বাংলা সাহিত্য (সপ্তম শ্রেণি)
তৃতীয় পাঠ (চতুর্থ অংশ): কুতুব মিনারের কথা (সৈয়দ মুজতবা আলি) – নোটস ও উত্তর
**উৎস:** প্রবন্ধ | **বিষয়বস্তু:** কুতুব মিনারের স্থাপত্যশৈলী, ঐতিহাসিক গুরুত্ব এবং নির্মাণে হিন্দু-মুসলমান শিল্পরীতির মিলন।
—১. প্রবন্ধ পরিচিতি ও সারমর্ম (Core Theme)
সৈয়দ মুজতবা আলীর **’কুতুব মিনারের কথা’** প্রবন্ধটি মিনারের স্থাপত্যের গুণ, ইতিহাস এবং তার নির্মাণশৈলী নিয়ে আলোচনা করে। লেখক এই মিনারটিকে **’পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ মিনার’** বলে ঘোষণা করেছেন। মিনারের নকশায় **বাঁশি ও কোণে**-এর মতো উপাদানগুলি ব্যবহার করে স্থপতি কীভাবে এটিকে **প্রথম ও শেষ এক্সপেরিমেন্ট** হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছেন, লেখক সেই দিকেই আলোকপাত করেছেন। মিনারের কারুকার্যে **হিন্দু ও মুসলমান শিল্পশৈলীর মিলনকে** লেখক ভারতীয় কলার প্রাঙ্গণে এক অটুট বন্ধন হিসেবে দেখিয়েছেন।
মূল বক্তব্য:
- **শ্রেষ্ঠত্বের দাবি:** কুতুব মিনার এমন একটি বিজয়স্তম্ভ, যার পূর্ববর্তী নিদর্শন ভারত বা ইরান-তুরানেও বিরল।
- **স্থাপত্যশৈলী:** মিনারটি **পাঁচতলা** বিশিষ্ট। এর গায়ে **বাঁশি ও কোণে**-এর নকশা, এবং **কারুকার্যের সঙ্গতি (প্রপর্শন)** এটিকে অনন্য করে তুলেছে।
- **ঐতিহাসিক সংস্কার:** বজ্রাঘাতে ভেঙে যাওয়া চতুর্থ ও পঞ্চম তলা **ফিরোজ তুগলক** মার্বেল দিয়ে মেরামত করেন।
- **হিন্দু-মুসলিম মিলন:** মিনারের গায়ে থাকা **লতা-পাতা ও ফুলের নকশা** (হিন্দু রীতি) এবং **আরবি লেখার সারি** (মুসলমান রীতি) একসঙ্গে ব্যবহার করা হলেও, খোদাইয়ের কাজটি **হিন্দু শিল্পীরাই** করেছিলেন। লেখক এই মিলনকে ভারতীয় কলার এক অটুট বন্ধন হিসেবে দেখিয়েছেন।
- **আল্লাউদ্দিনের উচ্চাকাঙ্ক্ষা:** আলাউদ্দিন খিলজি কুতুবের দ্বিগুণ উঁচু মিনার তৈরির চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু তা অসম্পূর্ণই থেকে যায়।
২. গুরুত্বপূর্ণ শব্দ ও ব্যাখ্যা
- **মিনার:** মোচার আকারে ঊর্ধ্বমুখী চূড়া বা স্তম্ভ।
- **বিজয়স্তম্ভ:** জয় বা বিজয়কে স্মরণীয় করে রাখার জন্য নির্মিত স্তম্ভ।
- **এক্সপেরিমেন্ট:** পরীক্ষা-নিরীক্ষা।
- **বাঁশি ও কোণে:** কুতুব মিনারের গায়ের কারুকার্যে ব্যবহৃত জ্যামিতিক নকশার শৈলী।
- **স্থপতি:** সৌধ, ইমারত বা স্থাপত্য তৈরির কাজে নিযুক্ত শিল্পী।
- **ফিরোজ তুগলক:** দিল্লির একজন সুলতান, যিনি কুতুব মিনারের ভাঙা অংশ মেরামত করেছিলেন।
- **প্রপর্শন (Proportion):** অনুপাত, সঙ্গতি।
- **মিনারেট/মিনারিকা:** মিনারের চেয়ে ছোট চূড়া, যা সাধারণত মসজিদ বা ইমারতের অংশ হয়।
৩. হাতেকলমে (অনুশীলনী প্রশ্ন ও উত্তর)
(অনুশীলনী থেকে নির্বাচিত প্রশ্নের উত্তর নিচে দেওয়া হলো:)
সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন ও উত্তর (মান: ১-২ নম্বর):
১. কোন্ সম্রাট ‘অশোক স্তম্ভ’ কে দিল্লি নিয়ে এসেছিলেন?
