বাংলা সাহিত্য (সপ্তম শ্রেণি)
তৃতীয় পাঠ: আত্মকথা (রামকিঙ্কর বেইজ) – নোটস ও উত্তর
**উৎস:** আত্মজীবনীমূলক রচনা | **বিষয়বস্তু:** শিল্পী রামকিঙ্কর বেইজের শৈশব, শিল্প শিক্ষার শুরু এবং শান্তিনিকেতনের কলাভবনে তাঁর অভিজ্ঞতা।
—১. রচনা পরিচিতি ও সারমর্ম (Core Theme)
ভাস্কর ও চিত্রশিল্পী রামকিঙ্কর বেইজ তাঁর **’আত্মকথা’**-য় তাঁর শৈশব থেকে শান্তিনিকেতনে শিল্পশিক্ষা শুরুর পর্ব পর্যন্ত অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছেন। এই রচনাটি তাঁর শিল্পসৃষ্টির প্রতি **স্বতঃস্ফূর্ত আগ্রহ, প্রতিকূলতা সত্ত্বেও সংগ্রাম** এবং শান্তিনিকেতনের মুক্ত পরিবেশে তাঁর **শিল্পীর স্বাতন্ত্র্য** খুঁজে পাওয়ার কথা বলে।
মূল বক্তব্য:
- **শিল্পের প্রথম পরিচয়:** শৈশবে বাড়ির দেওয়ালে নানা দেবদেবীর ছবি দেখে এবং পাশের **কুমোর পাড়ায়** মূর্তি গড়া দেখে তাঁর ‘ভিসুয়াল আর্টে’ প্রথম ‘বর্ণপরিচয়’ ঘটে।
- **রং ও তুলির ব্যবস্থা:** আর্থিক অনটনের কারণে তিনি **গাছের পাতার রস, শিলের হলুদ, আলতা ও ভুষোকালি** দিয়ে রঙের কাজ চালাতেন। ছাগলের ঘাড়ের লোম কেটে বাঁশের কাঠিতে বেঁধে তুলি তৈরি করতেন।
- **শান্তিনিকেতনে আগমন:** **রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়ের** (প্রবাসী পত্রিকার সম্পাদক) সৌজন্যে তিনি ১৯২৫ সালে ম্যাট্রিক না দিয়েই শান্তিনিকেতনের **কলাভবনে** আসেন।
- **আচার্য নন্দলাল বসু:** আচার্য নন্দলাল বসু তাঁকে পূর্ণ স্বাধীনতা দিয়েছিলেন। তিনি **ওরিয়েন্টাল আর্টের** প্রবর্তক হলেও রামকিঙ্করকে **অয়েল পেন্টিং** (যা ওয়েস্টার্ন আর্টের অংশ) চর্চায় বাধা দেননি।
- **শিল্পের দর্শন:** রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর ছবি দেখে মন্তব্য করেন, **’তুমি সবই জানো, আবার এখানে কেন?’** এবং তাঁকে দু-তিন বছর থাকতে বলেন। রামকিঙ্কর এখানে এসে **প্রাকৃতিক বাস্তবতার** সূচনা করেন।
২. গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র ও ব্যাখ্যা
- **রামকিঙ্কর বেইজ (কথক):** শিল্পী। তাঁর চরিত্রে **অদম্য উৎসাহ, প্রতিকূলতা জয়ের মানসিকতা** এবং **শিল্পের প্রতি গভীর ভালোবাসা** প্রকাশ পেয়েছে। তিনি শিল্পের ক্ষেত্রে **বাস্তবতার** গুরুত্ব দিতেন।
- **রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়:** ‘প্রবাসী’ পত্রিকার সম্পাদক। তাঁর উদ্যোগেই রামকিঙ্কর শান্তিনিকেতনে আসার সুযোগ পান।
- **নন্দলাল বসু:** কলাভবনের অধ্যক্ষ ও আচার্য। তিনি **ওরিয়েন্টাল আর্টের** প্রবর্তক হলেও ছাত্রদের স্বাধীনতায় বিশ্বাসী ছিলেন এবং রামকিঙ্করকে **পূর্ণ স্বাধীনতা** দিয়েছিলেন।
- **রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর:** শান্তিনিকেতন ব্রহ্মচর্য বিদ্যালয়ের প্রধান। তিনি রামকিঙ্করের প্রতিভাকে প্রথম দেখাতেই স্বীকৃতি দিয়েছিলেন।
৩. হাতেকলমে (অনুশীলনী প্রশ্ন ও উত্তর)
(অনুশীলনী থেকে নির্বাচিত প্রশ্নের উত্তর নিচে দেওয়া হলো:)
সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন ও উত্তর (মান: ১-২ নম্বর):
১. রামকিঙ্করের প্রথম শিল্পের-ইস্কুল কোথায় ছিল?
