ষষ্ঠ পাঠ: পিঁপড়ে (নোট)
প্রসেসিং হচ্ছে…

বাংলা সাহিত্য (ষষ্ঠ শ্রেণি)

ষষ্ঠ পাঠ: পিঁপড়ে (অমিয় চক্রবর্তী) – নোটস ও উত্তর

**উৎস:** কবিতা | **বিষয়বস্তু:** ক্ষুদ্র প্রাণী পিঁপড়ের জীবনবোধ, তার চলাচলের ব্যস্ততা এবং প্রকৃতির সঙ্গে তার আত্মিক সংযোগ।

১. কবিতা পরিচিতি ও সারমর্ম (Core Theme)

অমিয় চক্রবর্তীর **’পিঁপড়ে’** কবিতাটি একটি ক্ষুদ্র প্রাণী পিঁপড়েকে কেন্দ্র করে **মহাবিশ্বের গভীর জীবনবোধকে** তুলে ধরেছে। কবি পিঁপড়ের **ব্যস্ত ও মধুর চলাচলের** মধ্যে এক **’চেনা লাগে’** অনুভূতি খুঁজে পেয়েছেন। এই পিঁপড়ে ধুলোর রেণু মেখে, আলোয় ও গন্ধে ছুঁয়ে তার ক্ষুদ্র **’ভুবন’**-কে ভরে রাখে। কবি এই ক্ষুদ্র প্রাণীর জীবনকে **স্নেহ ও মমতা** দিয়ে দেখতে চেয়েছেন, কারণ আমরা সবাই **’এই দু-দিনের ঘরে’** একই মাটির বুকে বসবাস করি।

মূল বক্তব্য:

  • **ক্ষুদ্রের মধ্যে বিশ্ব:** কবি পিঁপড়ের **’ছোটো’** চলাচলের মধ্যে **’ব্যস্ত মধুর চলা’** ও এক বিশ্বজনীন ছন্দ খুঁজে পেয়েছেন।
  • **স্নেহের আবাহন:** কবি এই ক্ষুদ্র প্রাণীকে **’আহা’** বলে আবাহন জানিয়েছেন এবং তাকে **’দুঃখ নিতে’** দিতে চাননি। তার প্রতি কবির মনোভাব হলো **মমতা ও সুরক্ষা**।
  • **জীবনের নশ্বরতা:** কবি নিজেকে এবং পিঁপড়েকেও **’এই দু-দিনের ঘরে’** (নশ্বর পৃথিবীতে) মাটির বুকে থাকা সত্তা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
  • **মৃত্যুর পর ভালোবাসা:** কবি বিশ্বাস করেন, এই নশ্বর জীবনের শেষেও, **মাটির বুক** সকলের প্রতি **আদরে** ঘিরে রাখে। পিঁপড়ের **’অতলে’** ডাক দেওয়ার মধ্যে এক রহস্যময় জীবনের সমাপ্তির ইঙ্গিত রয়েছে।

২. গুরুত্বপূর্ণ শব্দ ও ব্যাখ্যা

  • **পিঁপড়ে:** পিপীলিকা, ক্ষুদ্র পতঙ্গ।
  • **মধুর চলা:** ছন্দময়, সুন্দর ও আনন্দময় গতি।
  • **স্তব্ধ শুধু চলায় কথা বলা:** পিঁপড়ের চলাচলের মধ্যে কোনো শব্দ না থাকলেও, সেই গতিই যেন এক নীরব বার্তা বা কথা।
  • **ভুবন:** পৃথিবী, জগৎ।
  • **ধুলোর রেণু মাখুক:** পৃথিবীর সঙ্গে মিশে থাকুক।
  • **অতলে:** এখানে মৃত্যুর পরের জগৎ বা জীবনের রহস্যময় সমাপ্তি।
  • **দু-দিনের ঘর:** ক্ষণস্থায়ী বা নশ্বর পৃথিবী।
  • **আদরে:** ভালোবাসায়, স্নেহভরে।

৩. হাতেকলমে (অনুশীলনী প্রশ্ন ও উত্তর)

সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন ও উত্তর (মান: ১-২ নম্বর):

১. কবির কী দেখে ‘কেমন যেন চেনা লাগে’ মনে হয়েছে? [১ নম্বর]

পিঁপড়ের **ব্যস্ত মধুর চলা** দেখে কবির **’কেমন যেন চেনা লাগে’** মনে হয়েছে।

২. পিঁপড়ে কীভাবে তার ভুবন ভরে রাখে? [২ নম্বর]

পিঁপড়ে **আলোয় গন্ধে ছুঁয়ে** এবং **ধুলোর রেণু মেখে** তার ক্ষুদ্র **ভুবন** (পৃথিবী)-কে ভরে রাখে।

৩. কবি কাউকে দুঃখ দিতে চাননি কেন? [২ নম্বর]

কবি কাউকে (এখানে পিঁপড়েকে) দুঃখ দিতে চাননি, কারণ আমরা সবাই **’এই দু-দিনের ঘরে’** একই মাটির বুকে বসবাস করি। এই **নশ্বর জীবনের একাত্মতার** কারণে কবি পিঁপড়েকে রক্ষা করতে চেয়েছেন।

৪. ‘দু দিনের ঘর’ বলতে কী বোঝ? [১ নম্বর]

‘দু দিনের ঘর’ বলতে **নশ্বর পৃথিবী** বা মানুষের **ক্ষণস্থায়ী জীবনকালকে** বোঝানো হয়েছে।

সংক্ষিপ্ত উত্তরধর্মী প্রশ্ন (মান: ৩ নম্বর):

৫. ‘আহা পিঁপড়ে ছোটো পিঁপড়ে ঘুরুক দেখুক থাকুক’—এই আবাহনের মধ্যে দিয়ে কবির কোন্ মনোভাবের পরিচয় মেলে? [৩ নম্বর]

পিঁপড়েকে এই আবাহনের মধ্যে দিয়ে কবির **গভীর মানবিকতা, স্নেহ ও বিশ্বজনীনতা**-র মনোভাব প্রকাশ পেয়েছে:

  • **মমতা:** ‘আহা’ এবং ‘ছোটো পিঁপড়ে’ শব্দের ব্যবহার প্রমাণ করে, কবি এই ক্ষুদ্র প্রাণীর প্রতি **নিবিড় মমতা** পোষণ করেন।
  • **সহাবস্থান:** কবি চান পিঁপড়ে তার **ব্যস্ত মধুর চলা** দিয়ে প্রকৃতিতে অবাধে **ঘুরুক, দেখুক ও থাকুক**। এটি জীবনের সব সৃষ্টির প্রতি **স্নেহশীল সহাবস্থানের** বার্তা দেয়।
  • **নিরাপত্তা:** কবি চান না পিঁপড়ে কোনো দুঃখ নিক। তিনি তার সুরক্ষার জন্য প্রার্থনা করছেন।

৬. ‘মাটির বুকে যারাই আছি এই দু-দিনের ঘরে / তার স্মরণে সবাইকে আজ ঘিরেছে আদরে’—ব্যাখ্যা করো। [৩ নম্বর]

এই পঙ্ক্তি দুটিতে কবি **জীবন ও মৃত্যুর** এক গভীর দর্শন তুলে ধরেছেন:

  • **নশ্বরতা:** কবি স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যে মানুষ বা পিঁপড়ে—সবাই **’এই দু-দিনের ঘরে’** (নশ্বর পৃথিবীতে) মাটির বুকে আছে।
  • **আদর:** এই নশ্বর জীবনের শেষে **’তার স্মরণে’** (অর্থাৎ, প্রকৃতির বা ঈশ্বরের স্মরণে, অথবা মৃত্যুর মাধ্যমে) **মাটির বুক** সবাইকে **’আদরে’** ঘিরে রাখে।

অর্থাৎ, **মৃত্যু** বা **মাটি** হলো এমন এক আশ্রয়, যেখানে জীবনের সব **বিভেদ ও কষ্ট** মুছে যায় এবং সবাই সমানভাবে **স্নেহ ও শান্তি** লাভ করে।

৭. ‘পিঁপড়ে’ কবিতা অবলম্বনে ক্ষুদ্র প্রাণীর জীবনের যে বিশ্বজনীন সত্য প্রকাশ পেয়েছে, তা আলোচনা করো। [৩ নম্বর]

পিঁপড়ে কবিতা অবলম্বনে ক্ষুদ্র প্রাণীর জীবনের নিম্নলিখিত বিশ্বজনীন সত্যগুলি প্রকাশ পেয়েছে:

  • **চলার মধ্যেই জীবন:** পিঁপড়ের **’ব্যস্ত মধুর চলা’** হলো জীবনের প্রতীক। ক্ষুদ্র হলেও তার চলন **ছন্দময়** ও **উদ্দেশ্যমূলক**।
  • **ক্ষুদ্রতার মহিমা:** পিঁপড়ে তার **’আলোয় গন্ধে ছুঁয়ে’** ক্ষুদ্র **’ভুবন’** ভরে রাখে। এটি প্রমাণ করে যে, **আকার ক্ষুদ্র হলেও জীবনের মূল্য বিশাল** এবং প্রতিটি প্রাণীই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের অংশ।
  • **নশ্বরতার বন্ধন:** মানুষ ও পিঁপড়ে—উভয়ই **’এই দু-দিনের ঘরে’** (নশ্বর পৃথিবীতে) বসবাসকারী। এই নশ্বরতাই সব প্রাণীকে **এক সূত্রে** বেঁধে রেখেছে।

রচনাধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর (মান: ৫ নম্বর):

৮. ‘পিঁপড়ে’ কবিতাটিতে অমিয় চক্রবর্তী কীভাবে প্রকৃতি ও ক্ষুদ্র প্রাণীর প্রতি মমতা ও দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ করেছেন, বিশ্লেষণ করো। [৫ নম্বর]

অমিয় চক্রবর্তীর **’পিঁপড়ে’** কবিতাটিতে **ক্ষুদ্র প্রাণীর প্রতি মমতা** এবং **জীবনের নশ্বরতা** নিয়ে এক গভীর দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ পেয়েছে:

  1. **মমতার প্রকাশ:** কবি পিঁপড়েকে **’আহা’** বলে আবাহন জানিয়েছেন এবং তাকে **’দুঃখ নিতে’** দিতে চাননি। পিঁপড়ের প্রতি এই সহানুভূতি কেবল প্রাণীপ্রেম নয়, বরং **বিশ্বজনীন মমত্ববোধের** পরিচায়ক। পিঁপড়ের **’ধুলোর রেণু মাখা’**-কে তিনি **স্নেহভরে** দেখতে চেয়েছেন।
  2. **জীবনের ক্ষুদ্র ভুবন:** কবি পিঁপড়ের **’ব্যস্ত মধুর চলা’**-র মধ্যে এক বিশ্বজনীন ছন্দ খুঁজে পেয়েছেন। পিঁপড়ে **আলোয় গন্ধে ছুঁয়ে** যে **’ভুবন’** ভরে রাখে, তা প্রমাণ করে, ক্ষুদ্র হলেও তার জীবন **অর্থপূর্ণ ও স্বকীয় মহিমায়** ভাস্বর।
  3. **নশ্বরতার দর্শন:** কবি **’এই দু-দিনের ঘরে’** (নশ্বর পৃথিবীতে) বসবাসকারী সব প্রাণীকে **একই নশ্বরতার সূত্রে** বেঁধেছেন। তিনি জানেন, একদিন **’কোথায় চলে নীচু’**—এই যাত্রা জীবনের অনিবার্য পরিণতি।
  4. **মৃত্যুর পর আশ্রয়:** কবি বিশ্বাস করেন, জীবনের শেষেও **’মাটির বুক’** সবাইকে **’আদরে’** ঘিরে রাখে। এই শেষ আশ্রয় হলো সেই **দার্শনিক শান্তি**, যা জীবনের সব কষ্ট ও ব্যস্ততা ভুলিয়ে দেয়।

এভাবে, কবি অমিয় চক্রবর্তী একটি ছোট্ট পিঁপড়ের জীবনকে কেন্দ্র করে **মানব জীবনের মৌলিক সত্য** এবং **প্রকৃতির সীমাহীন স্নেহকে** উপলব্ধি করেছেন।

BISWAZ GROWTH ACADEMY - Class Menu
BISWAZ GROWTH ACADEMY - Class Menu