বাংলা সাহিত্য (সপ্তম শ্রেণি)
ষষ্ঠ পাঠ (তৃতীয় অংশ): জাতের বজ্জাতি (কাজী নজরুল ইসলাম) – নোটস ও উত্তর
**উৎস:** কবিতা | **বিষয়বস্তু:** জাতিভেদ প্রথা, অস্পৃশ্যতা, ধর্মীয় গোঁড়ামি এবং তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ।
—১. কবিতা পরিচিতি ও সারমর্ম (Core Theme)
কাজী নজরুল ইসলামের **’জাতের বজ্জাতি’** কবিতাটি হলো **ধর্মীয় গোঁড়ামি, জাতপাত ও ছুঁৎমার্গের** বিরুদ্ধে কবির এক **তীক্ষ্ণ বিদ্রোহ**। কবি স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, ধর্ম মানুষের মিলন ঘটাতে পারে না, বরং **’জাত-জালিয়াৎ’** করে মানুষকে বিভক্ত করে ফেলে। কবির কাছে **মানুষের চেয়ে বড়ো** আর কোনো পরিচয় নেই।
মূল বক্তব্য:
- **জাতিভেদের সমালোচনা:** কবি জাতপাতের এই বাড়াবাড়িকে **’বজ্জাতি’** এবং **’জাত-জালিয়াৎ’** বলে আক্রমণ করেছেন। তিনি ব্যঙ্গ করে বলেছেন, **’হুঁকোর জল আর ভাতের হাঁড়ি’**-র মতো তুচ্ছ বিষয় নিয়ে মানুষ জাতিকে **’এক শ’ খান’** করে ফেলেছে।
- **ধর্মের প্রকৃতি:** কবির মতে, প্রকৃত ধর্ম হওয়া উচিত **বর্মের মতো সহনশীল ও মজবুত**। যে ধর্ম **’ছোঁয়া-ছুঁয়ির ছোট্ট ঢিল’**-এ ভেঙে যায়, সেই ধর্ম **’ঠুনকো’** এবং তার কোনো মূল্য নেই।
- **মানবিকতার জয়:** কবি চূড়ান্ত ঘোষণা করেছেন, যদি এমন দুর্বল ও বিভেদ সৃষ্টিকারী ধর্ম বিলুপ্তও হয়ে যায় (**’যাক না সে জাত জাহান্নমে’**), তাতেও তাঁর কোনো পরোয়া নেই। কারণ, **ধর্মের চেয়ে ‘মানুষ’**-ই হলো আসল পরিচয়, এবং মানুষের অস্তিত্বই টিকে থাকবে।
- **ভারতের চিত্র:** জাতিভেদের কারণে ভারতের মানুষরা কীভাবে **’বাসি মড়া’**-র মতো পচে আছে এবং সেখানে মানুষ না থেকে শুধু **’জাত-শেয়ালের হুক্কাহুয়া’** শোনা যাচ্ছে, তার এক করুণ চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।
২. গুরুত্বপূর্ণ শব্দ ও ব্যাখ্যা
- **বজ্জাতি:** দুষ্টুমি, বাড়াবাড়ি (এখানে জাতিভেদের বাড়াবাড়ি)।
- **জাত-জালিয়াৎ:** জাতের নামে প্রতারণা বা ঠকানো।
- **মোয়া:** মিষ্টি এক প্রকার খাদ্য, যা সহজেই হাতের মুঠোর মধ্যে চলে আসে।
- **বেকুব:** বোকা, নির্বোধ।
- **বর্ম:** যুদ্ধের সময় শরীরে পরা রক্ষা কবচ। এখানে ধর্মের দৃঢ়তা বোঝানো হয়েছে।
- **ছোঁওয়া-ছুঁয়ির ছোট্ট ঢিল:** ছুঁৎমার্গ বা অস্পৃশ্যতার মতো তুচ্ছ ও ক্ষণস্থায়ী বিভেদ।
- **ঠুনকো:** দুর্বল, ভঙ্গুর।
- **জাহান্নমে:** নরকে।
- **নাই পরোয়া:** কোনো চিন্তা নেই বা ভয় নেই।
৩. হাতেকলমে (অনুশীলনী প্রশ্ন ও উত্তর)
(অনুশীলনী থেকে নির্বাচিত প্রশ্নের উত্তর নিচে দেওয়া হলো:)
সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন ও উত্তর (মান: ১-২ নম্বর):
১. কবি জাতিভেদের বাড়াবাড়িকে কী বলে চিহ্নিত করেছেন?
