বাংলা সাহিত্য (সপ্তম শ্রেণি)
তৃতীয় পাঠ (তৃতীয় অংশ): খোকনের প্রথম ছবি (বনফুল) – নোটস ও উত্তর
**উৎস:** ছোটগল্প | **বিষয়বস্তু:** একজন চিত্রশিল্পীর শৈশব থেকে শিল্পশিক্ষা গ্রহণ, শিল্পের নকল থেকে মুক্তি এবং মৌলিক সৃষ্টির পথে প্রথম যাত্রা।
—১. গল্প পরিচিতি ও সারমর্ম (Core Theme)
বনফুল (বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায়) রচিত **’খোকনের প্রথম ছবি’** গল্পটি হলো এক কিশোরের শিল্পশিক্ষার মনোজ্ঞ কাহিনী। গল্পটি দেখায় যে শিল্প কেবল **নকল বা অনুকরণ নয়, বরং নিজস্ব কল্পনা ও অনুভূতির প্রকাশ**।
মূল বক্তব্য:
- **অনুকরণের পর্ব:** কিশোর **খোকন** প্রথমে ড্রইং মাস্টারের নির্দেশে টুল, টেবিল, চেয়ার, গাছ, পুল—ইত্যাদির ছবি আঁকত। সে ড্রইং বুক থেকে বা **চারপাশের প্রকৃতি থেকে নকল করে** ছবি আঁকতে শিখেছিল।
- **বাস্তবতার ব্যর্থতা:** কিছুদিন পর খোকন নিজেই বুঝতে পারল যে তার আঁকা **সূর্যের ছবিতে দীপ্তি** বা **গোলাপের ছবিতে সৌন্দর্য** ফোটাতে পারেনি। এমনকি মেঘের ছবি আঁকতে গিয়েও সে দেখল যে **প্রকৃতির ছবি অহরহ বদলায়** বলে তার নকল করা অসম্ভব।
- **মৌলিক সৃষ্টির দিকে যাত্রা:** খোকনের বাবার এক **বিখ্যাত চিত্রকর বন্ধু** তাকে শেখালেন যে ছবি নকল করা নয়, বরং **’চোখ বুজে বসে কল্পনা’** করে সেই কল্পনার ছবিটি আঁকাই হলো আসল শিল্প। তিনি খোকনকে বলেন, এগুলি সব **’নকল করা ছবি’**, তার **’নিজের আঁকা ছবি’** কোথায়?
- **প্রথম মৌলিক সৃষ্টি:** খোকন চোখ বুজে শুধু **অন্ধকার** দেখতে পেল। সে কালো রং দিয়ে সেই অন্ধকারেরই ছবি আঁকল। এক দৃষ্টিতে সেই ছবির দিকে চেয়ে থাকতে থাকতে সে দেখল, ওই কালোর ভেতরই **একটি মুখ রয়েছে, চোখে অদ্ভুত হাসি**। এটিই ছিল খোকনের **প্রথম মৌলিক ছবি**।
২. গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র ও ব্যাখ্যা
- **খোকন:** গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র। সে একজন **উৎসাহী, কৌতূহলী ও আত্মসচেতন** কিশোর। সে অনুকরণ থেকে সরে এসে মৌলিক সৃষ্টির দিকে মনোনিবেশ করে।
- **ড্রইংয়ের মাস্টারমশাই:** খোকনকে ড্রইং শিখিয়েছেন এবং তাকে প্রকৃতি থেকে ছবি আঁকার জন্য অনুপ্রাণিত করেছেন।
- **বিখ্যাত চিত্রকর বন্ধু:** খোকনের বাবার বন্ধু। তিনি খোকনকে **নকল শিল্পের ধারণা থেকে মুক্তি** দিয়ে **কল্পনার মাধ্যমে মৌলিক ছবি আঁকার** পথ দেখিয়েছেন।
৩. হাতেকলমে (অনুশীলনী প্রশ্ন ও উত্তর)
(অনুশীলনী থেকে নির্বাচিত প্রশ্নের উত্তর নিচে দেওয়া হলো:)
সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন ও উত্তর (মান: ১-২ নম্বর):
১. খোকন প্রথমদিকে কী কী আঁকত?
