চতুর্থ পাঠ: নোট বই (নোট)
প্রসেসিং হচ্ছে…

বাংলা সাহিত্য (সপ্তম শ্রেণি)

চতুর্থ পাঠ (দ্বিতীয় অংশ): নোট বই (সুকুমার রায়) – নোটস ও উত্তর

**উৎস:** কবিতা | **বিষয়বস্তু:** এক কৌতূহলী বালকের উদ্ভট, হাস্যরসাত্মক ও বিজ্ঞানসম্মত প্রশ্নের সংকলন।

১. কবিতা পরিচিতি ও সারমর্ম (Core Theme)

সুকুমার রায় রচিত **’নোট বই’** একটি **হাস্যরসাত্মক ছড়া**, যা এক **কৌতূহলী ও কল্পনাপ্রবণ বালকের** মনোজগতকে তুলে ধরে। কবিতাটির কথক একটি নোট বই হাতে নিয়ে সর্বদা ঘুরে বেড়ায় এবং ভালো কথা শোনা মাত্রই তা টুকে রাখে। কিন্তু তার ‘ভালো কথা’গুলি আসলে বৈজ্ঞানিক, সামাজিক ও ব্যক্তিগত জীবনের **উদ্ভট এবং নিরর্থক প্রশ্নের** সংকলন।

মূল বক্তব্য:

  • **অবিরাম কৌতূহল:** কথকের কৌতূহল ফড়িং-এর ঠ্যাং সংখ্যা, আরশোলার খাদ্য থেকে শুরু করে গরুর ছটফটানি, পেটের কামড়, জোয়ানের আরকের ঝাঁজ, তেজপাতার তেজ, নাকের ডাকা ও পিলের চমকানি—এই সবকিছুর মধ্যে ছড়িয়ে আছে।
  • **নোট বইয়ের গুরুত্ব:** সে নোট বইটিকে এমনভাবে উপস্থাপন করে যেন এটি **অমূল্য জ্ঞানের ভাণ্ডার**।
  • **প্রশ্ন জিজ্ঞাসা:** যে প্রশ্নগুলির উত্তর সে জানে না, সেগুলিকে গুছিয়ে লিখে রাখে এবং **মেজদাকে খুঁচিয়ে** জেনে নেওয়ার সংকল্প করে।
  • **উপসংহার:** সবশেষে সে পাঠককে চ্যালেঞ্জ করে—তারাও কি এই ‘জ্ঞানগর্ভ’ নোট বই পড়েনি? এই চ্যালেঞ্জের মাধ্যমে সুকুমার রায় **হাস্যরসের** সৃষ্টি করেছেন।

২. গুরুত্বপূর্ণ শব্দ ও ব্যাখ্যা

  • **কিলবিল:** এখানে অনেক লেখা বা আঁকিবুকি দ্বারা ভরা।
  • **ঠ্যাং:** পা (মূলত প্রাণীর)।
  • **চটচট:** আঠালো ভাব।
  • **ছটফট:** অস্থিরতার ভাব।
  • **কটকট:** কান বা দাঁতের তীব্র ব্যথা বা অনুভূতি।
  • **টনটন:** ফোড়া বা ঘা-এর ব্যথা।
  • **খটকা:** সন্দেহ, খুঁতখুঁতানি।
  • **ঝোলাগুড়:** তরল গুড়।
  • **জোয়ানের আরক:** জোয়ান নামক মশলা দিয়ে তৈরি ওষুধ বা পানীয়।
  • **দুন্দুভি:** ঢাক (বাদ্যযন্ত্র), এক প্রকার যুদ্ধবাদ্য।
  • **অরণি:** এক ধরনের কাঠ (বা চকমকি পাথর) যা ঘষে আগুন জ্বালানো হতো।

৩. হাতেকলমে (অনুশীলনী প্রশ্ন ও উত্তর)

(অনুশীলনী থেকে নির্বাচিত প্রশ্নের উত্তর নিচে দেওয়া হলো:)

সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন ও উত্তর (মান: ১-২ নম্বর):

১. নোট বই কী ধরনের লেখাতে ভরা? [১ নম্বর]

নোট বই **কিলবিল** লেখাতে ভরা। এই লেখাগুলি মূলত কৌতূহলী কথকের নানা ধরনের **প্রশ্ন ও তথ্যের** সংকলন।

২. বক্তা কী করে নিজে নিজে নোট বইটি লিখলেন? [২ নম্বর]

বক্তা **দেখে, শিখে, পড়ে শুনে** এবং **বসে মাথা ঘামিয়ে** নিজে নিজে নোট বইটি আগাগোড়া লিখেছিলেন।

৩. চটপট, চটচট, ছটফট, কটকট—এই শব্দগুলি কী ধরনের শব্দ? [১ নম্বর]

এই শব্দগুলি হলো **ধ্বন্যাত্মক** বা **অনুকার শব্দ** (যেমন: কোনো শব্দ বা অনুভূতির অনুকরণে তৈরি)।

৪. ‘খটকা’ বলতে কী বোঝানো হয়েছে? এটি কীভাবে দূর হবে? [২ নম্বর]

‘খটকা’ বলতে **সন্দেহ** বা **খুঁতখুঁতানি** বোঝানো হয়েছে। কথকের মনে খটকা লেগেছিল **’ঝোলাগুড় কিসে দেয়? সাবান না পটকা?’** এই প্রশ্নটি নিয়ে। এই খটকা দূর করতে সে **মেজদাকে খুঁচিয়ে** জবাব জেনে নেওয়ার সংকল্প করে।

সংক্ষিপ্ত উত্তরধর্মী প্রশ্ন (মান: ৩ নম্বর):

৫. বক্তা কোন্ কোন্ ‘ভালো কথা’ নোট বইয়ে লিখে রেখেছিলেন? [৩ নম্বর]

কথকের মতে তার নোট বইয়ে লেখা ‘ভালো কথা’গুলি হলো:

  1. ফড়িঙের ক’টা ঠ্যাং এবং আরশোলারা কী কী খায়।
  2. আঙুলে আঠা দিলে কেন **চটচট** করে এবং গরুকে কাতুকুতু দিলে কেন সে **ছটফট** করে।
  3. কান কেন **কটকট** করে, ফোড়া কেন **টনটন** করে এবং ঝোলাগুড় সাবান না পটকাতে দেয়—এই ধরনের উদ্ভট প্রশ্ন।

৬. ‘নোট বই’ কবিতাটিতে হাস্যরস সৃষ্টির কারণগুলি লেখো। [৩ নম্বর]

নোট বই কবিতাটিতে হাস্যরস সৃষ্টির প্রধান কারণগুলি হলো:

  1. **কৌতূহলের আতিশয্য:** কথকের **অবিরাম ও অবৈজ্ঞানিক কৌতূহল**। যেমন: ঝোলাগুড় সাবান না পটকাতে দেয়—এই ধরনের অবাস্তব প্রশ্ন।
  2. **উদ্ভট প্রশ্ন:** পেটের কামড়, নাকের ডাকা, পিলের চমকানি—এই ধরনের **ব্যক্তিগত ও শারীরিক** প্রশ্নগুলিকে বিজ্ঞানের মতো করে তুলে ধরা।
  3. **সরল বিশ্বাস:** নোট বইটিকে **’কিলবিল লেখাতে ভরা’** এবং **’জ্ঞানভাণ্ডার’** বলে দাবি করা, যা পাঠককে হাসায়।
  4. **সমাধানের উপায়:** মেজদাকে খুঁচিয়ে প্রশ্নগুলির উত্তর জেনে নেওয়ার সংকল্প—যা একটি **শিশুসুলভ ও মজাদার** সমাধান।

৭. ‘বলবে কী, তোমরাও নোট বই পড়োনি!’—কবিতা অবলম্বনে এই চ্যালেঞ্জের তাৎপর্য ব্যাখ্যা করো। [৩ নম্বর]

**তাৎপর্য:** কবিতার শেষে কথক যে চ্যালেঞ্জটি ছুড়ে দিয়েছেন, তার মধ্যে **কৌতুক ও ব্যঙ্গ** লুকিয়ে আছে।

  • **কৌতুক:** কথক তার নোট বইয়ের উদ্ভট প্রশ্নগুলির গুরুত্ব বোঝাতে চেয়েছেন এবং দাবি করেছেন যে এটিই **আসল জ্ঞানের ভাণ্ডার**। তিনি বোঝাতে চেয়েছেন, যারা এই নোট বই পড়েনি, তারা জগৎ সম্পর্কে কিছুই জানে না।
  • **ব্যঙ্গ:** সুকুমার রায় এই পঙক্তির মাধ্যমে **জ্ঞানচর্চার নামে গতানুগতিকতা**কে ব্যঙ্গ করেছেন। তিনি বোঝাতে চেয়েছেন, কৌতূহল বা প্রশ্নগুলি যতই উদ্ভট হোক না কেন, **প্রশ্ন করার মানসিকতাই** হলো আসল জ্ঞান অর্জনের ভিত্তি।

রচনাধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর (মান: ৫ নম্বর):

৮. ‘নোট বই’ কবিতা অবলম্বনে কৌতূহলী বালকটির চরিত্র বিশ্লেষণ করো। [৫ নম্বর]

সুকুমার রায়ের ‘নোট বই’ কবিতার কৌতূহলী বালকটির চরিত্রটি ছিল **হাস্যরস, সরলতা এবং কৌতূহলের** এক চমৎকার মিশ্রণ:

  1. **অদম্য কৌতূহলী:** বালকটি ছিল **অবিরাম প্রশ্নকারী**। তার কৌতূহল কেবল স্বাভাবিক জ্ঞান বা বিজ্ঞান নয়, বরং ফড়িঙের ঠ্যাং, আরশোলার খাবার, গরুর ছটফটানি, সাবান ও ঝোলাগুড়ের মতো **উদ্ভট বিষয়গুলিকেও** স্পর্শ করেছিল।
  2. **জ্ঞান সংগ্রহের নেশা:** সে বিশ্বাস করত যে **’ভালো কথা’** শোনা মাত্রই তা টুকে রাখতে হয়। তার কাছে নোট বই ছিল তথ্যের **’কিলবিল লেখাতে ভরা’** এক অমূল্য সম্পদ, যা সে দেখে, শুনে, পড়ে ও **’মাথা ঘামিয়ে’** তৈরি করেছে।
  3. **সহজ বুদ্ধির আশ্রয়:** যে প্রশ্নগুলির উত্তর সে নিজে খুঁজে পেত না, তার জন্য সে **মেজদার** কাছে সমাধান চাইত। ‘মেজদাকে খুঁচিয়ে’ জেনে নেওয়ার এই সংকল্পটি তার **শিশুসুলভ সরলতা ও বুদ্ধির** পরিচয় দেয়।
  4. **আত্মবিশ্বাসী ও কল্পনাপ্রবণ:** তার প্রশ্নগুলি যতই হাস্যকর হোক না কেন, তার মধ্যে **আত্মবিশ্বাসের অভাব ছিল না**। সে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করত যে তার নোট বই পড়লে পাঠকও জ্ঞান লাভ করবে।

এই বালকটি সুকুমার সাহিত্যের এক চিরায়ত চরিত্র—যে তার **হাস্যরস ও উদ্ভট কৌতূহলের** মাধ্যমে পাঠকের মনে চিরস্থায়ী আসন লাভ করেছে।

BISWAZ GROWTH ACADEMY - Class Menu
BISWAZ GROWTH ACADEMY - Class Menu