বাংলা সাহিত্য (পঞ্চম শ্রেণি)
ত্রয়োদশ পাঠ: মধু আনতে বাঘের মুখে (শিবশঙ্কর মিত্র) – নোটস ও উত্তর
**উৎস:** সুন্দরবন সমগ্র | **কেন্দ্রীয় ভাবমূল:** সুন্দরবনের প্রাকৃতিক বিপদের মধ্যে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে জীবিকা অর্জন ও সাহসিকতা।
—১. লেখক পরিচিতি (Author Information)
**শিবশঙ্কর মিত্র (১৯০৯-১৯৯২):** তাঁর জন্ম বাংলাদেশের খুলনা জেলার বেলফুলি গ্রামে। তাঁর লেখালেখির প্রধান বিষয় ছিল **সুন্দরবন**। তিনি সেখানে দীর্ঘদিন সময় কাটিয়েছিলেন। তাঁর **’সুন্দরবন’** বইটির জন্য তিনি ভারত সরকার থেকে **শ্রেষ্ঠ শিশুসাহিত্যের পুরস্কার** (১৯৬২ সালে) পান। সুন্দরবন নিয়ে লেখা তাঁর অন্যান্য বইগুলি হলো—**’সুন্দরবনের আর্জান সর্দার’, ‘বনবিবি’, ‘বিচিত্র এই সুন্দরবন’** এবং **’রয়েল বেঙ্গলের আত্মকথা’**। আলোচ্য পাঠ্যাংশটি তাঁর **’সুন্দরবন সমগ্র’** বই থেকে নেওয়া হয়েছে।
—২. সারসংক্ষেপ (Summary)
গল্পটি সুন্দরবনের গভীর বনে **মধু সংগ্রহকারী (মউলি)** তিনজনের—**ধনাই, আর্জান ও কফিলের**—অভিযান ও বিপদ থেকে বেঁচে ফেরার কাহিনি। মধু কাটতে তিনজন লোক চাই: একজন **চট মুড়ি দিয়ে চাক কাটে** (ধনাই), একজন **মশাল জ্বেলে মৌমাছি তাড়ায়**, এবং তৃতীয় জন **ধামা হাতে চাকের নীচে** দাঁড়ায়।
তারা মধু সংগ্রহ করে কলস প্রায় ভরে ফেলেছিল। চাক খুঁজতে খুঁজতে তারা গভীর বনের **’ট্যাক’** নামক একটি ত্রিভুজাকার জমির কাছে পৌঁছায়। ধনাই সবার আগে যাচ্ছিল। আর্জান একটি চাক লক্ষ্য করে কাদা ছুঁড়ে মারলে মৌমাছি তাড়া করে, আরজানেরা ঝোপের আড়ালে লুকায়। এদিকে ধনাই একটি **’শিষে’ (ছোটো সরু খাদ)** পার হতে গিয়ে **বাঘের আক্রমণের** শিকার হয়। বাঘটি ধনাইকে লক্ষ্য করে ঝাঁপ দিলেও, মাঝের **তল্লা গাছটাতে** ধাক্কা খায় এবং শিষের মধ্যে পড়ে যায়। বাঘটি কলস ভাঙার ফলে **মধু ছিটকে** তার চোখে-মুখে পড়লে সে চোখমুখ কুঁচকে ফ্যোঁৎ ফ্যোঁৎ করতে থাকে। ধনাই এই ফাঁকে প্রাণে বেঁচে যায়।
—৩. গুরুত্বপূর্ণ শব্দার্থ ও ব্যাখ্যা (Key Vocabulary)
| বাংলা শব্দ | অর্থ | প্রাসঙ্গিকতা |
|---|---|---|
| **নাস্তা** | জলখাবার | মধু কাটতে যাওয়ার আগে পেটপুরে **নাস্তা** খেয়েছিল। |
| **মউলি** | মধু সংগ্রহকারী ব্যক্তি | সুন্দরবনের মধু সংগ্রহকারীরা **মউলি** নামে পরিচিত। |
| **চট** | পাটের সুতো থেকে তৈরি মোটা কাপড় | চাক কাটার সময় একজন **চট** মুড়ি দিয়ে গাছে ওঠে। |
| **ধামা** | শস্য রাখা বা মাপার জন্য তৈরি বেতের ঝুড়ি | একজন **ধামা** হাতে চাকের নীচে দাঁড়ায়। |
| **গোঁয়ার্তুমি** | অসহযোগিতা বা জেদপূর্ণ আচরণ | লোকে ভাবত ধনাই **গোঁয়ার্তুমি** করেই মধু কাটে। |
| **ট্যাক্** | দুটি ছোটো নদী মিশে তৈরি হওয়া ত্রিভুজাকার জমির মাথা | ধনাইরা **ট্যাকের** দিকে একটি চাক দেখেছিল। |
| **শিষে** | ছোটো সরু খাদ বা নালা | ধনাই **শিষে** পার হতে গিয়ে বাঘের আক্রমণের মুখে পড়ে। |
| **শূলো** | শ্বাসমূল (ম্যানগ্রোভ উদ্ভিদের শ্বাস নেওয়ার জন্য মাটির ওপর উঠে আসা অংশ) | বনের ভেতরে **শূলো** ডিঙিয়ে যেতে হয়। |
৪. হাতেকলমে (অনুশীলনী ও অতিরিক্ত প্রশ্ন ও উত্তর)
(এখানে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ সংক্ষিপ্ত ও রচনাধর্মী প্রশ্নের উত্তর দেওয়া হলো।)
সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন ও উত্তর (মান: ২ নম্বর):
১. মধু কাটতে গেলে কতজন লোকের প্রয়োজন হয়? তাদের কাজ কী কী?