কবি জাতিভেদের বাড়াবাড়িকে **’জাতের বজ্জাতি’** এবং **’জাত-জালিয়াৎ’** বলে চিহ্নিত করেছেন।
২. কবির মতে, ধর্ম কিসের মতো হওয়া উচিত?
কবির মতে, ধর্ম **বর্মের** মতো **সহনশীল** হওয়া উচিত।
৩. কবি কীভাবে ভারতকে ব্যঙ্গ করেছেন?
কবি বলেছেন, ভারত জাতিভেদের কারণে **’বাসি মড়া’**-র মতো পচে আছে এবং সেখানে মানুষ না থেকে কেবল **’জাত-শেয়ালের হুক্কাহুয়া’** শোনা যাচ্ছে।
৪. ‘জাত ছেলের হাতের নয় তো মোয়া।’—কথাটির অর্থ কী?
‘মোয়া’ হলো মিষ্টি এবং সহজে ভক্ষণযোগ্য। কবি বলেছেন, **’জাত’** মোয়ার মতো **সহজে ফেলে দেওয়া বা নষ্ট করার জিনিস নয়**। যারা জাতপাতের বাড়াবাড়ি করে, তারা জাতের আসল মূল্য বোঝে না, এবং ভুলভাবে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করতে চায়।
সংক্ষিপ্ত উত্তরধর্মী প্রশ্ন (মান: ৩ নম্বর):
৫. ‘হুঁকোর জল আর ভাতের হাঁড়ি, ভাবলি এতেই জাতির জান’—পঙক্তিটির মধ্য দিয়ে কবি কী বোঝাতে চেয়েছেন?
এই পঙক্তির মধ্য দিয়ে কবি **জাতিভেদের মূর্খতা ও গোঁড়ামি**-কে তীব্র ব্যঙ্গ করেছেন।
- **অন্ধ বিশ্বাস:** যারা মনে করে, **’হুঁকোর জল’** (কার সাথে ধূমপান করা যাবে) বা **’ভাতের হাঁড়ি’** (কার হাতে খাওয়া যাবে) —এইসব তুচ্ছ সামাজিক আচার-নিয়মই **’জাতির প্রাণ’** বা অস্তিত্বকে টিকিয়ে রাখে।
- **ক্ষতি:** কবি এই ধরনের **’বেকুব’** ও **’জাত-জালিয়াৎ’**-দের বোঝাতে চেয়েছেন যে, এইরকম তুচ্ছ বিভেদের কারণেই **’এক জাতিকে এক শ’ খান’** করা হয়েছে এবং ভারত আজ দুর্বল হয়ে আছে।
৬. ‘ধর্ম সে যে বর্ম সম সহনশীল’—ধর্মকে ‘বর্ম’ বলার কারণ কী? এই মন্তব্যের তাৎপর্য ব্যাখ্যা করো।
‘বর্ম’ বলার কারণ: ধর্মকে **’বর্ম’** (যা শরীরকে রক্ষা করে) বলার কারণ হলো, প্রকৃত ধর্ম সবসময় **মজবুত, দৃঢ় এবং সহনশীল** হওয়া উচিত, যাতে কোনো আঘাত বা আক্রমণ তাকে টলাতে না পারে।
- **তাৎপর্য:** কবি বোঝাতে চেয়েছেন, যে ধর্ম **’ছোঁয়া-ছুঁয়ির ছোট্ট ঢিল’**-এর মতো সামান্য আঘাতে ভেঙে যায় বা দূষিত হয়, তা প্রকৃত ধর্ম নয়, বরং **’ঠুনকো’**।
- **আসল ধর্ম:** আসল ধর্ম হলো মানুষের **আত্মিক ও নৈতিক** জীবনকে রক্ষা করে, বিভেদ সৃষ্টি করা নয়। তাই প্রকৃত ধর্মকে অবশ্যই **সহনশীল** হতে হবে।
৭. ‘যাক না সে জাত জাহান্নমে, রইবে মানুষ, নাই পরোয়া।’—কবি কেন এমন চরম মন্তব্য করেছেন?