সম্রাট অশোক স্তম্ভকে দিল্লি নিয়ে এসেছিলেন **ফিরোজ তুগলক**।
২. মিনার ও মিনারেটের মধ্যে পার্থক্য কী?
মিনার হলো আপন মহিমায় নিজস্ব ক্ষমতায় দাঁড়িয়ে থাকা একটি **বিজয়স্তম্ভ**। আর **মিনারেট** বা মিনারিকা হলো **মিনারের চেয়ে ছোট চূড়া**, যা মসজিদ বা অন্য কোনো ইমারতের অঙ্গ হিসাবে থাকে।
৩. কুতুবের সঙ্গে পাল্লা দেওয়ার জন্য আর কে মিনার গড়তে চেষ্টা করেছিলেন?
কুতুবের সঙ্গে পাল্লা দেওয়ার জন্য **আলাউদ্দিন খিলজি** কুতুবের দ্বিগুণ উঁচু আরেকটি মিনার গড়তে চেষ্টা করেছিলেন।
৪. কুতুব মিনারের চতুর্থ ও পঞ্চম তলায় কী ছিল জানার উপায় নেই কেন?
বজ্রাঘাতে কুতুব মিনারের **চতুর্থ ও পঞ্চম তলা ভেঙে যাওয়ায়** স্থপতি প্রথম নির্মাণে কী রেখেছিলেন, তা জানার উপায় নেই। পরে ফিরোজ তুগলক সেই অংশ দুটি মেরামত করেন।
সংক্ষিপ্ত উত্তরধর্মী প্রশ্ন (মান: ৩ নম্বর):
৫. কুতুব মিনারের পাঁচটি বিশিষ্টতা উল্লেখ করো।
কুতুব মিনারের পাঁচটি বিশিষ্টতা হলো:
- এটি **পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ মিনার** হিসেবে স্বীকৃত।
- এটি একটি **বিজয়স্তম্ভ** এবং এর পূর্ববর্তী নিদর্শন বিরল।
- মিনারটির স্থাপত্যশৈলীতে **বাঁশি ও কোণে**-এর মতো জ্যামিতিক নকশার সজ্জা দেখা যায়।
- এর গাত্রে **হিন্দু ও মুসলমান** উভয় রীতির কারুকার্যের মিলন ঘটেছে।
- এর **সঙ্গতি বা প্রপর্শন** (Proportion) চূড়ান্ত পর্যায়ের শিল্পকলা।
৬. কুতুব মিনারের গঠনে হিন্দু-মুসলিম সাংস্কৃতিক মিলনের চেহারাটি কীভাবে ধরা পড়েছে তা লেখো।
কুতুব মিনারের কারুকার্যে হিন্দু-মুসলিম সাংস্কৃতিক মিলনের এক অপূর্ব চেহারা ধরা পড়েছে:
- **পরিকল্পনা ও কারুশিল্প:** গোটা মিনারটির পরিকল্পনা করেছিলেন **মুসলমান স্থপতি**, কিন্তু এর যাবতীয় খোদাই ও কারুশিল্পের কাজ করেছিলেন **হিন্দু শিল্পীরা**।
- **নকশার মিশ্রণ:** মিনারের গাত্রে **লতা-পাতা, ফুলের মালা ও চক্রের** নকশা (যা হিন্দু রীতি) এবং **আরবি লেখার সারি** (যা মুসলমান রীতি) সারি সারিভাবে একইসঙ্গে খোদাই করা হয়েছে।
লেখক মনে করেন, এই মিলন ভারতীয় কলার প্রাঙ্গণে একটি **অটুট বন্ধন** সৃষ্টি করেছে।
৭. তাজমহলের মিনারিকা সাদামাটা কেন?
লেখক সৈয়দ মুজতবা আলীর মতে, তাজমহলের মিনারিকাগুলি সাদামাটা হওয়ার কারণ হলো স্থপতির **আত্মমর্যাদাবোধ**।
- **কুতুবের ভয়:** তাজমহলের স্থপতিরা বিলক্ষণ জানতেন যে কুতুব মিনারের সঙ্গে পাল্লা দেওয়া কোনো **স্থপতির কর্ম নয়**।
- **তুলনা এড়ানো:** পাছে লোকে তার মিনারিকার সঙ্গে কুতুবের **তুলনা করে লজ্জা দেয়**, তাই তিনি সেটিকে এমন ন্যাড়া করে গড়েছেন যাতে দর্শকের মন কুতুবকে স্মরণ না করে।
রচনাধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর (মান: ৫ নম্বর):
৮. কুতুব মিনারকে ‘পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ মিনার’ বলা হয়েছে কেন? প্রবন্ধ অবলম্বনে যুক্তিসহ আলোচনা করো।
সৈয়দ মুজতবা আলি প্রবন্ধের শুরুতেই কুতুব মিনারকে **’পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ মিনার’** বলে ঘোষণা করেছেন। এর প্রধান কারণগুলি হলো:
- **অনন্যতা ও স্থাপত্যশৈলী:** কুতুব মিনার হলো স্থাপত্যের ইতিহাসে **’প্রথম ও শেষ এক্সপেরিমেন্ট’**। এর পূর্বে কোনো স্থপতি এত সাহস বা দক্ষতা দেখাননি। এর গঠনশৈলী **অপূর্ব**, যেখানে **সোজা খাড়া স্তম্ভে** সৌন্দর্য আনা হয়েছে।
- **সঙ্গতির চূড়ান্ত নিদর্শন:** মিনারটির গঠনে **পাঁচটি তলা**, প্রতিটি তলায় **বাঁশি ও কোণে**-এর নকশা, এবং উচ্চতার সঙ্গে সঙ্গে মিনারের আকার ছোটো করে নিয়ে আসা হয়েছে। এই **’প্রপর্শনে’র (সঙ্গতি)** চূড়ান্ত নিদর্শন পৃথিবীর আর কোনো মিনারে বিরল।
- **সাংস্কৃতিক মিলন:** মিনারের গায়ে **হিন্দু ও মুসলমান**—উভয় রীতির কারুকার্যের মিলন ঘটেছে, যা ভারতীয় **কলার প্রাঙ্গণে অটুট বন্ধনের** প্রতীক।
- **ঐতিহাসিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা:** কুতুবের শ্রেষ্ঠত্ব এত বেশি ছিল যে, পরবর্তী আট শতাব্দী ধরে বহু বাদশা বা স্থপতি (আলাউদ্দিন খিলজি, ইংরেজ স্থপতিরা) এর সঙ্গে **পাল্লা দিতে সাহস দেখাননি**।
এই সমস্ত কারণ এবং এর **অলোকসামান্য সৌন্দর্যই** এটিকে একটি সাধারণ ইমারত বা মিনারেট না রেখে **’পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ মিনার’**-এর মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করেছে।