মধু কাটতে গেলে **তিনজন** লোকের প্রয়োজন হয়। ১. একজন **চট মুড়ি দিয়ে গাছে উঠে চাক কাটে**। ২. একজন **মশাল জ্বেলে ধোঁয়া দিয়ে মৌমাছি তাড়ায়**। ৩. একজন **ধামা হাতে চাকের নীচে দাঁড়ায়**।
২. লোকেরা কেন মনে করত ধনাই ‘মন্ত্র’ জানে না?
ধনাই নিজে বলত যে সে মধু কাটার মন্ত্র জানে। কিন্তু লোকেরা তা বিশ্বাস করত না। তারা ভাবত ধনাই আসলে **গোঁয়ার (জেদি)**, তাই সে **গোঁয়ার্তুমি** করেই মন্ত্র ছাড়াই মধু কাটে।
৩. মধুকররা কোন পথে মধু খুঁজতে যেত?
মধু খুঁজতে যাওয়ার জন্য **মৌমাছি ফুল থেকে মধু নিয়ে কোন দিকে ছুটে চলেছে**, তা লক্ষ করা হয় এবং সেই **মৌমাছির পিছু পিছু** সেদিকে যাওয়া হয়।
৪. সুন্দরবনের বনের প্রাকৃতিক পরিবেশ কেমন ছিল?
শীতের শেষে সুন্দরবনের বনে **গরান গাছের হলদে রঙের ছোটো ছোটো ফুল** ধরেছিল। সকাল থেকে ফুলের গন্ধে, হলুদ রঙে ও মৌমাছির গুঞ্জনে বন মেতে উঠেছিল। বনের ভেতরে হাঁটাচলার জন্য **শূলো** (শ্বাসমূল) ডিঙিয়ে যেতে হয়।
৫. ধনাই কেন কাস্তে ও চটের সাথে একটা মোটা লাঠিও নিয়েছিল?
ধনাই মধু নিয়ে যখন ফিরছিল, তখন মাথায় **মধুর কলস** ছিল। সারা বনে শূলো ডিঙিয়ে চলতে গিয়ে **হোঁচট খাবার সম্ভাবনা** ছিল। কলস পড়ে যাওয়া থেকে বাঁচতে হোঁচট সামলানোর জন্য ধনাই লাঠিটি নিয়েছিল।
৬. আর্জান কেন চাক লক্ষ্য করে কাদা ছুঁড়ে মেরেছিল?
ট্যাকের কাছে একটি গরান গাছে চাক দেখে ধনাই বলেছিল তাতে মধু নেই। কিন্তু আর্জান **ধনাইকে বিশ্বাস করতে চায়নি**। চাকটিতে মধু আছে কিনা পরীক্ষা করার জন্য সে এক থাবা কাদা তুলে গোল করে পাকিয়ে সেটি চাক লক্ষ্য করে ছুঁড়ে মেরেছিল।
৭. শিষ কী? ধনাই কীভাবে শিষ পার হতে চেয়েছিল?
**শিষ** হলো তিন-চার হাত চওড়া একটি **ছোটো সরু খাদ বা নালা**। কলস মাথায় নিয়ে লাফ দিয়ে পার হওয়া ধনাইয়ের পক্ষে সম্ভব ছিল না। তাই সে তার **দীর্ঘ লাঠিখানা সাঁকোর মতো** করে শিষের এপার-ওপার ফেলে পার হতে চেয়েছিল।
৮. বাঘ ঝাঁপিয়ে পড়ার পরেও ধনাই কীভাবে প্রাণে বেঁচে গেল?
