বাংলা সাহিত্য (ষষ্ঠ শ্রেণি)
তৃতীয় পাঠ (তৃতীয় অংশ): কুমোরে-পোকার বাসাবাড়ি (গোপালচন্দ্র ভট্টাচার্য) – নোটস ও উত্তর
**উৎস:** বিজ্ঞান প্রবন্ধ | **বিষয়বস্তু:** কুমোরে-পোকার বাসা নির্মাণ কৌশল, শিকারের পদ্ধতি এবং তার জীবনচক্রের বিজ্ঞানসম্মত পর্যবেক্ষণ।
—১. প্রবন্ধ পরিচিতি ও সারমর্ম (Core Theme)
গোপালচন্দ্র ভট্টাচার্যের **’কুমোরে-পোকার বাসাবাড়ি’** প্রবন্ধটি পোকাটির **বাসা নির্মাণ, খাদ্য সংগ্রহ, ডিম পাড়া ও সন্তান রক্ষার** অসাধারণ প্রক্রিয়াকে বিজ্ঞানসম্মতভাবে পর্যবেক্ষণ করে লেখা হয়েছে। লেখক দেখিয়েছেন যে, কুমোরে-পোকা একটি **ছোট্ট প্রাণী হওয়া সত্ত্বেও** তার মধ্যে বাসা তৈরির **বুদ্ধি, কৌশল ও শৃঙ্খলাবোধ** রয়েছে। পোকাটির শিকার (মাকড়সা) ধরার এবং ভবিষ্যতের জন্য খাদ্য সঞ্চয় করে রাখার পদ্ধতিটি অত্যন্ত বিস্ময়কর, যা প্রবন্ধের মূল আকর্ষণ।
মূল বক্তব্য:
- **কুমোরে-পোকার পরিচয়:** পোকাটি **কালো রঙের, লিকলিকে** এবং তার শরীরের মাঝের সরু অংশটি **হলদে**।
- **বাসা নির্মাণ:** পোকাটি **কাদামাটি** সংগ্রহ করে দেওয়ালের গায়ে **লম্বাটে ধরনের এবড়ো-খেবড়ো** কুঠুরি নির্মাণ করে। একটি কুঠুরি তৈরি করতে প্রায় **দু-দিন** সময় লাগে।
- **খাদ্য সংগ্রহ কৌশল:** ভবিষ্যতের লার্ভার (বাচ্চা) জন্য কুমোরে-পোকা **মাকড়সা** শিকার করে। শিকার ধরার পর তাকে **হুল ফুটিয়ে বিষ ঢেলে দেয়**। বিষের প্রভাবে মাকড়সাটি মারা না গেলেও **অসাড়** হয়ে থাকে।
- **ডিম পাড়া ও সঞ্চয়:** অসাড় মাকড়সাগুলিকে কুঠুরির মধ্যে ভরে, তার **উদরদেশের এক পাশে ডিম** পেড়ে কুঠুরির মুখ **সম্পূর্ণ বন্ধ** করে দেয়। একাধিক কুঠুরি তৈরি হয়ে গেলে সে তার বাসার আর কোনো খোঁজ রাখে না।
- **পর্যবেক্ষণ:** লেখক সোজাসুজি কুমোরে-পোকাটিকে পর্যবেক্ষণ করেছেন এবং প্রমাণ করেছেন, সামান্য কীট-পতঙ্গের মধ্যেও **বুদ্ধিদীপ্ত জীবনধারণের কৌশল** রয়েছে।
২. গুরুত্বপূর্ণ শব্দ ও ব্যাখ্যা
- **আনাচে-কানাচে:** কোণায় কোণায়।
- **এবড়ো-খেবড়ো:** অসমান, উঁচু-নিচু।
- **কুঠুরি:** ছোটো ঘর বা প্রকোষ্ঠ।
- **পুনঃপুনঃ:** বারবার।
- **সংস্কারবশে:** প্রচলিত ধারণা বা বিশ্বাসের বশে।
- **অর্ধ-চক্রাকারে:** অর্ধেক চাকার মতো আকৃতিতে।
- **নিঃসৃত:** নির্গত।
- **প্রলেপ:** লেপন করা হয় এমন বস্তু (যেমন লালা)।
- **অসাড়:** জ্ঞানশূন্য, নিশ্চল (মারা যায়নি)।
- **নিম্নদেশে:** নীচের অংশে।
- **সঞ্চিত:** জমিয়ে রাখা হয়েছে এমন।
- **খালাস:** মুক্তি, রেহাই।
৩. হাতেকলমে (অনুশীলনী প্রশ্ন ও উত্তর)
(অনুশীলনী থেকে নির্বাচিত প্রশ্নের উত্তর নিচে দেওয়া হলো:)
সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন ও উত্তর (মান: ১-২ নম্বর):
১. কুমোরে-পোকার চেহারাটি কেমন?
