বাংলা সাহিত্য (পঞ্চম শ্রেণি)
বিংশ পাঠ: মিষ্টি (প্রেমেন্দ্র মিত্র) – নোটস ও উত্তর
**উৎস:** সংকলিত | **কেন্দ্রীয় ভাবমূল:** প্রকৃতিতে মিষ্টির উপস্থিতি এবং মানুষের দৃষ্টিতে তার গুরুত্ব।
—১. কবি পরিচিতি (Author Information)
**প্রেমেন্দ্র মিত্র (১৯০৫-১৯৮৮):** তিনি পশ্চিমবঙ্গের হুগলি জেলার কোদালিয়ায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি একজন বিখ্যাত কবি, সাহিত্যিক, সাংবাদিক এবং চিত্র পরিচালক ছিলেন। ছোটোদের জন্য তাঁর লেখা বিখ্যাত চরিত্রগুলি হলো—**’ঘনাদা’** (বিখ্যাত বিজ্ঞান-ভিত্তিক গল্প) এবং **’পরাশর বর্মা’** (গোয়েন্দা গল্প)। তাঁর উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ হলো—**’প্রথমা’, ‘সম্রাট’** এবং **’ফেনী’**। তিনি **রবীন্দ্র পুরস্কার** এবং **সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কারে** সম্মানিত হন।
—২. সারসংক্ষেপ (Summary)
‘মিষ্টি’ কবিতাটিতে কবি প্রেমেন্দ্র মিত্র প্রকৃতির বিভিন্ন দিকে **মিষ্টির উপস্থিতি** তুলে ধরেছেন। কবি প্রশ্ন করেছেন, আকাশে মেঘ ডাকলে কেন মিষ্টি হয় না বা বর্ষার জলে কেন মিষ্টি থাকে না? অথবা, কেন মেঘ ডাকে না এবং রোদ পড়ে না—এমন পথে চললে মনে আনন্দ লাগে না?
কবি বলেছেন, যে পথে হাঁটলে **পিছলে পড়ার ভয়** নেই, **হোঁচট খাওয়া বা দুঃখের ভয়** নেই, সেই পথ দিয়ে গড়িয়ে যেতেই মন মজা পায়। মিষ্টি হলো সেই জিনিস, যা **রাস্তা হোক বা চড়াই-উতরাই**—অনেক দূর থেকে আসে। আকাশে হয়তো **ঝাক ঝাক বৃষ্টি** হচ্ছে, আর কোথাও **কিছু রোদুর** আছে। কবি সিদ্ধান্ত টেনেছেন, সব কিছু চিবিয়ে দেখে বলতে হয়, এই মিষ্টিই হলো **সবার চাইতে মিষ্টি**। অর্থাৎ, মিষ্টি শব্দটি এখানে শুধু স্বাদ নয়, বরং **জীবনের সহজ আনন্দ ও প্রাপ্তির প্রতীক**।
—৩. গুরুত্বপূর্ণ শব্দার্থ ও ব্যাখ্যা (Key Vocabulary)
| বাংলা শব্দ | অর্থ | প্রাসঙ্গিকতা |
|---|---|---|
| **বাদ** | বাদল, বৃষ্টি বা মেঘ | আকাশে **বাদ** উঠলে বৃষ্টি হয়। |
| **পিছলে** | পিছল, পিছলানো | যে পথে **পিছলে** পড়ার ভয় নেই। |
| **হোঁচট** | পায়ে ধাক্কা লাগা, পড়ে যাওয়া | **হোঁচট** খাওয়া বা দুঃখের ভয় নেই। |
| **দুঃখু** | দুঃখ, কষ্ট | জীবনের পথে চলতে গেলে **দুঃখু** আসে। |
| **গড়িয়ে** | ঢাল বেয়ে নিচে নেমে আসা | দুঃখের ভয় না থাকলে মন **গড়িয়ে** যেতে পারে। |
| **মন-সুখ** | মনের সুখ বা আনন্দ | যে পথে চললে **মন-সুখ** পাওয়া যায়। |
| **চড়াই-উতরাই** | রাস্তার উঁচু-নিচু অংশ, জীবনের উত্থান-পতন | **রাঙা হোক না চড়াই-উতরাই** পথ। |
৪. হাতেকলমে (অনুশীলনী ও অতিরিক্ত প্রশ্ন ও উত্তর)
(এখানে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ সংক্ষিপ্ত ও রচনাধর্মী প্রশ্নের উত্তর দেওয়া হলো।)
সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন ও উত্তর (মান: ২ নম্বর):
১. ‘যে পথে নেই পিছলে পড়া, হোঁচট খাওয়া, দুঃখু,’— সেই পথের বৈশিষ্ট্য কী?