বাঘটি ধনাইকে লক্ষ্য করে ঝাঁপ দিলেও, ধনাইয়ের সামনে থাকা **তল্লা গাছটা** ধরে সে শিষ পার হতে চেয়েছিল। বাঘের মাথা সেই গাছটাতে **ঠোক্কর** খায় এবং বাঘ উলটে শিষের গর্তে পড়ে যায়। এইভাবে বাঘের সরাসরি আক্রমণ থেকে ধনাই বেঁচে যায়।
৯. বাঘ কেন চোখমুখ কুঁচকে ‘ফ্যোঁৎ ফ্যোঁৎ’ শব্দ করতে লাগল?
বাঘ যখন শিষের গর্তে পড়ে যায়, তখন ধনাইয়ের **মাথার মধুর কলসটি ভেঙে** তার উপর পড়ে। বাঘের সারা মুখে, নাকে ও চোখে **মধু ছিটকে পড়ায়** সে অস্বস্তিতে ও জ্বালায় চোখমুখ কুঁচকে **’ফ্যোঁৎ ফ্যোঁৎ’** শব্দ করতে লাগল।
রচনাধর্মী প্রশ্ন ও উত্তর (মান: ৫ নম্বর):
১. ‘মধু আনতে বাঘের মুখে’ গল্পে মধু সংগ্রহকারীদের কাজ ও তার ঝুঁকি বর্ণনা করো।
সুন্দরবনে মধু সংগ্রহ করা একটি **অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ কাজ**।
- **কাজের ধরণ:** মধু কাটতে তিনজন মউলি লাগে—একজন **চাক কাটে**, একজন **ধোঁয়া দিয়ে মৌমাছি তাড়ায়** এবং অন্যজন **ধামা হাতে নীচে চাকের মধু ধরে**। মধু সংগ্রহকারীরা **’মধু আনতে বাঘের মুখে’** যায়।
- **ঝুঁকি:**
- **হিংস্র পশু:** সুন্দরবন হলো **রয়েল বেঙ্গল টাইগার**-এর বাসস্থান। যেকোনো মুহূর্তে বাঘের আক্রমণে প্রাণহানির আশঙ্কা থাকে।
- **মৌমাছির আক্রমণ:** ভুল পথে চালিত হলে লক্ষ লক্ষ মৌমাছি ছেঁকে ধরে কামড়ে মেরে ফেলতে পারে।
- **প্রাকৃতিক প্রতিবন্ধকতা:** বনের ভেতরে শূলো ডিঙিয়ে, খাড়ির **শিষে** পেরিয়ে, হোঁচট খাওয়ার ঝুঁকি নিয়ে পথ চলতে হয়।
এই গল্পে বাঘের আক্রমণ থেকে ধনাইয়ের বেঁচে যাওয়া প্রমাণ করে যে, এই কাজে **জীবনের ঝুঁকি** কতটা বেশি।
২. ধনাইয়ের বুদ্ধিমত্তা নাকি ভাগ্য— কোনটি তাকে বাঘের হাত থেকে বাঁচিয়েছিল? যুক্তিসহ আলোচনা করো।
ধনাইকে বাঘের হাত থেকে বাঁচানোর পিছনে মূলত **ভাগ্যই** প্রধান ছিল, তবে তার **উপস্থিত বুদ্ধি** তাকে সাহায্য করেছিল।
- **ভাগ্যের ভূমিকা:**
- বাঘটি ঝাঁপিয়ে পড়ার সময় ধনাইকে ডিঙিয়ে **তল্লা গাছের** উপর আঘাত করে শিষের মধ্যে পড়ে যায়। এটি ছিল সম্পূর্ণ **দৈব ঘটনা**।
- তল্লা গাছটা তাকে বাঁচালেও বাঘের লেজের বাড়ি তার মাথায় লাগে। তখন কলসটি ভেঙে মধু বাঘের চোখে মুখে পড়লে বাঘ বেকায়দায় পড়ে—এটিও ছিল **অনাকাঙ্ক্ষিত শুভ ঘটনা**।
- **বুদ্ধিমত্তা/সাহসিকতা:** ধনাই বিপদ বুঝে **শিষে পার হবার জন্য লাঠিখানা সাঁকোর মতো** ব্যবহার করেছিল এবং তল্লা গাছটি ধরেছিল। যদিও এটি বাঘের ফাঁদ ছিল না, তবে এটি তার **সতর্কতা** ও **উপস্থিত বুদ্ধি**র পরিচয় দেয়।
উপসংহারে বলা যায়, বাঘকে ফাঁদে ফেলার পরিকল্পনা ধনাইয়ের ছিল না। তাই **ভাগ্যের জোরেই** সে তল্লা গাছ ও মধুর কারণে বেঁচে যায়।
৩. সুন্দরবনের মধু সংগ্রহকারীদের জীবনের বিপদ কীভাবে এই গল্পে ফুটে উঠেছে?
