বাংলা সাহিত্য (পঞ্চম শ্রেণি)
একবিংশ পাঠ: তালনবমী (বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়) – নোটস ও উত্তর
**উৎস:** সংকলিত গল্প | **কেন্দ্রীয় ভাবমূল:** দারিদ্র্য, ছেলেমানুষি লোভ ও মানবতাবোধের জয়।
—১. লেখক পরিচিতি (Author Information)
**বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় (১৮৯৪-১৯৫০):** তিনি বাংলার শ্রেষ্ঠ সাহিত্যিকদের মধ্যে অন্যতম। তাঁর লেখা বিশ্বজুড়ে বিখ্যাত, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—**’পথের পাঁচালী’**, **’অপরাজিত’** এবং **’আরণ্যক’**। তিনি গ্রামীণ জীবন ও প্রকৃতির প্রতি গভীর মমতা নিয়ে সাহিত্য রচনা করেছেন। তাঁর গল্প-উপন্যাসগুলিতে সাধারণত **দারিদ্র্য, সরলতা এবং প্রকৃতির সৌন্দর্য** ফুটে ওঠে। তাঁর লেখা বহু গল্প অবলম্বনে সিনেমা তৈরি হয়েছে, যার মধ্যে সত্যজিৎ রায়ের ‘পথের পাঁচালী’ বিশ্ববিখ্যাত।
—২. সারসংক্ষেপ (Summary)
গল্পটি **তালনবমীর দিন** ক্ষুদিরার দুই অনাথ ছেলেমেয়ে—**গোপাল (দশ বছর)** ও **সুন্দিরাম (বারো বছর)**-এর করুণ কাহিনি। সুন্দিরামের সামান্য গৃহস্থালি আছে, কিন্তু বর্ষার কারণে তাদের অবস্থা খুবই খারাপ। তারা দিন-দুই উপোস করে ছিল।
তালনবমীর দিন গোপাল তার পিসিমার বাড়ি **নেমন্তন্ন** খেতে যাওয়ার স্বপ্ন দেখে। কিন্তু পিসিমা (যিনি তার জেঠতুতো বোন) তাদের দারিদ্র্যের কারণে কখনোই নেমন্তন্ন করেন না। গোপাল যখন হতাশ হয়ে ফিরছে, তখন পথে তার সঙ্গে নেপাল ও তার দলবলের দেখা হয়। নেপাল গোপালকে **তাল পিঠে** খাওয়ার কথা বলে, যা শুনে গোপালের খুব দুঃখ হয়।
তারা **জেঠিমা পিসিমা** হরিয়মতি দেবীর কাছে সাহায্য চাইতে যায়। পিসিমা যদিও তাদের তাল খেতে দেন না, তবুও তাদের ক্ষুধার কথা শুনে তাদের কিছু **চাল** দেন। গোপাল চাল পেয়ে আনন্দিত হয়। গোপালের আশা ছিল, পিসিমা হয়ত কিছু **তাল** দেবেন। গোপালের শেষ আবদার, **’তাল কি বার হয় না, মা?’**—এই প্রশ্নের মধ্যে তার সরল লোভ ও গভীর হতাশা ফুটে ওঠে।
—৩. গুরুত্বপূর্ণ শব্দার্থ ও ব্যাখ্যা (Key Vocabulary)
| বাংলা শব্দ | অর্থ | প্রাসঙ্গিকতা |
|---|---|---|
| **বর্ষা** | বৃষ্টির মাস, বর্ষাকাল | শ্রাবণ মাস **বর্ষার** দিন ছিল। |
| **গৃহস্থালি** | সংসার, ঘরকন্না | সুন্দিরাম সামান্য **গৃহস্থালি** চালাত। |
| **অনাদরে** | যত্ন না পাওয়া, অবহেলায় | বর্ষার কারণে সুন্দিরামের সংসার **অনাদরে** আছে। |
| **উপোস** | অনাহারে থাকা, না খেয়ে থাকা | গোপাল ও সুন্দিরাম দিন-দুই **উপোস** ছিল। |
| **তালনবমী** | ভাদ্র মাসের শুক্লপক্ষের নবমী তিথি (তাল খাওয়ার উৎসব) | এই দিনটিতে তালের তৈরি খাবার খাওয়ার চল আছে। |
| **নেমন্তন্ন** | নিমন্ত্রণ, আমন্ত্রণ | গোপাল পিসিমার বাড়িতে **নেমন্তন্ন** খেতে চেয়েছিল। |
| **বাড়া** | পরিবেশন করা | পিঠের সঙ্গে তাল **বাড়া** হলে আর কোনো দুঃখ থাকত না। |
| **কাবু** | কাতর, দুর্বল, কাহিল | ক্ষুধা ও হতাশায় গোপাল **কাবু** হয়ে যায়। |
৪. হাতেকলমে (অনুশীলনী ও অতিরিক্ত প্রশ্ন ও উত্তর)
(এখানে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ সংক্ষিপ্ত ও রচনাধর্মী প্রশ্নের উত্তর দেওয়া হলো।)
সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন ও উত্তর (মান: ২ নম্বর):
১. সুন্দিরামের সংসারের অবস্থা কেমন ছিল?
