বাংলা সাহিত্য (ষষ্ঠ শ্রেণি)
তৃতীয় পাঠ (দ্বিতীয় অংশ): ঘাসফড়িং (অরুণ মিত্র) – নোটস ও উত্তর
**উৎস:** কবিতা | **বিষয়বস্তু:** ঘাসফড়িং-এর সঙ্গে কবির গভীর বন্ধুত্ব, প্রকৃতির স্নিগ্ধতা এবং আত্মিক সংযোগ।
—১. কবিতা পরিচিতি ও সারমর্ম (Core Theme)
অরুণ মিত্রের **’ঘাসফড়িং’** কবিতাটি **মানুষ (কবি) ও প্রকৃতির (ঘাসফড়িং)-এর মধ্যে গড়ে ওঠা এক গভীর বন্ধুত্ব ও আত্মিক সংযোগকে** তুলে ধরে। কবি মনে করেন, প্রকৃতির সঙ্গে এই সম্পর্ক এতটাই নিবিড় যে, ঘাসফড়িং-এর সঙ্গে তাঁর বন্ধুত্ব না হয়ে পারতই না। ঝিরঝির বৃষ্টির পর ভিজে ঘাসের স্নিগ্ধ পরিবেশে এই **’নতুন আত্মীয়তা’** তৈরি হয়।
মূল বক্তব্য:
- **অকৃত্রিম বন্ধুত্ব:** ঘাসফড়িং-এর সঙ্গে কবির **’গলায় গলায় ভাব’** হয়েছে। এই বন্ধুত্বে কোনো কৃত্রিমতা বা শর্ত নেই।
- **প্রকৃতির রূপ:** **ঝিরঝির বৃষ্টির পর ভিজে ঘাসে** এই বন্ধুত্বের সূচনা হয়। ঘাসফড়িং সবুজ মাথা তুলে খেলা দেখায়, যা প্রকৃতির **স্নিগ্ধ, প্রাণবন্ত** রূপকে বোঝায়।
- **আত্মিক সংযোগ:** ঘাসফড়িং-এর কাছ থেকে চলে আসার সময় কবির **মনখারাপ** হয় এবং তিনি কথা দিয়ে আসেন যে **আবার আসবেন**।
- **ঘরের সবুজ:** কবি অনুভব করেন, তার **ঘরের দরজা এখন সবুজে সবুজ**। এটি কেবল বাইরের দৃশ্য নয়, বরং **প্রকৃতির ভালোবাসা** কবির মনের মধ্যে স্থান করে নিয়েছে, যা তার মনকে আলোকিত ও প্রাণবন্ত করে তোলে।
২. গুরুত্বপূর্ণ শব্দ ও ব্যাখ্যা
- **গলায় গলায় ভাব:** গভীর বন্ধুত্ব, নিবিড় সম্পর্ক।
- **ঝিরঝির বৃষ্টি:** মৃদু বা হালকা বৃষ্টিপাত।
- **নতুন আত্মীয়তা:** এখানে বন্ধুত্বের সম্পর্ক, যা নতুন করে প্রকৃতির সঙ্গে তৈরি হয়েছে।
- **সবুজে সবুজ:** কেবল সবুজ রং নয়, সবুজ রঙের **আধিক্য** বা সবুজের **সমারোহ**।
- **ভিজে ঘাস:** বৃষ্টির পর আর্দ্র হওয়া ঘাস।
- **কথা দিয়ে এসেছি:** প্রতিজ্ঞা বা অঙ্গীকার করে আসা।
৩. হাতেকলমে (অনুশীলনী প্রশ্ন ও উত্তর)
(অনুশীলনী থেকে নির্বাচিত প্রশ্নের উত্তর নিচে দেওয়া হলো:)
সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন ও উত্তর (মান: ১-২ নম্বর):
১. কবির সঙ্গে ঘাসফড়িং-এর কেমন ভাব হয়েছিল?
কবির সঙ্গে ঘাসফড়িং-এর **’গলায় গলায় ভাব’** হয়েছিল।
২. কবির সঙ্গে ঘাসফড়িং-এর নতুন আত্মীয়তা কখন শুরু হয়?
**ঝিরঝির বৃষ্টির পর** কবি যখন **ভিজে ঘাসে পা** দেন, তখনই ঘাসফড়িং-এর সঙ্গে তাঁর **নতুন আত্মীয়তা** বা বন্ধুত্ব শুরু হয়।
৩. ঘাসফড়িং কী খেলা দেখাল?
ঘাসফড়িং **সবুজ মাথা তুলে** কবিকে অনেক খেলা দেখাল।
৪. ঘাসফড়িং-এর কাছ থেকে চলে আসার সময় কবির কেমন অনুভূতি হয়েছিল?
ঘাসফড়িং-এর কাছ থেকে চলে আসার সময় কবির **খুব মনখারাপ** হয়েছিল।
সংক্ষিপ্ত উত্তরধর্মী প্রশ্ন (মান: ৩ নম্বর):
৫. কবির সঙ্গে ঘাসফড়িং-এর নতুন আত্মীয়তা কীভাবে গড়ে উঠল?