যে পথে পিছলে পড়া, হোঁচট খাওয়া বা দুঃখের ভয় নেই, সেই পথ হলো **সহজ, নিরাপদ ও মসৃণ**। সেই পথে **গড়িয়ে যেতেই** মন মজা পায়।
২. কবি কোন পথে চলতে ভালো না লাগার কথা বলেছেন?
কবি সেই পথে চলতে ভালো না লাগার কথা বলেছেন যেখানে **মেঘ ডাকে না** এবং **রোদ পড়ে না**। অর্থাৎ, যে পথে **প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য** নেই, সেই পথ কবির ভালো লাগে না।
৩. ‘রাঙা হোক না চড়াই-উতরাই’— কবি কেন পথকে ‘রাঙা’ হতে বলেছেন?
**’রাঙা’** শব্দটি এখানে **আনন্দ ও উৎসবের** প্রতীক। কবি পথকে চ্যালেঞ্জিং (চড়াই-উতরাই) হওয়া সত্ত্বেও **উজ্জ্বল ও আনন্দময়** হতে বলেছেন। জীবনের পথে যত বাধা আসুক, তাকে যেন হাসিমুখে বরণ করে নেওয়া যায়।
৪. মিষ্টি জিনিসটি কোথা থেকে আসে বলে কবি মনে করেন?
কবি মনে করেন, মিষ্টি জিনিসটি অনেক দূর থেকে আসে। হয়তো যেখানে **ঝাক ঝাক বৃষ্টি** হচ্ছে, সেখানেই বা **যেখানে রোদুর** আছে—সেই বৈচিত্র্যপূর্ণ পরিবেশ থেকেই মিষ্টি আসে।
৫. ‘মিষ্টি সবার চাইতে মিষ্টি’— এই মন্তব্যের মাধ্যমে কবি কী বোঝাতে চেয়েছেন?
এই মন্তব্যের মাধ্যমে কবি মিষ্টি স্বাদকে **জীবনের সহজ আনন্দ** বা **প্রাকৃতিক প্রাপ্তির** প্রতীক হিসেবে ধরেছেন। জীবনের সব বৈচিত্র্য ও অভিজ্ঞতা (ঝাক ঝাক বৃষ্টি, রোদুর, চড়াই-উতরাই) শেষে যে আনন্দ পাওয়া যায়, সেটাই হলো **’সবার চাইতে মিষ্টি’**।
৬. আকাশ মেঘ ডাকলেও কেন মিষ্টি হয় না?
এটি একটি রূপকের প্রশ্ন। মেঘ ডাকা হলো **কষ্ট বা সমস্যার** প্রতীক। কবি বোঝাতে চেয়েছেন, জীবনে কষ্ট বা সমস্যা এলেও তার ফল **সহজেই মিষ্টি (আনন্দময়) হয় না**; তার জন্য **চেষ্টা ও সময়** প্রয়োজন।
৭. ‘গড়িয়ে যেতে যে পথ সে পায় মজা সে মন-সুখ’— কখন মন এই মজা ও সুখ পায়?
মন তখনই মজা ও সুখ পায়, যখন চলার পথে **পিছলে পড়া, হোঁচট খাওয়া বা দুঃখের ভয়** থাকে না। অর্থাৎ, মন **বাধাহীন, মসৃণ ও নিরাপদ** পথে চলতে পারলেই আনন্দ পায়।
৮. মিষ্টিকে কবি কেন অনেক দূর থেকে আসা জিনিস বলেছেন?
মিষ্টি হলো **আনন্দ বা সার্থকতা**। এই আনন্দ বা সার্থকতা সহজে আসে না, এর জন্য **বহু পথ পাড়ি দিতে হয়** (চড়াই-উতরাই) এবং **প্রাকৃতিক প্রতিকূলতা** (ঝাক ঝাক বৃষ্টি) সহ্য করতে হয়। তাই মিষ্টিকে **অনেক দূর থেকে আসা** জিনিস বলা হয়েছে।
রচনাধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর (মান: ৫ নম্বর):
১. ‘মিষ্টি’ কবিতাটিতে কবি কীভাবে জীবনের সহজ আনন্দকে তুলে ধরেছেন?
‘মিষ্টি’ কবিতাটি প্রতীকী অর্থে জীবনের সহজ আনন্দকে ফুটিয়ে তুলেছে:
- **বাধাহীনতার আনন্দ:** কবি প্রথমে দেখিয়েছেন, মন সেই পথেই মজা পায়, যেখানে **পিছলে পড়া বা হোঁচট খাওয়ার ভয়** নেই। এটি জীবনের **নিরাপদ ও সহজ** সময়ের আনন্দের প্রতীক।
- **বৈপরীত্যে আনন্দ:** কবি বলেছেন, মিষ্টি আসে **অনেক দূর থেকে**, যেখানে **ঝাক ঝাক বৃষ্টি ও রোদুর**—এই **বৈপরীত্যের** অবস্থান রয়েছে। অর্থাৎ, জীবন কেবল সহজ পথে নয়, **চড়াই-উতরাই** বা **কষ্টের** মধ্যেও আনন্দ খুঁজে নিতে হয়।
- **চূড়ান্ত প্রাপ্তি:** সব কিছু চিবিয়ে, অর্থাৎ **জীবনের সমস্ত অভিজ্ঞতা** শেষে যে উপলব্ধি বা সার্থকতা পাওয়া যায়, সেটাই হলো **’সবার চাইতে মিষ্টি’**।
এভাবে কবি মিষ্টির মাধ্যমে জীবনের **গতি, নিরাপত্তা ও চূড়ান্ত প্রাপ্তির** আনন্দকে বুঝিয়েছেন।
২. ‘রাঙা হোক না চড়াই-উতরাই—/অনেক দূর।/আকাশে থাক্ ঝাক্ বৃষ্টি,/আর কিছু রোদুর।’— এই পঙ্ক্তিগুলির মাধ্যমে জীবনের প্রতি কবির দৃষ্টিভঙ্গি আলোচনা করো।
এই পঙ্ক্তিগুলির মাধ্যমে জীবনের প্রতি কবির **আশাবাদী ও সংগ্রামশীল** দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশিত হয়েছে:
- **চ্যালেঞ্জ গ্রহণ:** **’চড়াই-উতরাই’** হলো জীবনের **বাধা, কষ্ট ও চ্যালেঞ্জের** প্রতীক। কবি এই পথকে এড়িয়ে যেতে বলেননি, বরং এটিকে **’রাঙা’** অর্থাৎ **আনন্দময় ও উৎসবমুখর** করে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন।
- **আশার সঞ্চার:** **’ঝাক্ বৃষ্টি’** হলো জীবনের **দুঃখ ও প্রতিকূলতা**, আর **’রোদুর’** হলো **আশা ও সুখ**। কবি এই দুটি বিপরীত অবস্থাকেই মেনে নিয়েছেন। তিনি জানেন, সুখ ও দুঃখ—উভয়ই জীবনের অঙ্গ।
- **দূরদর্শিতা:** ‘অনেক দূর’ থেকে মিষ্টি আসার কথা বলে কবি বোঝাতে চেয়েছেন যে, জীবনের **সার্থকতা ও আনন্দ** সহজে আসে না, তার জন্য **ধৈর্য্য ও দীর্ঘ পথ** পাড়ি দিতে হয়।
তাই, কবির দৃষ্টিভঙ্গি হলো—জীবনকে তার **সমস্ত চ্যালেঞ্জ সহকারে গ্রহণ করা** এবং **কষ্টের মধ্যেও আনন্দ** খুঁজে নেওয়া।
৩. মিষ্টিকে কেন ‘সবার চাইতে মিষ্টি’ বলা হয়েছে? এই মন্তব্যের মাধ্যমে কবি কোন জ্ঞানটি দান করেছেন?
মিষ্টিকে ‘সবার চাইতে মিষ্টি’ বলার মাধ্যমে কবি একটি **দার্শনিক জ্ঞান** দান করেছেন:
- **অভিজ্ঞতার মূল্য:** এই মিষ্টি হলো **জীবনের সমস্ত চিবানো অভিজ্ঞতা** (ভালো-মন্দ, বৃষ্টি-রোদ, চড়াই-উতরাই) থেকে আসা রস। কেবল মিষ্টি জিনিস নয়, বরং **সমস্ত অভিজ্ঞতা** থেকে পাওয়া উপলব্ধিই সেরা।
- **প্রাকৃতিক সামঞ্জস্য:** মিষ্টি আসে সেই জায়গা থেকে যেখানে **বৈপরীত্যের মধ্যে সামঞ্জস্য** (বৃষ্টি ও রোদ) থাকে। জীবনের সব ধরনের পরিস্থিতিকে মেনে নিয়ে যে ফল পাওয়া যায়, সেটাই প্রকৃত আনন্দ।
কবি এই জ্ঞান দিয়েছেন যে, **সহজ পথে পাওয়া আনন্দ ক্ষণস্থায়ী**। কিন্তু **সংগ্রাম ও অভিজ্ঞতা** থেকে আসা আনন্দই **চিরন্তন ও মূল্যবান**। এই কারণেই মিষ্টি হলো **’সবার চাইতে মিষ্টি’**।