বাংলা সাহিত্য (ষষ্ঠ শ্রেণি)
তৃতীয় পাঠ (মিলিয়ে পড়ো): আমার ময়ূর (প্রিয়ম্বদা দেবী) – নোটস ও উত্তর
**উৎস:** প্রবন্ধ/স্মৃতিচারণ | **বিষয়বস্তু:** পোষা ময়ূরের প্রতি লেখকের স্নেহ, তার দুষ্টুমিষ্টি স্বভাব এবং স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা।
—১. প্রবন্ধ পরিচিতি ও সারমর্ম (Core Theme)
প্রিয়ম্বদা দেবীর **’আমার ময়ূর’** রচনাটি কেবল একটি পোষা প্রাণীর বর্ণনা নয়, এটি পশুপাখির প্রতি লেখকের **গভীর স্নেহ, সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণ** এবং তাদের **স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাকে** তুলে ধরে। লেখিকা একটি ময়ূরছানাকে (যা প্রথমে দেখতে মুরগিছানার মতো ছিল) যত্ন করে বড় করে তোলেন। বড় হওয়ার পর ময়ূরটির **দুষ্টুমিষ্টি স্বভাব** এবং **রূপের লীলা** প্রকাশ পায়। ময়ূরটি **খাঁচার বন্দিত্ব** একদমই পছন্দ করত না। সে অন্য বন্দি পাখিকে (যেমন ময়না) খাঁচা খুলে **মুক্তি** দিয়ে দিত। ময়ূরটির এই **স্বাধীনচেতা মন** এবং অবশেষে তার বাড়ি ছেড়ে চলে যাওয়ার ঘটনাটি লেখিকার মনে গভীর রেখাপাত করে।
**মূল বক্তব্য:**
- **ময়ূরছানার পরিবর্তন:** প্রথমে কুশ্রী ময়ূরছানাটি যত্নে **সোনালি সবুজে নীলে** ভরে ওঠে এবং তার বিচিত্র পুচ্ছের **চাঁদের টুকরো** দেখা যায়।
- **দুষ্টুমিষ্টি স্বভাব:** ময়ূরটি ছিল **ভারি দুষ্টু**। সে লেখিকার গোছানো জিনিস ঠুকরে ছড়িয়ে দিত এবং বকলে **চোখ মিট মিট** করত। আবার আদর পেলে **আবদেরে ছেলের** মতো পায়ে পায়ে ঘুরত।
- **স্বাধীনতার প্রতীক:** ময়ূরটি **খাঁচায় বন্দি থাকতে চাইত না**। সে ছাদের সিঁড়ি দিয়ে দেবদারু গাছে রাত্রিযাপন করত এবং খাঁচাবন্দি **ময়না পাখিকে মুক্তি** দিয়ে তার স্বাধীনচেতা মনকে প্রকাশ করে।
- **স্নেহ ও দুঃখ:** লেখিকা ময়ূরটিকে অত্যন্ত ভালোবাসতেন। তার চলে যাওয়ার পর লেখিকার মনে গভীর দুঃখ হয়।
২. গুরুত্বপূর্ণ শব্দ ও ব্যাখ্যা
- **হর্ম্য:** অট্টালিকা, বিশাল প্রাসাদ।
- **উৎপাত:** উপদ্রব, ঝামেলা।
- **নৃত্য:** নাচ।
- **পুচ্ছ:** লেজ বা পালক।
- **বঙ্কিম চূড়া:** বাঁকা বা সুন্দর শিখা (এখানে ময়ূরের মাথার চূড়া)।
- **ধূপছায়া/ময়ূরকণ্ঠী রং:** নীল ও সবুজের মিশ্রণ, যা ময়ূরের পালকের মতো দেখায়।
- **বিজলি আলোকশিখা:** বিদ্যুতের আলোর মতো উজ্জ্বলতা।
- **আবদেরে:** অতিরিক্ত আব্দার বা বায়না করে যে।
- **ঝটাপটি:** ঝটপট শব্দ, দ্রুত নড়াচড়া।
- **কৃতকার্য:** সফল।
৩. হাতেকলমে (অনুশীলনী প্রশ্ন ও উত্তর)
সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন ও উত্তর (মান: ১-২ নম্বর):
১. ময়ূরছানাটি দেখতে কেমন ছিল?
প্রথম যখন এসেছিল, ময়ূরছানাটি দেখতে **মুরগিছানার মতো** ছিল। গায়ের বর্ণ ছিল **মাটির মতো** ও **শুকনো ঘাসের মতো**।
২. ময়ূরটি বড়ো হওয়ার পর তার গায়ের রং কেমন হলো?
বড়ো হওয়ার পর তার গায়ের বর্ণ **সোনালি সবুজে নীলে** মিশিয়ে **ধূপছায়া** বা **ময়ূরকণ্ঠী** রং ধারণ করল। তার পুচ্ছে **নীলকান্ত মণির খন্ড খন্ড চাঁদ** দেখা গেল।
৩. ময়ূরটি কোন কোন পাখি বা জন্তুকে ভয় পেত না?
ময়ূরটি **দাসীদের** তাড়া করত এবং **পাখিদের** ভয় পেত না।
৪. ময়ূরটি খাঁচাবন্দী আর কোন্ পাখিটিকে মুক্তি দিয়েছিল?
