বাংলা সাহিত্য (সপ্তম শ্রেণি)
তৃতীয় পাঠ (দ্বিতীয় অংশ): আঁকা, লেখা (মৃদুল দাশগুপ্ত) – নোটস ও উত্তর
**উৎস:** কবিতা | **বিষয়বস্তু:** প্রকৃতির স্বতঃস্ফূর্ত অনুপ্রেরণা এবং ছবি আঁকা ও ছড়া লেখার মধ্যেকার গভীর সংযোগ।
—১. কবিতা পরিচিতি ও সারমর্ম (Core Theme)
মৃদুল দাশগুপ্তের **’আঁকা, লেখা’** কবিতাটি শিল্পী মনের **খামখেয়ালি আনন্দ** এবং **প্রকৃতির সঙ্গে সৃজনশীলতার** গভীর বন্ধনকে তুলে ধরে। কবি দেখিয়েছেন যে, ছবি আঁকা বা ছড়া লেখার সময় প্রকৃতিও যেন তাতে অংশ নেয় এবং কবিকে অনুপ্রেরণা যোগায়। সৃজনশীলতার এই আনন্দই কবির কাছে **’পরম পুলক’** এবং **’পদক পাওয়া’**-র সমান।
মূল বক্তব্য:
- **আঁকার অনুপ্রেরণা:** কবি যখন **’খুশ-খেয়ালে’** রং ছড়িয়ে ছবি আঁকেন, তখন **তিনটি শালিক** ঝগড়া থামায়, **চড়ুই পাখি** অবাক হয়ে তাকায়, **মাছরাঙা** তার নীল রং ধার দিতে চায় এবং **প্রজাপতির ঝাঁক** কবির আঁকায় নিজেদের স্থান খুঁজে নিতে চায়। ইঁদুরও গর্ত থেকে উঁকি মারে।
- **লেখার অনুপ্রেরণা:** যখন **চাঁদের দুধের সর** জমে যায় এবং **বাতাস ঈষৎ কাঁপন** দেয়, তখনই কবির ছড়া লেখা শুরু হয়। তখন **তারার মালা** কাছে নেমে আসে এবং **দশ জোনাকি** বকুল গাছে ‘অ’ আর ‘আ’ লিখে দেয়।
- **সৃজনশীলতার পুরস্কার:** কবি বিশ্বাস করেন যে এই ছড়ার মাধ্যমেই হাওয়া তাঁকে কোনো প্রিয়জনের কাছে নিয়ে আসে। এই **মানসিক সংযোগ** ও **সৃজনশীল আনন্দই** তাঁর কাছে **সবচেয়ে বড়ো পুরস্কার**।
২. গুরুত্বপূর্ণ শব্দ ও ব্যাখ্যা
- **খুশ-খেয়াল:** খামখেয়াল, মর্জি বা নিজের খুশি মতো।
- **চিত্র:** ছবি, আলেখ্য।
- **মৎস্য:** মাছ।
- **বেজায়:** অত্যন্ত, খুব।
- **পুরু:** ঘন, স্থূল।
- **ঈষৎ:** অল্প, কিঞ্চিৎ।
- **কাঁপন:** কম্পন, স্পন্দন।
- **পরম পুলক:** চরম আনন্দ বা তৃপ্তি।
- **পদক পাওয়া:** পুরস্কার লাভ করা।
৩. হাতেকলমে (অনুশীলনী প্রশ্ন ও উত্তর)
(অনুশীলনী থেকে নির্বাচিত প্রশ্নের উত্তর নিচে দেওয়া হলো:)
সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন ও উত্তর (মান: ১-২ নম্বর):
১. কবি কখন ছবি আঁকেন?
কবি **খুশ-খেয়ালে রং ছড়িয়ে** যখন তাঁর মন চায়, তখনই ছবি আঁকেন।
২. তিনটি শালিক কী করে?
কবি যখন ছবি আঁকেন, তখন **তিনটি শালিক** তাদের **ঝগড়া থামিয়ে** অবাক হয়ে সেদিকে তাকিয়ে থাকে।
৩. কে অবাক তাকায়?
কবি যখন ছবি আঁকেন, তখন **চড়ুই পাখি** অবাক হয়ে কবির ছবি আঁকা দেখে।
৪. মাছরাঙা কী চায়?
মাছরাঙা পাখি **মাছ ধরার কথা ভুলে** গিয়ে তার **নীল রংটি** কবির আঁকায় **ধার দিতে** চায়।
৫. কখন কবির ছড়া লেখার শুরু?
যখন **চাঁদের দুধের পুরু সর জমে যায়** এবং **বাতাস ঈষৎ কাঁপন** দেয়, তখনই কবির ছড়া লেখার শুরু হয়।
সংক্ষিপ্ত উত্তরধর্মী প্রশ্ন (মান: ৩ নম্বর):
৬. কবি যখন ছবি আঁকেন তখন চারপাশের প্রকৃতিতে কী কী ঘটনা ঘটে?
কবি যখন ছবি আঁকেন, তখন প্রকৃতিতে এক **আনন্দময় ও অলৌকিক** পরিবেশ তৈরি হয়:
- **শান্ত পরিবেশ:** তিনটি শালিক ঝগড়া থামায় এবং চড়ুই পাখি অবাক হয়ে তাকায়।
- **সহায়তার হাত:** মাছরাঙা পাখি তার নীল রং ধার দিতে চায়, প্রজাপতির ঝাঁক কবির আঁকায় স্থান পেতে চায়।
- **উৎসাহ:** গর্ত থেকে ইঁদুরও উঁকি দিয়ে দেখে এবং রং-তুলিরাও **বেজায় খুশি** হয়।
৭. কবি যখন ছড়া লিখতে শুরু করেন তখন প্রকৃতির কোন্ কোন্ উপাদানের পরিবর্তন ঘটে?
কবি যখন ছড়া লিখতে শুরু করেন, তখন প্রকৃতি যেন এক **কাব্যময় রূপ** নেয়:
- **জমিন:** চাঁদের দুধের পুরু সর জমে যায়।
- **বাতাস:** বাতাস ঈষৎ কাঁপন দেয়।
- **আকাশ:** তারার মালা খুব গোপনে কাছে নেমে আসে।
- **জীব:** **দশ জোনাকি** বকুল গাছের পাতায় **’অ’ লিখছে ‘আ’ লিখছে**।
৮. “অ’ লিখছে ‘আ’ লিখছে”—কারা কীভাবে এমন লিখছে? তাদের দেখে কী মনে হচ্ছে?
**কারা লিখছে:** **দশ জোনাকি** বকুল গাছের পাতায় এমন লিখছে।
**কীভাবে লিখছে:** ছড়া লেখার সময় যখন রাত গভীর হয় এবং তারার মালা নেমে আসে, তখন জোনাকিরা **মিটমিট করে আলো জ্বেলে** যেন **’অ’ আর ‘আ’** অক্ষরগুলি লিখছে।
**মনে হওয়া:** তাদের দেখে মনে হচ্ছে, প্রকৃতিও কবির ছড়া লেখার আনন্দে **শিক্ষার্থীর মতো** বর্ণমালা চর্চা করছে এবং কবির সৃষ্টিতে অংশ নিচ্ছে।
রচনাধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর (মান: ৫ নম্বর):
৯. ‘আঁকা, লেখা’ কবিতার নামকরণের সার্থকতা বিশ্লেষণ করো। কবির কাছে ‘পরম পুলক’ বা ‘পদক পাওয়া’ কিসের সমান?
নামকরণের সার্থকতা:
কবিতাটির নাম **’আঁকা, লেখা’** অত্যন্ত সার্থক। কবিতাটি দু’টি প্রধান অংশে বিভক্ত—একটি অংশে **ছবি আঁকার আনন্দ** এবং অন্য অংশে **ছড়া লেখার প্রেরণা** বর্ণিত হয়েছে।
- **দ্বৈত সৃজন:** কবি এই দুটি শিল্পকর্মের মাধ্যমে প্রকৃতির সঙ্গে তাঁর সম্পর্ককে তুলে ধরেছেন। নামটিতে এই দুটি **সৃজনশীলতার মাধ্যমকে** প্রধান্য দেওয়া হয়েছে।
- **বিষয়ের সংহতি:** যদিও বিষয়বস্তু দুটি, কিন্তু তাদের প্রেরণার উৎস (প্রকৃতি) ও প্রকাশের আনন্দ (পুলক) একই। তাই নামটিতে এই **বিষয়ের সংহতি** বজায় থাকে।
‘পরম পুলক’ বা ‘পদক পাওয়া’:
কবির কাছে এই আনন্দ হলো: **”এই ছড়াতেই আজ আমাকে তোমার কাছে আনলো হাওয়া”**।
কবি যখন ছড়া লেখেন, তখন **হাওয়া সেই ছড়াকে বহন করে** তাঁর কোনো প্রিয়জনের কাছে নিয়ে আসে। এই **মানসিক ও আত্মিক সংযোগ** স্থাপনই কবির কাছে জীবনের **সবচেয়ে বড়ো পুরস্কার**। অর্থাৎ, তাঁর সৃজনশীলতা যখন কেবল আত্মিক আনন্দের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে, অন্য মানুষের সঙ্গে **স্নেহ ও ভালোবাসার সেতু** তৈরি করে, তখনই তিনি **’পরম পুলক’** বা **’পদক পাওয়া’**-র সমান আনন্দ লাভ করেন।