ষষ্ঠ পাঠ: স্মৃতিচিহ্ন (নোট)
প্রসেসিং হচ্ছে…

বাংলা সাহিত্য (সপ্তম শ্রেণি)

ষষ্ঠ পাঠ: স্মৃতিচিহ্ন (কামিনী রায়) – নোটস ও উত্তর

**উৎস:** কবিতা | **বিষয়বস্তু:** মানব-কীর্তির অস্থায়িত্ব এবং জনকল্যাণের মাধ্যমে হৃদয়ে আসন পাওয়ার অমরতা।

১. কবিতা পরিচিতি ও সারমর্ম (Core Theme)

কামিনী রায় রচিত **’স্মৃতিচিহ্ন’** কবিতাটি মানব জীবনের **নশ্বরতা** এবং **অমরত্বের প্রকৃত পথ** নিয়ে রচিত। কবি দেখিয়েছেন যে, মানুষ যত চেষ্টাই করুক না কেন, **ইট-পাথরের তৈরি সৌধ** বা বিশাল অট্টালিকা দিয়ে নিজের নাম চিরকাল ধরে রাখা যায় না। সময়ের স্রোতে সেইসব কীর্তিচিহ্ন ভেঙে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যায়।

মূল বক্তব্য:

  • **অস্থায়ী কীর্তি:** যারা **’মনোহর হর্ম্যরূপে’** বা বিশাল অট্টালিকা তৈরি করে নাম রাখতে চেয়েছিল, তারা ছিল **’মূঢ়’** এবং তাদের মনস্কামনা ছিল **’ব্যর্থ’**। সময়ের স্রোতে (কাল-নদী জলে) তাদের কীর্তি ধুয়ে যায়।
  • **অমরত্বের পথ:** যারা নিজেদের নাম নয়, বরং **দরিদ্র মানুষের সেবায়** জীবন উৎসর্গ করে মানুষের হৃদয়ে **’দৃঢ় সিংহাসন’** প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছে, তারাই প্রকৃত অর্থে অমর।
  • **অক্ষুণ্ণ রাজত্ব:** এই দরিদ্র মানুষরা যদিও **’সহায়-সম্বলহীন’** ছিল এবং পাথর জড়ো করার সামর্থ্য তাদের ছিল না, তবুও তাদের **মানবিকতার রাজত্ব** অক্ষুণ্ণ রয়েছে। **কালস্রোত** তাদের স্মৃতিকে ধুয়ে নিতে পারে না, বরং তাদের নাম **’নিত্য সমুজ্জ্বল’** হয়ে থাকে।

২. গুরুত্বপূর্ণ শব্দ ও ব্যাখ্যা

  • **হর্ম্য:** অট্টালিকা, বিশাল প্রাসাদ।
  • **ইষ্টক-প্রস্তরে:** ইট ও পাথরের সাহায্যে।
  • **মূঢ়:** মূর্খ, নির্বোধ।
  • **মনস্কাম:** মনের ইচ্ছা বা বাসনা।
  • **ভগ্ন স্তূপ:** ভেঙে যাওয়া ধ্বংসাবশেষ।
  • **কাল-নদী:** সময়ের স্রোত বা কালস্রোত।
  • **সম্বল:** সহায়, পুঁজি।
  • **অক্ষুণ্ণ:** অবিনশ্বর, যা ক্ষয় হয় না।
  • **নিত্য সমুজ্জ্বল:** চিরকাল উজ্জ্বল।

৩. হাতেকলমে (অনুশীলনী প্রশ্ন ও উত্তর)

(অনুশীলনী থেকে নির্বাচিত প্রশ্নের উত্তর নিচে দেওয়া হলো:)

সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন ও উত্তর (মান: ১-২ নম্বর):

১. কবিতায় কবি কাদের ‘মূঢ়’ ও ‘ব্যর্থ মনস্কাম’ বলেছেন? [২ নম্বর]

যারা নিজেদের **নাম চিরকাল ধরে রাখার জন্য** বিশাল **ইট-পাথরের সৌধ** বা মনোহর অট্টালিকা তৈরি করেছিল, কবি তাদের **’মূঢ়’** ও **’ব্যর্থ মনস্কাম’** বলেছেন।

২. তাদের স্মৃতি কীভাবে লুপ্ত হয়ে যায়? [২ নম্বর]

তাদের তৈরি **ইট-পাথরের সৌধগুলি** সময়ের স্রোতে (কাল-নদী জলে) ভেঙে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে **ভগ্ন স্তূপে** পরিণত হয়। আর সেইসব স্তূপের তলে তাদের **স্মৃতি লুপ্ত** হয়ে যায়।

৩. কারা মানুষের মনে চিরস্থায়ী আসন লাভ করে? [২ নম্বর]

যাঁরা **সম্পদহীন ও দরিদ্র** হওয়া সত্ত্বেও **জনকল্যাণমূলক কাজের** মাধ্যমে মানুষের হৃদয়ে **দৃঢ় সিংহাসন** প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছেন, তারাই মানুষের মনে চিরস্থায়ী আসন লাভ করে।

৪. কবিতায় ‘শুষ্ক তৃণ’ বলতে কবি কী বুঝিয়েছেন? [২ নম্বর]

কবিতায় **’শুষ্ক তৃণ’** বলতে কবি **তুচ্ছ, মূল্যহীন এবং ক্ষণস্থায়ী বস্তুকে** বুঝিয়েছেন। তিনি বোঝাতে চেয়েছেন, কালস্রোতে লুপ্ত হয়ে যাওয়া সেইসব ধনী মানুষের কীর্তি, যা একসময় অহংকারী ছিল, আজ **শুষ্ক তৃণের** মতোই মূল্যহীন হয়ে ভেসে যায়।

সংক্ষিপ্ত উত্তরধর্মী প্রশ্ন (মান: ৩ নম্বর):

৫. ‘কালস্রোতে ধৌত নাম নিত্য সমুজ্জ্বল।’—এই উক্তিটির তাৎপর্য বিশ্লেষণ করো। [৩ নম্বর]

**তাৎপর্য:** এটি হলো কবির **অমরত্বের দর্শন**।

  • **নিত্য সমুজ্জ্বল:** যেসব মানুষ নিজেদের জন্য কীর্তি না করে **দরিদ্র ও সাধারণ মানুষের সেবায়** জীবন উৎসর্গ করেছেন, তাদের নাম সময়ের স্রোত (কালস্রোত) ধুয়ে নিতে পারে না।
  • **অমরতা:** মানুষের হৃদয়ে প্রতিষ্ঠিত এই **মানবীয় কীর্তি** স্থায়ী হয় এবং চিরকাল **’নিত্য সমুজ্জ্বল’** (চির উজ্জ্বল) হয়ে থাকে।
  • **মূল্যবোধ:** এই উক্তি প্রমাণ করে যে, **ইট-পাথরের সৌধের চেয়ে মানবিক মূল্যবোধ ও জনকল্যাণ** অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

৬. ‘মানব হৃদয়-ভূমি করি অধিকার’—কারা, কীভাবে মানবহৃদয় ভূমি অধিকার করে? [৩ নম্বর]

**যারা অধিকার করে:** সহায়-সম্বলহীন, **দরিদ্র** কিন্তু **উদার ও জনকল্যাণকামী** মানুষ।

**যেভাবে অধিকার করে:**

  • তারা **ধন-সম্পদ** বা **অট্টালিকা** তৈরি করে নাম রাখতে চায়নি।
  • তারা তাদের **ত্যাগ, সেবা ও ভালোবাসার** মাধ্যমে মানুষের হৃদয়ে স্থায়ীভাবে আসন বা **’দৃঢ় সিংহাসন’** প্রতিষ্ঠা করে।

এই অধিকার **জোর করে হয় না**, বরং মানুষের প্রতি **নিঃস্বার্থ কল্যাণের** মাধ্যমে অর্জিত হয়।

৭. কবির দৃষ্টিতে নশ্বর মানুষ কীভাবে অমরতা লাভ করতে পারে তা লেখো। [৩ নম্বর]

নশ্বর মানুষ অমরতা লাভ করতে পারে **জনকল্যাণমূলক কাজ ও আত্মত্যাগের** মাধ্যমে:

  • **ভগ্ন স্তূপ পরিহার:** ইট-পাথরের সৌধ তৈরি করে নয়, কারণ তা কালস্রোতে ভেঙে যায়।
  • **হৃদয়ে প্রতিষ্ঠা:** **দরিদ্র ও অসহায় মানুষের সেবায়** জীবন উৎসর্গ করার মাধ্যমে মানুষের হৃদয়ে **ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতার** আসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

এইভাবে মানুষ অমরত্ব লাভ করে এবং তাদের নাম **কাল-নদীর জলে** ভেসে না গিয়ে **নিত্য সমুজ্জ্বল** হয়ে থাকে।

রচনাধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর (মান: ৫ নম্বর):

৮. ‘স্মৃতিচিহ্ন’ কবিতার মূল ভাব বিশ্লেষণ করো এবং নামকরণের সার্থকতা বিচার করো। [৫ নম্বর]

**কবিতার মূল ভাব:**

কবিতার মূল ভাব হলো **বস্তুগত কীর্তির অস্থায়িত্ব** এবং **মানবিক কাজের স্থায়িত্ব**। কবি দেখিয়েছেন, যারা বিশাল অট্টালিকা তৈরি করে নিজেদের নাম রাখতে চেয়েছিল, তারা ছিল নির্বোধ। কারণ, কালস্রোতে সেসব কীর্তিচিহ্ন ভেঙে ধ্বংসাবশেষে পরিণত হয়। অন্যদিকে, যারা সাধারণ মানুষ ও দরিদ্রের জন্য ভালো কাজ করে মানুষের হৃদয়ে স্থান পেয়েছে, তাদের কীর্তিচিহ্ন **অবিনশ্বর** হয়ে থাকে।

**নামকরণের সার্থকতা:**

কবিতাটির নামকরণ **’স্মৃতিচিহ্ন’** অত্যন্ত সার্থক ও ব্যঞ্জনাময়:

  • **দ্বৈত ব্যঞ্জনা:** ‘স্মৃতিচিহ্ন’ শব্দটির দ্বৈত ব্যঞ্জনা রয়েছে। প্রথমে এটি **ইট-পাথরের সৌধ** (যা অস্থায়ী) এবং পরে এটি **মানবহৃদয়ে তৈরি হওয়া স্থায়ী আসন** (যা অমর) বোঝায়।
  • **অস্থায়ী চিহ্ন:** যারা মনোহর হর্ম্য তৈরি করেছিল, তাদের কীর্তি হলো **’ব্যর্থ মনস্কাম’**-এর প্রতীক বা **’ভগ্ন স্তূপ’**—যা অস্থায়ী স্মৃতিচিহ্ন।
  • **স্থায়ী চিহ্ন:** যারা জনকল্যাণ করেছে, তাদের নাম **’কালস্রোতে ধৌত নাম নিত্য সমুজ্জ্বল’**—এরাই হলেন প্রকৃত অমর স্মৃতিচিহ্ন।

অর্থাৎ, কবি ইট-পাথরের স্মৃতিচিহ্নকে তুচ্ছ করে **মানব হৃদয়ের স্মৃতিচিহ্নকে** শ্রেষ্ঠ আসনে বসিয়েছেন। এই তুলনাকে প্রতিষ্ঠা করার জন্যই নামকরণটি সার্থক হয়েছে।

BISWAZ GROWTH ACADEMY - Class Menu
BISWAZ GROWTH ACADEMY - Class Menu