বাংলা সাহিত্য (পঞ্চম শ্রেণি)
চতুর্বিংশ পাঠ: বোম্বাগড়ের রাজা (সুকুমার রায়) – নোটস ও উত্তর
**উৎস:** আবোল তাবোল কাব্যগ্রন্থ | **কেন্দ্রীয় ভাবমূল:** উদ্ভট কল্পনার জগৎ, হাস্যরস ও অসঙ্গতি।
—১. কবি পরিচিতি (Author Information)
**সুকুমার রায় (১৮৮৭-১৯২৩):** তিনি ছিলেন বাংলার শিশুসাহিত্যের এক কিংবদন্তী। বিখ্যাত সাহিত্যিক উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর ছেলে এবং সত্যজিৎ রায়ের বাবা। তাঁর লেখাগুলি **ননসেন্স রাইম (Nonsense Rhyme)** বা উদ্ভট রচনার জন্য বিখ্যাত। তাঁর রচনায় **অসঙ্গতিপূর্ণ চিত্রকল্প** এবং **হাস্যরস** প্রাধান্য পায়। তাঁর বিখ্যাত রচনাগুলি হলো—**’আবোল তাবোল’, ‘হ-য-ব-র-ল’, ‘পাগলা দাশু’** এবং **’ঝালাপালা’**।
—২. সারসংক্ষেপ (Summary)
‘বোম্বাগড়ের রাজা’ কবিতাটিতে কবি **সুকুমার রায়** তাঁর **উদ্ভট কল্পনার জগত** বা **’বোম্বাগড়’**-এর পরিচয় দিয়েছেন। এই রাজ্যটি **হাস্যকর ও অসঙ্গতিপূর্ণ** নিয়মে চলে।
১. **রাজা ও রাজত্ব:** বোম্বাগড়ের রাজা **হাঁড়িপানা** মুখ করে বসে থাকেন, অথচ তিনি **গান** গাইতে ভালোবাসেন। তাঁর রানীর **সর্দির বাতিক**, আর রাজার মন্ত্রীর **মাথা ভর্তি খই**। ২. **রীতিনীতি:** সেখানে লোকে **জোড়াতালি** দিয়ে কাপড় পরে। গরুর গাড়ির আগে **উট** জোতা হয়। চোরেরা যখন চুরি করে, তখন তাদের **গলায় মালা** পরানো হয়। ৩. **আচার ও ব্যবহার:** সেখানে **দিনে** বাতি জ্বেলে, আর **রাতে** সব নিভিয়ে রাখা হয়। রাজার আদেশে কবিকে **চক্ষু বুঁজে** থাকতে হয়। সেখানে কেউ কখনও **কষ্ট** পায় না বা **কঠিন কথা** বলে না।
কবিতাটি এমন এক রাজ্যের কল্পনা করে, যেখানে **বাস্তবের কোনো নিয়ম** খাটে না, কেবল **উদ্ভটতা ও আনন্দই** প্রধান।
—৩. গুরুত্বপূর্ণ শব্দার্থ ও ব্যাখ্যা (Key Vocabulary)
| বাংলা শব্দ | অর্থ | প্রাসঙ্গিকতা |
|---|---|---|
| **বোম্বাগড়** | উদ্ভট ও কাল্পনিক রাজ্য (Nonsense Land) | কবিতাটি **বোম্বাগড়ের রাজা** ও তার রাজ্য নিয়ে লেখা। |
| **হাঁড়িপানা** | হাঁড়ির মতো দেখতে, এখানে গোমড়া বা গম্ভীর | বোম্বাগড়ের রাজা **হাঁড়িপানা** মুখ করে বসে থাকেন। |
| **সর্দির বাতিক** | ঠান্ডা লাগার বাতিক, সব সময় হাঁচি-কাশি | রাজার রানীর **সর্দির বাতিক**। |
| **খই** | মুড়ি, ভাজা ধান | রাজার মন্ত্রীর মাথা ভর্তি **খই**। |
| **জোড়াতালি** | অগোছালোভাবে সেলাই করা বা মেরামত করা | সেখানকার লোকে **জোড়াতালি** দিয়ে কাপড় পরে। |
| **জোতা** | জুড়ে দেওয়া, বাঁধা | গরুর গাড়ির আগে **উট** জোতা হয়। |
| **বুঁজে** | বন্ধ করে, মুদে | রাজার আদেশে কবিকে **চক্ষু বুঁজে** থাকতে হয়। |
| **কষ্ট** | দুঃখ, বেদনা | সেখানে কেউ কখনও **কষ্ট** পায় না। |
৪. হাতেকলমে (অনুশীলনী ও অতিরিক্ত প্রশ্ন ও উত্তর)
(এখানে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ সংক্ষিপ্ত ও রচনাধর্মী প্রশ্নের উত্তর দেওয়া হলো।)
সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন ও উত্তর (মান: ২ নম্বর):
১. বোম্বাগড়ের রাজার মুখ কেমন? তাঁর রানীর কী বাতিক ছিল?
বোম্বাগড়ের রাজার মুখ **হাঁড়িপানা (গোমড়া)** করে থাকে, যদিও তিনি গান গাইতে ভালোবাসেন। তাঁর রানীর **সর্দির বাতিক** ছিল।
২. বোম্বাগড়ের মন্ত্রী ও সভার চিত্র কেমন ছিল?
বোম্বাগড়ের রাজার মন্ত্রীর **মাথা ভর্তি খই**। সেখানে সভার সকলেই **চক্ষে চশমা** পরে থাকেন এবং কেউ কখনও **কষ্ট** পায় না।
৩. বোম্বাগড়ে দিনের বেলায় কী নিয়ম চলে?
বোম্বাগড়ে দিনের বেলায় এক উদ্ভট নিয়ম চলে—**দিনে বাতি জ্বেলে** রাখা হয়, আর **রাতে সব বাতি নিভিয়ে রাখা হয়**।
৪. বোম্বাগড়ের লোকেদের পোশাক ও যানবাহনের ব্যবস্থা কেমন ছিল?
সেখানকার লোকে **জোড়াতালি** দিয়ে কাপড় পরে। যানবাহনের জন্য **গরুর গাড়ির আগে উট** জোতা হয়।
৫. বোম্বাগড়ে চোরদের কী করা হয়? এটি কেন হাস্যকর?
বোম্বাগড়ে চোরেরা চুরি করলে তাদের **গলায় মালা** পরানো হয়। এটি হাস্যকর, কারণ সাধারণত চোরদের শাস্তি দেওয়া হয়, কিন্তু সেখানে পুরস্কারের মতো মালা পরিয়ে সম্মান জানানো হয়।
৬. রাজাকে কেন চক্ষু বুঁজে থাকতে হয়?
রাজার আদেশে কবিকে **চক্ষু বুঁজে** (চোখ বন্ধ করে) থাকতে হয়। এটি সম্ভবত বোম্বাগড়ের উদ্ভট নিয়মের অংশ, অথবা রাজা এমন অদ্ভুত কর্মকাণ্ড করেন যা কবিকে দেখতে বারণ করা হয়েছে।
৭. কেন বোম্বাগড়ে কেউ কঠিন কথা বলে না?
বোম্বাগড় হলো **আনন্দ ও উল্লাসের** রাজ্য। এই রাজ্যে **কষ্ট** বা **দুঃখ** নেই। কঠিন কথা দুঃখ বা খারাপ অনুভূতির সৃষ্টি করে, যা এই রাজ্যের পরিবেশের সঙ্গে বেমানান, তাই কেউ কঠিন কথা বলে না।
৮. বোম্বাগড়ের রাজার চারিত্রিক অসঙ্গতি লেখো।
বোম্বাগড়ের রাজার চারিত্রিক অসঙ্গতি হলো—তাঁর **মুখ সবসময় হাঁড়িপানা (গোমড়া)** করে থাকে, কিন্তু তিনি **গান গাইতে** ভালোবাসেন। গোমড়া মুখের সঙ্গে গান গাওয়ার শখ অসঙ্গতিপূর্ণ।
রচনাধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর (মান: ৫ নম্বর):
১. ‘বোম্বাগড়ের রাজা’ কবিতায় বর্ণিত বোম্বাগড়ের উদ্ভট রীতিনীতিগুলি আলোচনা করো।
বোম্বাগড় হলো সুকুমার রায়ের কল্পনায় আঁকা এক উদ্ভট রাজ্য, যেখানে বাস্তবের কোনো নিয়ম খাটে না। রীতিনীতিগুলি ছিল:
- **পোশাক ও যানবাহন:** সেখানকার লোকেরা **জোড়াতালি** দেওয়া পোশাক পরে। গরুর গাড়িতে গরুর বদলে **উট** জোতা হয়।
- **আইন:** সেখানে চোরেরা চুরি করলে তাদের **গলায় মালা** পরানো হয়। অর্থাৎ অপরাধের শাস্তি না দিয়ে সম্মান জানানো হয়।
- **আলো ও অন্ধকার:** সেখানে **দিনে বাতি জ্বালিয়ে** রাখা হয় এবং **রাতে সব নিভিয়ে** রাখা হয়। এটি প্রচলিত পদ্ধতির সম্পূর্ণ উল্টো।
- **আচার-আচরণ:** রাজার মুখ **হাঁড়িপানা** হলেও তিনি গান গাইতে ভালোবাসেন। রানীর **সর্দির বাতিক** আর মন্ত্রীর মাথা **খই-ভর্তি**।
এই সমস্ত উদ্ভট রীতিনীতিগুলি এই রাজ্যের **অসঙ্গতিপূর্ণ চিত্রকল্প** ফুটিয়ে তুলেছে।
২. বোম্বাগড়কে কেন ‘ননসেন্স রাইম’ বা উদ্ভট রচনার আদর্শ উদাহরণ বলা যায়?
বোম্বাগড়কে উদ্ভট রচনার আদর্শ উদাহরণ বলার কারণ:
- **অসঙ্গতিপূর্ণ চিত্রকল্প:** রাজা গোমড়া মুখে গান গাইছেন, গরুর গাড়ির আগে উট জোতা হচ্ছে, আর মন্ত্রীর মাথা ভর্তি খই—এই সমস্ত চিত্রগুলি **বাস্তবে অসম্ভব ও যুক্তিহীন**।
- **প্রচলিত নিয়মের উল্টো:** দিনে আলো জ্বালানো আর রাতে আলো নেভানো, চোরকে মালা পরানো—এই রীতিনীতিগুলি **প্রচলিত সামাজিক ও প্রাকৃতিক নিয়মের সম্পূর্ণ বিপরীত**।
- **হাস্যরস:** এই সমস্ত অসঙ্গতিগুলি পাঠকের মধ্যে **কৌতুক ও নির্মল হাস্যরস** সৃষ্টি করে। উদ্ভট রচনার মূল উদ্দেশ্যই হলো এই কৌতুক সৃষ্টি করা।
সুকুমার রায় এই কবিতায় **যুক্তির শৃঙ্খলা** ভেঙে **কল্পনার অবাধ রাজ্যে** প্রবেশ করেছেন, তাই এটি ননসেন্স রাইমের সার্থক উদাহরণ।
৩. তোমার মতে বোম্বাগড়ের রাজার তিনটি সেরা উদ্ভট নিয়ম কী ছিল? তোমার যুক্তি দাও।
আমার মতে বোম্বাগড়ের রাজার তিনটি সেরা উদ্ভট নিয়ম হলো:
- **চোরকে মালা পরানো:** এই নিয়মটি সবচেয়ে উদ্ভট, কারণ চুরি একটি অপরাধ, যার জন্য শাস্তি দেওয়া উচিত। কিন্তু এখানে **পুরস্কার দেওয়া হয়**, যা ন্যায়বিচারের ধারণাকে সম্পূর্ণ উল্টে দেয়।
- **গরুর গাড়ির আগে উট জোতা:** উট মরুভূমির প্রাণী, যা পাহাড়ি পথ বা সমতলে গরুর গাড়িতে জোতার কথা নয়। এই কাজটি **স্থান ও প্রাণীর ব্যবহারিক অসঙ্গতি** তৈরি করে।
- **দিনে বাতি জ্বালানো ও রাতে নিভিয়ে রাখা:** এটি সবচেয়ে **অযৌক্তিক** নিয়ম। দিনের বেলায় সূর্যের আলোতে বাতি জ্বালানোর কোনো প্রয়োজন নেই। আর রাতে অন্ধকার দূর করার জন্য আলো না থাকলে জীবনের কাজ থেমে যায়।
এই তিনটি নিয়মই প্রমাণ করে যে বোম্বাগড়ের রাজার রাজত্ব **যুক্তিহীনতা ও কৌতুকের** ওপর প্রতিষ্ঠিত।