বাংলা সাহিত্য (সপ্তম শ্রেণি)
একাদশ পাঠ (দ্বিতীয় অংশ): বই-টই (প্রেমেন্দ্র মিত্র) – নোটস ও উত্তর
**উৎস:** প্রবন্ধ | **বিষয়বস্তু:** বই পড়ার প্রতি আকর্ষণ, বই পড়ার কায়দা-কানুন এবং তার মাধ্যমে জগৎকে চেনার আনন্দ।
—১. প্রবন্ধ পরিচিতি ও সারমর্ম (Core Theme)
প্রেমেন্দ্র মিত্রের **’বই-টই’** প্রবন্ধটি বই পড়ার গুরুত্ব, আনন্দ এবং বইকে কীভাবে নিজের করে নিতে হয়—সেই প্রসঙ্গে রচিত। লেখক এখানে বই পড়ার অভিজ্ঞতাকে এক **অ্যাডভেঞ্চার** বা **ভ্রমণ**-এর সঙ্গে তুলনা করেছেন। লেখকের মতে, বই পড়াকে কেবল একটি কর্তব্য হিসেবে দেখলে চলে না, বরং বইয়ের সঙ্গে **আত্মিক সম্পর্ক** তৈরি করতে পারলেই তার থেকে প্রকৃত আনন্দ লাভ করা সম্ভব।
মূল বক্তব্য:
- **বই পড়ার আনন্দ:** বই পড়ার মধ্য দিয়ে মানুষ **’অজানা জগৎ’** আবিষ্কার করে এবং **অজস্র বন্ধুর** সন্ধান পায়। বই হলো মানুষের **’একান্ত সঙ্গী’**।
- **বইয়ের সঙ্গে সম্পর্ক:** লেখক বলেছেন, বইকে আলমারিতে রেখে বা মলাট দিয়ে মুড়ে রাখলে চলে না। বইকে পড়তে হবে **ভালোবেসে**, বইয়ের সাথে **মিত্রতা** পাতাতে হবে।
- **বই পড়ার কায়দা-কানুন:** বই পড়ার কয়েকটি কায়দা-কানুনের কথা বলা হয়েছে, যেমন—বইয়ের সাথে একান্তে মেশা, বইকে নিজের মতো ব্যবহার করা (দরকার পড়লে দাগ দেওয়া) এবং বইকে **জীবনেরই অংশ** করে তোলা।
- **জ্ঞানের পথ:** বই কেবল তথ্য নয়, এটি মানুষের মনে **চিন্তা, কল্পনা ও প্রশ্ন** জাগায়, যা তাকে জীবনের পথ চলতে সাহায্য করে।
২. গুরুত্বপূর্ণ শব্দ ও ব্যাখ্যা
- **বই-টই:** বই ও অন্যান্য আনুসঙ্গিক জিনিস (এখানে বইয়ের প্রতি লেখকের হালকা কৌতুক)।
- **অজানা জগৎ:** যে জগৎ সম্পর্কে আমরা জানি না, কল্পনার জগৎ।
- **একান্ত সঙ্গী:** কাছের বা প্রিয় বন্ধু।
- **কায়দা-কানুন:** নিয়ম, রীতিনীতি।
- **মিত্রতা:** বন্ধুত্ব।
- **সহকর্মী:** একসঙ্গে কাজ করা ব্যক্তি।
- **অটুট:** যা ভাঙে না, দৃঢ়।
৩. হাতেকলমে (অনুশীলনী প্রশ্ন ও উত্তর)
(অনুশীলনী থেকে নির্বাচিত প্রশ্নের উত্তর নিচে দেওয়া হলো:)
সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন ও উত্তর (মান: ১-২ নম্বর):
১. লেখকের মতে, বই কিসের চেয়েও বেশি মিষ্টি লাগে?
লেখকের মতে, **আম্বিয়া আমের রসের** চেয়েও বই বেশি মিষ্টি লাগে।
২. বই পড়াকে কিসের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে?
বই পড়াকে **’অজানা জগৎ’** আবিষ্কারের **অ্যাডভেঞ্চার** বা **ভ্রমণ**-এর সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে।
৩. লেখকের মতে, বইয়ের সঙ্গে কেমন সম্পর্ক তৈরি করা উচিত?
লেখকের মতে, বইয়ের সঙ্গে **’একান্ত মিত্রতা’** ও **’আত্মিক সম্পর্ক’** তৈরি করা উচিত। বইকে নিজের **সহকর্মী ও বন্ধু** হিসেবে দেখতে হবে।
৪. বই পড়লে মানুষ কীসের সন্ধান পায়?
বই পড়লে মানুষ **অজানা জগৎ, নতুন জ্ঞান** এবং **অজস্র বন্ধুর** সন্ধান পায়।
সংক্ষিপ্ত উত্তরধর্মী প্রশ্ন (মান: ৩ নম্বর):
৫. ‘বই-টই’ প্রবন্ধে বই পড়ার কায়দা-কানুনগুলি কী কী?