ময়ূরটি খাঁচাবন্দী আর একটি **পাহাড়ি ময়না** পাখিকে খাঁচা খুলে মুক্তি দিয়েছিল।
সংক্ষিপ্ত উত্তরধর্মী প্রশ্ন (মান: ৩ নম্বর):
৫. ময়ূরটির দুষ্টুমিষ্টি স্বভাবের পরিচয় দাও।
ময়ূরটির স্বভাব ছিল **দুষ্টুমিষ্টি**।
- **দুষ্টুমি:** সে লেখিকার গোছানো জিনিস **ঠুকরে** চারিদিকে ছড়িয়ে দিত এবং লেখিকা বকলে বা মারবার ভান করলে **পাখা ছড়িয়ে** উল্টে দাঁড়িয়ে থাকত।
- **মিষ্টি স্বভাব:** সে লেখিকার **আবদেরে ছেলের মতো** পায়ে পায়ে ঘুরত এবং চৌকির হাতায় এসে বসত। লেখিকা তার দিকে মনোযোগ না দিলে **কাপড় ধরে টানত** বা **এলোচুলের গুচ্ছ ধরে** টানত।
৬. ময়ূরটির স্বাধীনতার প্রতি আগ্রহ কীভাবে প্রকাশ পেয়েছে?
ময়ূরটির স্বাধীনতার প্রতি আগ্রহ নিম্নলিখিতভাবে প্রকাশ পেয়েছে:
- **আশ্রয়:** সে রাতে বন্দি থাকতে চাইত না, তাই সন্ধ্যার পর ছাদের সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠে **দেবদারু গাছে রাত্রিযাপন** করত।
- **নিয়ম ভঙ্গ:** ভোর হলেই সে সিঁড়ি দিয়ে না নেমে, **পাখা মেলে মহানন্দে উড়ে নেমে আসত**।
- **অন্যকে মুক্তি:** সে শুধু নিজে স্বাধীন হতে চায়নি, খাঁচাবন্দি **পাহাড়ি ময়না** পাখিটিকেও খাঁচা খুলে **মুক্তি** দিয়ে এসেছিল।
৭. ময়ূরটির চলে যাওয়ার পর লেখিকার মনে কী ধরনের অনুভূতির সৃষ্টি হয়েছিল?
ময়ূরটির চলে যাওয়ার পর লেখিকার মনে **গভীর দুঃখ, শূন্যতা ও ব্যাকুলতা** সৃষ্টি হয়েছিল।
- **অনুভূতি:** তিনি ময়ূরটিকে **আবদেরে ছেলের মতো** ভালোবাসতেন। তাই তার চলে যাওয়া লেখিকার কাছে ছিল এক **বড় ক্ষতি**।
- **সন্ধান:** তিনি ময়ূরটির জন্য **আশা ছেড়ে** দিয়েছিলেন। যখন একজন লোক ময়ূরটিকে কোলে করে নিয়ে আসে, তখন লেখিকার **’হারাধন পেয়ে ভারি আনন্দ’** হয়েছিল।
রচনাধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর (মান: ৫ নম্বর):
৮. ‘আমার ময়ূর’ রচনা অবলম্বনে পোষা প্রাণীর প্রতি লেখিকার স্নেহ ও পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা বিশ্লেষণ করো।
প্রিয়ম্বদা দেবীর **’আমার ময়ূর’** রচনায় তাঁর **স্নেহময়ী সত্তা** এবং **তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা** ফুটে উঠেছে:
- **স্নেহময়ী মাতৃসত্তা:** লেখিকা ময়ূরছানাটিকে কেবল পাখি হিসেবে দেখেননি, বরং তাকে **’আবদেরে ছেলের মতো’** ভালোবাসতেন। ময়ূরটি যখন খেতে পারত না, তখন লেখিকা তাকে **হাতে করে খাইয়ে** দিতেন। তার দুষ্টুমি বকলে নয়, বরং হেসে উড়িয়ে দিতেন। এটি তাঁর **গভীর মমতা ও স্নেহের** পরিচয়।
- **তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা:** লেখিকা ময়ূরটির জীবনের **খুঁটিনাটি** লক্ষ্য করতেন।
- **রূপের বিবর্তন:** ময়ূরছানাটি কীভাবে **মাটির বর্ণ** থেকে **ধূপছায়া/ময়ূরকণ্ঠী** রঙে পরিবর্তিত হলো এবং পুচ্ছে **চাঁদের টুকরো** ফুটল—তা তিনি সূক্ষ্মভাবে পর্যবেক্ষণ করেন।
- **আচরণের বিশ্লেষণ:** তিনি লক্ষ করেন, ময়ূরটি খাবার সময় **মুখে যতটা ধরে, খাবল দিয়ে তার চেয়ে বেশি** নেয়। এছাড়াও, ময়ূরটির **স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা** এবং অন্য পাখিকে মুক্তি দেওয়ার মতো **মানবিক আচরণ** তিনি লক্ষ্য করেন।
এভাবে লেখিকা তাঁর **স্নেহ ও পর্যবেক্ষণ** দিয়ে ময়ূরটিকে কেবল পোষা প্রাণী নয়, বরং **স্বাধীনচেতা একটি সংবেদনশীল সত্তা** হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছেন।