বাংলা সাহিত্য (পঞ্চম শ্রেণি)
তৃতীয় পাঠ: দারোগাবাবু এবং হাবু (ভবানীপ্রসাদ মজুমদার) – নোটস ও উত্তর
**উৎস:** সংকলিত | **কেন্দ্রীয় ভাবমূল:** অতিরিক্ত পশুপ্রেমের ফলে সৃষ্ট হাস্যরস ও জটিলতা।
—১. কবি পরিচিতি (Poet Information)
**ভবানীপ্রসাদ মজুমদার (জন্ম ১৯৫৩):** তিনি বাংলা শিশুসাহিত্যে একজন অত্যন্ত পরিচিত **ছড়াকার**। তাঁর ছড়াগুলি মজাদার হলেও তাতে শেখার বিষয় থাকে। তাঁর লেখার স্বীকৃতি হিসেবে তিনি ‘সুকুমার রায় শতবার্ষিকী পুরস্কার’, ‘সত্যজিৎ রায় পুরস্কার’ এবং ‘শিশুসাহিত্য পরিষদ পুরস্কার’-সহ বিভিন্ন পুরস্কারে সম্মানিত হয়েছেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে—**’মজার ছড়া’** এবং **’নাম তাঁর সুকুমার’**।
—২. সারসংক্ষেপ (Summary)
‘দারোগাবাবু এবং হাবু’ কবিতাটি একটি **হাস্যরসের ছড়া**। হাবু একদিন ভোরে থানায় গিয়ে **কান্নাজড়িত কণ্ঠে** বড়ো দারোগাবাবুর কাছে এক গুরুতর **অভিযোগ (নালিশ)** জানায়। তারা চারজন ভাই মাত্র একটি ঘরেই থাকে। হাবুর বড়দা সাতটি বেড়াল, মেজদা আটটি কুকুর এবং সেজদা দশটি ছাগল পুষেছে। এই সমস্ত পশুপাখির গন্ধে হাবুর **প্রাণ যায় যায়** অবস্থা।
দারোগাবাবু সহজ সমাধান হিসেবে হাবুকে পরামর্শ দেন যেন ঘরের **জানলা-দরজাগুলো সবসময় খুলে রাখা হয়**। এই কথা শুনে হাবু বেজায় **কাতর (কাবু)** হয়ে যায়। সে করুণ সুরে জানায় যে, সে নিজে **দেড়শো পোষা পায়রা** পোষে। জানলা-দরজা খুলে রাখলে তার **সব পায়রা উড়ে যাবে**। ফলে দারোগাবাবুর দেওয়া পরামর্শ হাবুর নিজের জন্যই কার্যকর হয় না। কবিতাটি অতিরিক্ত পশুপ্রেমের ফলে সৃষ্ট হাস্যকর জটিলতাকে তুলে ধরে।
—৩. গুরুত্বপূর্ণ শব্দার্থ (Word Meanings)
| বাংলা শব্দ | অর্থ | বাক্য রচনা (নমুনা) |
|---|---|---|
| **নালিশ** | অভিযোগ | ছেলেটি তার বন্ধুর নামে **নালিশ** জানাল। |
| **বারণ** | নিষেধ, মানা | বড়রা খারাপ কাজ করতে **বারণ** করেন। |
| **সদাই** | সবসময় | মা **সদাই** আমার পাশে থাকেন। |
| **কাবূ** | কাহিল, কাতর, দুর্বল | অসুস্থতার জন্য লোকটি **কাবূ** হয়ে পড়েছে। |
| **করুণ** | কাতর, বেদনাপূর্ণ, মর্মস্পর্শী | হাবুর কথাগুলো ছিল **করুণ** সুরে ভরা। |
| **পাগল** | উন্মাদ, এখানে অতিরিক্ত শখের কারণে বুদ্ধিহীন | সেজদার ছাগল পোষা দেখে মনে হয় সে যেন **পাগল**। |
৪. হাতেকলমে (অনুশীলনী প্রশ্ন ও উত্তর)
(অনুশীলনী এবং অতিরিক্ত প্রশ্ন ও উত্তর নিচে দেওয়া হলো।)
সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন ও উত্তর (মান: ২ নম্বর):
১. হাবু কার কাছে, কখন নালিশ জানাতে গিয়েছিল?
হাবূ **থানায়** গিয়ে **বড়ো দারোগাবাবুর** কাছে নালিশ জানাতে গিয়েছিল। সে গিয়েছিল **সেদিন ভোরে**।
২. হাবু ও তার দাদারা মোট কটি পশু-পাখি পুষতো?
