বাংলা সাহিত্য (ষষ্ঠ শ্রেণি)
দ্বিতীয় পাঠ: আকাশভরা সূর্য-তারা ও মন-ভালো-করা – নোটস ও উত্তর
**বিষয়বস্তু:** মহাবিশ্বের সঙ্গে মানুষের আত্মিক বন্ধন, জীবনের প্রতি বিস্ময় এবং প্রকৃতির রঙের সৌন্দর্য।
—১. আকাশভরা সূর্য-তারা (রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর): পরিচিতি ও সারমর্ম
**সারমর্ম:** রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এই গানটি **মহাজাগতিক বিশালতা** এবং তার সঙ্গে **ব্যক্তিগত অস্তিত্বের** গভীর সংযোগকে তুলে ধরে। কবি বিস্ময়ের সঙ্গে উপলব্ধি করেছেন, এই **আকাশভরা সূর্য-তারা**, **বিশ্বভরা প্রাণের** মাঝে তিনি নিজের স্থান খুঁজে পেয়েছেন। মহাবিশ্বের যে চিরন্তন ছন্দ (জোয়ার-ভাঁটা) কাজ করছে, তার টান কবির **রক্তধারার** মধ্যেও লেগে আছে। প্রকৃতির ছোটো ছোটো জিনিস—যেমন ঘাস, ফুল—সবই আনন্দের দান। এই **বিস্ময়বোধ** এবং **অনুভূতির গভীরতা** থেকেই কবির গান জেগে ওঠে।
মূল ভাবনা: মানব জীবন মহাবিশ্বের অংশ, আর এই বিশ্ব-বিস্ময় থেকে জীবনের আনন্দ আসে।
—২. মন-ভালো-করা (শক্তি চট্টোপাধ্যায়): পরিচিতি ও সারমর্ম
**সারমর্ম:** শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের এই কবিতাটি **মাছরাঙা পাখির অসাধারণ রঙের সৌন্দর্য** এবং সেই সৌন্দর্য থেকে সৃষ্ট **বিস্ময়** নিয়ে লেখা। কবি মন-ভালো-করা রোদ্দুরকে মাছরাঙার গায়ের রঙের সঙ্গে তুলনা করেছেন। মাছরাঙার গায়ে থাকা **হ্রস্ব-দীর্ঘ নীল, শান্ত ও খর** রং-এর বিচিত্রতা কবিকে মুগ্ধ করেছে। প্রকৃতির উপাদান (হাওয়া, বাতাস, পাতা, আলো) মাছরাঙার ওপর পড়ে এক **মুহূর্তের সৌন্দর্য** তৈরি করে, যা কবির মনকে ভালো করে তোলে।
মূল ভাবনা: প্রকৃতির ছোটো ছোটো জিনিসের রঙের রহস্য ও সৌন্দর্য জীবনের প্রতি বিস্ময় জাগায়।
—৩. হাতেকলমে (অনুশীলনী প্রশ্ন ও উত্তর)
সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন ও উত্তর (মান: ১-২ নম্বর):
১. ‘বিস্ময়ে তাই জাগে আমার গান’—কোন্ বিস্ময়ে কবির গান জাগে?
**আকাশভরা সূর্য-তারা** এবং **বিশ্বভরা প্রাণের** মাঝে কবি নিজেকে খুঁজে পেয়েছেন। মহাবিশ্বের এই অপার **বিশালতা** এবং তার সঙ্গে নিজের **ক্ষুদ্র অস্তিত্বের সংযোগের** বিস্ময়ে কবির গান জেগে ওঠে।
২. কবির রক্তধারায় কীসের টান লেগেছে?
কবি বলেছেন, **অসীম কালের যে হিল্লোলে** (জোয়ার-ভাঁটা) **ভুবন দোলে**, তারই টান কবির রক্তধারায় লেগেছে।
৩. কবি মাছরাঙাটির গায়ের রঙের কোন্ কোন্ বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করেছেন?
কবি মাছরাঙাটির গায়ের রঙের **হ্রস্ব দীর্ঘ নীল-নীলান্ত**, **খর ও শান্ত** এবং **লাল হরিদ্রা সবুজাভ**—এই বৈশিষ্ট্যগুলি উল্লেখ করেছেন।
৪. ‘মন-ভালো-করা রোদ্দুর’কে কবি কিসের সঙ্গে তুলনা করেছেন?
‘মন-ভালো-করা রোদ্দুর’কে কবি **মাছরাঙাটির গায়ের মতন** (রঙের সঙ্গে) তুলনা করেছেন।
৫. ‘ঘাসে ঘাসে পা ফেলেছি বনের পথে যেতে’—বনের পথে যেতে কবি আর কী কী অনুভব করেন?
