বাংলা সাহিত্য (সপ্তম শ্রেণি)
একাদশ পাঠ: দেবতাত্মা হিমালয় (প্রবোধকুমার সান্যাল) – নোটস ও উত্তর
**উৎস:** প্রবন্ধ/ভ্রমণ সাহিত্য | **বিষয়বস্তু:** হিমালয়ের প্রাকৃতিক মহিমা, আধ্যাত্মিক গুরুত্ব এবং তার প্রতি লেখকের গভীর শ্রদ্ধাবোধ।
—১. রচনা পরিচিতি ও সারমর্ম (Core Theme)
প্রবোধকুমার সান্যালের **’দেবতাত্মা হিমালয়’** প্রবন্ধটি হিমালয় পর্বতমালার **প্রাকৃতিক বিশালতা, পবিত্রতা ও আধ্যাত্মিক শক্তিকে** তুলে ধরে। লেখক হিমালয়কে কেবল একটি পর্বতশ্রেণী হিসেবে না দেখে, তাকে **’দেবতাত্মা’** (অর্থাৎ দেবতাদের আত্মা বা আশ্রয়স্থল) রূপে বর্ণনা করেছেন। হিমালয়ের প্রকৃতি, এখানকার মানুষ এবং প্রাচীন ঐতিহ্য—সবকিছুই লেখকের দৃষ্টিতে এক গভীর শ্রদ্ধার জায়গা।
মূল বক্তব্য:
- **প্রাকৃতিক মহিমা:** হিমালয়ের আকাশ, বরফের স্তূপ, কঠিন পর্বতশিরা এবং তার মাঝে লুকানো সবুজ ঘাসের স্নিগ্ধতা—এইসবই হিমালয়ের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও বিশালতা বোঝায়।
- **দেবতাত্মা উপাধি:** হিমালয়কে ‘দেবতাত্মা’ বলা হয়েছে, কারণ এটি প্রাচীন মুনিঋষিদের **তপস্যা ও সাধনার ক্ষেত্র**। এটি **পবিত্রতা ও শুভ্রতার** প্রতীক এবং ভারতের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের মূল ভিত্তি।
- **লেখক ও হিমালয়:** লেখক নিজে বারবার হিমালয়ের টানে ছুটে যান। হিমালয়কে তিনি **জীবন্ত সত্তা** হিসেবে দেখেন, যার আকর্ষণ তার কাছে দুর্নিবার।
- **মানব জীবন:** হিমালয়ের কোলে থাকা মানুষগুলি **সরল ও কর্মঠ**। তারা জীবনের কঠোরতাকে মেনে নিয়ে হিমালয়ের সঙ্গে মানিয়ে চলে।
- **আত্মিক শান্তি:** হিমালয় কেবল তীর্থযাত্রীদের জন্য নয়, এটি এমন এক স্থান যেখানে মানুষ **শান্তি ও জীবনের সঠিক অর্থ** খুঁজে পেতে পারে।
২. গুরুত্বপূর্ণ শব্দ ও ব্যাখ্যা
- **দেবতাত্মা:** দেবতাদের আত্মা বা পবিত্র স্থান।
- **গিরিশিরা:** পর্বতের চূড়া বা মাথা।
- **জটাজুট:** জটা বা চুল একত্র করে বাঁধা। এখানে হিমালয়ের পর্বতশিরাগুলিকে বোঝানো হয়েছে।
- **প্রলয়ঙ্কর:** প্রলয় বা ধ্বংসকারী।
- **তপস্যা:** কঠোর সাধনা।
- **সংহতি:** ঐক্য, মিলন।
- **মৌন:** নীরব, চুপচাপ।
- **অটুট:** অটুট, অক্ষত, যা সহজে ভাঙে না।
- **তৃষ্ণা:** এখানে আধ্যাত্মিক বা জানার আকাঙ্ক্ষা।
৩. হাতেকলমে (অনুশীলনী প্রশ্ন ও উত্তর)
(অনুশীলনী থেকে নির্বাচিত প্রশ্নের উত্তর নিচে দেওয়া হলো:)
সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন ও উত্তর (মান: ১-২ নম্বর):
১. লেখক হিমালয়কে কী বলে উল্লেখ করেছেন?
লেখক হিমালয়কে **’দেবতাত্মা’** বলে উল্লেখ করেছেন।
২. হিমালয়ের ‘প্রলয়ঙ্কর’ রূপটির বর্ণনা দাও।
হিমালয়ের প্রলয়ঙ্কর রূপটি হলো তার **কঠিন, বরফের স্তূপ ও দুর্গম গিরিশিরাগুলি**, যা মানুষকে ভয় দেখায় এবং তার বিশালতাকে প্রমাণ করে। এটি এমন এক রূপ যা ধ্বংসের শক্তি রাখে।
৩. হিমালয়ের কোলে থাকা মানুষগুলির জীবনযাত্রা কেমন?
হিমালয়ের কোলে থাকা মানুষগুলির জীবনযাত্রা **সরল ও কর্মঠ**। তারা হিমালয়ের কঠিন পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিয়ে শান্তভাবে জীবন অতিবাহিত করে।
৪. হিমালয় কেন ‘দেবতাত্মা’ উপাধি লাভ করেছে?
হিমালয়কে ‘দেবতাত্মা’ বলা হয়েছে, কারণ এটি **পবিত্রতা ও শুভ্রতার** প্রতীক এবং **প্রাচীন মুনিঋষিদের তপস্যা ও সাধনার** স্থান হিসেবে পরিচিত।
সংক্ষিপ্ত উত্তরধর্মী প্রশ্ন (মান: ৩ নম্বর):
৫. হিমালয়ের প্রাকৃতিক মহিমা লেখকের চোখে কীভাবে ধরা পড়েছে?
হিমালয়ের প্রাকৃতিক মহিমা লেখকের চোখে **বিশাল ও পবিত্র** রূপে ধরা পড়েছে:
- **বিশালতা:** আকাশের দিকে মাথা উঁচু করে থাকা **বরফের স্তূপ ও কঠিন গিরিশিরাগুলি** তার বিশালতাকে বোঝায়।
- **বৈপরীত্য:** তার কঠিন প্রলয়ঙ্কর রূপের মাঝে মাঝে **সবুজ ঘাসের স্নিগ্ধতা** এবং **পানির স্রোত** দেখা যায়, যা বৈচিত্র্য ও জীবনের প্রতীক।
- **পবিত্রতা:** তার চূড়াগুলি সবসময় **শুভ্র বরফে** ঢাকা থাকে, যা তাকে এক গভীর পবিত্রতার প্রতীক করে তুলেছে।
৬. লেখক হিমালয়ের প্রতি তাঁর গভীর শ্রদ্ধাবোধ কীভাবে প্রকাশ করেছেন?
লেখক হিমালয়ের প্রতি তাঁর গভীর শ্রদ্ধাবোধ প্রকাশ করেছেন:
- **ব্যক্তিগত টান:** তিনি বারবার হিমালয়ের টানে ছুটে যান এবং হিমালয়কে **জীবন্ত সত্তা** হিসেবে দেখেন।
- **’দেবতাত্মা’ উপাধি:** তিনি হিমালয়কে কেবল পর্বত না বলে, তাকে **’দেবতাত্মা’** বলে উল্লেখ করেছেন।
- **মৌন ভঙ্গি:** হিমালয়ের **মৌন, শান্ত ও গম্ভীর** ভঙ্গি লেখকের কাছে তপস্যার প্রতীক, যার সামনে তিনি নিজেকে ক্ষুদ্র মনে করেছেন।
৭. ‘দেবতাত্মা হিমালয়’ প্রবন্ধ অবলম্বনে হিমালয়ের সঙ্গে ভারতের সাংস্কৃতিক সম্পর্কের পরিচয় দাও।
‘দেবতাত্মা হিমালয়’ প্রবন্ধ অবলম্বনে হিমালয়ের সঙ্গে ভারতের সাংস্কৃতিক সম্পর্ক গভীর:
- **তপস্যার ক্ষেত্র:** হিমালয় **প্রাচীন মুনিঋষিদের তপস্যা ও সাধনার** ক্ষেত্র। ভারতের আধ্যাত্মিকতার মূল উৎস এই পর্বতমালা।
- **পবিত্রতার প্রতীক:** হিমালয় **পবিত্রতা, শুভ্রতা ও বিশালতার** প্রতীক। এই বিশালতা ভারতের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের মূল ভিত্তি।
- **ঐতিহ্য:** হিমালয়ের **জটাজুটের** মধ্যে যেমন বরফের স্তূপ রয়েছে, তেমনি ভারতের প্রাচীন **ঐতিহ্য**ও সেখানে অটুট আছে।
রচনাধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর (মান: ৫ নম্বর):
৮. ‘হিমালয়ের বিশালতা ও শুভ্রতার মাঝেই নিহিত রয়েছে ভারতের ঐক্যের প্রতীক’—প্রবন্ধ অবলম্বনে এই উক্তিটি আলোচনা করো।
**হিমালয়ের বিশালতা ও শুভ্রতার মধ্যে ঐক্যের প্রতীক:**
প্রবোধকুমার সান্যাল হিমালয়কে কেবল ভৌগোলিক নয়, বরং ভারতের **জাতীয় ঐক্য ও আধ্যাত্মিকতার প্রতীক** হিসেবে তুলে ধরেছেন।
- **বিশালতা ও সংহতি:** হিমালয়ের **বিশালতা** ভারতের বিভিন্ন জাতি, ভাষা ও সংস্কৃতির মধ্যেকার **ঐক্যের** প্রতীক। যেমন বহু পর্বতশিরা এক হিমালয়ে এসে মিলেছে, তেমনি ভারতও বহু বৈচিত্র্যের মধ্যেও **অটুট সংহতি** বজায় রাখে।
- **শুভ্রতা ও পবিত্রতা:** হিমালয়ের **শুভ্র বরফ** তার **পবিত্রতা** ও **শান্তির** প্রতীক। এই পবিত্রতাই ভারতবাসীকে ধর্ম ও জাতপাতের ঊর্ধ্বে উঠে **ঐক্যবদ্ধ** হতে অনুপ্রাণিত করে। হিমালয় তার মৌন তপস্যায় এই শুভ্রতাকে রক্ষা করে চলেছে।
- **আকর্ষণ:** হিমালয়ের এই দুর্নিবার আকর্ষণ ভারতের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষকে বারবার তার দিকে টানে, যা দেশের মানুষের মধ্যেকার **অন্তর্নিহিত ঐক্য ও আধ্যাত্মিক তৃষ্ণার** প্রতীক।
- **ঐতিহ্য:** হিমালয় প্রাচীনকাল থেকে ভারতের মুনিঋষিদের আশ্রয় দিয়ে **জাতীয় ঐতিহ্যের ভিত্তি** তৈরি করেছে। এই ঐতিহ্যের প্রতি সকলের শ্রদ্ধা, ঐক্যের মূল ভিত্তি।
এইভাবে হিমালয় তার **মৌন, বিশাল এবং শুভ্র** রূপের মাধ্যমে ভারতের **ঐক্য ও আধ্যাত্মিক সংহতির** প্রতীক হয়ে উঠেছে।