সুন্দিরাম ও গোপাল ছিল **অনাথ**। শ্রাবণ মাসে প্রচণ্ড বর্ষার কারণে তাদের সামান্য **গৃহস্থালি (সংসার)** একেবারেই **অনাদরে** ছিল। তারা এতটাই দরিদ্র ছিল যে দিন-দুই **উপোস** করে কাটাতে হয়েছিল।
২. গোপাল তালনবমীর দিন কী আশা করেছিল?
তালনবমীর দিন গোপাল তার পিসিমার বাড়িতে **নেমন্তন্ন** খেতে যাওয়ার আশা করেছিল। সে ভেবেছিল, সেখানে পেট পুরে **তাল পিঠে** খেতে পাবে।
৩. গোপালের নেমন্তন্নের আশা পূর্ণ হলো না কেন?
গোপালের পিসিমা (জেঠতুতো বোন) তাদের **দারিদ্র্যের** কারণে কখনোই তাদের নেমন্তন্ন করতেন না। এই দিনও তাই নেমন্তন্ন না পাওয়ায় গোপালের আশা পূর্ণ হলো না।
৪. গোপালকে দেখে তার জেঠিমা হরিয়মতি কী বলেছিলেন?
গোপালকে দেখে তার জেঠিমা হরিয়মতি দেবী প্রথমে অবাক হয়ে বলেছিলেন, **’ও তুমি, সুন্দির ছেলে? এখনো এখানে কেন রে? যাওনি পিসিমার বাড়ি?’**
৫. পিসিমা গোপালকে তাল খেতে না দিলেও কী দিয়েছিলেন? গোপাল তাতে খুশি হয়েছিল কেন?
পিসিমা গোপালকে তাল খেতে না দিলেও তাদের উপোসের কথা শুনে কিছু **চাল** দিয়েছিলেন। গোপাল এতে খুশি হয়েছিল, কারণ চাল পেলে তারা **খিদে মিটিয়ে ভাত** খেতে পারত।
৬. গোপাল নেপালের কাছে তালনবমীর দিনে কী কী খাবার তৈরি হওয়ার কথা শুনেছিল?
গোপাল নেপালের কাছে তালনবমীর দিনে **তাল পিঠে**, **ভাজা তাল** এবং **দুধে-গড়া ক্ষীরের পুতুল** তৈরি হওয়ার কথা শুনেছিল।
৭. গোপালের কাছে পিসিমার বাড়িটি কেমন ছিল?
গোপালের কাছে পিসিমার বাড়ি ছিল এক **মায়াময়** জায়গা। সেখানে গেলে **পেট পুরে খাওয়া** যেত। তাই সে মনে করত, পিসিমার বাড়িতে যাওয়া তার কাছে **সাত রাজার ধন** পাওয়ার মতো আনন্দ।
৮. ‘তালনবমীর ব্রত উপলক্ষে তাদের নিমন্ত্রণ করার কথা নয়’— কেন এমন বলা হয়েছে?
হরিয়মতি দেবীর কাছে গোপাল ও সুন্দিরামের **সামাজিক ও অর্থনৈতিক মূল্য কম** ছিল। তাদের দারিদ্র্যের কারণে তিনি তাদের অবহেলা করতেন এবং নেমন্তন্ন করতেন না। তাই নেমন্তন্ন করার কথা তার মনেও আসেনি।
৯. গোপাল চাল পেয়েও কেন শেষ পর্যন্ত হতাশ হয়েছিল?