খোকন প্রথমদিকে **টুল, টেবিল, চেয়ার, কলসি, কাপ** এমন কি একটি **গোরুও** এঁকেছিল।
২. ‘বেকুব’ শব্দটির অর্থ কী? মেঘের ছবি আঁকতে গিয়ে খোকন বেকুব হয়ে গিয়েছিল কেন?
‘বেকুব’ শব্দটির অর্থ হলো **বোকা বা নির্বোধ**। মেঘের ছবি আঁকতে গিয়ে খোকন বেকুব হয়ে গিয়েছিল, কারণ সে দেখল **প্রকৃতির মেঘের আকৃতি দ্রুত বদলায়**—যা সে এঁকেছিল (হাতি), তা মুহূর্তে **কুমির** হয়ে যায়—তাই নকল করা তার পক্ষে অসম্ভব ছিল।
৩. ‘এগুলো সব নকল করা ছবি।’—কে কাকে এই কথা বলেছেন? ‘নকল করা ছবি’ বলতে তিনি কী বুঝিয়েছেন?
এই কথাটি **খোকনের বাবার বিখ্যাত চিত্রকর বন্ধু** খোকনকে বলেছিলেন।
**নকল করা ছবি:** তিনি বুঝিয়েছেন যে ছবিগুলি **ড্রইং বুক বা বাইরের কোনো দৃশ্য থেকে অনুকরণ** করা হয়েছে, তার মধ্যে **খোকনের নিজস্ব কল্পনা, অনুভূতি বা মৌলিকতা** অনুপস্থিত।
৪. খোকন কীভাবে তার প্রথম মৌলিক ছবিটি আঁকল?
বিখ্যাত চিত্রকর বন্ধুর পরামর্শে খোকন চোখ বুজে **কল্পনা করে** শুধু **অন্ধকার** দেখতে পায়। সে সেই অন্ধকারটাই কালো রং দিয়ে এঁকেছিল। সেই ছবির দিকে চেয়ে থাকতে থাকতে সে **কালোর মধ্যে একটি মুখ, চোখে অদ্ভুত হাসি** দেখতে পেল।
সংক্ষিপ্ত উত্তরধর্মী প্রশ্ন (মান: ৩ নম্বর):
৫. খোকনের ‘ড্রইংয়ের মাস্টারমশাই’ কীভাবে খোকনকে প্রকৃতি দেখতে শিখিয়েছিলেন?
খোকনের ড্রইং মাস্টারমশাই তাকে **নকল বা কপি করার ধারণা থেকে মুক্তি** দিয়ে **প্রকৃতি থেকে ছবি আঁকার** পরামর্শ দেন।
- তিনি খোকনকে তার **চারপাশে ছড়িয়ে থাকা ছবিগুলি** দেখতে বলেন।
- প্রথমে তিনি খোকনকে **বাড়ির সামনের ইউক্যালিপটাস গাছটি** আঁকতে বলেন।
- পরে বাড়ির ছাদ থেকে দেখা **পুলের ছবি** আঁকতে বলেন।
- মাস্টারমশাই তাকে বলেছিলেন, **’চারপাশে যা দেখবে এঁকে ফেলবে। খুব বড়ো চিত্রকর হবে তুমি।’** এই উৎসাহের মাধ্যমে তিনি খোকনকে প্রকৃতিকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করতে শিখিয়েছিলেন।
৬. প্রকৃতির দৃশ্যের যে বদল অহরহ হয় তা খোকন কীভাবে বুঝল?
প্রকৃতির দৃশ্যের বদল যে অহরহ হয়, তা খোকন মেঘের ছবি আঁকতে গিয়ে হাতে নাতে বুঝতে পারে।
- খোকন আকাশে একটি মেঘকে **হাতির মতো শুঁড় তুলে থাকা** অবস্থায় দেখতে পায় এবং দ্রুত সেই ছবিটি আঁকতে শুরু করে।
- আঁকা শেষ হওয়ার পর যখন সে ছবিটি মিলিয়ে দেখতে যায়, তখন সে দেখে হাতির আকৃতির সেই মেঘটি আর নেই, তার বদলে সেখানে **প্রকাণ্ড একটা কুমির** শুয়ে আছে।
এই ঘটনা থেকে খোকন উপলব্ধি করে যে **সূর্যের দীপ্তি বা গোলাপের সৌন্দর্য** যেমন হুবহু আঁকা যায় না, তেমনই প্রকৃতির দৃশ্যও **অহরহ বদলায়** বলে তার নকল করা অসম্ভব।
৭. খোকনের বাবার বন্ধু তাকে কী পরামর্শ দিয়েছিলেন? সেই পরামর্শের গুরুত্ব কোথায়?
খোকনের বাবার বিখ্যাত চিত্রকর বন্ধু তাকে নিম্নলিখিত পরামর্শ দিয়েছিলেন: **’চোখ বুজে বসে কল্পনা করো। কল্পনায় যা দেখবে সেটাই এঁকে ফেলো।’**
পরামর্শের গুরুত্ব: এই পরামর্শটি খোকনের শিল্পজীবনে এক **মৌলিক মোড়** এনেছিল। এর মাধ্যমে খোকন **অনুকরণ ও নকলের ধারণা থেকে মুক্তি** পায় এবং বুঝতে পারে যে শিল্প হলো:
- **বাহ্যিক দৃশ্য নয়:** ভেতরের অনুভূতি ও কল্পনার জগৎ।
- **নিজের সৃষ্টি:** নিজের মনের ভেতর থেকে তৈরি হওয়া মৌলিক সৃষ্টি, যা কোনো ক্যামেরার ছবির মতো নিখুঁত না হলেও **আসল শিল্প**।
রচনাধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর (মান: ৫ নম্বর):
৮. ‘খোকনের প্রথম ছবি’ গল্প অবলম্বনে একজন কিশোর শিল্পীর অনুকরণ থেকে মৌলিক সৃষ্টির পথে যাত্রাপথের বিশ্লেষণ করো।
বনফুলের ‘খোকনের প্রথম ছবি’ গল্পটি কিশোর শিল্পীর **অনুপ্রেরণা, সংগ্রাম ও মৌলিক সৃষ্টির দিকে যাত্রাপথের** এক সুন্দর দলিল:
- **অনুকরণের শুরু (নকলের পর্ব):** প্রথমে খোকন ড্রইং মাস্টারের নির্দেশে **ড্রইং বুক থেকে কপি করে** এবং **চারপাশের বস্তুগত জিনিস** (টুল, চেয়ার, গাছ, পুল) আঁকতে শেখে। এই পর্বটি তার শিল্পের প্রতি আগ্রহ জাগালেও, এটি ছিল কেবল **অনুকরণ বা নকল**।
- **বাস্তবতার ব্যর্থতা ও আত্মসচেতনতা:** এরপর সে প্রকৃতি থেকে আঁকতে গিয়ে দেখে **সূর্যের দীপ্তি, গোলাপের সৌন্দর্য** বা **মেঘের পরিবর্তনশীল রূপ** হুবহু নকল করা অসম্ভব। এই ব্যর্থতা তাকে **আত্মসচেতন** করে তোলে—সে বুঝতে পারে নকল করা শিল্প নয়।
- **কল্পনার পথে মোড়:** এই দ্বিধার সময়ে **বিখ্যাত চিত্রকর বন্ধুর** পরামর্শ, **’চোখ বুজে বসে কল্পনা করো’**, খোকনকে নতুন পথ দেখায়। এই পরামর্শ তাকে বাহ্যিক দৃষ্টি থেকে **আভ্যন্তরীণ কল্পনার** দিকে নিয়ে যায়।
- **প্রথম মৌলিক সৃষ্টি:** খোকন চোখ বুজে দেখা **অন্ধকার**-এর ছবিটি আঁকে। এক দৃষ্টিতে চেয়ে থাকার পর সেই কালোর ভেতরেই সে **অদ্ভুত হাসিমাখা একটি মুখ** দেখতে পায়। এই মুখটি বাইরের বাস্তব নয়, বরং তার **মনের ভেতরের অনুভূতি ও কল্পনার প্রকাশ**। এটিই ছিল খোকনের **প্রথম মৌলিক ছবি**।
এভাবে খোকন অনুকরণ ও নকলের পর্ব থেকে সরে এসে **কল্পনা ও আত্ম-অনুভূতির** মাধ্যমে শিল্পের মৌলিক সত্যকে আবিষ্কার করে এবং একজন প্রকৃত শিল্পী হিসেবে তার যাত্রাপথ শুরু করে।