রামকিঙ্করের প্রথম শিল্পের-ইস্কুল ছিল তাঁর বাড়ির পাশের **কুমোর পাড়ায়**।
২. কী কী দিয়ে শিল্পী রামকিঙ্কর রঙের প্রয়োজন মেটাতেন?
শিল্পী রামকিঙ্কর **গাছের পাতার রস, বাটনা-বাটা শিলের হলুদ, মেয়েদের পায়ের আলতা এবং মুড়ি-ভাজা খোলার চাঁছা ভুষোকালি** দিয়ে রঙের প্রয়োজন মেটাতেন।
৩. তুলির কাজ তিনি কীভাবে করতেন?
ছাগলের ঘাড়ের লোম কেটে নিয়ে **বাঁশের কাঠির ডগায়** বেঁধে তিনি তাতে তুলির কাজ করতেন।
৪. কার সৌজন্যে রামকিঙ্করের সঙ্গে শান্তিনিকেতনের যোগাযোগ হয়?
**শ্রদ্ধেয় রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়** মহাশয়ের সৌজন্যে রামকিঙ্করের সঙ্গে শান্তিনিকেতনের যোগাযোগ হয়।
৫. শান্তিনিকেতনের আচার্য নন্দলাল বসু কাজের ক্ষেত্রে কেমন মনোভাব দেখাতেন?
আচার্য নন্দলাল বসু ছাত্রদের **পূর্ণ স্বাধীনতা** দিতেন। তিনি নিজে কিছু ইনস্ট্রাকশন দিলেও, কখনোই নিজের শিল্পাদর্শ ছাত্রদের উপর **’ইমপোজ’ (আরোপ)** করতেন না।
সংক্ষিপ্ত উত্তরধর্মী প্রশ্ন (মান: ৩ নম্বর):
৬. ‘ভিসুয়াল আর্টে আমার প্রথম বর্ণপরিচয়’—শিল্পী রামকিঙ্করের ছবির সঙ্গে প্রথম বর্ণপরিচয় হয়েছিলো কী ভাবে?
শিল্পী রামকিঙ্করের ‘ভিসুয়াল আর্টে’ প্রথম বর্ণপরিচয় ঘটেছিল শৈশবের স্বতঃস্ফূর্ত অভিজ্ঞতা থেকে:
- **বাড়ির দেওয়ালে ছবি:** শৈশবে তিনি বাড়ির চারদিকের দেওয়ালে আঁকা **নানা দেবদেবীর ছবি** দেখতেন এবং সেগুলি কপি করতেন।
- **কুমোর পাড়ার কাজ:** বাড়ির পাশের **কুমোর পাড়ায়** তিনি অনেকক্ষণ ধরে কুমোরদের মূর্তি গড়া দেখতেন এবং নিজেও **বৃষ্টির পর নীল মাটি** দিয়ে পুতুল তৈরি করতেন।
- **থিওরি নয়, অভিজ্ঞতা:** প্রথাগত শিক্ষা নয়, বরং এই **দেখা, নকল করা ও হাতে কাজ করার** মাধ্যমেই তাঁর শিল্পের প্রতি আগ্রহ জন্মেছিল।
৭. শান্তিনিকেতনের কলাভবনে এসে রামকিঙ্কর কীসের সূচনা করেছিলেন? এই বিষয়ে নন্দলাল বসুর ভূমিকা কী ছিল?
রামকিঙ্কর বেইজ শান্তিনিকেতনের কলাভবনে এসে **’প্রাকৃতিক বাস্তবতার’** বা **’ওয়েস্টার্ন আর্টের’** সূচনা করেছিলেন।
- **রামকিঙ্করের ভূমিকা:** তিনি শান্তিনিকেতনে প্রথম **অয়েল পেন্টিং** (তৈলচিত্র) শুরু করেন। তাঁর শিল্পধারণা ছিল, ভারতীয় শিল্প **বাস্তবতার** ভিতর দিয়ে না গেলে সার্থক হবে না।
- **নন্দলাল বসুর ভূমিকা:** নন্দলাল বসু যদিও নিজে **’ওরিয়েন্টাল আর্টের’** (প্রাচ্য শিল্পকলা) প্রবর্তক ছিলেন এবং অয়েল পেন্টিং পছন্দ করতেন না, তবুও তিনি রামকিঙ্করকে **বাধাও দেননি**। তিনি ছাত্রদের স্বাধীনতায় বিশ্বাসী ছিলেন।
৮. রবীন্দ্রনাথ রামকিঙ্করের ছবি দেখে তাঁকে কী বলেছিলেন? এর উত্তরে রামকিঙ্কর কী স্থির করেন?
রামকিঙ্করের আঁকা ছবি দেখার পর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁকে বলেছিলেন, **”তুমি সবই জানো, আবার এখানে কেন?”** এরপর একটু ভেবে তিনি রামকিঙ্করকে **”আচ্ছা, দু-তিন বছর থাকো তো”** বলেছিলেন।
রামকিঙ্করের সিদ্ধান্ত: রবীন্দ্রনাথের এই মন্তব্য এবং তাঁর স্নেহপূর্ণ আহ্বানে রামকিঙ্কর এত আনন্দিত ও অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন যে, তাঁর মনে হয়েছিল, **’সেই দু-তিন বছর আমার এখনো শেষ হলো না’**। অর্থাৎ, তিনি শান্তিনিকেতন ছেড়ে আর কোথাও যেতে চাননি এবং সেখানেই তাঁর বাকি জীবন শিল্পের সাধনা করার সিদ্ধান্ত নেন।
রচনাধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর (মান: ৫ নম্বর):
৯. ‘আত্মকথা’ অবলম্বনে শিল্পী রামকিঙ্কর বেইজের শিল্পী হয়ে ওঠার পথে কোন্ কোন্ প্রতিকূলতার সম্মুখীন হতে হয়েছিল, তা আলোচনা করো।
রামকিঙ্কর বেইজের শিল্পী হয়ে ওঠার পথটি ছিল প্রতিকূলতা ও সংগ্রামের:
- **আর্থিক অনটন:** তাঁর বাবার আর্থিক অবস্থা ভালো ছিল না। এর ফলে তিনি দামি রং বা তুলি কিনতে পারেননি।
- **উপকরণের অভাব:** রং কেনার সামর্থ্য না থাকায় তাঁকে **গাছের পাতার রস, হলুদ, আলতা, ও ভুষোকালি** দিয়ে রঙের কাজ চালাতে হতো। তুলি তৈরির জন্য তাঁকে **ছাগলের ঘাড়ের লোম কেটে বাঁশের কাঠিতে** বেঁধে ব্যবহার করতে হতো।
- **প্রথাগত শিক্ষার প্রতি অনীহা:** তাঁর পড়াশোনা ভালো লাগত না, তাই বাঁকুড়াতে ঠেলাঠেলি করে ম্যাট্রিক পর্যন্ত হয়েছিল। তিনি প্রথাগত **অ্যাকাডেমিক** শিক্ষার পরিবর্তে শিল্পের প্রতিই বেশি মনোযোগ দিতেন।
- **পরিবেশের সীমাবদ্ধতা:** শান্তিনিকেতনে আসার আগে তাঁর গ্রামে আধুনিক শিল্প বা **ওয়েস্টার্ন আর্টের** কোনো চর্চা ছিল না। তাই তাঁকে সব কাজ **নিজেই শিখে** নিতে হয়েছিল, যেমন অয়েল পেন্টিং-এর কৌশল।
এই সমস্ত প্রতিকূলতা সত্ত্বেও তাঁর **শিল্পের প্রতি স্বতঃস্ফূর্ত আগ্রহ ও অদম্য জেদই** তাঁকে একজন বিখ্যাত শিল্পী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছিল।
৪. অতিরিক্ত প্রশ্ন (Extra Questions)
সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন ও উত্তর (মান: ১-২ নম্বর):
১০. রামকিঙ্কর কোন আন্দোলন চলাকালীন নেতা-নেত্রীদের পোর্ট্রেট এঁকেছিলেন?
