বাংলা সাহিত্য (সপ্তম শ্রেণি)
অষ্টম পাঠ: স্বাধীনতা সংগ্রামে নারী (কমলা দাশগুপ্ত) – নোটস ও উত্তর
**উৎস:** প্রবন্ধ | **বিষয়বস্তু:** ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে বাঙালি নারীদের বিপ্লবী ভূমিকা ও আত্মত্যাগ।
—১. প্রবন্ধ পরিচিতি ও সারমর্ম (Core Theme)
কমলা দাশগুপ্তের এই প্রবন্ধটি ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে **বাঙালি নারীদের আত্মত্যাগ, সাহসিকতা এবং বিপ্লবী কার্যক্রমে** সক্রিয় অংশগ্রহণের কথা তুলে ধরে। প্রবন্ধটি প্রমাণ করে যে, স্বাধীনতার লড়াইয়ে নারীরা কেবল গৃহের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না, বরং পুরুষের পাশাপাশি কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কঠিন সংগ্রামে অংশ নিয়েছিলেন।
মূল বক্তব্য:
- **বিপ্লবী নারীর ভূমিকা:** প্রবন্ধটিতে **ননীবালা দেবী, দুকড়িবালা দেবী, সরলা দেবী** প্রমুখ নারীর আত্মত্যাগের কথা বলা হয়েছে। এঁরা ছিলেন কঠিন বিপ্লবী কর্মকাণ্ডের অংশ।
- **ননীবালা দেবীর সংগ্রাম:** ননীবালা দেবী বিপ্লবী **অমৃত চ্যাটার্জির** স্ত্রী সেজে তাঁর কাছ থেকে তথ্য জানতে চেয়েছিলেন। পুলিশ তাঁর ওপর নির্মম অত্যাচার চালালেও তিনি কোনো তথ্য দেননি।
- **দুকড়িবালা দেবীর আত্মত্যাগ:** দুকড়িবালা দেবী বিপ্লবীদের জন্য **মাউজার পিস্তল** লুকিয়ে রেখেছিলেন। এর জন্য তাঁকে **শ্রমিক** করা হয়েছিল এবং তাঁর ছোটো সন্তান মারা গিয়েছিল।
- **সরলা দেবীর অবদান:** সরলা দেবী নারী-বিপ্লবীদের অস্ত্র লুকিয়ে রাখার জন্য একটি **ইন্টারমিডিয়েট ক্লাস** চালু করেছিলেন এবং স্বাধীনতা সংগ্রামে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন।
- **সাহসিকতার প্রতিষ্ঠা:** এই বিপ্লবীরা সমাজের চোখরাঙানি, পুলিশের অত্যাচার ও কারাবাসকে ভয় না পেয়ে নীরবে দেশকে মুক্ত করার জন্য নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছেন।
২. গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র ও ব্যাখ্যা
- **ননীবালা দেবী:** বিপ্লবী নারী। বিপ্লবী অমৃত চ্যাটার্জির স্ত্রী সেজে তথ্য জানতে চেয়েছিলেন। পুলিশের অকথ্য অত্যাচার সহ্য করেও মুখ খোলেননি।
- **দুকড়িবালা দেবী:** বিপ্লবী নারী। বিপ্লবীদের জন্য **মাউজার পিস্তল** লুকিয়ে রেখেছিলেন। এর জন্য তাঁকে কঠিন শাস্তি ভোগ করতে হয় এবং তাঁর সন্তান মারা যায়।
- **সরলা দেবী:** বিপ্লবী নারী। তিনি বিপ্লবীদের কার্যকলাপ পরিচালনার জন্য একটি **ইন্টারমিডিয়েট ক্লাস** শুরু করেছিলেন।
- **অমৃত চ্যাটার্জি:** বিপ্লবী নেতা। ননীবালা দেবী তাঁর স্ত্রী সেজে তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা করেছিলেন।
- **অশ্বিনী কুমার গঙ্গোপাধ্যায়:** দুকড়িবালা দেবীর স্বামী।
৩. হাতেকলমে (অনুশীলনী প্রশ্ন ও উত্তর)
(অনুশীলনী থেকে নির্বাচিত প্রশ্নের উত্তর নিচে দেওয়া হলো:)
সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন ও উত্তর (মান: ১-২ নম্বর):
১. স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশগ্রহণের জন্য প্রথম বাঙালি নারী হিসেবে কাকে কারাবরণ করতে হয়েছিল?
স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশগ্রহণের জন্য প্রথম বাঙালি নারী হিসেবে **ননীবালা দেবীকে** কারাবরণ করতে হয়েছিল।
২. ননীবালা দেবী কেন বিপ্লবী অমৃত চ্যাটার্জির স্ত্রী সেজে তাঁর কাছ থেকে তথ্য জানতে চেয়েছিলেন?
ননীবালা দেবী **অমৃত চ্যাটার্জির স্ত্রী সেজে** তাঁর কাছ থেকে তথ্য জানতে চেয়েছিলেন, কারণ তাঁর বিপ্লবী দলের একজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্যকে পুলিশ আটক করেছিল। তাঁকে বাঁচানোর জন্য এই তথ্য প্রয়োজন ছিল।
৩. দুকড়িবালা দেবী কেন শ্রমিক হয়েছিলেন?
দুকড়িবালা দেবী বিপ্লবীদের জন্য **মাউজার পিস্তল** লুকিয়ে রেখেছিলেন। এই অপরাধের জন্য ব্রিটিশ সরকার তাঁকে কঠিন শাস্তি হিসেবে **শ্রমিক** (কারাগারে কঠিন পরিশ্রমের সাজা) করেছিলেন।
৪. সরলা দেবী কীসের জন্য একটি ইন্টারমিডিয়েট ক্লাস চালু করেছিলেন?
সরলা দেবী বিপ্লবীদের **অস্ত্র লুকিয়ে রাখা এবং বিপ্লবী কার্যকলাপ** পরিচালনার জন্য নারী-বিপ্লবীদের সুবিধার্তে একটি **ইন্টারমিডিয়েট ক্লাস** চালু করেছিলেন।
সংক্ষিপ্ত উত্তরধর্মী প্রশ্ন (মান: ৩ নম্বর):
৫. দুকড়িবালা দেবীর জীবন কীভাবে আত্মত্যাগের প্রতীক হয়ে উঠেছিল?
দুকড়িবালা দেবীর জীবন আত্মত্যাগের প্রতীক হয়ে উঠেছিল কারণ:
- **সাহসিকতা:** তিনি নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বিপ্লবীদের জন্য **মাউজার পিস্তল** লুকিয়ে রেখেছিলেন।
- **কঠিন শাস্তি ভোগ:** এই অপরাধের জন্য ব্রিটিশ সরকার তাঁকে **শ্রমিক** (কঠিন পরিশ্রম) হওয়ার সাজা দেয়।
- **অবিচলতা:** কারাগারে থাকার সময় তাঁর **ছোট্ট সন্তান মারা যায়**, তবুও তিনি বিপ্লবীদের তথ্য দেননি। এই সমস্ত ত্যাগ ও কষ্টের মুখেও তাঁর অবিচলতা তাঁকে আত্মত্যাগের প্রতীক করে তোলে।
৬. ননীবালা দেবীর উপর পুলিশ কীভাবে অত্যাচার করেছিল? এই অত্যাচারের সামনেও তাঁর মনোভাব কেমন ছিল?
অত্যাচারের প্রকৃতি: পুলিশ ননীবালা দেবীর ওপর অকথ্য অত্যাচার করেছিল। তাঁকে **উলঙ্গ করে তাঁর দেহে রবারের বেত, বেতের ফলা** দিয়ে আঘাত করা হয়েছিল এবং **বরফের উপর শুইয়ে** দেওয়া হয়েছিল।
মনোভাব: এই **ভয়াবহ অত্যাচারের সামনেও** ননীবালা দেবী **অবিচল ও দৃঢ়** ছিলেন। তিনি মুখ ফুটে কোনো তথ্য দেননি। এই সাহসিকতা তাঁর **বিপ্লবী আদর্শ** ও **দেশপ্রেমের** প্রতি অটুট বিশ্বাসকে প্রমাণ করে।
৭. স্বাধীনতা সংগ্রামে নারীরা পুরুষের পাশে কোন্ কোন্ কঠিন ভূমিকা পালন করেছিলেন?
স্বাধীনতা সংগ্রামে নারীরা পুরুষের পাশে নিম্নলিখিত কঠিন ভূমিকা পালন করেছিলেন:
- **তথ্য সংগ্রহ:** ননীবালা দেবীর মতো নারীরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ **বিপ্লবী তথ্য** সংগ্রহ করতেন।
- **অস্ত্র লুকানো:** দুকড়িবালা দেবীর মতো নারীরা বিপ্লবীদের জন্য **অস্ত্র (পিস্তল)** লুকিয়ে রাখতেন।
- **বিপ্লবী কেন্দ্র স্থাপন:** সরলা দেবীর মতো নারীরা **অস্ত্র লুকানোর** এবং বিপ্লবী কার্যকলাপ পরিচালনার জন্য **শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান** (ইন্টারমিডিয়েট ক্লাস) স্থাপন করেছিলেন।
- **অত্যাচার সহ্য:** তাঁরা পুলিশের **নির্মম অত্যাচার** ও **কারাবাস** হাসিমুখে বরণ করে নিয়েছিলেন।
রচনাধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর (মান: ৫ নম্বর):
৮. ‘স্বাধীনতা সংগ্রামে নারী’ প্রবন্ধে উল্লিখিত বাঙালি নারীদের আত্মত্যাগ কীভাবে দেশের স্বাধীনতা অর্জনের পথ সুগম করেছিল? আলোচনা করো।
কমলা দাশগুপ্তের প্রবন্ধে উল্লিখিত বাঙালি নারীদের **অসামান্য আত্মত্যাগ ও সাহসিকতা** দেশের স্বাধীনতা অর্জনের পথ সুগম করেছিল:
- **বিপ্লবী প্রেরণা:** ননীবালা দেবী, দুকড়িবালা দেবী এবং সরলা দেবীর মতো নারীরা **পুরুষ বিপ্লবীদের অনুপ্রাণিত** করেছিলেন। তাঁদের অংশগ্রহণ বিপ্লবের গতিকে বহুগুণ বাড়িয়েছিল।
- **তথ্য ও অস্ত্র সরবরাহ:** নারীরা কেবল মিছিল-মিটিং-এই ছিলেন না, তাঁরা **গুরুত্বপূর্ণ বিপ্লবী তথ্য** আদান-প্রদান করতেন এবং **অস্ত্র লুকিয়ে** রেখে বিপ্লবীদের কাজে সহায়তা করতেন, যা সশস্ত্র সংগ্রামের জন্য অপরিহার্য ছিল।
- **অবিচল দৃঢ়তা:** পুলিশ যখন ননীবালা দেবীর ওপর অকথ্য অত্যাচার চালায় বা দুকড়িবালা দেবীকে তাঁর সন্তানের মৃত্যু দিয়ে শাস্তি দেয়, তখনো তাঁরা **মুখ খোলেননি**। এই **অবিচল দৃঢ়তা** বিপ্লবীদের মনোবলকে অটুট রেখেছিল।
- **সামাজিক বাধা জয়:** এঁরা সেই সময়ে যখন নারীদের ঘরের বাইরে আসা কঠিন ছিল, তখন **সমস্ত সামাজিক চোখরাঙানি** উপেক্ষা করে স্বাধীনতার সংগ্রামে অংশ নেন। তাঁদের এই সাহসিকতা নারী সমাজকে জাগিয়ে তোলে এবং **বিপ্লবের ভিতকে মজবুত** করে।
এইভাবে, নারীদের এই **নীরব ও প্রকাশ্য আত্মত্যাগ** স্বাধীনতার সংগ্রামকে এক নতুন মাত্রা দিয়েছিল এবং তা অর্জনকে ত্বরান্বিত করেছিল।