বাংলা সাহিত্য (ষষ্ঠ শ্রেণি)
প্রথম পাঠ: ভরদুপুরে (নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী) – নোটস ও উত্তর
**উৎস:** কাব্যগ্রন্থ | **বিষয়বস্তু:** গ্রামবাংলার এক অলস দুপুরের নিস্তব্ধতা, আশ্রয় এবং বিশ্বপ্রকৃতির ঘুম।
—১. কবিতা পরিচিতি ও সারমর্ম (Core Theme)
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর **’ভরদুপুরে’** কবিতাটি গ্রামবাংলার এক **স্নিগ্ধ, নিস্তব্ধ ও অলস মধ্যাহ্নকালের** ছবি এঁকেছে। এই সময়ে মানুষের কর্মব্যস্ততা থেমে যায়, কিন্তু প্রকৃতি তার নিজস্ব ভঙ্গিতে পথিক ও প্রাণীদের আশ্রয় দেয়। কবি এই নিস্তব্ধতার গভীরে গিয়ে উপলব্ধি করেছেন যে, এই সময়ে কেবল মানুষ নয়, **সমগ্র বিশ্বভুবনই** যেন শান্তিতে ঘুমিয়ে আছে।
মূল বক্তব্য:
- **অশথের আশ্রয়:** গ্রামের **অশথ গাছটি** পথিকজনের **ছাতা** বা আশ্রয়দাতার ভূমিকা পালন করে। তার তলায় **ঘাসের গালচে** পাতা রয়েছে, যা পথিককে বিশ্রামের জন্য আদর করে ডাকে।
- **গ্রামীণ দৃশ্য:** দূরে **গোরুবাছুর** চরছে, **রাখাল** গাছের তলায় শুয়ে মেঘ দেখছে। **নদীর ধারে** শুকনো খড়ের আঁটি বোঝাই করা বড়ো নৌকাটি বাঁধা।
- **নিস্তব্ধতা:** ভরদুপুরে **মিহিন সাদা ধুলো** উড়ে বেড়ায়, কিন্তু **মানুষজন যে যার ঘরে** ঘুমিয়ে থাকে। কোথাও কোনো শব্দ বা কোলাহল নেই।
- **বিশ্বভুবনের ঘুম:** কবি কেবল মানুষের ঘুমে থেমে থাকেননি। তিনি উপলব্ধি করেছেন, যারা জীবনকে গভীরভাবে অনুভব করে, তারা জানে—এই সময়ে **’আঁচল পেতে বিশ্বভুবন’** ঘুমোচ্ছে। অর্থাৎ, এই ঘুম বিশ্বপ্রকৃতির এক **শান্তি ও বিশ্রাম**।
২. গুরুত্বপূর্ণ শব্দ ও ব্যাখ্যা
- **অশথ:** বট বা অশ্বত্থ জাতীয় বড়ো গাছ, যা ছায়া দেয়।
- **পথিকজন:** পথচারী, ভ্রমণকারী।
- **ছাতা:** এখানে আশ্রয় বা ছায়া।
- **গালচে:** কার্পেট বা শৌখিন ফরাশ। এখানে ঘাসকে গালচের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে।
- **গোরুবাছুর:** গোরুর ছোটো বাচ্চা।
- **খোল:** ফাঁপা আবরণ, এখানে নৌকার ভিতরের অংশ বোঝানো হয়েছে।
- **আঁটি:** দড়ি দিয়ে বাঁধা শুকনো খড় বা ঘাসের গোছা।
- **মিহিন:** সূক্ষ্ম, অতি ক্ষুদ্র।
৩. হাতেকলমে (অনুশীলনী প্রশ্ন ও উত্তর)
(অনুশীলনী থেকে নির্বাচিত প্রশ্নের উত্তর নিচে দেওয়া হলো:)
সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন ও উত্তর (মান: ১-২ নম্বর):
১. ‘অশথ গাছ’কে পথিক জনের ছাতা বলা হয়েছে কেন?
**অশথ গাছটি** বিশাল ও ছায়াসুনিবিড়। ভরদুপুরের তীব্র রোদে পথচারীরা যখন ক্লান্ত হয়ে পড়ে, তখন এই গাছটি তাদের **ঠাণ্ডা ছায়া দিয়ে আশ্রয়** দেয়। ছাতা যেমন রোদ থেকে মানুষকে বাঁচায়, তেমনি এই গাছটিও পথিককে রক্ষা করে বলে, একে পথিকজনের ছাতা বলা হয়েছে।
২. রাখালরা গাছের তলায় শুয়ে কী দেখছে?
রাখালরা গাছের তলায় শুয়ে **আকাশটাকে ছুঁয়ে মেঘগুলো** ভেসে যাওয়া দেখছে।
৩. নদীর ধারের কোন্ দৃশ্য কবিতায় ফুটে উঠেছে?