হাবু ও তার দাদারা পোষা মোট পশু-পাখির সংখ্যা হলো: (৭টি বেড়াল + ৮টি কুকুর + ১০টি ছাগল + ১৫০টি পায়রা) = **১৭৫টি**।
৩. সেজদার পোষা প্রাণীর সমস্যা কী ছিল?
হাবুর সেজদা ঘরেই দশটা ছাগল বেঁধে রাখতেন। ছাগলের **দুর্গন্ধে (গন্ধে)** হাবুর **প্রাণ যায় যায়** অবস্থা হয়েছিল।
৪. দারোগাবাবু হাবুকে কী পরামর্শ দিয়েছিলেন?
দারোগাবাবু হাবুকে পরামর্শ দিয়েছিলেন যে, তারা যেন ঘরের **জানলা-দরজাগুলো সদাই (সবসময়) খুলে রাখে**।
৫. হাবু কেন দারোগাবাবুর পরামর্শ মানতে পারেনি?
দারোগাবাবুর পরামর্শ মেনে ঘরের জানলা-দরজা খুলে রাখলে হাবুর পোষা **দেড়শো পায়রা** সব **উড়ে যাবে**। তাই হাবু এই পরামর্শ মানতে পারেনি।
রচনাধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর (মান: ৫ নম্বর):
১. হাবুর করুণ অবস্থার জন্য সে নিজেও কীভাবে দায়ী ছিল, তা আলোচনা করো।
হাবুর করুণ অবস্থার জন্য তার দাদাদের অতিরিক্ত পশুপ্রেম দায়ী হলেও, হাবু নিজেও কম দায়ী ছিল না।
- **অতিরিক্ত পশুপ্রেম:** হাবুর দাদারা মোট ২৫টি পশু পুষত, কিন্তু হাবু একাই **দেড়শোটি পায়রা** পোষে। পশুর গন্ধের জন্য সে কষ্ট পেলেও পায়রাদের জন্য সে কোনো ঝুঁকি নিতে নারাজ।
- **অসহযোগিতা:** দাদাদের পশুদের দুর্গন্ধের অভিযোগ করতে গেলেও সে নিজের পোষা পায়রাদের কথা গোপন রেখেছিল। দারোগাবাবুর পরামর্শে যখন সমস্যা সমাধানের পথ আসে, তখন **নিজের স্বার্থের** কারণে সে সেই পথে হাঁটেননি।
- **অযৌক্তিকতা:** একটি মাত্র ঘরে এতগুলো প্রাণী (মোট ১৭৫টি) রাখা যে কেবল অস্বাস্থ্যকর নয়, **অযৌক্তিকও**—এই সাধারণ জ্ঞান হাবুর ছিল না।
সুতরাং, হাবুর নিজের **অতিরিক্ত পায়রাপ্রীতি** এবং সমস্যার মূল কারণকে উপেক্ষা করার প্রবণতাই তার দুঃখের প্রধান কারণ ছিল।
২. ‘দারোগাবাবু এবং হাবু’ কবিতাটিতে হাস্যরসের আড়ালে কী সামাজিক সমস্যা ফুটে উঠেছে, লেখো।
ভবানীপ্রসাদ মজুমদারের ছড়াটি মূলত হাস্যরস সৃষ্টি করলেও এর আড়ালে একটি গুরুত্বপূর্ণ **সামাজিক সমস্যা** ফুটে উঠেছে:
- **সংকীর্ণ বাসস্থান ও ভিড়:** চারজন প্রাপ্তবয়স্ক ভাই এবং তাদের বিপুল সংখ্যক পশুপাখির মাত্র **একটি ঘরে** বসবাস করার সমস্যাটি গ্রাম বা শহরের **সংকীর্ণ বাসস্থানের** সমস্যাকে তুলে ধরে।
- **সহনশীলতার অভাব:** হাবুর নালিশের মূলে রয়েছে **পারস্পরিক সহনশীলতার অভাব**। প্রতিটি ভাই নিজের শখকে প্রাধান্য দিয়েছে, কিন্তু অন্যের সমস্যা নিয়ে ভাবেনি।
- **সমাধানের জটিলতা:** দারোগাবাবুর সহজ সমাধান (জানলা খোলা) বাস্তবে হাবুর নিজের শখের কারণে **জটিল** হয়ে ওঠে। এটি দেখায় যে, ব্যক্তিগত স্বার্থের কারণে সহজ সমস্যাও কীভাবে জটিল আকার ধারণ করতে পারে।
তাই, কবিতাটি হাসির আড়ালে **অতিরিক্ত ব্যক্তিগত শখ, সংকীর্ণ বাসস্থানে সহাবস্থান এবং পারস্পরিক বোঝাপড়ার অভাবের** মতো বাস্তব সমস্যাকে ইঙ্গিত করে।