কবি এবং ঘাসফড়িং-এর মধ্যে নতুন আত্মীয়তাটি গড়ে ওঠার মূল কারণ ছিল **প্রকৃতির প্রতি কবির অকৃত্রিম ভালোবাসা** এবং **ঘাসফড়িং-এর সরলতা**।
- **পরিবেশ:** ঝিরঝির বৃষ্টির পর যখন ভিজে ঘাসে পা দেন, তখন প্রকৃতির **স্নিগ্ধতা** এবং **সজীবতা** কবিকে মুগ্ধ করে।
- **ঘাসফড়িং:** ঘাসফড়িং সেই মুগ্ধতার মধ্যে **সবুজ মাথা তুলে খেলা** দেখায়, যা কবির মনে আনন্দ ও কৌতূহল সৃষ্টি করে।
এই পারস্পরিক **সাড়া ও আনন্দ বিনিময়ই** তাদের মধ্যে এক গভীর ও স্বতঃস্ফূর্ত বন্ধুত্ব তৈরি করেছিল।
৬. ‘আমার ঘরের দরজা এখন সবুজে সবুজ।’- কবির এরূপ সবুজের সমারোহ দেখার কারণ কী?
এই পঙ্ক্তিটির অর্থ কেবল ঘরের দরজার রং সবুজ হওয়া নয়, বরং কবির **মানসিক অবস্থার** পরিবর্তন।
- **আত্মিক প্রভাব:** ঘাসফড়িং-এর সঙ্গে বন্ধুত্ব এবং প্রকৃতির **স্নিগ্ধতা** কবির মনে গভীরভাবে প্রভাব ফেলেছিল।
- **সৃজনশীলতা:** প্রকৃতির ভালোবাসা কবির মনের মধ্যে **আনন্দ ও সজীবতা** এনে দেয়। এই সজীবতা এতটাই তীব্র যে কবির কাছে তখন **ভেতরের জগৎ ও বাইরের জগৎ** একাকার হয়ে যায়।
অর্থাৎ, **প্রকৃতির ভালোবাসা** কবির মনকে সবুজের মতো **প্রাণবন্ত ও উজ্জ্বল** করে তুলেছে, যার প্রতিফলন হিসেবে তিনি তার **ঘরের দরজাকেই সবুজে সবুজ** দেখছেন।
৭. ‘ভিজে ঘাসের ওপর আমাকে যেতেই হবে আবার।’- কোন্ ‘ভিজে ঘাসের ওপর’ কবিকে ফিরতেই হবে? সেখানে তিনি যেতে চান কেন?
ভিজে ঘাস: কবি অরুণ মিত্রকে **ঝিরঝির বৃষ্টির পর ভিজে যাওয়া ঘাসযুক্ত খোলা মাঠে** ফিরতেই হবে।
যেতে চাওয়ার কারণ:
- **প্রতিজ্ঞা:** ঘাসফড়িং-এর কাছ থেকে আসার সময় কবি **কথা দিয়ে এসেছিলেন** যে তিনি আবার আসবেন।
- **আত্মিক টান:** এই ভিজে ঘাস এবং ঘাসফড়িং-এর **বন্ধুত্ব** কবির কাছে এক **নতুন আত্মীয়তা** তৈরি করেছে। এই **আত্মিক সংযোগ** ও **স্নিগ্ধ আনন্দ** বারবার কবিকে সেই প্রকৃতির কাছে ফিরে যেতে অনুপ্রাণিত করে।
রচনাধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর (মান: ৫ নম্বর):
৮. প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসার নিবিড় টান কীভাবে কবি অরুণ মিত্রের ‘ঘাসফড়িং’ কবিতায় প্রকাশ পেয়েছে, তা নিজের ভাষায় লেখো।
কবি অরুণ মিত্রের ‘ঘাসফড়িং’ কবিতাটিতে প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসার এক **নিবিড় ও আন্তরিক টান** ফুটে উঠেছে:
- **বন্ধুত্ব স্থাপন:** কবি ঘাসফড়িং-এর মতো একটি **ক্ষুদ্র পতঙ্গের** সঙ্গে **’গলায় গলায় ভাব’** করে ফেলেছেন। এই বন্ধুত্ব কেবল সাময়িক নয়, বরং তাদের মধ্যে এক **’নতুন আত্মীয়তা’** তৈরি হয়েছে, যা প্রমাণ করে প্রকৃতিকে তিনি **মানুষের মতো আপন** করে দেখেন।
- **স্নিগ্ধ প্রকৃতির বর্ণনা:** এই বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছে **’ঝিরঝির বৃষ্টির পর’ ভিজে ঘাসের স্নিগ্ধ পরিবেশে**। **ভিজে ঘাস** এবং **সবুজ মাথা তোলা ঘাসফড়িং**—এইসবই প্রকৃতির প্রতি কবির **সংবেদনশীলতা** তুলে ধরে।
- **আবেগময় সম্পর্ক:** ঘাসফড়িং-এর কাছ থেকে চলে আসার সময় কবির **মনখারাপ** হয় এবং তিনি **আবার আসবেন** বলে কথা দিয়ে আসেন। এই আবেগপূর্ণ বিদায় এবং প্রত্যাবর্তনের সংকল্প প্রমাণ করে যে, কবির টান গভীর ও ব্যক্তিগত।
- **মনের সবুজ:** কবির মনে হয়, তার **’ঘরের দরজা এখন সবুজে সবুজ’**। এটি প্রকৃতির প্রতি তাঁর ভালোবাসার চূড়ান্ত প্রকাশ। অর্থাৎ, প্রকৃতির সৌন্দর্য ও সজীবতা কবির মনের মধ্যে **স্থায়ী আশ্রয়** পেয়েছে।
এইভাবে, কবি ঘাসফড়িং-এর মাধ্যমে প্রকৃতির **স্নেহ, সরলতা ও চিরন্তন সজীবতাকে** উপলব্ধি করেছেন এবং তার প্রতি নিজের **অবিচ্ছিন্ন ভালোবাসার** প্রকাশ করেছেন।