বাংলা সাহিত্য (সপ্তম শ্রেণি)
সপ্তম পাঠ: ভানুসিংহের পত্রাবলি (রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর) – নোটস ও উত্তর
**উৎস:** পত্র সাহিত্য | **বিষয়বস্তু:** কলকাতা ও শান্তিনিকেতনের বর্ষার তুলনা, প্রকৃতির প্রতি কবির টান এবং আত্রাই নদীর ওপর বোটে থাকার অভিজ্ঞতা।
—১. রচনা পরিচিতি ও সারমর্ম (Core Theme)
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচিত **’ভানুসিংহের পত্রাবলি’** হলো তাঁর লেখা চিঠির সংকলন। এখানে দুটি চিঠি স্থান পেয়েছে, যা কবির **প্রকৃতিপ্রেম** এবং **কলকাতা শহরের প্রতি বিরূপ মনোভাবকে** তুলে ধরে। এই পত্রগুলি মূলত দিনু (দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুর)-কে লেখা। প্রথম চিঠিতে কবি শান্তিনিকেতন ও কলকাতার বর্ষার তুলনা করেছেন; দ্বিতীয় চিঠিতে **আত্রাই নদীর ওপর বোটে থাকার** এক নিবিড় প্রাকৃতিক অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিয়েছেন।
মূল বক্তব্য:
- **কলকাতা ও শান্তিনিকেতনের তুলনা:** কবি কলকাতার ইট-কাঠের পরিবেশকে **’মস্ত জন্তু’**-র সঙ্গে তুলনা করেছেন, যা তাঁকে গিলে ফেলেছে। এই শহরে বর্ষার কোনো ছন্দ বা গান নেই। অন্যদিকে, শান্তিনিকেতনের মাঠে বর্ষা নামলে **আকাশের আলো করুণ** হয়, ঘাসে ঘাসে পুলক লাগে এবং **মনের মধ্যে গান** জেগে ওঠে।
- **প্রকৃতির প্রতি টান:** কবি নদী ও আকাশকে খুব ভালোবাসেন। তিনি আত্রাই নদীতে বোটে থাকার অভিজ্ঞতা জানিয়েছেন—নদীর কূলে কূলে জল, ঘন বাঁশের ঝাড়, সবুজ ঘনিমা এবং বাদল-সায়াহ্নের ছায়া।
- **সৃজনশীলতার উৎস:** প্রকৃতির শান্ত, স্নিগ্ধ পরিবেশ কবির মনে **সৃজনশীলতার আনন্দ** এনে দেয়। তিনি বোটে বসে গান তৈরি করতে চেয়েছেন। অন্যদিকে, কলকাতার ব্যস্ততা ও কৃত্রিমতা সেই সৃজনশীলতাকে ব্যাহত করে।
- **জীবনবোধ:** প্রকৃতির মাঝে থাকার অভিজ্ঞতা কবির কাছে **’পৃথিবীর মনের কথাটি’** শুনতে পাওয়ার মতো ছিল।
২. গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র ও ব্যাখ্যা
- **ভানুসিংহ (ছদ্মনাম):** রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই ছদ্মনামে চিঠি লিখতেন।
- **দিনু (দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুর):** রবীন্দ্রনাথের পৌত্র, রবীন্দ্র সঙ্গীতের প্রধান স্বরলিপিকার, যাকে উদ্দেশ্য করে চিঠিগুলি লেখা।
- **আত্রাই নদী:** চিঠি লেখার সময় কবি এই নদীর ওপর বোটে ছিলেন।
- **বর্ষামঙ্গল:** বর্ষা ঋতুর আগমন উপলক্ষ্যে অনুষ্ঠিত সঙ্গীত ও সাহিত্য অনুষ্ঠান।
৩. হাতেকলমে (অনুশীলনী প্রশ্ন ও উত্তর)
(অনুশীলনী থেকে নির্বাচিত প্রশ্নের উত্তর নিচে দেওয়া হলো:)
সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন ও উত্তর (মান: ১-২ নম্বর):
১. “কলকাতা শহরটা আমি মোটেই পছন্দ করিনে” – কবির এই অপছন্দের কারণ কী?
কবির মতে, কলকাতা শহরটা **ইট-কাঠের এক মস্ত জন্তু**-র মতো, যা তাঁকে গিলে ফেলতে চায়। এই কৃত্রিম শহরে **বর্ষার কোনো নৃত্য, গান বা ছন্দ** খুঁজে পাওয়া যায় না।
২. “শান্তিনিকেতনের মাঠে যখন বৃষ্টি নামে…” – তখন কবির কেমন অনুভূতি হয়?
শান্তিনিকেতনের মাঠে বৃষ্টি নামলে **আকাশের আলো করুণ** হয়ে আসে, ঘাসে ঘাসে **পুলক** (আনন্দ) লাগে, গাছগুলি যেন কথা কইতে চায় এবং কবির **মনের মধ্যে গান** জেগে ওঠে।
৩. “আজ সকালেই সে পালাবে স্থির করেচে” – ‘সে’ বলতে কার কথা বলা হয়েছে? সে কোথায় পালাবে এবং কেন?
‘সে’ বলতে **দিনুবাবু (দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুর)**-এর কথা বলা হয়েছে। দিনুবাবু তাঁর দাঁত তোলাবার জন্য কলকাতায় এসেছিলেন, কিন্তু তিনি কলকাতার কৃত্রিম পরিবেশে থাকতে চাননি, তাই আজ সকালেই **শান্তিনিকেতনে** পালাবেন বলে স্থির করেছেন।
৪. “পৃথিবীর মনের কথাটি শুনতে পাওয়া যাচ্চে” – কখন কবির এমন মনে হয়েছিল?
অনেকদিন বোলপুরের **শুকনো ডাঙায়** কাটিয়ে এসে কবি যখন **আত্রাই নদীর ওপর বোটে** ভাসছিলেন এবং জল-স্থল-আকাশের নিভৃত শ্যামলতার সঙ্গে মিল অনুভব করছিলেন, তখনই তাঁর মনে হয়েছিল যে তিনি **’পৃথিবীর মনের কথাটি’** শুনতে পাচ্ছেন।