এই গল্পটি সুন্দরবনের মধু সংগ্রহকারীদের জীবনের বিপদকে নিপুণভাবে তুলে ধরেছে:
- **হিংস্র পশুর ভয়:** গল্পের মূল বিপদ ছিল **রয়েল বেঙ্গল টাইগার**-এর আক্রমণ। ধনাইকে লক্ষ্য করে বাঘের ঝাঁপিয়ে পড়া সেই ভয়কে বাস্তবে রূপ দেয়।
- **প্রাকৃতিক বাধা:** সুন্দরবনের শ্বাসমূল (শূলো), ছোটো নদী ও খাদ (শিষে) পার হওয়া ছিল এক **কঠিন শারীরিক চ্যালেঞ্জ**। অসাবধান হলেই প্রাণ যেতে পারত।
- **মৌমাছির ঝুঁকি:** মধু কাটতে মন্ত্র জানার কথা বলা হয়েছে, কারণ একবার শত্রুর খোঁজ পেলে **লক্ষ লক্ষ মৌমাছি** কামড়ে মেরে ফেলতে পারে। আর্জানের কাদা ছোঁড়ার ঘটনায় মৌমাছির তাড়া করা সেই বিপদের ইঙ্গিত দেয়।
এই সমস্ত ঝুঁকি সত্ত্বেও, জীবনধারণের তাগিদে এই মউলিদের প্রতি বছর বনের গভীরে প্রবেশ করতে হয়, যা তাদের জীবনের চরম **সংগ্রাম ও সাহসিকতাকে** তুলে ধরে।
৪. ‘ট্যাক্’ ও ‘শিষে’-এর পরিচয় দিয়ে তাদের ভৌগোলিক তাৎপর্য আলোচনা করো।
**ট্যাক্:**
- **পরিচয়:** ‘ট্যাক’ হলো **দুটি ছোটো নদী মিশবার ফলে তৈরি হওয়া ত্রিভুজাকার জমির মাথা** বা প্রান্ত।
- **তাৎপর্য:** সুন্দরবনের নদী ও খাড়িগুলি ক্রমাগত তাদের গতিপথ পরিবর্তন করে। দুটি খাড়ি বা নদী মিশে গেলে মাঝে যে ভূখণ্ড তৈরি হয়, সেই প্রান্তভূমিকে স্থানীয়রা ‘ট্যাক’ বলে। এই জায়গাগুলো সাধারণত গাছপালা ও জীবজন্তুদের বিচরণের জন্য উপযুক্ত হয়।
**শিষে:**
- **পরিচয়:** ‘শিষে’ হলো **তিন-চার হাত চওড়া একটি ছোটো সরু খাদ বা নালা**।
- **তাৎপর্য:** সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চলে জোয়ার-ভাটার কারণে জলস্রোত ছোটো ছোটো নালা তৈরি করে। এই শিষগুলি মধু সংগ্রহকারীদের চলার পথে **গুরুত্বপূর্ণ বাধা** সৃষ্টি করে, যা তাদের দ্রুত চলাচলের জন্য সাঁকোর মতো পার হতে হয়।
৫. গল্পে সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্যের কোন কোন দিকের পরিচয় পাওয়া যায়?
গল্পে সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্যের নিম্নলিখিত দিকগুলির পরিচয় পাওয়া যায়:
- **উদ্ভিদ:** বনের মধ্যে **গরান গাছ** ও **তল্লা গাছের** উল্লেখ রয়েছে। এছাড়া ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চলের অন্যতম বৈশিষ্ট্য **শ্বাসমূল (শূলো)**-এর উল্লেখ রয়েছে।
- **প্রাণী:**
- **হিংস্র পশু:** বনের প্রধান আতঙ্ক হলো **বাঘ (রয়েল বেঙ্গল টাইগার)**।
- **পতঙ্গ:** মধু সংগ্রহের সূত্র ধরে **মৌমাছির** উল্লেখ রয়েছে।
- **জলজ পরিবেশ:** **নদী, খাড়ি, ট্যাক্, ও শিষের** মতো জলজ ও প্রান্তীয় ভূখণ্ডের বর্ণনা রয়েছে।
এই সমস্ত উপাদানগুলি একত্রিত হয়ে সুন্দরবনের **বিপজ্জনক কিন্তু সুন্দর পরিবেশকে** পাঠকের সামনে তুলে ধরে।