‘বই-টই’ প্রবন্ধে বই পড়ার কায়দা-কানুনগুলি হলো:
- **ভালোবেসে পড়া:** বইকে কেবল কর্তব্য হিসেবে নয়, **ভালোবেসে ও আগ্রহ** নিয়ে পড়তে হবে।
- **একান্তে মেশা:** বইকে আলমারিতে তুলে না রেখে, তার সাথে **একান্তে মেশা** ও **আত্মিক সম্পর্ক** তৈরি করা।
- **ব্যবহার করা:** প্রয়োজনে বইয়ের পাতায় **দাগ দেওয়া, নোট নেওয়া** বা **মন্তব্য** লেখা—অর্থাৎ বইকে নিজের **জীবনেরই অংশ** করে তোলা।
৬. বইকে ‘সহকর্মী’ বা ‘একান্ত বন্ধু’ বলা হয়েছে কেন?
বইকে **’সহকর্মী’** বা **’একান্ত বন্ধু’** বলা হয়েছে কারণ:
- **সহকর্মী:** বই মানুষের **জ্ঞান অর্জনের পথে** সবসময় পাশে থাকে এবং **চিন্তা, কল্পনা ও প্রশ্ন** জাগিয়ে তোলে, যা তাকে জীবনের কঠিন কাজগুলিতে সাহায্য করে।
- **একান্ত বন্ধু:** বই মানুষের **নিঃসঙ্গতা দূর করে**। বইয়ের সাথে এমন গভীর মিত্রতা তৈরি হয় যে, সে হয়ে ওঠে মানুষের **একমাত্র সঙ্গী**, যে কখনোই ছেড়ে যায় না।
৭. লেখকের মতে, বইকে কীভাবে বাঁচিয়ে রাখা যায়?
লেখকের মতে, বইকে কেবল আলমারিতে **মলাট দিয়ে মুড়ে** রাখলেই বাঁচিয়ে রাখা যায় না। বইকে বাঁচিয়ে রাখার উপায় হলো:
- **পড়া ও ব্যবহার:** বইয়ের সাথে **একান্তে মেশা** এবং তাকে **মন দিয়ে পড়া ও ব্যবহার** করা।
- **জীবনের অংশ:** বইয়ের জ্ঞানকে **নিজের জীবনে প্রয়োগ** করা এবং বইকে নিজের চিন্তা, কল্পনা ও প্রশ্নের **অংশ** করে তোলা।
- **অটুট বন্ধন:** বইয়ের সঙ্গে **অটুট মিত্রতা** তৈরি করা, যা তাকে **জীবন্ত** করে রাখবে।
রচনাধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর (মান: ৫ নম্বর):
৮. ‘বই-টই’ প্রবন্ধে প্রেমেন্দ্র মিত্রের যে বইপ্রেমিক ও সাহিত্যিক মনোভঙ্গি প্রকাশ পেয়েছে, তা বিশ্লেষণ করো।
প্রেমেন্দ্র মিত্রের **’বই-টই’** প্রবন্ধটিতে তাঁর **গভীর বইপ্রেম ও সাহিত্যিকের মনোভঙ্গি** প্রকাশ পেয়েছে:
- **বইকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য নয়:** লেখক বইকে কেবল তথ্য বা কাগজ হিসেবে দেখেননি। তিনি বইকে **’আম্বিয়া আমের রসের চেয়েও মিষ্টি’** বলে অভিহিত করেছেন, যা তাঁর **তীব্র বইপ্রেমের** পরিচয়।
- **বই পড়ার দার্শনিকতা:** তাঁর মতে, বই পড়া কোনো **কর্তব্য নয়**, এটি **’অজানা জগৎ’** আবিষ্কারের এক **অ্যাডভেঞ্চার**। এই দার্শনিকতা তাঁর সাহিত্যিক মনোভঙ্গিকে তুলে ধরে।
- **মিত্রতা ও সহকর্মীত্ব:** তিনি বইকে **’একান্ত বন্ধু’** ও **’সহকর্মী’** বলেছেন। এই উপমা প্রমাণ করে, লেখক বইকে **জীবন্ত সত্তা** হিসেবে দেখেন এবং তাদের সঙ্গে **মানসিক সম্পর্ক** স্থাপন করেন।
- **নকল নয়, আপন করে নেওয়া:** লেখক মনে করেন, বইকে মলাট দিয়ে মুড়ে আলমারিতে রাখলে চলে না। বইকে **দাগ দিয়ে, মন্তব্য লিখে** নিজের মতো ব্যবহার করে **আত্মস্থ** করতে হবে। এটি একজন প্রকৃত পাঠকের কায়দা-কানুন, যিনি বই থেকে কেবল তথ্য নেন না, বরং **চিন্তা ও কল্পনা** সংগ্রহ করেন।
এইভাবে প্রেমেন্দ্র মিত্র একজন সাহিত্যিক হিসেবে প্রমাণ করেছেন, বই হলো মানুষের **আত্মার খোরাক** এবং **মনের শক্তির উৎস**, যা **অটুট মিত্রতার** মাধ্যমে বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব।