বাংলা সাহিত্য (ষষ্ঠ শ্রেণি)
চতুর্থ পাঠ: হাট (যতীন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত) – নোটস ও উত্তর
**উৎস:** কবিতা | **বিষয়বস্তু:** হাটের দৈনিক জীবন ও তার অস্তিত্বরহস্য, যেখানে ব্যস্ততা ও নিস্তব্ধতা পাশাপাশি চলে।
—১. কবিতা পরিচিতি ও সারমর্ম (Core Theme)
যতীন্দ্রনাথ সেনগুপ্তের **’হাট’** কবিতাটি কেবল একটি বাজারের ছবি নয়, এটি **জীবনের আসা-যাওয়া, লাভ-ক্ষতি ও নশ্বরতার** এক দার্শনিক রূপক। এই হাটে **বেচা-কেনা, দর-দাম ও কোলাহল** থাকে, কিন্তু দিন শেষ হলেই সব কোলাহল থেমে গিয়ে এক গভীর **নিস্তব্ধতা** নেমে আসে। কবি এই হাটের মধ্যে জীবনের **চিরন্তন ও শাশ্বত খেলা**-টিকে খুঁজে পেয়েছেন।
মূল বক্তব্য:
- **দৈনিক চক্র:** হাটটি **দশ-বারোখানি গ্রামের** মাঝে অবস্থিত। **বিকালবেলায়** বেচা-কেনা সেরে ক্রেতা-বিক্রেতা যে যার ঘরে ফিরে যায়। **সন্ধ্যায় প্রদীপ জ্বলে না** এবং **প্রভাতে ঝঁটি পড়ে না**।
- **নিস্তব্ধতা:** রাত নামলে **ক্লান্ত কাকের পাখে** নিশা নামে। নদীর বাতাস **বিদ্রূপ-বাঁশি** বাজায় জীর্ণ বাঁশের ফাঁকে। হাটের **দোচালা** যেন নয়ান মুদে (চোখ বুজে) থাকে।
- **জীবনের খেলা:** হাটে **’কত ক্রেতা বিক্রেতা এল আর গেল’**। কেউ **গাঁটে কড়ি বাঁধে**, কেউ **খালি ফিরে যায়**। এটি **লাভ-ক্ষতি, আনন্দ-বেদনা** মিশ্রিত জীবনেরই প্রতিফলন।
- **শাশ্বত রূপ:** এই হাট **খোলা আছে মুক্ত বাতাসে**, যেখানে কোনো বাধা নেই। নতুন করে বসা আর ভাঙার এই **নিত্য নাটের খেলা** **চিরকাল** চলতে থাকে, যা মানব জীবনের **নশ্বরতা** ও **নিরুদ্দেশ যাত্রাকে** বোঝায়।
২. গুরুত্বপূর্ণ শব্দ ও ব্যাখ্যা
- **প্রভাতে:** সকালে।
- **ঝাঁট:** ঝাঁটা বা ঝাড়ু (এখানে ঝাড়ু দেওয়া)।
- **নিশা:** রাত্রি।
- **শ্রেণিহারা:** দল বা দল থেকে বিচ্ছিন্ন।
- **পাখে:** ডানায়।
- **শাখে:** শাখায়, গাছের ডালে।
- **দোচালা:** দু’টি চাল বা ছাদযুক্ত বাড়ি।
- **মুদিল নয়ান:** চোখ বুজল।
- **বিদ্রূপ:** ব্যঙ্গ, উপহাস।
- **জীর্ণ:** পুরোনো, বহু ব্যবহারে ক্ষয়প্রাপ্ত।
- **শিশির-বিমল:** শিশিরের মতো নির্মল বা পরিষ্কার।
- **পসরা:** পণ্যদ্রব্য বা বিক্রয়ের সামগ্রী।
- **গাঁটে কড়ি বাঁধে:** টাকা বা অর্থ সঞ্চয় করে।
৩. হাতেকলমে (অনুশীলনী প্রশ্ন ও উত্তর)
সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন ও উত্তর (মান: ১-২ নম্বর):
১. হাটে সন্ধ্যাপ্রদীপ জ্বলে না কেন?