নদীর ধারে একটি **বড়ো নৌকা বাঁধা** রয়েছে, যার খোলের মধ্যে **শুকনো খড়ের আঁটি বোঝাই** করা আছে। এই দৃশ্যটি নদীর ধারে ভরদুপুরের অলসতাকে তুলে ধরেছে।
৪. ‘বিশ্বভুবন’ শব্দে ‘বিশ্ব’ আর ‘ভুবন’ শব্দদুটির একত্র উপস্থিতি রয়েছে যাদের অর্থ একই। এমন পাঁচটি নতুন শব্দ তুমি তৈরি করো।
একই অর্থযুক্ত শব্দযোগে তৈরি পাঁচটি নতুন শব্দ হলো:
- আচার-ব্যবহার
- নদী-নালা
- ঘর-দুয়ার
- কাজ-কর্ম
- লতা-পাতা
সংক্ষিপ্ত উত্তরধর্মী প্রশ্ন (মান: ৩ নম্বর):
৫. ‘আঁচল পেতে বিশ্বভুবন ঘুমোচ্ছে এইখানে’ কবির এমন ভাবনার কারণ কী?
ভরদুপুরে **মানুষের কর্মব্যস্ততা ও কোলাহল** থেমে যায়। কবি লক্ষ্য করেন, শুধু মানুষ নয়, **গোরুবাছুর** চরাচ্ছে, **রাখাল** শুয়ে মেঘ দেখছে, **নৌকা**ও বাঁধা আছে—অর্থাৎ প্রকৃতিও যেন এক **অলস বিশ্রামে** মগ্ন। এই নিস্তব্ধতা এতটাই গভীর যে কবির মনে হয়েছে, যেন **স্নেহময়ী মা** যেমন তার সন্তানকে আঁচল পেতে ঘুম পাড়ায়, তেমনই **সমগ্র বিশ্বপ্রকৃতি** যেন এই শান্ত দুপুরের কোলে **আশ্রয় ও শান্তি** লাভ করেছে। এই উপলব্ধি কবির **গভীর প্রকৃতিপ্রেম ও দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গিকে** তুলে ধরে।
৬. ‘ভরদুপুরে’ কবিতায় গ্রামবাংলার এক অলস দুপুরের ছবি খুঁজে পাওয়া যায়। কবিতায় ফুটে ওঠা সেই ছবিটি কেমন লেখো।
‘ভরদুপুরে’ কবিতায় গ্রামবাংলার যে অলস দুপুরের ছবিটি ফুটে উঠেছে, তা হলো:
- **আশ্রয় ও বিশ্রাম:** পথিকজনের ছাতা হয়ে **অশথ গাছটি** দাঁড়িয়ে, যার তলায় **ঘাসের গালচে** পাতা। রাখাল সেই গাছের তলায় শুয়ে **মেঘের খেলা** দেখছে।
- **স্তব্ধতা:** বাতাস **মিহিন সাদা ধুলো** ওড়াচ্ছে। **লোকজন যে যার ঘরে** ঘুমোচ্ছে। কোথাও কোনো কোলাহল নেই।
- **অলসতা:** নদীতে **খড়ের আঁটি বোঝাই** করা নৌকাটি যেন কাজ শেষ করে অলসভাবে বাঁধা রয়েছে।
এই পুরো দৃশ্যটিতেই এক **শান্ত, স্নিগ্ধ ও গতিহীন** পরিবেশ বিরাজমান, যা গ্রামবাংলার অলস দুপুরের চিরন্তন চিত্র।
রচনাধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর (মান: ৫ নম্বর):
৭. ‘ভরদুপুরে’ কবিতার বিষয়বস্তু বিশ্লেষণ করে প্রকৃতির সঙ্গে কবির আত্মিক যোগসূত্র আলোচনা করো।
‘ভরদুপুরে’ কবিতাটির মূল বিষয়বস্তু হলো **গ্রামবাংলার মধ্যাহ্নের নিস্তব্ধতা** এবং সেই নিস্তব্ধতার মধ্যে **প্রকৃতির এক জীবন্ত ও আশ্রয়দাত্রী সত্তাকে** খুঁজে পাওয়া।
প্রকৃতির সঙ্গে কবির আত্মিক যোগসূত্র:
- **প্রকৃতিতে মানবিকতা আরোপ:** কবি অশথ গাছটিকে কেবল একটি উদ্ভিদ হিসেবে দেখেননি; তিনি সেটিকে **’পথিকজনের ছাতা’** বলেছেন এবং ঘাসের গালচেখানি যেন **’আদর করে পাতা’**—এই ভাবনা প্রকৃতির প্রতি কবির **গভীর স্নেহ ও মানবতাবোধকে** তুলে ধরে।
- **নিস্তব্ধতার উপলব্ধি:** কবি এই অলস দুপুরের নিস্তব্ধতাকে বাইরে থেকে পর্যবেক্ষণ করেননি, বরং এর **আত্মিক অর্থ** উপলব্ধি করেছেন। তিনি জানেন, এই নীরবতা নিছক শব্দহীনতা নয়, বরং **’বিশ্বভুবনের ঘুম’**। এটি প্রকৃতির প্রতি কবির **গভীর মনোনিবেশের** ফল।
- **শান্তির খোঁজ:** কবির কাছে এই দুপুরের দৃশ্যটি হলো নাগরিক জীবনের **ব্যস্ততা থেকে মুক্তি**। এই অলস, শান্ত প্রকৃতি কবিকে এক **মানসিক আশ্রয়** ও **নিরাপত্তা** দিয়েছে।
এইভাবে কবি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী গ্রামবাংলার দুপুরের মধ্যে এক **পরম ও অসীম শান্তিময়** সত্তাকে অনুভব করেছেন, যা প্রকৃতির সঙ্গে তাঁর এক **গভীর আধ্যাত্মিক সংযোগের** ফল।