বাংলা সাহিত্য (ষষ্ঠ শ্রেণি)
পঞ্চম পাঠ: চিঠি (জসীমউদ্দীন) – নোটস ও উত্তর
**উৎস:** কবিতা | **বিষয়বস্তু:** প্রকৃতির বিভিন্ন উপাদানের মধ্য দিয়ে কবি ও তাঁর খোকা ভাইয়ের কাছে আসা ভালোবাসার বার্তা।
—১. কবিতা পরিচিতি ও সারমর্ম (Core Theme)
পল্লীকবি **জসীমউদ্দীন** রচিত **’চিঠি’** কবিতাটি প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের **আত্মিক ও স্নেহময় বন্ধন**-কে তুলে ধরেছে। কবি এখানে চিঠিকে কেবল কাগজের বার্তা হিসেবে দেখেননি, বরং প্রকৃতির বিভিন্ন উপাদানকে (যেমন: মোরগ, চখাচখি, গাঙশালিক, বাবুই পাখি) **চিঠিবাহক** হিসেবে কল্পনা করেছেন। এই চিঠিগুলি মূলত **ভালোবাসা, প্রকৃতি ও জীবনের আনন্দের** বার্তা বহন করে। এই সবকিছুর মাঝে **’খোকা ভাই’**-এর হাতে লেখা চিঠিটি যেন কবির কাছে **নিখিল বিশ্বের ভালোবাসা** হয়ে এসেছে।
মূল বক্তব্য:
- **প্রকৃতির পত্রবাহক:** কবি **লাল মোরগ**-এর ভোর-জাগানোর সুর, **চখাচখি**-র বালুচরের ঝিকিমিকি, **গাঙশালিক**-এর মোড়ল সাজার খবর এবং **বাবুই পাখির** বুনট-করা নকশা—সবকিছুকেই চিঠি হিসেবে গ্রহণ করেছেন।
- **বার্তার প্রকৃতি:** এই চিঠিগুলিতে **বর্ষার স্রোত, খোকার নূপুরের ঝুমুর-ঝামুর শব্দ** এবং **শীতের ভোরের রোদের** মতো মিঠে ভালোবাসার বার্তা রয়েছে।
- **খোকা ভাইয়ের চিঠি:** খোকা ভাইয়ের চিঠিটি কবির কাছে **বিশেষ মূল্যবান**। খোকার রঙিন হাতে লেখা সেই চিঠি যেন **আকাশ জুড়ে ছড়ানো** পড়া ও শেখার সুর বহন করে এনেছে।
- **পরম তৃপ্তি:** এই সব চিঠি পাওয়ার আনন্দে কবির **নিরালাতে (নির্জনতায়) খুশির নূপুর** বেজে উঠেছে। কবির কাছে সবকিছুর মধ্যে খোকা ভাইয়ের চিঠিটিই যেন **নিখিল বিশ্বের ভালোবাসা** হয়ে এসেছে।
২. গুরুত্বপূর্ণ শব্দ ও ব্যাখ্যা
- **ঊষা:** ভোরবেলা, প্রভাত।
- **চখাচখি:** হাঁস জাতীয় পরিযায়ী পাখিবিশেষ (স্ত্রী ও পুরুষ একত্রে)।
- **বালুচর:** বালির চর বা নদীর পাড়।
- **গাঙ:** নদী। **গাঙশালিক** হলো নদীর তীরে থাকা এক ধরনের পাখি।
- **মোড়ল:** নেতা, গ্রামের প্রধান।
- **উজান সোঁতে:** স্রোতের বিপরীতে (এই কবিতায়)।
- **কোড়াকুড়ী:** জলচর পাখিবিশেষ (স্ত্রী ও পুরুষ একত্রে)।
- **দেয়া:** মেঘ।
- **হরফ:** অক্ষর, বর্ণ।
- **নিরালাতে:** নির্জন স্থানে বা একাকীত্বে।
৩. হাতেকলমে (অনুশীলনী প্রশ্ন ও উত্তর)
সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন ও উত্তর (মান: ১-২ নম্বর):
১. কবি কার কার থেকে চিঠি পেয়েছেন?
কবি **লাল মোরগ, চখাচখি, গাঙশালিক, বাবুই পাখি, কোড়াকুড়ী** এবং **খোকা ভাই**-এর থেকে চিঠি পেয়েছেন।
২. লাল মোরগের পাঠানো চিঠিটি কেমন?
লাল মোরগের পাঠানো চিঠিটি ছিল **ভোর-জাগানোর সুর-ভরা** এবং **শিশুর ঊষার (ভোরের) রঙন হাসিতে রঙিন করা**।
৩. বাবুই পাখির বাসার থেকে আসা চিঠিটি কেমন?
বাবুই পাখির বাসার থেকে আসা চিঠিটি ছিল **ধানের পাতায় তালের পাতায় বুনট-করা নকশা** এঁকে তৈরি করা।
৪. খোকা ভাই-এর চিঠিটির বর্ণনা দাও।
খোকা ভাই-এর চিঠিটি ছিল **শীতের ভোরের রোদের মতো মিঠি**। সেই চিঠিতে **আকাশ জুড়ে ছড়ানো** পড়া বা শেখার **হরফ-করা** ছিল।
সংক্ষিপ্ত উত্তরধর্মী প্রশ্ন (মান: ৩ নম্বর):
৫. কোড়াকুড়ীর পাঠানো চিঠিটির বর্ণনা দাও। এই চিঠিটিতে কোন্ ঋতুর প্রসঙ্গ রয়েছে?
কোড়াকুড়ীর পাঠানো চিঠিটি হলো **বর্ষাকালের ফসল-ক্ষেতে** থেকে আসা, যেখানে **সবুজ পাতার আসরগুলি জল-ধারায় মেতে** নাচছে। এই চিঠির বার্তা **আকাশ জুড়ে মেঘের কাঁদন** এবং **উদাস বাতাসের** কথা বলে। এই বর্ণনায় **বর্ষা ঋতুর** প্রসঙ্গ রয়েছে।
৬. কবিতায় অন্য ঋতুর পটভূমি সত্ত্বেও খোকাভাই-এর চিঠির লেখনখানি ‘শীতের ভোরের রোদের মতো’ মিঠে মনে হওয়ার তাৎপর্য বুঝিয়ে দাও।
কবিতায় মূলত **বর্ষা ঋতুর** পটভূমি থাকলেও, খোকা ভাই-এর চিঠিকে **’শীতের ভোরের রোদের মতো মিঠে’** বলা হয়েছে। এর তাৎপর্য হলো: **শীতের ভোর যেমন স্নিগ্ধ, আরামদায়ক ও মধুর** হয়, তেমনি **খোকার হাতের লেখা** চিঠিটিও কবির কাছে **স্নেহ, ভালোবাসা ও আনন্দ** এনে দিয়েছে, যা মনের সব বিষণ্ণতা দূর করে দেয়। বস্তুত, এই উপমাটি **ভালোবাসার গভীরতা** বোঝাতে ব্যবহৃত হয়েছে।
৭. ‘খুশির নূপুর ঝুমুর-ঝামুর বাজছে আমার নিরালাতে’—পঙ্ক্তিটির অর্থ বুঝিয়ে দাও।
পঙ্ক্তিটির অর্থ হলো: কবি **নির্জন স্থানে** বা একাকীত্বে আছেন। যখন তিনি প্রকৃতির কাছ থেকে এবং **খোকা ভাইয়ের** কাছ থেকে **ভালোবাসার বার্তা** বা চিঠিগুলি পান, তখন তাঁর মন আনন্দে ভরে ওঠে। এই **মানসিক আনন্দ** এতটাই তীব্র যে তা **নূপুর বাজার ঝুমুর-ঝামুর শব্দের** মতো কবির **অন্তরের মধ্যে ধ্বনিত** হতে থাকে। অর্থাৎ, **আনন্দ বা উল্লাস** যেন একটি বাদ্যের মতো তাঁর একাকীত্বকে দূর করে দেয়।
রচনাধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর (মান: ৫ নম্বর):
৮. ‘চিঠি’ কবিতা অবলম্বনে প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের আত্মিক বন্ধন কীভাবে প্রকাশিত হয়েছে, বিশ্লেষণ করো।
পল্লীকবি জসীমউদ্দীন তাঁর **’চিঠি’** কবিতায় প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের এক **স্নেহময় ও আত্মিক বন্ধনকে** তুলে ধরেছেন:
- **প্রকৃতির বাণীবাহক:** কবি **প্রকৃতির উপাদানগুলিকে** (লাল মোরগ, চখাচখি, গাঙশালিক, বাবুই পাখি) মানুষের **চিঠিবাহক** হিসেবে কল্পনা করেছেন। মোরগের সুর, চখাচখির বালুচর, বাবুইয়ের নকশা—এগুলি সবই **ভালোবাসা ও আনন্দের** বার্তা বহন করে।
- **বর্ষার আবেগের আদান-প্রদান:** কোড়াকুড়ীর পাঠানো চিঠিতে **বর্ষার আবেগ** এবং **মেঘের কাঁদন**-এর কথা রয়েছে। কবি নিজে এই আবেগের অংশীদার হন।
- **খোকা ভাইয়ের প্রতীকী অবস্থান:** প্রকৃতির সবকিছুর মাঝে **খোকা ভাই**-এর চিঠিটি যেন **নিখিল বিশ্বের ভালোবাসা** হয়ে এসেছে। খোকার চিঠি ও প্রকৃতির বার্তা—এই দুটি যেন একই সূত্রে গাঁথা। খোকা ভাই হলো মানবজীবনের **সহজ, সরল ও অকৃত্রিম ভালোবাসার** প্রতীক।
- **নিরালার আনন্দ:** প্রকৃতির এই চিঠিগুলি কবির **নিরালাতে** (একাকীত্বে) **’খুশির নূপুর’** বাজিয়ে তোলে। অর্থাৎ, মানুষের ভালোবাসা ও প্রকৃতির সান্নিধ্য তাঁর মনের **একাকীত্ব দূর করে** সেখানে আনন্দ সঞ্চার করে।
এভাবে কবি দেখিয়েছেন, প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক কেবল ভৌগোলিক নয়, বরং এটি **স্নেহ, ভালোবাসা ও অনুভূতির** এক গভীর বন্ধন।