হাটে সন্ধ্যাপ্রদীপ জ্বলে না, কারণ **বিকালবেলায়** বেচা-কেনা সেরে **সবাই ঘরে ফিরে যায়**, তাই হাটে প্রদীপ জ্বালানোর মতো কেউ থাকে না।
২. কোন্ কোন্ সময়ে হাটকে নীরব থাকতে দেখা যায়?
বিকালবেলায় বেচা-কেনা শেষ হলে **সন্ধ্যা** থেকে শুরু করে **রাত্রি** এবং **প্রভাতে** (ভোরবেলা)-ও হাটকে নীরব থাকতে দেখা যায়।
৩. হাটের দোচালা কখন নয়ান মুদে থাকে?
**নিশা নামার পর** হাটের দোচালা (হাটের চালাঘরগুলি) **নয়ান মুদে** থাকে। কবি এখানে দোচালা ঘরকে মানবিক গুণ দিয়ে বর্ণনা করেছেন, যা হাটের নীরবতাকে বোঝায়।
৪. হাটের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া বাতাসের শব্দকে কবি কিসের সঙ্গে তুলনা করেছেন?
হাটের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া বাতাসের শব্দকে কবি **জীর্ণ বাঁশের ফাঁকে বাজা বিদ্রূপ-বাঁশি**-র সঙ্গে তুলনা করেছেন। এই বাঁশি যেন হাটের **নিঃসঙ্গতা** ও **নশ্বরতার** প্রতি উপহাস করে।
সংক্ষিপ্ত উত্তরধর্মী প্রশ্ন (মান: ৩ নম্বর):
৫. হাটের স্থান ছাড়িয়ে দূরের গ্রামের ছবি কীভাবে কবিতায় ফুটে উঠেছে?
দূরের গ্রামের ছবি হাটের থেকে সম্পূর্ণ বিপরীত:
- **দিনের শেষে:** বেচা-কেনা সেরে ক্রেতা-বিক্রেতা যখন ঘরে ফিরে যায়, তখন **বকের পাখায় আলোক** লুকায়।
- **সন্ধ্যা:** **দূরে দূরে গ্রামে** কিন্তু **দীপ জ্বলে ওঠে**, যা হাটের অন্ধকার ও নিস্তব্ধতার বিপরীতে গ্রামের **জীবন্ত অস্তিত্ব** ও **শান্তিকে** তুলে ধরে।
- **জীবনের সন্ধান:** হাট দিনের শেষে মরে গেলেও, গ্রাম তার **আলো** ও **জীবনযাত্রা** বজায় রাখে।
৬. ‘বাজে বায়ু আসি বিদ্রুপ-বাঁশি’—কবির এমন মনে হওয়ার কারণ কী?
কবি এখানে **দুঃখবাদী** মনোভাবের পরিচয় দিয়েছেন।
- **নিঃসঙ্গতা:** দিনভর যে হাট **কোলাহলে** মুখর ছিল, সন্ধ্যা নামতেই তা **নির্জন** হয়ে যায়। এই **আকস্মিক নীরবতা** কবির কাছে অসহ্য মনে হয়েছে।
- **নশ্বরতার উপহাস:** জীবনের সব লাভ-ক্ষতি, আনন্দ-বেদনা, দর-দাম—সবই যেন **ক্ষণস্থায়ী**। কিন্তু এই নিশা যখন নামে, তখন সেই **জীর্ণ বাঁশের ফাঁকে** দিয়ে হাটের এই নশ্বরতার প্রতি **উপহাস** করে বাতাস যেন **বিদ্রূপ-বাঁশি** বাজায়।
৭. হাটের কোন্ কোন্ বিষয়কে কবি ‘নিত্য নাটের খেলা’ বলেছেন?