কুমোরে-পোকাটি **কালো রঙের, লিকলিকে**। তার **গায়ের রং আগাগোড়া মিশমিশে কালো**। কেবল শরীরের মধ্যস্থলের বোঁটার মতো সরু অংশটি **হলদে**।
২. কুমোরে-পোকা কী দিয়ে বাসা বানায়?
কুমোরে-পোকা **কাদামাটি** সংগ্রহ করে বাসা বানায়।
৩. কোনো অদৃশ্য স্থানে কুমোরে-পোকা বাসা বাঁধছে তা কীভাবে বোঝা যায়?
কুমোরে-পোকা কাদামাটি খুঁড়ে তোলবার সময় বা মাটির ডেলাটিকে বসাবার সময় **অতি তীক্ষ্ণ স্বরে একটানা গুনগুন শব্দ** করতে থাকে। কোনো অদৃশ্য স্থানে বাসা বাঁধলেও সেই **শব্দ শুনেই** বোঝা যায় যে সে বাসা বাঁধছে।
৪. কুমোরে-পোকার শিকার কী ছিল? শিকারকে সে কেন পুরোপুরি মেরে ফেলে না?
কুমোরে-পোকার শিকার হলো **ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ভ্রমণকারী মাকড়সা**। কুমোরে-পোকা শিকারকে **হুল ফুটিয়ে বিষ** ঢেলে দেয়। এর ফলে মাকড়সাটি মারা না গিয়ে **অসাড়ভাবে** পড়ে থাকে, যা লার্ভার জন্য **সতেজ খাদ্য** হিসেবে জমা থাকে।
সংক্ষিপ্ত উত্তরধর্মী প্রশ্ন (মান: ৩ নম্বর):
৫. কুমোরে-পোকা বাসা বানানোর প্রস্তুতি কীভাবে নেয়?
বাসা বানানোর প্রস্তুতিতে কুমোরে-পোকা অত্যন্ত কৌশলী:
- **স্থান নির্বাচন:** ডিম পাড়ার সময় হলেই সে **উপযুক্ত স্থান খুঁজতে** বের হয় এবং মনোমতো স্থান পেলে **বারবার ঘুরে বিশেষভাবে পরীক্ষা** করে দেখে।
- **মাটি সংগ্রহ:** এরপর সে কাদামাটির সন্ধানে বের হয়। কাদামাটির সন্ধান পেলেই বাসা নির্মাণের জন্য সেই স্থান থেকে নির্বাচিত স্থানে **যাতায়াত করে রাস্তা চিনে** নেয়।
- **অসুবিধা অতিক্রম:** যদি কাছাকাছি মাটি না পাওয়া যায়, তবে সে **দেড়-দুশো গজ দূর** থেকেও কাদামাটি সংগ্রহ করে।
৬. কুমোরে-পোকার শিকার ধরার উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করো। শিকারকে সে কীভাবে সংগ্রহ করে?
উদ্দেশ্য: শিকার ধরার উদ্দেশ্য হলো **তার ডিম থেকে বের হওয়া লার্ভা বা বাচ্চার জন্য খাদ্য সঞ্চয়** করা।
সংগ্রহ পদ্ধতি:
- **শিকার নির্বাচন:** সে বেছে বেছে **ক্ষুদ্র ভ্রমণকারী মাকড়সা** শিকার করে।
- **অসাড় করা:** মাকড়সা চোখে পড়লেই সে ছুটে গিয়ে তার ঘাড় কামড়ে ধরে এবং **হুল ফুটিয়ে বিষ** ঢেলে দেয়। এই বিষের প্রভাবে মাকড়সাটি মারা না গিয়ে **অসাড়ভাবে** পড়ে থাকে।
- **সঞ্চয়:** অসাড় মাকড়সাকে মুখে করে কুঠুরির মধ্যে ভরে দেয়। প্রতিটি কুঠুরিতে **দশ-পনেরোটা মাকড়সা** সঞ্চয় করে তার উদরদেশের এক পাশে ডিম পাড়ে।
রচনাধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর (মান: ৫ নম্বর):
৭. কুমোরে-পোকার বাসা বানানোর প্রক্রিয়াটি বিজ্ঞানসম্মতভাবে আলোচনা করো।
কুমোরে-পোকার বাসা বানানোর প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত বিজ্ঞানসম্মত ও সুশৃঙ্খল:
- **স্থান নির্বাচন ও প্রস্তুতি:** ডিম পাড়ার জন্য সে **উপযুক্ত স্থান বিশেষভাবে পরীক্ষা** করে এবং কাদামাটি সংগ্রহের **পথ আগে থেকেই চিনে** নেয়। যদি বাসা সরিয়ে ফেলা হয়, তবে সে **জলাশয়ের পাড়** থেকে ভিজা মাটি সংগ্রহ করে নতুন বাসা তৈরি করে, যা তার **সংস্কার বা বুদ্ধির** পরিচায়ক।
- **কুঠুরি নির্মাণ (Construction):** সে চোয়ালের সাহায্যে মটরদানার মতো গোল করে মাটি তুলে আনে। মাটি দিয়ে **অর্ধ-চক্রাকারে** দেওয়ালের গায়ে বসিয়ে প্রায় **সওয়া ইঞ্চি লম্বা** একটি কুঠুরি তৈরি করে। এই কাজে তার প্রায় **দু-দিন** সময় লাগে।
- **প্রলেপ ও সুরক্ষা (Sealing):** কুঠুরিটি তৈরি হয়ে গেলে সে তার মুখ থেকে লালা নিঃসৃত করে তার সাহায্যে ভিতরের দেয়ালে **প্রলেপ** মাখিয়ে দেয়, যা বাসার ভেতরের কাঠামোকে মজবুত করে।
- **ডিম পাড়া ও খাদ্য সঞ্চয় (Provisioning):** একটি কুঠুরি তৈরি হলেই সে তার মধ্যে **অসাড় মাকড়সা** (যা বিষ দিয়ে অবশ করা) ভরে দেয়, ডিম পাড়ে এবং **কুঠুরির মুখ সম্পূর্ণরূপে বন্ধ** করে দেয়।
- **পরবর্তী ধাপ:** একটি কুঠুরি সম্পূর্ণ হলে, তার গা ঘেঁষে বা উপরেই সে **নতুন কুঠুরি নির্মাণ** শুরু করে। এভাবে এক একটি বাসাতে চার-পাঁচটি কুঠুরি তৈরি হয়।
এই সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটি প্রমাণ করে যে, কুমোরে-পোকা তার **ভবিষ্যৎ সন্তানের জন্য নিখুঁত পরিকল্পনা, প্রকৌশল ও খাদ্য ব্যবস্থাপনা** অনুসরণ করে।
৮. ‘বাসার আর কোনো খোঁজ খবর নেয় না।’—কখন কুমোরে-পোকা তার বাসার আর কোনো খোঁজ খবর নেয় না? এই মন্তব্যের তাৎপর্য বিশ্লেষণ করো।
কখন খোঁজ নেয় না: কুমোরে-পোকা যখন একটি বাসার মধ্যে **চার-পাঁচটি কুঠুরি** নির্মাণ করে, প্রতিটি কুঠুরিতে **পর্যাপ্ত অসাড় মাকড়সা ভরে** তার **ডিম পাড়া সম্পূর্ণ** করে দেয় এবং প্রতিটি কুঠুরির মুখ **সুদৃঢ়ভাবে বন্ধ** করে দেয়, তখনই সে তার বাসার আর কোনো খোঁজ খবর নেয় না।
তাৎপর্য বিশ্লেষণ: এই মন্তব্যের মধ্যে এক গভীর **প্রাকৃতিক নিয়ম** এবং **মাতৃসুলভ দায়িত্বের** প্রকাশ রয়েছে:
- **মাতৃত্বের শেষ দায়িত্ব:** কুমোরে-পোকা তার লার্ভার জন্য প্রয়োজনীয় **সবটুকু দায়িত্ব** (বাসা তৈরি, খাদ্য সংগ্রহ, সুরক্ষা) পালন করে ফেলেছে। তার কাজ হলো **বীজ রোপণ করা**, ফলনের জন্য অপেক্ষা করা নয়।
- **প্রকৃতির নিয়ম:** এটি প্রকৃতির এক চিরায়ত নিয়ম। পোকাটি জানে যে তার লার্ভা ডিম থেকে বের হয়ে অসাড় মাকড়সা খেয়ে বড় হবে এবং সঠিক সময়ে বাসা ভেঙে বেরিয়ে আসবে। এখানে **পোকাটির আর হস্তক্ষেপের প্রয়োজন নেই**।
- **মুক্তি:** পোকাটি এই কাজ শেষ করার পর **’খালাস’** পায়। তার কাছে এটি বন্ধন নয়, বরং **কর্তব্য পালন** এবং তারপরে **মুক্তি**।
অর্থাৎ, এই আচরণটি কুমোরে-পোকার **সুশৃঙ্খল জীবনচক্র** এবং **পরবর্তী প্রজন্মের প্রতি তার চূড়ান্ত দায়িত্ববোধকে** তুলে ধরে।