তিনি **নন্-কোঅপারেশন (অসহযোগ)** আন্দোলন চলাকালীন নেতা-নেত্রীদের পোর্ট্রেট এঁকেছিলেন।
১১. রামকিঙ্কর তার কোন কাজটিকে ‘অয়েল পেন্টিং’-এর প্রথম ভালো কাজ হিসেবে মনে করেছিলেন?
তিনি **’গার্ল অ্যান্ড দ্য ডগ’** (‘Girl and the Dog’) নামের তৈলচিত্রটিকে তাঁর প্রথম ভালো কাজ হিসেবে মনে করেছিলেন।
১২. নন্দলাল বসু কেন রামকিঙ্করের অয়েল পেন্টিং-এ অসন্তুষ্ট হয়েছিলেন?
নন্দলাল বসু ছিলেন **ওরিয়েন্টাল আর্ট** (প্রাচ্য শিল্পকলা)-এর প্রবর্তক। অয়েল পেন্টিং ছিল **ওয়েস্টার্ন আর্ট** (পাশ্চাত্য শিল্পকলা)-এর অন্তর্গত। এই কারণেই তিনি রামকিঙ্করের অয়েল পেন্টিং-এ কিছুটা অসন্তুষ্ট হয়েছিলেন।
বিশ্লেষণমূলক প্রশ্ন (মান: ৩-৫ নম্বর):
১৩. শান্তিনিকেতনে কলাভবনে এসে রামকিঙ্করের মনে শিল্প সম্বন্ধে যে মূল ধারণা তৈরি হয়েছিল, তা লেখো।
শান্তিনিকেতনে কলাভবনে এসে রামকিঙ্করের মনে শিল্প সম্বন্ধে একটি মৌলিক ধারণা তৈরি হয়েছিল: তাঁর মনে হয়েছিল, ভারতীয় শিল্প ভালো লাগলেও, **বাস্তবতার ভিতর দিয়ে না-গেলে সেটা সার্থক হবে না**। এই ধারণার ফলেই পরবর্তীকালে শান্তিনিকেতনে **’প্রাকৃতিক বাস্তবতার’** সূচনা হয়েছিল। তিনি বিশ্বাস করতেন, শিল্পের ভিত্তি হওয়া উচিত প্রকৃতি ও মানুষের জীবনের বাস্তবের প্রতিচ্ছবি।
১৪. ‘ওরিয়েন্টাল আর্ট’ ও ‘ওয়েস্টার্ন আর্ট’ সম্বন্ধে নন্দলাল বসু ও রামকিঙ্করের মনোভাব আলোচনা করো।
শান্তিনিকেতনে এই দুটি শিল্পধারার মধ্যে ভিন্নতা ছিল, যা দুই শিল্পীর মনোভাব থেকে বোঝা যায়:
- **নন্দলাল বসুর মনোভাব (ওরিয়েন্টাল আর্ট):** নন্দলাল বসু ছিলেন **ওরিয়েন্টাল আর্ট** (প্রাচ্য শিল্পকলা)-এর প্রবর্তক। তিনি এই ধারার শিল্পকর্মকে পছন্দ করতেন এবং ওয়েস্টার্ন আর্টের প্রচলন তখনো শান্তিনিকেতনে হয়নি। তবে তিনি ছাত্রদের স্বাধীনতায় বিশ্বাসী হওয়ায় রামকিঙ্করকে **বাধাও দেননি**।
- **রামকিঙ্করের মনোভাব (ওয়েস্টার্ন আর্ট):** রামকিঙ্কর প্রাচ্য শিল্পকে ভালোবাসলেও, তিনি মনে করতেন যে শিল্পকে সার্থক হতে গেলে **বাস্তবতার** (যা ওয়েস্টার্ন আর্টের ভিত্তি) আশ্রয় নিতে হবে। তিনি শান্তিনিকেতনে প্রথম **অয়েল পেন্টিং** (ওয়েস্টার্ন আর্টের অংশ) শুরু করেন এবং **’প্রাকৃতিক বাস্তবতার’** সূচনা করেন।
দুই শিল্পীর এই ভিন্ন মনোভাবই শান্তিনিকেতন কলাভবনকে **মুক্ত শিল্পচর্চার** ক্ষেত্রে এক অনন্য শিক্ষাকেন্দ্র করে তুলেছিল।