পঞ্চম পাঠ: দুটি গানের জন্মকথা (নোট)
প্রসেসিং হচ্ছে…

বাংলা সাহিত্য (সপ্তম শ্রেণি)

পঞ্চম পাঠ: দুটি গানের জন্মকথা (রামকুমার চট্টোপাধ্যায়) – নোটস ও উত্তর

**উৎস:** প্রবন্ধ/স্মৃতিচারণ | **বিষয়বস্তু:** রবীন্দ্রনাথের ‘জনগণমন’ ও ‘আমার সোনার বাংলা’ গানের জন্ম-ইতিহাস এবং ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট।

১. প্রবন্ধ পরিচিতি ও সারমর্ম (Core Theme)

রামকুমার চট্টোপাধ্যায়ের এই প্রবন্ধটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা দুটি ঐতিহাসিক গান—**’জনগণমন অধিনায়ক জয় হে’ (ভারতের জাতীয় সংগীত)** এবং **’আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি’ (বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত)**-এর জন্ম এবং তার সাথে জড়িত বিতর্কের কথা তুলে ধরেছে। লেখক দেখিয়েছেন কীভাবে দুটি গানই কেবল সুর ও কাব্য নয়, বরং **জাতীয় চেতনা ও ঐতিহাসিক মুহূর্তের** প্রতীক হয়ে উঠেছে।

মূল বক্তব্য:

  • **’জনগণমন’ (ভারত):** এই গানটি ১৯১১ সালের **২৬তম বার্ষিক জাতীয় কংগ্রেসের অধিবেশনে** প্রথম গাওয়া হয়। বিতর্কের জন্ম হয়েছিল যখন রবীন্দ্রনাথের বিরোধীগণ প্রচার করেন যে এটি **সম্রাট পঞ্চম জর্জের** আগমন উপলক্ষ্যে রচিত। রবীন্দ্রনাথ পরে চিঠি লিখে স্পষ্ট করেন যে, তিনি **ভারতভাগ্যবিধাতার** জয় ঘোষণা করেছেন, কোনো মানুষের (জর্জ) নয়। এই গান **’The Morning Song of India’** নামে পরিচিত ছিল।
  • **’আমার সোনার বাংলা’ (বাংলাদেশ):** বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে ১৯০৫ সালের **২৫ আগস্ট** গানটি রচিত হয়। সরলা দেবীর স্মৃতিচারণ অনুযায়ী, গানটির সুর রবীন্দ্রনাথ মাঝি বা বাউলের গান থেকে আহরণ করেছিলেন। এই গানটি ১৯৭১ সালে **স্বাধীন বাংলাদেশের** জাতীয় সংগীত হিসেবে গৃহীত হয়।

২. গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র ও স্থান

  • **রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর:** দুটি গানেরই স্রষ্টা। তাঁর গানের মাধ্যমে জাতীয় চেতনা ও স্বদেশপ্রেম প্রকাশ পেয়েছে।
  • **সরলা দেবী:** রবীন্দ্রনাথের ভাগনি। তাঁর স্মৃতিচারণায় ‘আমার সোনার বাংলা’ গানের সুরের উৎস জানা যায়।
  • **দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুর:** রবীন্দ্রনাথের গানের স্বরলিপিকার, যিনি ‘জনগণমন’ গানের রিহার্সালে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।
  • **সম্রাট পঞ্চম জর্জ:** যার আগমন উপলক্ষ্যে ‘জনগণমন’ গানটি রচিত হয়েছিল বলে ভুল ধারণা তৈরি হয়েছিল।
  • **কলকাতার জাতীয় কংগ্রেস (১৯১১):** যেখানে ‘জনগণমন’ প্রথম গাওয়া হয়।
  • **গিরিডি (১৯০৫):** যেখানে রবীন্দ্রনাথ ‘আমার সোনার বাংলা’ গানটি রচনা করেন।

৩. হাতেকলমে (অনুশীলনী প্রশ্ন ও উত্তর)

(অনুশীলনী থেকে নির্বাচিত প্রশ্নের উত্তর নিচে দেওয়া হলো:)

সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন ও উত্তর (মান: ১-২ নম্বর):

১. ভারতবর্ষের জাতীয় সংগীতটি কোন্ উপলক্ষে প্রথম গাওয়া হয়েছিল? [১ নম্বর]

ভারতবর্ষের জাতীয় সংগীতটি ১৯১১ সালের **২৬তম বার্ষিক জাতীয় কংগ্রেসের** অধিবেশনে প্রথম গাওয়া হয়েছিল।

২. রবীন্দ্রনাথ ‘জনগণমন’র যে ইংরাজি নামকরণ করেন সেটি লেখো। [১ নম্বর]

রবীন্দ্রনাথ ‘জনগণমন’ গানটির ইংরেজি নামকরণ করেন **’The Morning Song of India’**।

৩. ‘তত্ত্ববোধিনী’ পত্রিকায় ভারতবর্ষের জাতীয় সংগীতটির কোন্ পরিচয় দেওয়া হয়েছিল? [১ নম্বর]

‘তত্ত্ববোধিনী’ পত্রিকায় এই গানটির পরিচয় **ব্রহ্মসংগীত** হিসেবে দেওয়া হয়েছিল।

৪. ‘আমার সোনার বাংলা’ গানটি কোন ঐতিহাসিক আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে রচিত? [১ নম্বর]

‘আমার সোনার বাংলা’ গানটি **বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের** (১৯০৫) পরিপ্রেক্ষিতে রচিত।

সংক্ষিপ্ত উত্তরধর্মী প্রশ্ন (মান: ৩ নম্বর):

