বাংলা সাহিত্য (সপ্তম শ্রেণি)
চতুর্থ পাঠ (তৃতীয় অংশ): মেঘ-চোর (সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়) – নোটস ও উত্তর
**উৎস:** কল্পবিজ্ঞান গল্প | **বিষয়বস্তু:** বিজ্ঞানের ক্ষমতা, জলবায়ুর নিয়ন্ত্রণ, অহংকারী বিজ্ঞানীর উচ্চাকাঙ্ক্ষা এবং মানবিক মূল্যবোধের জয়।
—১. গল্প পরিচিতি ও সারমর্ম (Core Theme)
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের **’মেঘ-চোর’** গল্পটি একজন **অহংকারী বিজ্ঞানীর** সীমাহীন ক্ষমতা দখলের বাসনা এবং একজন **মানবিক চেতনার** ছাত্রীর প্রতিরোধের কাহিনী। গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র **বৃষ্টিবিজ্ঞানী পুরন্দর চৌধুরি** মেঘ চুরি করে সাহারায় বৃষ্টি ঝরিয়েছিলেন এবং প্রতিশোধের বশে পৃথিবীর জলবায়ু নিয়ন্ত্রণ করতে চেয়েছিলেন। গল্পটি মূলত বিজ্ঞানকে **মানবকল্যাণে** ব্যবহার করার বার্তা দেয়, যেখানে ব্যক্তিগত অহংকার ও প্রতিশোধের চেয়ে **প্রকৃতির ভারসাম্য** এবং **নৈতিকতা** অধিক মূল্যবান।
মূল বক্তব্য:
- **মেঘ-চোর:** পুরন্দর চৌধুরী সাইবেরিয়া থেকে মেঘ তাড়িয়ে এনে সাহারায় বৃষ্টিপাত ঘটিয়েছিলেন, তাই রাষ্ট্রসঙ্ঘের কিছু দেশ তাকে **’মেঘ-চোর’** বলে নিন্দা করে।
- **প্রতিশোধ ও অহংকার:** পুরন্দর চৌধুরী তার প্রতিপক্ষ বিজ্ঞানী **কারপভ**-কে জব্দ করার জন্য এবং নিজের জ্ঞান জাহির করার অহংকারে আলাস্কার **লেক শ্রেভার**-এর বিশাল জলকে বাষ্প করে সাইবেরিয়াতে পাঠিয়ে পৃথিবীর জলবায়ু নষ্ট করার পরিকল্পনা করেন।
- **অসীমার ভূমিকা:** অসীমা (আসলে কারপভের মেয়ে) ছদ্মবেশে পুরন্দরের ভাইঝি সেজে তার সঙ্গে ছিল। সে পুরন্দরের এই ধ্বংসাত্মক পরিকল্পনা বুঝতে পেরে শেষ মুহূর্তে তাকে বাধা দেয়।
- **মানবিকতার জয়:** অসীমা রকেটকে বায়ুমণ্ডলের ওপরে নিয়ে গিয়ে পুরন্দরের তৈরি **ধাতব বল** (যা জলকে বাষ্প করে) অকেজো করে দেয়। সে প্রমাণ করে যে, **প্রকৃতির ধ্বংস একটি অপরাধ** এবং ব্যক্তিগত অহংকারের চেয়ে **প্রকৃতির ভারসাম্য** রক্ষা করা জরুরি।
২. গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র ও ব্যাখ্যা
- **পুরন্দর চৌধুরী:** বিজ্ঞানী। তিনি **বৃষ্টিবিজ্ঞানী** হিসেবে বিখ্যাত। অহংকারী, আত্মবিশ্বাসী এবং ব্যক্তিগত প্রতিশোধের বশে পরিবেশ ধ্বংসকারী বিজ্ঞানীর প্রতীক।
- **অসীমা (আসলে কারপভের মেয়ে):** ইতিহাস ও কম্পিউটারে আগ্রহী ছাত্রী। **মানবিকতা ও পরিবেশ রক্ষার** প্রতীক। ছদ্মবেশে পুরন্দরকে বাধা দিয়ে পৃথিবীর ভারসাম্য রক্ষা করে।
- **দিবিজয়:** পুরন্দরের নিরুদ্দেশ ভাই।
- **কারপভ:** পুরন্দরের প্রতিপক্ষ বিজ্ঞানী, যিনি তাকে প্রথম ‘মেঘ-চোর’ বলে নিন্দা করেন।
- **মাউন্ট চেম্বারলিন ও লেক শ্রেভার:** আলাস্কার শৃঙ্গ ও হ্রদ, পুরন্দরের পরীক্ষার স্থান।
- **ধাতব বল (অ্যালয়):** মার্কারি ও আরও এগারোটি ধাতুর মিশ্রণে তৈরি বল, যা জলের সংস্পর্শে এসে উত্তাপ সৃষ্টি করে জলকে বাষ্পীভূত করতে পারে।
৩. হাতেকলমে (অনুশীলনী প্রশ্ন ও উত্তর)
(অনুশীলনী থেকে নির্বাচিত প্রশ্নের উত্তর নিচে দেওয়া হলো:)
সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন ও উত্তর (মান: ১-২ নম্বর):
১. পুরন্দর চৌধুরির সংক্ষিপ্ত পরিচয় দাও।
**পুরন্দর চৌধুরি** ছিলেন একজন বিখ্যাত **বৃষ্টিবিজ্ঞানী**। তিনি সাহারা মরুভূমিতে মেঘ তাড়িয়ে এনে বৃষ্টিপাত ঘটিয়েছিলেন। তিনি ছিলেন অহংকারী এবং তার চোখের মণি ছিল নীল। তার বয়স ছিল পঞ্চাশের কাছাকাছি।
২. অসীমা সম্বন্ধে দু-একটি বাক্য লেখো।
**অসীমা** ছিল আমেরিকার হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাস নিয়ে গবেষণা করা ছাত্রী। তার বয়স ছিল সাতাশ। সে আসলে প্রতিপক্ষ বিজ্ঞানী কারপভের মেয়ে। সে মানবিক চেতনার দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে পুরন্দরের পরিবেশ ধ্বংসের পরিকল্পনাকে ব্যর্থ করে দেয়।
৩. পুরন্দর কী সাঙ্ঘাতিক কাণ্ড করেছেন?
পুরন্দর চৌধুরী অন্য দেশ থেকে মেঘ তাড়িয়ে এনে সাহারা মরুভূমিতে এক মাসে একশো ইঞ্চি বৃষ্টিপাত ঘটিয়েছিলেন। এই কাজটি পৃথিবীর জলবায়ুর ভারসাম্য নষ্ট করায় রাষ্ট্রসঙ্ঘে নিন্দা শুরু হয়।
৪. পুরন্দরের তৈরি গোলকটি এয়ারটাইট রাখতে হয় কেন?
পুরন্দরের তৈরি গোলকটি এমন একটি **অ্যালয় (ধাতু সঙ্কর)** দিয়ে তৈরি, যা বাতাসের **জলকণা**-র সংস্পর্শে এলেই গরম হতে শুরু করে। তাই অনাবশ্যক উত্তাপ এবং বিস্ফোরণ এড়াতে গোলকটিকে **বায়ুনিরোধক (এয়ারটাইট)** অবস্থায় রাখতে হয়।
সংক্ষিপ্ত উত্তরধর্মী প্রশ্ন (মান: ৩ নম্বর):
৫. অসীমা কেন পুরন্দরকে মেঘ-চোর বলেছিল? পুরন্দর এর উত্তরে কী জবাব দিয়েছিলেন?
