার আগমন এবং কদম্ব ফুলের প্রস্ফুটিত হওয়ার কারণে সৃষ্টি হয়েছে।
সংক্ষিপ্ত উত্তরধর্মী প্রশ্ন (মান: ৩ নম্বর):
৫. ‘দহনশয়নে তপ্ত ধরণী পড়েছিল পিপাসার্তা’—ব্যাখ্যা করো।
**ব্যাখ্যা:** গ্রীষ্মকালে সূর্যের তীব্র তাপে পৃথিবী উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। কবি এই তীব্র তাপকে **’দহনশয়ন’** (দহনের বিছানা) বলে অভিহিত করেছেন। অতিরিক্ত তাপে পৃথিবী শুষ্ক ও জলহীন হয়ে যাওয়ায় তাকে **’পিপাসার্তা’** (তৃষ্ণার্ত) নারীর মতো মনে হয়েছে। এই উপমা গ্রীষ্মের চরম কষ্টকে বোঝায়, যা বর্ষার আগমনকে আরও বেশি আকাঙ্ক্ষিত করে তোলে।
৬. বর্ষার আগমনে প্রকৃতির মধ্যে কীসের জয় ও মুক্তির বার্তা আসে?
বর্ষার আগমনে প্রকৃতির মধ্যে **নবজীবনের জয়** এবং **বন্ধন মুক্তির** বার্তা আসে:
- **জয়:** বর্ষা **’অমৃতবারির বার্তা’** এনে মাটির **কঠিন বাধা ক্ষীণ** করে দেয়। ফলে দিক-দিগন্তে **নব-অঙ্কুর** (নতুন চারা) জন্ম নেয়। এই নতুন অঙ্কুরগুলি যেন **’জয়পতাকা’** উড়িয়ে পৃথিবীর ওপর নতুন জীবনের জয় ঘোষণা করে।
- **মুক্তি:** এটি বন্দিদশা থেকে **মুক্তির** প্রতীক। দহন-যন্ত্রণা ও শুষ্কতা থেকে প্রকৃতি যেন মুক্তি (‘বন্ধন বন্দীর ছিন্ন হয়েছে’) পায় এবং এক আনন্দঘন উৎসবে মগ্ন হয়।
রচনাধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর (মান: ৫ নম্বর):
৭. ‘নীল অঞ্জনঘন পুঞ্জছায়ায়’—গানটিতে রবীন্দ্রনাথ কীভাবে প্রকৃতির দহন-যন্ত্রণা দূর করে মুক্তির উল্লাসকে চিত্রিত করেছেন?
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই গানে **প্রকৃতির দহন ও মুক্তির উল্লাস**—এই দুটি বিপরীত চিত্রকে অত্যন্ত শৈল্পিকভাবে তুলে ধরেছেন:
- **দহন-যন্ত্রণা ও আকুলতা (গ্রীষ্ম):** গানটি শুরু হওয়ার আগে গ্রীষ্মের কষ্টের ছবি আঁকা হয়েছে। তপ্ত পৃথিবী **’দহনশয়নে পিপাসার্তা’** হয়ে ছিল, যা প্রকৃতির চরম কষ্ট ও আকুলতাকে বোঝায়।
- **বর্ষার আগমন ও রূপ:** এই কষ্ট দূর করতে বর্ষার আকাশ **’নীল অঞ্জনঘন পুঞ্জছায়ায়’** (কাজলের মতো কালো ঘন মেঘের স্তূপে) আচ্ছন্ন হয়ে ওঠে। এই মেঘের রূপটি কেবল কালো নয়, এটি **’অমৃতবারির বার্তা’** বহনকারী পরিত্রাতার প্রতীক।
- **মুক্তির উল্লাস (শব্দ ও গন্ধ):** বর্ষার আগমনে প্রকৃতি উল্লাসিত হয়ে ওঠে। **মেঘমন্দ্রিত ছন্দে** বর্ষণগীত বাজে, **ঝিল্লির মন্ত্রীরে** বনলক্ষ্মীর অন্তর চঞ্চল হয় এবং **কদম্ববনের আনন্দঘন গন্ধে** প্রকৃতি মগ্ন হয়। এটি **শ্রাব্য ও ঘ্রাণজ চিত্রকল্পের** মাধ্যমে মুক্তির আনন্দ ফুটিয়ে তোলে।
- **নবজীবনের জয়:** বৃষ্টির প্রভাবে মাটির **কঠিন বাধা ছিন্ন** হয়ে যায় এবং দিকে দিকে **নব-অঙ্কুর** (নতুন চারা) জন্ম নেয়। এই নতুন চারাগাছগুলি যেন মুক্তির **’জয়পতাকা’** উড়িয়ে ঘোষণা করে যে, দহন ও শুষ্কতা থেকে প্রকৃতি এখন মুক্তি পেয়েছে। এটিই হলো **’বন্ধন বন্দীর ছিন্ন’** হওয়ার উল্লাস।
এভাবে গানটিতে প্রকৃতিকে একটি **জীবন্ত সত্তা** হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে, যার কাছে বর্ষা কেবল জল নয়, এটি **নবজীবনের বার্তা ও মুক্তির উৎসব**।