কবি নিম্নলিখিত বিষয়গুলিকে **’নিত্য নাটের খেলা’** বলেছেন:
- **লাভ-ক্ষতি:** হাটে কেউ **’গাঁটে কড়ি বাঁধে’** (লাভ করে), আবার কেউ **’খালি ফিরে’** যায় (ক্ষতিগ্রস্ত হয়)।
- **আসা-যাওয়া:** **’নূতন করিয়া বসা আর ভাঙা’**—অর্থাৎ, ক্রেতা-বিক্রেতার **দিনের পর দিন** হাটে আসা এবং ফিরে যাওয়া।
- **দ্বন্দ্ব:** ক্রেতা-বিক্রেতার মধ্যে **মাল চেনাচিনি, দর জানাজানি, কানা কড়ি নিয়ে টানাটানি** এবং **হানাহানি**—এইসবই হলো হাটের নিত্যকার খেলা।
কবি এই লাভ-ক্ষতি ও আসা-যাওয়ার চিরন্তন চক্রের মধ্যেই জীবনের শাশ্বত নাট্য খুঁজে পেয়েছেন।
রচনাধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর (মান: ৫ নম্বর):
৮. ‘হাট’ কবিতার মধ্যে কবি যে গভীর জীবন-দর্শন প্রকাশ করেছেন, তা ব্যাখ্যা করো।
যতীন্দ্রনাথ সেনগুপ্তের **’হাট’** কবিতাটি তার দুঃখবাদী বা দার্শনিক মনোভঙ্গির জন্য বিখ্যাত। এই কবিতায় তিনি हाट-কে **মানবজীবনের এক বৃহত্তর রূপক** হিসেবে ব্যবহার করে গভীর জীবন-দর্শন প্রকাশ করেছেন:
- **জীবনের অস্থায়িত্ব:** দিনের বেলায় হাট যেমন **কোলাহলে** মুখর থাকে, রাত নামলে তেমনই তা **নিস্তব্ধ ও নির্জন** হয়ে যায়। এই দৈনিক চক্রের মধ্য দিয়ে কবি দেখিয়েছেন, **জীবনের ব্যস্ততা ও সাফল্য সবই ক্ষণস্থায়ী এবং নশ্বর**।
- **লাভ-ক্ষতির খেলা:** হাটে কেউ লাভ করে (‘গাঁটে কড়ি বাঁধে’), কেউ বা খালি হাতে ফেরে। এই **লাভ-ক্ষতি ও আনন্দ-বেদনার** চিরন্তন দ্বন্দ্বে মানব জীবনও বাঁধা। কেউ সফল হয়, কেউ ব্যর্থ।
- **নশ্বরতার বিদ্রূপ:** কবি হাটের **দোচালা মুদে থাকা নয়ান** এবং **জীর্ণ বাঁশের ফাঁকে বাজা বিদ্রূপ-বাঁশি**-র মাধ্যমে প্রকৃতির নীরব উপহাসকে দেখিয়েছেন। এই বিদ্রূপ মানব কীর্তি ও অহংকারের ক্ষণস্থায়ীত্বের প্রতি ইঙ্গিত করে।
- **শাশ্বত যাত্রা:** হাটে **’দিবসরাত্রি নূতন যাত্রী’** আসে আর যায়। এটি মানব জীবনের **নিরুদ্দেশ যাত্রার** প্রতীক। মানুষ আসে, নিজের লাভ-ক্ষতির খেলা খেলে, কিন্তু কেউই চিরকাল থাকে না। এই **’নিত্য নাটের খেলা’** চিরকাল চলতে থাকে।
সুতরাং, হাটের এই **নিঃসঙ্গতা** ও **অবিরাম আসা-যাওয়া**-র মধ্য দিয়ে কবি দেখিয়েছেন যে, জীবনের সমস্ত চাওয়া-পাওয়া, লাভ-ক্ষতি—সবই **মহাকালের প্রেক্ষাপটে নগণ্য এবং ক্ষণস্থায়ী**।