কবি কাজী নজরুল ইসলাম জাতিভেদের বিরুদ্ধে তাঁর **চূড়ান্ত বিদ্রোহ** ও **মানবিকতার শ্রেষ্ঠত্ব** প্রতিষ্ঠার জন্য এই চরম মন্তব্যটি করেছেন।
- **বিদ্রোহ:** যে ধর্ম বা প্রথা মানুষকে **বিভক্ত করে, শোষণ করে এবং ঘৃণা** ছড়ায়, তার প্রতি কবির কোনো আনুগত্য নেই। সেই বিভেদ সৃষ্টিকারী ধর্ম বিলুপ্ত হলেও তাঁর কোনো দুঃখ নেই।
- **মানবিকতা:** কবির কাছে **’মানুষ’**-এর পরিচয়ই হলো **সর্বশ্রেষ্ঠ**। তিনি মনে করেন, ধর্মীয় বা জাতিগত পরিচয়ের চেয়ে **মানবিক মূল্যবোধ** অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। মানুষের অস্তিত্ব ও ঐক্যই কবির কাছে মুখ্য, তাই এই চরম মন্তব্য।
রচনাধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর (মান: ৫ নম্বর):
৮. ‘জাতের বজ্জাতি’ কবিতায় কাজী নজরুল ইসলামের সমাজ-সচেতন ও বিদ্রোহী চেতনার পরিচয় দাও।
নজরুল ইসলামের ‘জাতের বজ্জাতি’ কবিতাটি তাঁর **সমাজ-সচেতনতা** এবং **বিদ্রোহী চেতনার** এক অন্যতম দলিল:
- **জাতিভেদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ:** কবি জাতিভেদ প্রথাকে **’বজ্জাতি’** এবং **’জাত-জালিয়াৎ’** বলে সরাসরি আক্রমণ করেছেন। তিনি **’হুঁকোর জল আর ভাতের হাঁড়ি’**-র মতো তুচ্ছ বিষয় নিয়ে বিভেদ সৃষ্টিকারীদের **’বেকুব’** ও **’জাত-শেয়াল’** বলে ব্যঙ্গ করেছেন।
- **ধর্মের প্রকৃত স্বরূপ প্রতিষ্ঠা:** তিনি ধর্মকে **বর্মের মতো সহনশীল** হতে বলেছেন। তাঁর মতে, যে ধর্ম **’ছোঁয়া-ছুঁয়ির ছোট্ট ঢিল’**-এ ভেঙে যায়, তা দুর্বল (ঠুনকো) এবং সেই ধর্মের কোনো মূল্য নেই। এই বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি **ধর্মীয় গোঁড়ামির** বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছেন।
- **মানবিকতার শ্রেষ্ঠত্ব:** নজরুলের বিদ্রোহী চেতনার মূল ভিত্তি হলো **মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব**। তিনি বলেছেন, বিভেদ সৃষ্টিকারী জাত **’জাহান্নমে’** গেলেও তাঁর পরোয়া নেই, কারণ **’রইবে মানুষ’**। কবির কাছে মানুষই শেষ কথা, যা তাঁর **বিপ্লবী মানবতাবাদকে** তুলে ধরে।
- **সমাজের প্রতি হতাশা:** কবি হতাশ হয়ে দেখেছেন যে, জাতিভেদের কারণে ভারত **’বাসি মড়া’**-র মতো পচে আছে এবং সেখানে **মানুষের ঐক্য** নেই। তাঁর কবিতা এই হতাশা দূর করে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানায়।
এভাবে, নজরুল তাঁর **অগ্নিময় ভাষা** ও **তীক্ষ্ণ ব্যঙ্গের** মাধ্যমে সমাজের অকল্যাণকর প্রথার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে এক **সুস্থ ও মানবিক** সমাজ গঠনের বার্তা দিয়েছেন।