বাংলা সাহিত্য (ষষ্ঠ শ্রেণি)
ষষ্ঠ পাঠ (দ্বিতীয় অংশ): ফাঁকি (রাজকিশোর পট্টনায়ক) – নোটস ও উত্তর
**উৎস:** গল্প (ওড়িয়া গল্পের অনুবাদ) | **বিষয়বস্তু:** একটি আমগাছকে কেন্দ্র করে মানুষের আবেগ, ভুল বোঝাবুঝি ও প্রকৃতির কাছে জীবনের ফাঁকি।
—১. গল্প পরিচিতি ও সারমর্ম (Core Theme)
রাজকিশোর পট্টনায়কের **’ফাঁকি’** গল্পটি একটি **আমগাছকে** কেন্দ্র করে আবর্তিত। গল্পটি মানুষের **ক্ষুদ্র স্বার্থপরতা, ভুল বোঝাবুঝি ও প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসা**—এইসবের এক সরল চিত্র তুলে ধরে। গল্পটির মূল ভাবনা হলো: মানুষ যখন নিজের অহংকার ও লোক দেখানো স্বার্থের জন্য প্রকৃতির সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করে, তখন সেই প্রকৃতির কাছেই সে **’ফাঁকি’** দিয়ে যায়।
মূল বক্তব্য:
- **আমগাছের প্রতিষ্ঠা:** গোপালবাবুর বাবা **আমগাছ** লাগানোর সিদ্ধান্ত নেন। বাবা ও গোপালের মধ্যে প্রথমে গাছ কোথায় পোঁতা হবে—তা নিয়ে ঝগড়া হয়। শেষে মায়ের হস্তক্ষেপে গাছটি পাঁচিলের কাছ থেকে দু’হাত ভেতরে লাগানো হয়।
- **পরিবারের আবেগ:** এই গাছটি শীঘ্রই পরিবারের অংশ হয়ে ওঠে। গাছের **বোল ধরা, আম হওয়া**—সবকিছু নিয়ে পরিবারের সকলে **উদ্বেগ** প্রকাশ করে। গোপাল গাছটিকে **’পোষা গাছ’** বলে দাবি করে এবং এর পাতা পর্যন্ত দিতে চায় না।
- **অত্যাচার ও সংগ্রাম:** আমগাছটি নদীর দিক থেকে আসা **গরম বালির ঝাপটা** আটকায়, রাস্তার ছেলেদের **ঢিল ছোড়া** সহ্য করে এবং যুদ্ধের সময় ট্রেঞ্চের আঘাতে **হেলে** যায়।
- **জীবনের ফাঁকি:** এত যত্ন পাওয়া সত্ত্বেও আমগাছটি আসলে **উইয়ে খেয়ে ফেলেছিল**, যা পরিবারের চোখ এড়িয়ে যায়। এক **ঝড়-বৃষ্টির রাতে** গাছটি উপড়ে পড়ে। এটিই হলো জীবনের **ফাঁকি**—যেটিকে যত্ন করা হয়েছে, সেটিই ভেতরে ভেতরে ক্ষয় হয়ে গেছে।
- **চূড়ান্ত ত্যাগ:** গাছটি পড়ার সময় **ঘরের ওপর না পড়ে** বাড়ির উপরকার বিজলি বাতিটাও ভাঙেনি, যেন জীবনের শেষ মুহূর্তেও সে **কর্তব্য** পালন করেছে।
২. গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র ও ব্যাখ্যা
- **গোপালের বাবা:** পরিবারে কঠোর স্বভাবের। নিজের সিদ্ধান্তে অটল থাকেন। তিনি আমগাছ লাগানোর প্রধান উদ্যোক্তা।
- **গোপাল (পুত্র):** সে আমগাছটিকে **’পোষা গাছ’** বলে দাবি করে। সে গাছটিকে খুব ভালোবাসে এবং তার প্রতি অতিরিক্ত যত্ন দেখায়।
- **আমগাছ (কেন্দ্রীয় চরিত্র):** এই গাছটি **স্নেহ, সংগ্রাম ও নীরবতা**-র প্রতীক। এটি বাড়ির পাহারাদারের মতো দাঁড়িয়ে থাকে এবং গোপালদের পরিবারের আবেগের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে।
৩. হাতেকলমে (অনুশীলনী প্রশ্ন ও উত্তর)
(অনুশীলনী থেকে নির্বাচিত প্রশ্নের উত্তর নিচে দেওয়া হলো:)
সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন ও উত্তর (মান: ১-২ নম্বর):
১. গোপালের বাবা কেন বাগানে ফুলগাছ লাগাতে চাননি?
গোপালের বাবা প্রথমে বাগানে ফুলগাছ লাগাতে চাননি, কারণ সেই এলাকার **মাটি ছিল বেলে মাটি** এবং সেখানে **জল দেওয়ারও সুবিধা** ছিল না।
২. আমগাছটি কীভাবে গোপালবাবুর বাড়ির নিশানা হয়ে উঠেছিল?
কেউ গোপালবাবুর বাড়ির ঠিকানা জিজ্ঞাসা করলে তিনি বোঝাতেন—কাঠজোড়ি নদীর ধার বরাবর পুরীঘাট পুলিশের ফাঁড়ির পশ্চিমে যেখানে **পাঁচিলের মধ্যে আমগাছ** দেখবেন, সেইখানেই তাদের বাড়ি। এভাবে গাছটি বাড়ির নিশানা হয়ে উঠেছিল।
৩. আমগাছে কেন ঠেকো দিতে হয়েছিল?
**যুদ্ধের সময়** সরকারের লোক বোমা থেকে বাঁচবার জন্য **ট্রেঞ্চ** (গর্ত) খুঁড়েছিল। সেই ট্রেঞ্চের আঘাতে গাছটি **হেলে পড়েছিল পুবদিকে**, তাই গাছটিকে সোজা রাখতে **ঠেকো** দিতে হয়েছিল।
৪. আমগাছের বোল ঝরে যাওয়ার কারণ কী ছিল?
আমগাছে বোল ঝরে যাওয়ার প্রধান কারণ ছিল **কুয়াশা** এবং **বাতাস**। এছাড়াও **আগুন লাগানো পিঁপড়েগুলো** বোলগুলো খেয়ে ফেলেছিল।
সংক্ষিপ্ত উত্তরধর্মী প্রশ্ন (মান: ৩ নম্বর):
৫. আমগাছটি কীভাবে পরিবারের একজনের মতো হয়ে উঠেছিল?
আমগাছটি পরিবারের একজনের মতো হয়ে উঠেছিল কারণ:
- **আবেগের কেন্দ্র:** গাছের বোল ধরা থেকে শুরু করে ফল পাকা—সবকিছু নিয়ে পরিবারের সকলে **উদ্বেগ ও আনন্দ** প্রকাশ করত।
- **পাহারাদার:** গাছটি গরম বালির ঝাপটা, রাস্তার ছেলেদের ঢিল—সবকিছু **আপন দেহ দিয়ে ঠেকাত**।
- **বন্ধু:** গোপাল গাছটিকে **’পোষা গাছ’** বলে দাবি করে এবং তার কাছেই সে মনের কথা বলত।
৬. ‘সেই দিন থেকে গাছ হেলে পড়েছে পুবদিকে।’ কোন্ দিনের কথা বলা হয়েছে। গাছটি হেলে পড়ার কারণ কী?
এখানে **দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ** চলাকালীন কোনো এক দিনের কথা বলা হয়েছে, যখন **বোমা থেকে বাঁচবার জন্য** সরকারের লোক গাছের গোড়ার কাছে **ট্রেঞ্চ** (গর্ত) খুঁড়েছিল।
কারণ: ট্রেঞ্চ খোঁড়ার ফলে গাছের **শিকড়ের অনেকটা অংশ আলগা** হয়ে যায়। এই আঘাতের ফলে গাছটি **কমজোর** হয়ে পড়ে এবং **পুবদিকে হেলে** যায়।
৭. আমগাছটির ওপর মানুষেরা কীভাবে অত্যাচার করত?
আমগাছটির ওপর মানুষেরা নানাভাবে অত্যাচার করত:
- **ঢিল ছোড়া:** রাস্তার ছেলেরা **ঢিল ছুড়ে** আম পাড়তে চেষ্টা করত।
- **শরীর আঘাত:** হেলে যাওয়ার পর লোক এলে গেলে **সাইকেল ঠেসান** দিত।
- **ক্ষতি:** গোপাল **ডাল কেটে ফেলে** দিত। আত্মীয়-স্বজনরা **আম পাতা** চাইতে আসত।
রচনাধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর (মান: ৫ নম্বর):
৮. ‘ফাঁকি’ গল্পের নামকরণের সার্থকতা বিশ্লেষণ করো। জীবনের কোন্ দিক থেকে এই ফাঁকি এসেছিল?
**নামকরণের সার্থকতা:**
গল্পের নামকরণ **’ফাঁকি’** গভীর ব্যঞ্জনাময়। এটি মানুষের **ভুল ধারণা** ও **অহংকারের ফাঁকি**-কে তুলে ধরে:
- **মানুষের ফাঁকি:** পরিবার মনে করত, তারা গাছটিকে **অত্যন্ত যত্ন** করছে এবং তার পাতা পর্যন্ত কাউকে দিচ্ছে না। কিন্তু তারা খেয়াল করেনি যে, যেটিকে তারা প্রাণের মতো আগলে রাখছে, সেটি ভেতরে ভেতরে **উইয়ের কারণে ফাঁকি** হয়ে গেছে (ক্ষয়প্রাপ্ত)। **বাইরেকার লোক দেখানোর যত্ন** ছিল, কিন্তু **ভেতরের আসল ক্ষয়** তাদের চোখ এড়িয়ে গিয়েছিল।
- **জীবনের ফাঁকি:** গোপালবাবুদের বাবা-মায়েদের স্নেহ, গোপালের আবেগ—সবই ছিল গাছের প্রতি। কিন্তু গাছটি শেষ মুহূর্তে **উইয়ের ফাঁকির** কারণে উপড়ে পড়ে যায়। গাছটিকে বাঁচানোর জন্য যে কঠিন রোগ (উই) ভেতরে ভেতরে কাজ করছিল, তা তারা ধরতে পারেনি।
- **আমগাছের চূড়ান্ত ফাঁকি:** আমগাছটি উপড়ে পড়ার সময় **ঘরের ওপর না পড়ে** বিজলি বাতিও ভাঙেনি। এটি যেন শেষ মুহূর্তে **কর্তব্য পালন করে, জীবনের সব হিসেব চুকিয়ে দিয়ে** চলে যাওয়ার এক নীরব ফাঁকি।
এইভাবে, গল্পটি দেখায় যে **জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জিনিসটিই আমাদের চোখ এড়িয়ে যায়**—যাকে আমরা ফাঁকি দিই বা যার ভেতরে ফাঁকি থাকে। এই দার্শনিক ফাঁকির কারণেই গল্পটির নামকরণ সার্থক।