৫. ‘জনগণমন’কে জাতীয় সংগীত রূপে গ্রহণ করতে বিরোধিতা হয়েছিল কেন? রবীন্দ্রনাথের ব্যাখ্যায় সেই বিরোধিতার অবসান কীভাবে ঘটেছিল? [৩ নম্বর]

বিরোধিতার কারণ: রবীন্দ্রনাথের বিরোধীগণ প্রচার করেছিলেন যে, গানটি **সম্রাট পঞ্চম জর্জের** আগমন উপলক্ষ্যে রচিত হয়েছিল, যা জাতীয়তাবাদের বিরোধী।

অবসান: রবীন্দ্রনাথ পরে চিঠি লিখে স্পষ্ট করেন যে, তিনি কোনো মানব সম্রাট বা **’পঞ্চম বা ষষ্ঠ বা কোনো জর্জই’**-এর জয় ঘোষণা করেননি। তিনি জয় ঘোষণা করেছেন সেই **’ভারতভাগ্যবিধাতার’**—যিনি যুগ-যুগান্তরের মানব ভাগ্যরথচালক। এই ব্যাখ্যায় বিরোধিতার অবসান ঘটেছিল।

৬. ‘আমার সোনার বাংলা’ গানটির সুরের উৎস কী ছিল? এটি কীভাবে ঐতিহাসিক তাৎপর্য লাভ করে? [৩ নম্বর]

সুরের উৎস: সরলা দেবীর স্মৃতিচারণ অনুযায়ী, গানটির সুর রবীন্দ্রনাথ চুঁচুড়ায় থাকাকালীন তাঁর **বোটের মাঝির কাছ থেকে আহরিত বাউলের গান** থেকে গ্রহণ করেছিলেন।

ঐতিহাসিক তাৎপর্য: গানটি **বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের** পরিপ্রেক্ষিতে রচিত হয়েছিল। ১৯৭১ সালে এটি **স্বাধীন বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত** হিসেবে গৃহীত হয়, যা এটিকে এক অসাধারণ ঐতিহাসিক মর্যাদা এনে দেয়।

৭. ‘জনগণমন’ গানটি কলকাতার বাইরে আর কোথায় কোথায় বিশেষ মর্যাদা পেয়েছিল? [৩ নম্বর]

‘জনগণমন’ গানটি কলকাতার বাইরেও বিশেষ মর্যাদা পেয়েছিল:

  • **মদনপল্লী (ভারত):** ১৯১৯ সালে রবীন্দ্রনাথ সেখানে গেলে, গানটির সুর ও অর্থগৌরব কলেজ কর্তৃপক্ষকে অভিভূত করে। গানটি সেখানে **’The Morning Song of India’** নামে প্রতিদিনের অ্যাসেম্বলি সং হিসেবে গৃহীত হয়।
  • **সোভিয়েট রাশিয়া (মস্কো):** ১৯৩০ সালে মস্কোয় অনাথ বালক-বালিকাদের অনুরোধে রবীন্দ্রনাথ এই গানটি গেয়ে শুনিয়েছিলেন।

রচনাধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর (মান: ৫ নম্বর):

৮. রবীন্দ্রনাথের দুটি গান কীভাবে ভারতের জাতীয় চেতনা ও ঐতিহাসিক মুহূর্তের প্রতীক হয়ে উঠেছে—’দুটি গানের জন্মকথা’ প্রবন্ধ অবলম্বনে বিশ্লেষণ করো। [৫ নম্বর]

রবীন্দ্রনাথের ‘জনগণমন’ ও ‘আমার সোনার বাংলা’ দুটি গানই কেবল সাহিত্য বা সঙ্গীত নয়, বরং **জাতীয় চেতনা ও ইতিহাসের** এক উজ্জ্বল প্রতীক:

  1. **’জনগণমন’ ও অসাম্প্রদায়িক জাতীয়তাবোধ:**
    • **জাতীয় কংগ্রেসের সভা:** গানটি ১৯১১ সালে জাতীয় কংগ্রেসের অধিবেশনে প্রথম গাওয়া হয়, যা এটিকে সরাসরি **ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম** ও **জাতীয়তাবাদের** সঙ্গে যুক্ত করে।
    • **বিতর্কের অবসান:** সম্রাট পঞ্চম জর্জকে জয় জানাতে গানটি লেখা হয়েছে—এই বিতর্ককে রবীন্দ্রনাথ খারিজ করে দিয়ে বলেন, তিনি **ভারতভাগ্যবিধাতার** জয়গান করেছেন। এই ব্যাখ্যা **অসাম্প্রদায়িক ও সর্বজনীন জাতীয়তাবোধ** প্রতিষ্ঠা করে।
  2. **’আমার সোনার বাংলা’ ও স্বদেশী আন্দোলন:**
    • **বঙ্গভঙ্গ বিরোধীতা:** গানটি ১৯০৫ সালের **বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের** তীব্র আবেগের মুহূর্তে রচিত হয়। এটি অবিভক্ত বাংলার মানুষের কাছে **ঐক্য ও স্বদেশপ্রেমের** প্রতীক ছিল।
    • **ঐতিহাসিক স্বীকৃতি:** গানটির প্রথম দশ পঙক্তি **১৯৭১ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত** হিসেবে গৃহীত হয়।

এইভাবে, একটি গান **ভারতের সর্বজনীন আত্মার** জয়গান গেয়েছে এবং অন্যটি **বাঙালি জাতির আত্মপরিচয় ও মুক্তির** প্রতীক হয়ে উঠেছে। দুটি গানই ঐতিহাসিক মুহূর্তের সৃষ্টি এবং জাতীয় চেতনার প্রধান বাণীবাহক।

BISWAZ GROWTH ACADEMY - Class Menu
BISWAZ GROWTH ACADEMY - Class Menu