অসীমার মন্তব্য: অসীমা বলেছিলেন, পুরন্দর একবার এই ধরনের কাজ শুরু করলে, এরপর যে-কোনো দেশ অন্য দেশের মেঘ চুরি করতে শুরু করবে এবং সে দেশের মানুষের অবস্থা খারাপ হবে—তাই তাকে ‘মেঘ-চোর’ বলা যায়।
পুরন্দরের জবাব: পুরন্দর অহংকারের সঙ্গে জবাব দেন, তিনি অন্যায় কিছু করেননি। সাইবেরিয়ায় অত বরফ, সেখানে বৃষ্টি না হলে ক্ষতি কী আছে? বরং তিনি পৃথিবীর মানুষকে শিখিয়ে দেবেন, মেঘ চুরি হলেও যাতে কোনো ক্ষতি না হয়।
৬. পুরন্দরের তৈরি ধাতব বলটির বৈশিষ্ট্য কী ছিল? এই বল নিয়ে তিনি কী করতে চেয়েছিলেন?
ধাতব বলের বৈশিষ্ট্য: এই গোলকটি **মার্কারি (পারদ)**-এর সঙ্গে আরও এগারোটি ধাতু মিশিয়ে তৈরি একটি **নতুন অ্যালয়** (ধাতু সঙ্কর)। এর গুণ হলো, **জলের ছোঁয়া লাগলেই এটি গরম হতে শুরু করে** এবং উত্তাপ এত বাড়ে যে জল বাষ্প হয়ে যায়।
পরিকল্পনা: এই বলটি নিয়ে পুরন্দর আলাস্কার **লেক শ্রেভার**-এর জলে ছুঁড়ে ফেলতে চেয়েছিলেন। এর ফলে হ্রদের সমস্ত বরফ ও জল **পাঁচ মিনিটে বাষ্প** হয়ে যাবে, যা তিনি সাইবেরিয়াতে পাঠিয়ে দেবেন।
৭. পুরন্দর চৌধুরী কেন নিজেকে ‘আকাশের দেবতা ইন্দ্র’ বলে কল্পনা করেছিলেন?
পুরন্দর চৌধুরী নিজের সীমাহীন বৈজ্ঞানিক ক্ষমতা ও অহংকার প্রকাশের জন্য নিজেকে **’আকাশের দেবতা ইন্দ্র’** বলে কল্পনা করেছিলেন।
- **ক্ষমতা:** পুরন্দর মনে করতেন, তার কাছে সেই বিশাল মেঘের অধিকার থাকলে, তিনি পৃথিবীর **সব মেঘ একসঙ্গে জুড়ে নিতে** পারেন।
- **নিয়ন্ত্রণ:** তখন কোথায়, কখন বৃষ্টি হবে, তা তিনি ঠিক করতে পারবেন। তিনি ইচ্ছে করলে তার প্রতিপক্ষ বিজ্ঞানীদের দেশে **এক ফোঁটাও বৃষ্টি** না দিতে পারেন।
বৃষ্টির দেবতা ইন্দ্রের মতো পৃথিবীর জলবায়ু নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা তার হাতে আছে বলেই তিনি এই অহংকারী তুলনাটি করেছিলেন।
রচনাধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর (মান: ৫ নম্বর):
৮. ‘মেঘ-চোর’ গল্পে Purandar Chowdhury এবং Asima আসলে দুটি পৃথক বিজ্ঞান চেতনার প্রতিনিধিত্ব করেছেন—আলোচনা করো।
‘মেঘ-চোর’ গল্পে Purandar Chowdhury এবং Asima আধুনিক বিজ্ঞানের দুটি পরস্পরবিরোধী চেতনার প্রতিনিধিত্ব করেছেন:
- **পুরন্দর চৌধুরী (অহংকারী বিজ্ঞান):**
- **নীতি:** বিজ্ঞানকে **ব্যক্তিগত অহংকার, প্রতিশোধ ও ক্ষমতা** লাভের জন্য ব্যবহার করা।
- **লক্ষ্য:** প্রকৃতিকে বশ করা বা ধ্বংস করে জলবায়ু নিজের হাতে নিয়ন্ত্রণ করা। Purandar চৌধুরী ছিলেন সেই বিজ্ঞানীর প্রতীক, যিনি আবিষ্কারের নৈতিক দিক নিয়ে ভাবেন না।
- **পরিণতি:** তাঁর আবিষ্কার পৃথিবীর **বিপর্যয়** ডেকে আনতে পারত।
- **অসীমা (মানবিক বিজ্ঞান):**
- **নীতি:** বিজ্ঞানকে **মানবিকতা ও পরিবেশ রক্ষার** জন্য ব্যবহার করা।
- **লক্ষ্য:** ব্যক্তিগত প্রতিশোধ বা অহংকারের ঊর্ধ্বে উঠে **প্রকৃতির ভারসাম্য** রক্ষা করা। অসীমা সেই মানবিক চেতনার প্রতীক, যা বিজ্ঞানকে **কল্যাণমুখী** করতে চায়।
- **জয়:** তিনি বুদ্ধিমত্তা (কম্পিউটার জ্ঞান) ও নৈতিকতার জোরে পুরন্দরের ধ্বংসাত্মক পরিকল্পনাকে ব্যর্থ করে দেন।
গল্পে অসীমার জয় প্রমাণ করে যে, বিজ্ঞানকে যদি **মানবিকতা ও নৈতিকতার** পথে পরিচালিত না করা হয়, তবে তা সমগ্র পৃথিবীর জন্য বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে।
৯. ‘বিজ্ঞান মানুষকে দিয়েছে অমিত বল, কিন্তু অযোগ্য মানুষের হাতে সেই ক্ষমতা হয়ে উঠতে পারে বিপজ্জনক এবং প্রাণঘাতী’—পঠিত গল্পটি অবলম্বনে উপরের উদ্ধৃতিটি বিশ্লেষণ করো।
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘মেঘ-চোর’ গল্পে এই উক্তিটির সত্যতা স্পষ্ট। এখানে **’অমিত বল’** হলো Purandar চৌধুরির সেই বৈজ্ঞানিক ক্ষমতা, যার সাহায্যে তিনি মেঘ চুরি করতে পারেন এবং মার্কারি ও আরও এগারোটি ধাতুর মিশ্রণে তৈরি একটি **ধ্বংসাত্মক অ্যালয়** আবিষ্কার করতে পারেন।
অযোগ্য মানুষের হাতে ক্ষমতা:
- **ব্যক্তিগত অহংকার:** Purandar চৌধুরি জ্ঞান অর্জন করলেও, সেই ক্ষমতা ব্যবহার করেছেন **ব্যক্তিগত অহংকার** ও **প্রতিশোধ** নেওয়ার জন্য (প্রতিপক্ষ বিজ্ঞানী কারপভ-কে জব্দ করতে)।
- **পরিবেশের ক্ষতি:** তার পরিকল্পনা ছিল আলাস্কার **লেক শ্রেভার**-এর বিশাল জলরাশিকে বাষ্প করে সাইবেরিয়াতে পাঠিয়ে পৃথিবীর **জলবায়ুর ভারসাম্য** নষ্ট করা। তার এই কাজ কোনো মানবিক কল্যাণের উদ্দেশ্যে ছিল না।
- **বিপজ্জনকতা:** Purandar নিজেই স্বীকার করেছেন যে কৃত্রিমভাবে তৈরি এই মেঘ যদি ভুল জায়গায় ভেঙে পড়ে, তবে **কলকাতার অর্ধেক বাড়ি ভেঙে গুঁড়ো** হয়ে যাবে। এই ঘটনা প্রমাণ করে যে, নৈতিকতা ও মানবিক বোধের অভাবে বৈজ্ঞানিক ক্ষমতা কতটা বিপজ্জনক হতে পারে।
গল্পে অসীমা সেই **মানবিকতার প্রতীক** হিসেবে দাঁড়িয়ে Purandar-এর ক্ষমতাকে নিষ্ক্রিয় করে দেয়। এটিই প্রমাণ করে যে, বিজ্ঞানকে সর্বদা **মানবকল্যাণ ও প্রকৃতির সুরক্ষার** পথে পরিচালিত করা আবশ্যক।