বনের পথে যেতে কবি **ফুলের গন্ধে চমক** লেগে ওঠেন এবং অনুভব করেন যে **বিশ্বভুবন আনন্দেরই দান** ছড়িয়ে আছে।
সংক্ষিপ্ত উত্তরধর্মী প্রশ্ন (মান: ৩ নম্বর):
৬. ‘মন-ভালো-করা’ কবিতায় রোদ্দুরকে মাছরাঙার গায়ের রঙের সঙ্গে তুলনা করার কারণ কী?
কবি এই তুলনাটি করেছেন কারণ:
- **আকর্ষণ:** মাছরাঙা পাখির **অসাধারণ রঙের বিন্যাস** (নীল, হলুদ, সবুজাভ) এতটাই উজ্জ্বল ও আকর্ষণীয় যে তা কবির মনকে ভালো করে তোলে।
- **বিস্ময়:** মাছরাঙার রঙের মধ্যে যে **বিস্ময় ও বৈপরীত্য** (খর ও শান্ত) রয়েছে, সেই **বিস্ময়**-ই যেন সূর্যের **আলো বা রোদ্দুর** হয়ে কবির মনকে ছুঁয়ে যায়।
- **মুহূর্তের সৌন্দর্য:** আলো ও বাতাসের স্পর্শে মাছরাঙার গায়ের রং বারবার পরিবর্তিত হয় এবং সেই **মুহূর্তের উজ্জ্বলতা** রোদ্দুরের মতোই মনোমুগ্ধকর।
৭. ‘ছড়িয়ে আছে আনন্দেরই দান’—এই আনন্দের দান বলতে কবি কী বুঝিয়েছেন?
এই আনন্দের দান বলতে কবি প্রকৃতির **অফুরন্ত সৌন্দর্য** এবং **জীবনের প্রতি বিস্ময়বোধকে** বুঝিয়েছেন।
- **প্রকৃতির উপাদান:** ঘাস, ফুল, গাছপালা, আলো, বাতাস—এইসবই হলো সেই **আনন্দের দান**।
- **উপলব্ধি:** কবি যখন **কান পেতেছেন, চোখ মেলেছেন** এবং **ধরা-বুকে প্রাণ ঢেলেছেন**, তখনই তিনি এই দান অনুভব করেছেন। অর্থাৎ, এই দান কেবল দেখলেই হয় না, **মন দিয়ে উপলব্ধি** করতে হয়।
রচনাধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর (মান: ৫ নম্বর):
৮. ‘আকাশভরা সূর্য-তারা’ গানটিতে কীভাবে মহাজাগতিক বিস্ময় এবং ব্যক্তিগত অস্তিত্বের সংযোগ স্থাপিত হয়েছে?
রবীন্দ্রনাথ এই গানে মহাবিশ্বের **বিশালতা** (Cosmic scale) এবং **ব্যক্তিগত অস্তিত্বের** (Individual existence) মধ্যে এক গভীর **আত্মিক সংযোগ** স্থাপন করেছেন:
- **বিস্ময় ও অস্তিত্বের স্বীকৃতি:** কবি প্রথমে মহাবিশ্বের বিশালতাকে স্বীকার করেছেন—**’আকাশভরা সূর্য-তারা, বিশ্বভরা প্রাণ’**। এই বিপুল সৃষ্টির মাঝে কবি উপলব্ধি করেন যে তিনি নিজের **’স্থান’** খুঁজে পেয়েছেন। এই বিস্ময় থেকেই তাঁর গান জেগে ওঠে।
- **মহাজাগতিক ছন্দ:** কবি বলেছেন, **’অসীম কালের যে হিল্লোলে / জোয়ার-ভাঁটায় ভুবন দোলে’**—অর্থাৎ, মহাবিশ্বের সৃষ্টি, লয় ও গতি এক চিরন্তন ছন্দে বাঁধা।
- **রক্তধারায় সংযোগ:** সেই মহাজাগতিক ছন্দের **’টান’** কবির **’নাড়িতে মোর রক্তধারায়’** লেগেছে। এর মধ্য দিয়ে কবি প্রমাণ করেছেন, মানুষ মহাবিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন নয়, বরং **মহাবিশ্বের শক্তি** মানুষের শরীরের প্রতিটি কণা ও রক্তস্রোতের সঙ্গে যুক্ত।
- **আনন্দের উপলব্ধি:** এই সংযোগের কারণে কবির কাছে **ঘাস, ফুল** সবই **’আনন্দেরই দান’**। বিশ্বকে **’জানার মাঝে অজানারে’** (জ্ঞানের মাধ্যমে ব্রহ্মকে) সন্ধান করার যে প্রচেষ্টা, তা-ই কবির **পরম তৃপ্তি**।
এভাবে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর দেখিয়েছেন, **ব্যক্তিগত জীবন** মহাবিশ্বের সঙ্গে **একাত্ম**, আর এই উপলব্ধি থেকেই জীবনের **শ্রেষ্ঠ আনন্দ** আসে।