গোপাল চাল পেয়ে সাময়িক খুশি হলেও, তালনবমীর দিন তার **তাল খাওয়ার লোভ** বা **আকাঙ্ক্ষা** ছিল বেশি। পিসিমা তাকে চাল দিলেও তাল দেবেন না জেনে সে হতাশ হয়েছিল এবং করুণ সুরে জিজ্ঞাসা করেছিল, **’তাল কি বার হয় না, মা?’**
রচনাধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর (মান: ৫ নম্বর):
১. ‘তালনবমী’ গল্পে গোপালের দারিদ্র্য ও লোভের করুণ চিত্রটি বিশ্লেষণ করো।
গোপালের জীবনে দারিদ্র্য ও লোভের করুণ চিত্রটি গভীর সহানুভূতি জাগায়:
- **চরম দারিদ্র্য:** গোপাল ও তার দাদা ছিল **অনাথ**। প্রচণ্ড বর্ষায় তাদের গৃহস্থালি ভেঙে পড়েছিল এবং তারা দিন-দুই **উপোস** করে ছিল। এই উপোস থেকেই তাদের চরম দারিদ্র্য বোঝা যায়।
- **ছেলেমানুষি লোভ:** তালনবমীর দিন তার মনে **তাল পিঠে** খাওয়ার তীব্র লোভ জন্মায়। তার এই লোভ নেপালের কাছ থেকে **তাল পিঠের বর্ণনা** শোনার পর আরও বেড়ে যায়।
- **আশার ছলনা:** সে পিসিমার বাড়িতে নেমন্তন্ন পাওয়ার **মিথ্যা আশা** নিয়ে গিয়েছিল। যখন সে বোঝে তার আশা পূরণ হবে না, তখন তার লোভ করুণ হতাশায় পরিণত হয়।
- **হতাশা:** চাল পেয়ে সাময়িক আনন্দ পেলেও, শেষে তার **’তাল কি বার হয় না, মা?’**—এই প্রশ্নটি তার **মিষ্টি খাওয়ার অপূর্ণ বাসনা** এবং সেই বাসনা পূরণে ব্যর্থতার করুণ চিত্রটি তুলে ধরে।
২. গোপালের জেঠিমা হরিয়মতি দেবীর চরিত্রটি আলোচনা করো।
হরিয়মতি দেবীর চরিত্রে **স্নেহহীনতা ও কর্তব্যবোধ**—এই দুটি বিপরীত দিক লক্ষ্য করা যায়:
- **স্নেহহীনতা ও আলস্য:** তিনি গোপালকে নিজের **জেঠতুতো বোন**-এর ছেলে হওয়া সত্ত্বেও কোনোদিন **নেমন্তন্ন** করেননি। তালনবমীর দিন উৎসব করলেও, তিনি গোপালের ক্ষুধার্ত মুখের দিকে মনোযোগ দেননি।
- **অসম্পূর্ণ মানবতাবোধ:** যখন গোপালের উপোসের কথা শোনেন, তখন তার মধ্যে **সামান্য কর্তব্যবোধ** জেগে ওঠে। তিনি পিঠে বা তাল না দিলেও, **চাল** দিতে রাজি হন—এটি তার **খাদ্যদানের মানসিকতাকে** প্রকাশ করে।
- **সামাজিক মূল্যবোধ:** গোপালদের দারিদ্র্যের কারণে তিনি তাদের **সামাজিক মূল্য কম** দিতেন এবং নেমন্তন্ন থেকে দূরে রাখতেন।
হরিয়মতির চরিত্রে **সহানুভূতি কম** থাকলেও, চাল দান করার মাধ্যমে তার মধ্যে থাকা **সীমিত মানবিকতা** প্রকাশ পায়।
৩. তালনবমীর উৎসব গোপালদের কাছে কী বার্তা নিয়ে এসেছিল?
তালনবমীর উৎসব গোপালদের কাছে **আনন্দ ও কষ্টের মিশ্র বার্তা** নিয়ে এসেছিল:
- **আশার বার্তা (আনন্দ):** তালনবমীর দিন গোপালের মনে **তাল পিঠে** খাওয়ার তীব্র **আকাঙ্ক্ষা ও আশা** জাগিয়েছিল। এটি ছিল তার কাছে **স্বাভাবিক শৈশবের আনন্দের** বার্তা।
- **বঞ্চনার বার্তা (কষ্ট):** উৎসবের এই দিনেও সে তার পিসিমার বাড়িতে **নেমন্তন্ন পেল না**। এটি তাকে তার **দারিদ্র্য** এবং **পারিবারিক অবহেলার** কথা মনে করিয়ে দিল।
- **বৈষম্যের বার্তা:** সে নেপালের কাছ থেকে উৎসবের **বিপুল খাবারের বর্ণনা** শুনল, যা তার ক্ষুধার্ত মনকে আরও কষ্ট দিল।
অর্থাৎ, তালনবমীর উৎসব গ্রামের ধনী ও সম্পন্ন পরিবারের জন্য **আনন্দের** বার্তা নিয়ে এলেও, গোপালদের মতো দরিদ্রদের জন্য তা ছিল কেবলই **বঞ্চনা, ক্ষুধা ও গভীর হতাশার** বার্তা।